চারমিনার ও একটি অবিস্ফোরিত বোমার গল্প

এক বালকের দেখা মুক্তিযুদ্ধ সিরিজ

William A. S. Ouderland ছিলেন একমাত্র বিদেশি, যিনি আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে তাঁর অবদানের জন্য ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব পেয়েছিলেন। জন্মগতভাবে ডাচ হলেও তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। যুদ্ধে তার অভিজ্ঞতা নতুন নয়, জার্মান ও ডাচ ভাষায় দক্ষ হওয়ার কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৩৯–১৯৪৫ সময়কালে তিনি ডাচ আন্ডারগ্রাউন্ড রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্টে একইসাথে স্পাই ও গেরিলা হিসেবে  যুক্ত ছিলেন। সেকারণে সরাসরি যুদ্ধে সশস্ত্র অভিজ্ঞতা সহ তার ছিলো চতুর স্পাই কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা আর এ দুটো অভিজ্ঞতাই তিনি সাফল্যের সাথে কাজে লাগান আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে।

১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন টঙ্গীর বাটা সু কোম্পানির কোম্পানি ম্যানেজিং ডিরেক্টর । ওই সময় আমার বাবা কে,এম, আব্দুল হাই ছিলেন বাটা সু কোম্পানির তাঁর ইমিডিয়েট পরের পদেই কর্মরত। আমার বাবা ও ওডারল্যান্ড ছিলেন বন্ধুর মতো। আমাদের দেশ সম্বন্ধে জানার ছিলো তার গভীর আগ্রহ, প্রতিটা জিনিস তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গিজ্ঞেস করতেন আর অনায়াসে এদেশের যে কোন সামাজিক স্তরের মানষের সাথে মিশতে পারতেন। তিনি প্রায়ই আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতেন, একত্রে রাতের খাবার খেতেন আর ঘন্টার পর ঘন্টা আমাদের দেশের রাজনীতি ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে আমাদের আসন্ন সংঘাত নিয়ে আব্বার সাথে আলাপ করতেন। এভাবে দিনের পর দিন আলাপচারিতার মাধ্যমে আব্বা তাঁকে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন একান্ত আন্তরিক সহযোগীতে পরিণত করেন এবং তাঁর মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেন। ফলাফল সরূপ ১৯৭১ সালের পুরো সময়টাই তিনি আমাদের স্বাধিনতা যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ভাবে সম্পৃক্ত থেকে কাজ করা শুরু করেন ………………………। এরই স্বীকৃতি হিসেবে দেশ স্বাধীন হবার পর সরকা তাঁকে একমাত্র বিদেশী হিসেবে বীর প্রতীক খতাবে ভূষিত করেন এবং ১৯৯২ সালে বিজয় দিবসের আগের দিন ওনার পক্ষে আমার আব্বা তাঁর সে মেডেলটি ততকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার কাছ থেকে গ্রহণ করেন।

১৯৭১-এর ভয়াল সময়ে ওডারল্যান্ড আংকেলের বিশেষ অনুরোধে আব্বাকে ফ্যাক্টরি সরাসরি দেখাশোনার জন্য কলাবাগান ছেড়ে ফ্যাক্টরিসংলগ্ন গেস্টহাউসে সপরিবারে উঠে আসতে হয়। পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময়সহ প্রায় বছর দেড়েক আমরা টঙ্গীর বিশাল গেস্টহাউসের বাসায় থাকতাম। ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে ভারতীয় বিমানবাহিনী বিমান থেকে বাটা ফ্যাক্টরি চত্বরে আটটি বোমা ফেলে। তারা খুব সম্ভব বোমাগুলো ফেলতে চেয়েছিল বাটা ফ্যাক্টরির পাশেই টি,আই,সি (টেলিফোন ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন) ভবনের ওপর, যেখানে ছিল টঙ্গী অঞ্চলে হানাদার পাকিস্তানি মিলিটারির হেডকোয়ার্টার। ওই আটটি বোমার মধ্যে কয়েকটি বোমা পড়ে আমাদের বাসার কয়েকশ গজের মধ্যে। সবচেয়ে কাছে যে বোমাটি পড়েছিল তা ছিল আমাদের বাসা থেকে মাত্র ৫০-৬০ গজ দূরে। আমার মনে আছে, যেখানে যেখানে বোমা পড়েছিল সেখানেই বিশাল বিশাল পুকুরের মতো গভীর গোল গর্ত হয়ে গিয়েছিল ।আমাদের বাড়ির ওপরও বোমার অনেক অংশ এসে পড়ে, তবে তখন আমরা বাড়িতে ছিলাম না, আমরা ছিলাম কয়েকশ গজ দূরে ফ্যাক্টরির পশ্চিম পাশে একটা বিরাট W আকৃতির ট্রেঞ্চের ভেতরে। আব্বার কঠিন সিদ্ধান্তে আমরা রাতের খাবারের পর লেপ-তোশক নিয়ে বাটা ফ্যাক্টরির একদম পশ্চিম দিকে বিশাল স্টোররুমের ফ্লোরে আশ্রয় নিই। আমরা ছিলাম একটা বিরাট দল—আব্বা, মা, আমরা পাঁচ ভাই; আমার ছোট ভাইয়ের বয়স তখন মাত্র সাড়ে তিন মাস, আমাদের নানা, নানি, দুই মামা, চার খালা, বাসার দুজন কাজের লোক আর আমাদের গ্রামের দুজন মেহমান। সব মিলে মোট উনিশজন। আব্বা যদি সেদিন ওই সিদ্ধান্তটা না নিতেন আর যদি আমরা সেদিন বাসায় থাকতাম তাহলে আজ হয়তো এ লেখা লেখার সুযোগ আমার আর হতো না। এক একটি জীবন হচ্ছে আসলে এমন অসংখ্য সিদ্ধান্তের প্রক্ষেপণ। এসব অসংখ্য সিদ্ধান্ত একটা জীবনে অসংখ্য পথ খুলে দেয় আর সেই পথগুলো তখন আবার আরো নতুন নতুন পথ আমাদের জন্য খুলে দেয়। তাই জীবনের ছোট একটি সিদ্ধান্ত আমাদের জীবনটা সম্পূর্ণ এদিক-সেদিক করে দিতে পারে। সৃষ্টিকর্তা জীবনে আমাদের মাধ্যমে নানা রকমের সিদ্ধান্ত নেয়ান আর আমাদের জীবনের নানা সম্ভাবনার দরজা-জানালা খুলে দেন। তিনি হয়তো দেখতে চান আমরা সে সম্ভাবনাগুলোকে কীভাবে কাজে লাগাই।

তবে সেদিনের ঘটনা এখানে বলবো না, সে ঘটনা অনেক বড়ো। আজ শুধু বলবো সে রাতে ওই আটটি বোমার মধ্যে সাতটি বোমা আমাদের চতুর্দিকে বিস্ফোরিত হলেও একটি বোমা যেকোনো কারণেই হোক বিস্ফোরিত হয়নি। ওই রহস্যজনক বোমাটি বিস্ফোরিত না হয়ে মাটির গভীরে ঢুকে যায়। বোমাটি দীর্ঘদিন সেখানে ঘুমিয়ে থাকে। বোমাটি যেখানে মাটির ভেতর ঢুকে যায় সেখানে প্রায় তিন ফিট ডায়ামিটারের একটা সুড়ঙ্গের মতো তৈরি হয়। জায়গাটা ছিল ফ্যাক্টরি আর আমাদের বাসার মাঝামাঝি, আমাদের বাসা থেকে মাত্র প্রায় ১৫০ গজ দূরে। ১৬ ডিসেম্বরের পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা এসে জায়গাটা লাল রঙের দড়ি দিয়ে ঘিরে দেয় এবং একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়, যাতে লেখা ছিল—
“DANGER , OUT OF BOUND”

কোনো শ্রমিক বা কর্মকর্তা ভয়ে ওই এলাকার কাছে যেতো না, সে জন্য জায়গাটা হয়ে পড়ে জনশূন্য । আমি সব সময়ই বাটার ফ্যাক্টরি ক্যাম্পাসে বিনা কারণে ঘোরাঘুরি করতাম। আমাকে কেউ বাধা দিতো না। একদিন বিকালবেলা হঠাৎ কেন যেন মনে হলো ওই ঘুমন্ত বোমাটাকে দেখে আসি, কেন এমন দুর্মতি হয়েছিল জানি না। বলা হয়—”idle brain is devil’s workshop”। আসলেই তাই, যেহেতু তখন দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে, স্কুল তখনো খোলেনি, নানার পরিবার সবাই পিরোজপুর ফিরে গেছেন, সারা দিন কোনো কাজ নেই, তেমন কোনো সঙ্গীসাথিও নেই, তাই সারা দিন এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করা ছাড়া কোনো কাজ নেই। তবে ডেঞ্জার সাইন আর লাল দড়ির বেষ্টনী দেখে থমকে দাঁড়ালাম, ভয় ভয় করতে লাগলো, মনে হতে লাগলো এখন যদি কোনো কারণে বোমাটা ফেটে যায়?
তখন কী হবে?

একবার মনে হলো, না দরকার নেই রিস্ক নেওয়ার। কিন্তু ওই ডেভিল বা শয়তান তার লোভনীয় প্রলোভন ফাঁদ পেতে রাখে, তাকে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রে প্রলোভন ছিল একটা কমলা রঙের ইন্ডিয়ান চারমিনার সিগারেটের চকচকে প্যাকেট। প্যাকেটটা পড়ে ছিল বোমার গর্তের একদম মুখে, খুব সম্ভবত ভারতীয় সামরিক অফিসাররা বোমার অবস্থা পরিদর্শনে এসে এটা ফেলে গিয়েছিলেন। তখন আমাদের ছোটদের শখ ছিল সিগারেটের প্যাকেট সংগ্রহ করে তা দিয়ে তাস খেলা। চারমিনারের প্যাকেটটি ছিল আমার কাছে অভিনব। কেননা এর আগে এ ব্র্যান্ডের কোনো সিগারেটের প্যাকেট আমি দেখিনি কোনো দিন। আমি নিশ্চিত ছিলাম এই নতুন প্যাকেটটি দেখিয়ে আমি আমার প্রতিযোগীদের মাত করে দিতে পারবো। যেই ভাবা সেই কাজ, চারমিনারের আকর্ষণে ভয় কোথায় যেন উবে গেলো, আমি তখন লাল দড়ি অতিক্রম করে ডেঞ্জার এরিয়ার ভেতরে ঢুকে গেছি, এক দৌড়ে পৌঁছে গেছি একদম বোমার গর্তের সামনে মাটিতে পড়ে থাকা কমলা প্যাকেটটির দিকে। দৌড়ে গিয়ে প্যাকেটটি আমার হাফ প্যান্টের পকেটে চালান করে দিলাম। প্যাকেটটি নিয়ে আমি তখনই চলে আসতে পারতাম; কিন্তু ভাবলাম বোমার এতো কাছে যখন এসেই গেছি তখন একবার বোমার সুড়ঙ্গে ভালো করে উঁকি মেরে দেখে নিই না কেন, যদি বোমাটা দেখা যায়। জীবনে এমন সুযোগ তো আর আসবে না। সুতরাং হাঁটু গেড়ে বসে ঠিক বোমার সুড়ঙ্গের মুখে গলা ঢুকিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করতে লাগলাম।

তখনই ঘটলো বোমা ফাটার চেয়েও ভয়াবহ ঘটনাটা। হঠাৎ মানুষের হালকা কথাবার্তার শব্দ শুনতেই পেছনে তাকিয়ে দেখি লাল দড়ির কাছে পঁচিশ-ত্রিশজন মানুষ দাঁড়িয়ে। আমি তখনো বোমার সুড়ঙ্গের মুখে হাঁটু গেড়ে বসে আছি। ওই পঁচিশ-ত্রিশজন মানুষের সবাই অবাক বিস্ময়ে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন আমি কোনো ফাঁসিকাষ্ঠের আসামি। যারা তাকিয়ে আছে তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন স্বয়ং আমার আব্বা, তাঁর পাশে ওডারল্যান্ড আংকেল, আরো আছে বাটার অনেক বড়ো বড়ো অফিসার আর এই দলের মাঝে মধ্যমণির মতো দাঁড়িয়ে আছেন জলপাই রঙের স্মার্ট পোশাক পরা ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন খুব বড়ো অফিসার, খুব সম্ভব তিনি ছিলেন কর্নেল র‍্যাংকের কোনো বড়ো অফিসার। তাঁকে ঘিরে আছে আরো পাঁচ-সাতজন লম্বা লম্বা ভারতীয় সামরিক অফিসার। তাঁরা সেদিন সেখানে এসেছিলেন পরিকল্পিতভাবে বোমাটা ফাটানোর প্রস্তুতি মিটিংয়ে অংশ নিতে। মিটিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ফ্যাক্টরি চত্বর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের নিরাপত্তাবিষয়ক আর মিটিংয়ের পরই যদি দেখা যায় বাটার টপ কর্মকর্তার বড়ো ছেলে বোমার গর্তে কল্লা ঢুকিয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, তখন আব্বার আবস্থা যে কতো বিব্রতকর হতে পারে তা সহজেই বোঝা যায়।

আব্বার ভয়ে আমার সমস্ত শরীর তখন পাথরের মতো শক্ত আর স্থবির হয়ে গেছে। আমি কী ওই বোমার সুড়ঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে যাবো, না চোখ বন্ধ করে দৌড় শুরু করবো বুঝতে পারছি না। শরীরের সকল মাংসপেশি শক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু ওডারল্যান্ড ছিলেন অন্য ধাতুর মানুষ, তিনি আমাকে ভালোভাবে চিনতেন, সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমার সে ঘোর বিব্রতকর দুঃসময়ে তিনি আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলেন, হালকা ধমকে স্বরে তিনি বললেন,

“Hey boy, go home.”

তারপর ভারতীয় কর্নেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“Gentlemen, it’s not his fault, it’s our fault, we have dropped a bomb in the middle of his play ground.”

ওনার এ কথায় পরিস্থিতি হালকা হয়ে এলো, মনে হলো আমার শরীরে অনেকক্ষণ পর আবার রক্তপ্রবাহ শুরু হয়েছে। এক মুহূর্ত দেরি না করেই আমি এক দৌড়ে গেট পেরিয়ে সোজা বাসায় এসে ঘামতে লাগলাম। হাতে তখনো আঁকড়ে ধরে আছি চারমিনারের কমলা প্যাকেট। বাসায় এসে অপেক্ষা করছিলাম রাতের রাম প্যাদানির জন্য। তবে মানুষের জীবনে অনেক অলৌকিক ঘটনাও ঘটে আর সে রাতে এমন অলৌকিক ঘটনাই ঘটলো, আব্বা বাসায় এসে একবারের জন্যও আমাকে কিছু বললেন না। ভাবলাম, আব্বা হয়তো রাতে খেয়েদেয়ে শক্তি সঞ্চয় করে তারপর আমার ওপর অভিযান শুরু করবেন। তাই ঘুমানোর আগ পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করছিলাম কখন আব্বা ডাকবেন আর প্যাদানি শুরু করবেন। তবে চরম আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, তিনি আমাকে আর ডাকেননি বা এ ব্যাপারে একটি কথাও বলেননি। আমি ১০০% নিশ্চিত, ওডারল্যান্ড আংকেল নিশ্চয়ই আব্বাকে বারণ করেছিলেন তা না হলে ওই বয়সে আমার প্রচণ্ড রাগী আব্বা আমাকে এমনভাবে ছেড়ে দেওয়ার কথা না । অতীত অভিজ্ঞতা তা বলে না।

এ ঘটনার কয়েক দিন পর দেখা গেলো ভারতীয় সেনারা এসে শত শত বালির বস্তা দিয়ে বোমার স্থানটা ঢেকে দিলো, সেখানে নানা রকম যন্ত্রপাতি আর লম্বা লম্বা তার এনে জড়ো করা হলো। আমি পরাজিত ভিলেনের মতো কাঁটাতারের বেষ্টনীর অপর পাশে দাঁড়িয়ে সব কিছু লক্ষ করতাম, কাছাকাছি যাওয়ার আমার আর সাহস ছিল না, আর সেদিনের ঘটনার পর আমাকে এতো আদর করতো যেসব দারোয়ান, তারাও আমাকে আর ফ্যাক্টরি চত্বরে ঢুকতে দিতো না।

এদিকে চারদিকে মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হলো, দুদিন পর ওই বোমাটা ফাটানো হবে, তাই ওই এলাকার প্রত্যেক মানুষকে ওই দিন বোমার কেন্দ্র থেকে অন্তত দুই মাইল দূরে চলে যেতে হবে। সেদিন দুপুরের পর আমরা গাড়িতে করে বর্তমান এয়ারপোর্ট পার হয়ে রাস্তার পাশে অপেক্ষা করতে লাগলাম। নির্দিষ্ট সময়ে দেখলাম গুমগুম শব্দে বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটানো হলো। অসংখ্য বালির বস্তা আকাশে উড়তে লাগলো, ধোঁয়া ও ধুলায় মুহূর্তে চারদিক কালো হয়ে গেলো। আধাঘণ্টার মতো অপেক্ষার পর আমরা টঙ্গী ফিরে এসে দেখলাম, সব কিছু বালুতে ঢেকে গেছে। আমাদের বাসা থেকে সে বালি সরাতে সপ্তাহখানেক লেগেছিল। বালি সরে গেলো, কিন্তু সেই কমলা রঙের চকচকে চারমিনারের প্যাকেটটা আমার হৃদয় থেকে সরেনি কোনো দিন। অমূল্য গুপ্তধনের মতো সেটি আমি আগলে রেখেছিলাম বহুদিন।

২০০১ সালে ওডারল্যান্ড আংকেল অস্ট্রেলিয়ার পার্থে মৃত্যুবরণ করেন। শৈশবের বিশেষ কিছু স্মৃতি, বিশেষ কিছু বাক্য আমাদের মস্তিষ্ক খুব স্পষ্টভাবে সংরক্ষণ করে রাখে। কেন রাখে কে জানে। মনোবিজ্ঞানীরা এসব স্মৃতির নাম দিয়েছেন episodic memories, আমাদের মস্তিষ্ক মানবমনের বিশেষ বিশেষ স্পর্শকাতর ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত এই গভীর স্মৃতিগুলোকে খুব যত্নের সঙ্গে আমৃত্যু আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই আজও মনের গভীরে স্পষ্ট শুনতে পাই ওডারল্যান্ড আংকেলের সে আশকারা দেওয়া ধমক,

“Hey boy, go home… go home.”

মাহফুজুল হক জগলুল
২০২০-২০২১