জেওফ্রি বাওয়ার লোনা নদী: আইনজীবী থেকে স্থপতি  

১ম পর্ব

বাংলায় আমরা বলি ‘লোনা’, অর্থাৎ লবনাক্ত; সিংহলি ভাষায় এই ‘লোনা’ কে ওরা বলে লুনু, আর গঙ্গা বলতে ওরা বোঝায় নদী। তাই লুনুগঙ্গা নামের আক্ষরিক অর্থ হলো ‘লবনাক্ত নদী’। লুনুগঙ্গা নামের এই অদ্ভুত সুন্দর জলরাশির পাড়ে এসে দাঁড়াতেই মনে হলো এটা তো ঠিক নদী নয়। আমি নদীর দেশের মানুষ, নদীর বহমানতার ভাষা আমার চেনা। যতোই সুন্দর হোক নদী আর স্থির জলাশয়ের আবহ এক নয়। সেকারণে উপস্থিত গাইডকে জিজ্ঞেস করতেই সে বললো যে এটা আসলে কোন নদী নয়, এটা একটা হ্রদ, নাম দেদ্দুয়া হ্রদ। তবে হ্রদ হলেও এটা বেনতোতা নদীরই একটি সম্প্রসারিত অংশ, খরার সময় কাছেই ভারত মহাসাগর থেকে এখানে লবনাক্ত পানি ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কলম্বো থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরে এই হ্রদের কোল ঘেষে বেনতোতা অঞ্চলের এক পরিত্যক্ত  ওলন্দাজ দারুচিনি বাগানের প্রায় ১৫ একর জায়গার উপরই ট্রপিক্যাল মর্ডানিজম স্থাপত্য ধারার মহাগুরু জেফ্রি ম্যানিং বাওয়ার একান্ত নিজের বাগানবাড়ি বা কান্ট্রি হাউসের নাম হচ্ছে লুনুগঙ্গা এস্টেট। বাওয়া নিজেই এ নাম দিয়েছেন। দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে এটাই ছিলো বিশ্ব বিখ্যাত স্থপতি জেওফ্রি বাওয়ার স্থাপত্য ও ল্যান্ডস্কেপের বিভিন্ন ধরনের গবেষণা ও নিরীক্ষার একান্ত প্রয়োগের ক্ষেত্র।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের ১৮ তারিখ শ্রীলঙ্কা ইন্সটিটিউট অব আর্কিটেক্টস (SLIA) এর জাতীয় কনভেনশনে বাংলাদেশ স্থপতি ইন্সটিটিউটের প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছিলাম কলম্বো। দ্বিতীয় দিনের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা কঠিন কঠিন সব সেমিনার, আলোচনা সভা আর একের পর এক বক্তৃতার সাথে নানা দেশের রাস্ট্রদূতদের সাথে নানা রকম অতি ভদ্রোচিত আলাপ-সালাপের পর তৃতীয় দিনে অনুষ্ঠানের চাপ ছিলো কিছুটা কম। সারাটা দিন প্রায় ছুটি, শুধু সন্ধ্যা দিকে ওদের বিল্ড এক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সেদিন ওরা আয়োজন করলো আন্তর্জাতিক অতিথিদের জন্য জেওফ্রি বাওয়ার এই বাগানবাড়ি লুনুগঙ্গা পরিদর্শনের।

আমাদের বলা হলো কাঁটায় কাঁটায় সকাল নয়টায় কিংসবারি হোটেল লবিতে উপস্থিত থাকতে। আমাদের দলে আছেন আর্কেশিয়ার বর্তমান চেয়ারম্যান বাংলাদেশের প্রখ্যাত স্থপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড: আবু সাইদ ।  সাইদ ভাই বুয়েটে আমার পাঁচ বছরের সিনিয়র, তিতুমীর হলের রুমমেট আর এছাড়া আমি ছিলাম ওনার থিসিস প্রজেক্টের কামলা। সাথে আরো আছে দুইজন খুব কমিটেড তরুন ভারতীয় স্থপতি যারা উত্তর  ভারতের চন্ডিগড় অঞ্চলে গ্রামীণ জনপদের অল্প আয়ের মানুষের ঘরবাড়ি ডিজাইন করে খুব নাম করেছে আর আছে উত্তর কোরিয়ার স্থপতি গিবসন গানসাপ রিহ। গিবসন গরমের মধ্যেও সারাটা সময় দামি কোট-প্যান্ট পরে থাকে আর সাধারণত কথাবার্তা তেমন বলে না। কয়েকবার ওর সাথে ভাব জমাতে চেয়েছি কিন্তু তেমন কামিয়াব হতে পারিনি। গাড়িতে আমার পাশেই বসেছে গিবসন কিন্তু সারা রাস্তা আমার সাথে কোন কথা বলেনি। এছাড়া শ্রীলঙ্কান দু’জন খুব তরুন স্থপতি আছে সার্বক্ষণিক গাইড হিসেবে।এদের একজনের নাম ডন কেভিন। নামের সাথে ডন থাকলেও সে মোটেও ডন টাইপের না। বরং মাত্রাতিরিক্ত কোমল ও ভদ্র স্বভাবের এই ডন কেভিন সারাটা সময় ব্যস্ত থাকে কিভাবে আমাদের আরো বেশি আরাম দেয়া যায়, কিভাবে আমাদের ভ্রমণ আরো স্বাচ্ছন্দময় করা যায়।

ঘন্টাখানেক চলার পর গাড়ি এসে থামলো একটা বিশাল রোড সাইড ফুড কোর্টে । ফুড কোর্টের ডিজাইনটা খুবই আধুনিক আর চোখকাড়া। সবাই হই হই করে কফি খেতে নেমে গেলো । আমি মাত্র ভরপেট নাস্তা করেছি , আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছিলো না । সবাই দেখলাম কফি অর্ডার দিচ্ছে । আমি তেমন কফি প্রেমিক না । হাতের কাছে পেলে খাই , না পেলে নাই । ইতিহাস পড়ে যতোটুকু জেনেছি যে, খুব সম্ভবত কফি বিনের প্রথম আবিস্কার হয় ইথিয়পীয়ায়, তবে পঞ্চদশ শতাব্দীতে কফিকে পানীয় হিসেবে প্রথম পান করা শুরু করে ইয়ামেনের সুফি সাধকরা। সুফিরা মনে করতো কফি পান করলে তাদের আধ্যাত্মিকতার দৃষ্টি খুলে যাবে, নামাজ বা মোরাকাবায় ( ধ্যান) কন্সেন্ট্রেশন অনেক ভালো হবে। রমজানের সময় সারারাত জেগে থেকে প্রার্থনা করতে কফি তাদের অনেক সাহায্য করতো। অনেক সুফিরা বিশ্বাস করতেন কফির মাধ্যমে তাদের মধ্যে spiritual intoxication কার্যকর হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে তুর্কীরা যখন ইয়ামেন তাদের অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে নেয় তখন সেখান থেকে কফি খাওয়া শিখে তা সারা ইউরোপে ছড়িয়ে দেয় । ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকা ঘুরে বহু বছর পরে সেই কফি এখন আমাদের দেশে বেশ দাপিয়ে প্রবেশ করেছে কয়েক দশক আগে। এর আগে বৃটিশরা ১৮৩৭ সালে আসাম টি কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমাদের প্রথম ফ্রি চা খাইয়ে খাইয়ে চা খেতে শিখিয়েছে। আমাদের জীবনে গত এক শতাব্দীর থেকেও বেশি সময় ধরে চায়েরই প্রভাব বেশি। গত শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে চা খাওয়ার বর্ণনা যতো পাওয়া যায় সে তুলনায় কফির বর্ণনা প্রায় নাই বললেই চলে।

এই ইয়েমেনি সুফিদের সেই কফি এখন ইওরোপ ঘুরে আমাদের সমাজে এসেছে। তবে চা অর্ডার দেয়া যতো সহজ, কফি অর্ডার দেয়া ততো সহজ না আর আমার জন্য এটাই হচ্ছে প্রধান ঝামেলা। কফি খাওয়ার আগে একটা এক্সট্রা ঝামেলা হলো অর্ডার দেবার সময় একটা ছোটোখাটো ইন্টারভিউ দিতে হয়। আমেরিকানো, কাপাচিনো, মোকা, এক্সপেসো, লাটে, ফাটে, ফ্ল্যাট হোয়াইট, ব্ল্যাক কফি , সিঙ্গেল না ডাবল ইত্যাদি নানান পদের প্রশ্ন আর অপশন।  আমি ভালো করে বুঝি না কোনটা কি , তাই যখন দলেবলে খেতে হয় তখন আশেপাশের সফিস্টিকেটেড কেউ থাকলে সে যেটা অর্ডার করে সেটাই খুব গম্ভির ভাবে সবজান্তার মতো মাথা ঝুকিয়ে অর্ডার করে দেই । বেশির ভাগ সময়ই এ তরিকা ভালো কাজে দেয়, তবে মাঝে মাঝে পাশের সফিস্টিকেটেড মানুষটির অনুকরণ করতে গিয়ে কষটা ঘন কালো বিস্বাদময় এক ধরনের তরল বস্তু খুব আনন্দের সাথে উপভোগ করছি এমন একটা ভাব দেখিয়ে খুব কষ্টের সাথে গলাধঃকরণ করতে হয়েছে। তাই এসব ঝামেলার মধ্যে না গিয়ে আমি একা একা ঘুরে ঘুরে সুন্দর বিল্ডিংটা দেখতে লাগলাম।

দেশবিদেশে একা একা ঘুরতে আমার খুব ভালো লাগে। আমি পরীক্ষা করে দেখেছি একা একা ঘুরলে স্নায়ু ও চোখকান যেমন খোলা থাকে, খুটিয়ে খুঁটিয়ে সব কিছু দেখা যায়, দলেবলে ঘুরলে সেটা অনেক কম হয় , তখন নতুন দেশ, নতুন সমাজ দেখার চেয়ে আড্ডাবাজিতে আনন্দ ও ফোকাস থাকে অনেক বেশি। এ জন্যই বোধহয় ইবনে বতুতা বা মার্কো পলোর মতো পরিব্রাজকসহ যুগে যুগে সব বড় বড় পরিব্রাজকরা একা একা ভ্রমণ করতেন। ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম বিল্ডিংযের বাইরে সুন্দর ল্যান্ডস্কেসহ বিশাল পার্কিং স্পেস। এমন সময় দেখা হয়ে গেলো অন্য গাড়িতে আসা আমাদের সফর সঙ্গী এক শ্রীলঙ্কান স্থপতির সাথে । চোখে কালো সানগ্লাস, কালো দাড়ি আর কোলো লিনেনের শার্ট পরিহিত বিরাট বুকের ছাতিওয়ালা অনেকটা খাটো পালোয়ান টাইপ শারীরিক গঠনের শ্রীলঙ্কান স্থপতি সুপমল বান্দারা। ওর হাটাচলার মধ্যে একটা স্পোর্টসম্যান স্পোর্টসম্যান ভাব। সবসময়ই হাতপা নাড়াচাড়া করছে।হাতপা নাড়াচাড়া দেখে মনে ও এইমাত্র ফুটবল খেলতে মাঠে নেমেছে, হাত-পা নাড়িয়ে শরীর গরম করে নিচ্ছে। আমার সাথে এটাসেটা নিয়ে কিছুক্ষন আলাপ হলো। এক পর্যায়ে আমি বললাম আরো যেহেতু অনেকটা পথ যেতে হবে, রেস্টরুম থেকে কিছুটা হালকা হয়েনি। আগেই বলেছি ওরা মহা অতিথিপরায়ণ । সুপমল আমাকে ফুড কোর্টের ভিতরেই পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেটে নিয়ে গেলো। বললো , ও বাইরে দাঁড়াচ্ছে, আমি বের হলেই আমাকে নিয়ে গাড়ির কাছে যাবে।

আমি বড় জোর ৩ থেকে ৪ মিনিট পর বের হয়ে দেখি, ‘ময়দান ফাঁকা‘ । সুপমল সেখানে নেই । আমি ফুডকোর্ট থেকে বের হয়ে দেখি যেখানে গাড়ি ছিলো সেখানে কোন গাড়িও নেই । মাত্র চার মিনিটের মধ্যে এতোকিছু কিভাবে ঘটে গেলো সে এক অপার বিস্ময় । সুপমল কি করে আমাকে টয়লেটে ঢুকিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যেতে পারে, আমি ভাবতে পারছিলাম না। কোরিয়ান স্থপতি গিবসনের পাশের সিটে আমার ম্যাগাজিন আর পাওয়ার ব্যাঙ্ক রাখা, ব্যাটা কি একবারের জন্যও ভাবলো না তার পাশের সিটের নিরীহ মানুষটি অনুপস্থিত? আর সবচেয়ে বড় কথা আমার আমলা সাইদ ভাইজানও একবার অনুভব করলেন না যে আমি গাড়িতে নেই । ভাইজান বরাবরই আমার প্রতি যে কোন বিচিত্র কারণেই হোক কিছুটা উদাসিন । যদিও আমি তার উলটা, যেহেতু আমার কোন বায়োলজিকাল বড়ভাই নেই তাই যে গুটি কয়েক বড় ভাইজানদের প্রতি আমি বেশ অনুরক্ত ,সাইদ ভাইজান তাদের মধ্যে একজন । বরাবরের মতো সেই আবার ভাবতে লাগলাম, জগত বড়ই রহস্যময় ।

গাড়িতে কারোর ফোন নাম্বারই আমার কাছে নেই , আছে স্থপতি তিতাসের নাম্বার, সে আছে অন্য শহরে, সে আমাদের সফর সঙ্গীও না। সে মহা মহা ব্যস্ত মানুষ, কানে সর্বদা ব্লু-টুথ লাগানো ,একত্রে একাধিক মানুষের সাথে কথা বলে চলে সারাদিন থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত, এক কানে স্বদেশী তো অন্য কানে বিদেশী, কারো না কারো সাথে কথা বলেই যাচ্ছে। মোটকথা সবসময়ই সে কোন না কোন আন্তর্জাতিক নেগোসিয়েশনে ব্যস্ত। তিতাসকে ফোনে সব বলতেই ও বিকট শব্দে হাসা শুরু করে দিলো । নিজেকে তখন মনে হচ্ছিলো করুন পরিণতি প্রাপ্ত এক কৌতুক অভিনেতার মতো । তবে তিতাস সর্ব কর্মের কর্মবীর । সব কাজেই কোন না কোনভাবে সে একটা সমাধান বের করে আনতে জানে। কিছুক্ষন পরে ওর ফোন এলো, ওর হাসি তখনো থামেনি, হাসতে হাসতেই ও বললো যে গাড়ি বহুদূর চলে গেছে , আরো বহুদূর গেলে ইউটার্ন মিলবে ,তখন তারা এসে আমায় নিয়ে যাবে । আপাতত আমার ভ্যারেন্ডা ভাজা ছাড়া আর কোন কাজ নেই, তবে আমার একটা বিশেষ সুবিধা হলো আমি যে কোন পরিস্থিতিতে জেগে জেগে ঘন্টার পর ঘন্টা স্বপ্ন দেখতে পারি । একদম ছটবেলা থেকেই এটা আমার একটা বিশেষ অভ্যেস । এখনও তাই করলাম , আমি ফুটকোর্টের পাশে প্রায় পরিত্যাক্ত ও প্রায় নির্জন একটা জুস বারে বসে বসে স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম । তারপর কতোক্ষন কেটে গেছে আমি জানি না, হঠাৎ খেয়াল করলাম আমাকে কে যেনো ডাকছে, মাথা তুলে তাকিয়ে দেখি সেই পরম ভক্ত ও বিনয়ী স্থপতি কেভিন কালো মাইক্রোবাস নিয়ে অপেক্ষা করছে আমার সামনে। কেভিন কতোবার সরি বলেছিলো আমি গুনিনি তবে সেটা গুনতে গেলে খাতা কলম লাগতো । তবে গাড়ির অন্যদের মধ্যে কোন বিকার দেখলাম না। আমাকে ফেলে যাওয়ায় তারা কেউ লজ্জিতও না আবার এতো সময় নষ্ট করে আবার উলটোপথ চলে আসার জন্য তেমন বিরক্তও না। আমি আমার আগের সিটে এসে বসলাম , আমার পাশের সিটে সেই কোরিয়ান কেভিন মাইক্রোবাসের জানালা দিয়ে বহুদূরের মহাকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেনো খুঁজছে। আমার মতো এ গ্রহের নিতান্ত ক্ষুদ্র মানুষের হারিয়ে যাওয়ার মতো আরো ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে চিন্তা করার মতো সময় তার নেই।

আরো ঘন্টাখানে পথ চাইনিজদের বানানো সুপার এক্সপ্রেস ওয়ের উপর দিয়ে চলার পর আমদের দুটি মাইক্রোবাস তখন চারিদিকে নানান ধরনের বনজ ঝোপঝাড়ে ঠাঁসা গ্রাম আর বনভূমির আঁকাবাঁকা সাধারণ মেঠো রাস্তার মতো বাওয়ার অতি প্রিয় লাল গ্রাভেলের আটপৌরে রাস্তার উপর দিয়ে এসে লুনুগঙ্গায় থামলো, বেলা তখন মনে হয় প্রায় বারোটা বেজে গেছে।সবুজ গাছগাছালির মাঝে অদ্ভুত শান্তিময় এক পরিবেশ। জনমানুষের কোলাহলহীন এক ধরনের মায়াময় নিস্তব্ধতা ঘিরে আছে সমগ্র এলাকাটাকে।  চারিদিকে মোলায়েম ঝিরিঝিরি বাতাস তবুও কিছুটা গরম লাগছে তবে বিশাল বিশাল গাছের অবারিত ছায়ার কারণে সে গরম তেমন অসহনীয় নয়।

গত শতাব্দীর প্রথম দিকে আমাদের উপমহাদেশের পরিপূর্ণ ঔপনবেশিক শাসনামলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতায় ক্ষমতাবান অধিপতি শ্রেণির পরিবারের সন্তানদের সাধারণ স্বপ্ন ছিলো ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স আর বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টার ডিগ্রি অর্জন। জওহরলাল নেহেরু, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ, নেতাজী সুভাষ বসু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী থেকে আমাদের জ্যোতি বসু পর্যন্ত এরা সবাই ছিলেন বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার। বাবা ও দাদার মতো জেওফ্রি বাওয়াও তাই ই করেছেন, কমম্বোতে পড়াশোনার পর ১৯৩৮ সালে তিনি কেম্ব্রিজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ডিগ্রি অর্জন করেন ও পরবর্তীতে সেই পরিচিত পারিবারিক ঐতিহ্য  অনুসারে আইন শাস্ত্র পড়তে মনস্থ করেন ও ১৯৪৪ সালে ব্যারিস্টার হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশে ফিরে এসে তিনি কলম্বোর একটা আইন ফার্মে যোগ দেন । কিন্তু যার মধ্যে গভীরতর শিল্পবোধের তৃষ্ণা, আইনের জগত তাকে কিভাবে আটকে রাখবে। এভাবে কিছুকাল চলার পর তার মায়ের মৃত্যুর হলে তার জীবন অনেকটা মুক্ত হয়ে যায় । পারিবারিক কোন টান তার আর রইলো না, এ অবস্থায়ই ২৮ বছর বয়সের টগবগে তরুন বাওয়া অনেকটা অস্থির মন নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তার জীবনের গন্তব্যের খোঁজে। প্রথমে তিনি যান যুক্তরাষ্ট্র, তারপর সেখান থেকে ইউরোপ ঘুরে ঘুরে সবশেষে ইতালিতে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার জন্য মনস্থির করেন। সেখানে একটা ভিলা পছন্দ করেন , সিদ্ধান্ত নেন যে সেটা কিনে সেখানে থাকবেন বাকিটা জীবন। কিন্তু তার অস্থির মনে স্থিরতা আসে না, কোনকিছুই তার পরিকল্পনা মাফিক করতে পারেন না। সব যেনো কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। সবশেষে ১৯৪৮ সালে তিনি আবার শ্রীলঙ্কা ফিরে আসেন। কিন্তু ইতালীর সেই গার্দা হ্রদের পাশের ভিলার নস্টালজিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি মনের মতো ভিলার স্বপ্ন ও আকাঙ্খা তার মনের মধ্যে আস্তে আস্তে আরো বড় হতে থাকে।

জীবনের এরকম অবস্থায় তার নিজস্ব ভিলা বা বাগানবাড়ির সেই পুরনো স্বপ্ন পূরণের জন্য কলম্বো আর গলের মোটামুটি মাঝামাঝি বেনতোতা অঞ্চলের দেদ্দুয়া হ্রদের পাশে ১৫ একরের এক পরিত্যক্ত রাবার বাগান যা প্রাথমিক ভাবে ওলন্দাজ আমলে ছিলো একটা দারুচিনি বাগান তা কিনে নেন । এখানেই তিনি প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেন তার স্বপ্নের সেই বাগান বাড়ি, লুনুগঙ্গা। লুনুগঙ্গাকে বলা যেতে পারে জেওফ্রি বাওয়ার জীবনের প্রথম কাজ ,তবে আগেই বলেছি তখনো তিনি কিন্তু স্থপতি নন, তখনও তিনি বিশাল বনেদি পরিবার থেকে উঠে আসা উচ্চ সামাজিক ক্ষমতাবান এক তরুন উদিয়মান আইন ব্যবসায়ী । তবে আইন ও বিচারালয়ের চেয়ে কলম্বোর শিল্প ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেই এই আইনজীবীর সর্বক্ষন উপস্থিতি। তার বন্ধুদের মধ্যে বেশিরভাগই, শিল্পী, ভাস্কর, স্থপতি, লেখক বা কবি ।

তবে লুনুগঙ্গায় কাজ করতে করতেই কিছুদিনের মধ্যেই বুদ্ধিমান বাওয়া বুঝতে পারেন তার কারিগরি জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। বুঝতে পারেন আবেগের সাথে দরকার পেশগত বিশেষ জ্ঞান । বিশেষ করে তার ফরাসী এক কাজিন তাকে বুঝান যে তুমি নিজের টাকায় যে শিল্প গড়ে তুলছো তা অন্যের টাকার আরো বড় পরিসরে করতে পারবে যদি তোমার স্থাপত্যের উচ্চডিগ্রি আর কারিগরি জ্ঞান থাকে। তবুও স্থপতি হবার প্রচন্ড মনবাসনা থেকে বাওয়া তখনকার সিলোনের বিখ্যাত স্থাপত্য ফার্ম Edward, Reid and Begg এ এপ্রেন্টিস হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন । বিন্দুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছিলো তা আমার কল্পনায় আসে না ।

যাই হোক ১৯৫২ সালে বাওয়া আবার ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে একবছর কেম্ব্রিজে থেকে পরে লন্ডনের Architectural Association থেকে স্থাপত্যে ডিপ্লোমা করেন ও ১৯৫৬ সালের মধ্যে RIBA এর মেম্বাশিপ অর্জন করে নেন। অনেকেই মনে করে এতো কম সময়ে এ মেম্বারশীপ অর্জন করার সম্ভব হয়েছিলো বাওয়ার আসম্ভব সুন্দর কথা বলে মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেবার  যাদুকরী ক্ষমতার জন্য। ভালো স্থপতিদের এ গুনটা থাকা খুব জরুরি। এরপর আর দেরি নয় , ১৯৫৭ সালে ৩৮ বছর বয়সে বাওয়া শ্রীলঙ্কায় ফিরে আসেন পরিপূর্ণ ডিগ্রিধারী স্থপতি হিসেবে। দেশে ফিরে এসে তিনি আবার সেই Edward, Reid and Begg এ যোগ দেন। একবছর পর সেখানে যোগ দেন ডেনমার্কের স্থপতি উলরিক প্লেস্নারের । দু’জনার মধ্যে খুব দ্রুত সখ্যতা গড়ে ওঠে এবং ১৯৬৬ পর্যন্ত অনেক কাজ তারা একত্রে করেন। অনেকে মনে করেন বাওয়ার ট্রপিক্যাল মর্ডানিজম দর্শনে এই প্লেস্নারের প্রভাব আছে। আমাদের স্থাপত্যে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নিতে লেগেছে ২৩ বছর , সেখানে বাওয়ার লেগেছে , ৩৮ বছর। ইংরেজিতে একে বলে ‘লেট স্টার্টার’ । কিন্তু মজার কথা হলো ১৫ বছর পরে শুরু করেও বাওয়া যেখানে পৌঁছাতে পেরেছেন, এক কথায় সেটা অবিশ্বাস্য । দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে শুধু নিজের দেশ শ্রীলঙ্কা ছাড়াও ভারত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ফিজি, পাকিস্থান ও মরিশাসে তিনি কাজ করেছেন।

বাওয়ার প্রাথমিক জীবনের সৃষ্টি আকাঙ্খার সাথে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ইউরোপ প্রীতির মিল খুঁজে পাওয়া যায় । মাইকেলের ইচ্ছে ছিলো ইংরেজি সাহিত্যের দিকপাল হবার, ইংরেজি ভাষায় সনেট লেখার আর আর বাওয়ারও ইচ্ছে ছিলো শ্রীলঙ্কার ট্রপিক্যাল জমিনে ইটালিয়ান ভিলা আর বাগান ডিজাইন করার। বিশেষ করে ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ভিলা ও এর সাথে সংযুক্ত বাগানের স্থাপত্য ও নিসর্গ এবং ইউরোপের অন্যন্য অঞ্চলের তুলনায় এ অঞ্চল সমূহের জলবায়ুর উষ্ণতা, বিচিত্র উজ্জ্বল রঙের উপস্থিতি ও প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে নানা প্রকার উদ্ভিদের বিচরণ বাওয়াকে আকর্ষণ করেছে সারা জীবন। তবে শেষমেশ যা হবার তাই হয়েছে, দু’জনই পরবর্তীতে জন্ম দিয়েছেন নিজস্ব জমিনে প্রোথিত একান্ত নিজস্ব মৌলিক সৃষ্টিকর্ম। তবে ইংলিশ বাগান বাড়ি আর ইংলিশ নিসর্গও বাওয়াকে মুগ্ধ করেছে বারবার যার কথা তিনি অনেক বার বলেছেন। এছাড়া গ্রানাডার আল হামরার স্থাপত্য , রাজস্থানের বিচিত্র সব দূর্গের স্থাপত্য , কেরালার পদ্মবাপুরাম প্রাসাদ আর কেম্ব্রিজের ভবন সমূহের স্থাপত্যও বাওয়াকে আকৃষ্ট করেছে বারবার। তবে দিন শেষে ফিরে গেছেন সেই সিংহলী ক্লাসিক্যাল স্থাপত্য আর পর্তুগীজ, ওলন্দাজ আর বৃটিশ স্থাপত্যে জারিত হয়ে বিকশিত হওয়া শ্রীলঙ্কার নিজস্ব স্থানীয় স্থাপত্যের কাছে।

২য় পর্বদেশে ফিরেই বাওয়া ব্যস্ত হয়ে পড়েন নতুন নতুন প্রজেক্টের ভিতর দিয়ে তার নানান রকমের স্থাপত্য চিন্তা ও স্থাপত্য দর্শনের বাস্তবায়য়ন ঘটাতে , তবে যতই ব্যস্ত থাকেন না কেন সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে তিনি ছুটে আসতেন লুনুগঙ্গায় । শুধু তিনি নিজে একা আসতেন না , অতিথি হিসেবে প্রায় প্রতিবারই আমন্ত্রণ জানাতেন নানান সৃষ্টিধারার শিল্পী, স্থপতি, ভাস্কর, শিল্পবোদ্ধা ও সংস্কৃতিবান বান্ধবদের । সত্যি কথা বলতে গেলে লুনুগঙ্গা ছিলো সারা শ্রীলঙ্কার ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংস্কৃতিবান মানুষদের পরম

মিলনকেন্দ্র ।দেশে ফিরেই বাওয়া ব্যস্ত হয়ে পড়েন নতুন নতুন প্রজেক্টের ভিতর দিয়ে তার নানান রকমের স্থাপত্য চিন্তা ও স্থাপত্য দর্শনের বাস্তবায়য়ন ঘটাতে , তবে যতই ব্যস্ত থাকেন না কেন সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে তিনি ছুটে আসতেন লুনুগঙ্গায় । শুধু তিনি নিজে একা আসতেন না , অতিথি হিসেবে প্রায় প্রতিবারই আমন্ত্রণ জানাতেন নানান সৃষ্টিধারার শিল্পী, স্থপতি, ভাস্কর, শিল্পবোদ্ধা ও সংস্কৃতিবান বান্ধবদের । সত্যি কথা বলতে গেলে লুনুগঙ্গা ছিলো সারা শ্রীলঙ্কার ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংস্কৃতিবান মানুষদের পরম সেই ১৯৪৮ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত , পঞ্চাশ বছর ধরে খুব উদ্দিপনা নিয়ে বাওয়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানান স্থাপত্য, নানান ধরনের ভাস্কর্য ও নানান ধরনের ল্যান্ডস্কেপের ধারনার বাস্তবায়ন করে গেছেন এই লুনুগঙ্গায়। তবে বাওয়ার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এখানে কিছু না কিছু কাজ করে যেতে থাকেন। সেই অর্থে লুনুগঙ্গা দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে চলমান একটি কাজ । শুধু বাওয়া একাই যে নানান উপাদান ও স্পেস এখানে যুক্ত করেছেন তাই না, তার বিখ্যাত সব শিল্পী ও ভাস্কর বন্ধুরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এসে তাদের বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষাধর্মী কাজ এখানে স্থাপন করেছেন । সেই নতুন স্থাপনাকে ঘিরেই বাওয়া আবার নতুন করে চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছেন আর এভাবেই এই সংযোজিত নতুন চিন্তা বাওয়াকে উদ্বুদ্ধ করেছে নতুনভাবে কোন স্থাপত্য উপাদান বা কোন ল্যান্ডস্কেপ উপাদান যোগ করতে। এভাবেই লুনুগঙ্গা হয়ে উঠেছে অনেকটা পাঁচ দশক ধরে চলমান একটি সম্মিলিত সৃষ্টিকর্ম যজ্ঞ।

একজন প্রকৃত আত্মবিশ্বাসী সৃষ্টিশীল, রুচিবান, স্মার্ট মানুষ যেমন টিশার্ট আর ট্রাউজারে বেশ মানানসই আবার জিন্সের প্যান্টের উপর পাঞ্জাবিতেও সুন্দর ও সাবলীল। জেওফ্রি বাওয়াও তেমন যে কোন ধারার আর্ট এর সাথে ভিন্ন ধারার আর্টের সংশ্লেষণের পারঙ্গমতায় চরম সাবলীল, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও সার্থক। সেকারণেই জেওফ্রি বাওয়ার স্থাপত্য কর্মে একদম ট্রাডিশনার সিংহলি ট্রপিকাল স্থাপত্য স্টাইলের সাথে অবলীলায় এসে যুক্ত হয় ওলন্দাজ বা বৃটিশ কলোনিয়াল স্থাপত্য ধারার ক্লাসিকাল বা এক্সপেরিমেন্টাল উপাদান। হাজার বছরের মাটির টালির ঢাল যুক্ত চালের সাথে এসে মিশে যায় আর্চ শেপড ইউরোপীয় হাই উইন্ডো বা একদম প্লিন্থ থেকে উঠে যাওয়া গ্রিলহীন রংচটা কাঠের ফ্রেমের ফ্রেঞ্চ উইন্ডো আর তাকে ভিন্নমাত্রায় নিয়ে যায় এই জানালা থেকেই আলোছায়ার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সেখানে সাজিয়ে রাখা হিন্দু বা বৌদ্ধ মিথোলজি থেকে তুলে আনা কোন ভাষ্কর্যের স্থাপনা। কখনো কখনো সে ভাষ্কর্যের অবয়বে ক্লাসিকাল ফর্মের সাথে আধুনিক বা এক্সপেরিমেন্টাল ফর্মেরও সংযোজন। জানালার বাইরেই দিগন্ত বিস্তৃত খোলা মাঠের সবুজ ঘাস এসে থেমে যায় লাল টালির ঢালু ছাদের লাল মাটির ফ্লোর টাইলসের ছায়াময় খোলা বারান্দায়। বারান্দার টালির ঢালু ছাদ ধরে রেখেছে  শ্রীলঙ্কার প্রাচীন মন্দিরের গুহার গ্রানাইট কেটে তৈরি করা থামের মতো একই ধরনের ফর্ম ও কারুকাজের রঙ বা বার্নিশ হীন নিরেট কাঠের থাম। বারান্দা ছুঁয়ে যাওয়া ঘাসের মাঠকে এখানে আলাদা করা যায় না।মনে হয় বারান্দাটা মানুষের বানানো নয়। মনে হয় যেনো উভয়ই বহুকাল ধরেই একত্রে ছিলো,প্রকৃতির সহোদর ভাই বোনের মতো। জেওফ্রি বাওয়ার স্থাপত্য প্রকৃতিকে বিরক্ত করে না আবার অধীনস্থও করতে চায় না বরং উভয়ে মিলে প্রকৃতিকে নতুন মাত্রা দেয় এবং নিশ্চিত অনুভব করা যায় প্রকৃতি তাতে বেশ খুশি।

জেওফ্রি বাওয়ার রক্তের মধ্যে বিচিত্র ধরনের রক্তধারার সংযোগ ঘটেছে। তার বাবা মেজর উইলিয়া বেঞ্জামিন বাওয়ার বাবা ছিলেন সিলোনের (১৯৭৮ সালে সিলোন নাম বদলিয়ে দেশটি তার প্রাচীন শ্রীলঙ্কা নাম ধারন করে। মহাকাব্য রামায়নে রাক্ষস রাজ রাবনের যে লংকার রাজ্যের কথা লেখা আছে, এই সেই শ্রীলংকা) একদম দক্ষিনের ঐতিহাসিক শহর গলের একজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম আইনজ্ঞ ও পরবর্তীতে বিচারপতি। জেওফ্রি বাওয়ার দাদা আহমেদু বাওয়া ছিলেন আরব মুসলিম রক্ত ধারার ও জেওফ্রি বাওয়ার দাদি ছিলেন একজন ফরাসী মহিলা। অন্যদিকে জেওফ্রি বাওয়ার মা বার্থার মধ্যে বহমান ছিলো সিংহলি, স্কটিশ ও জার্মান রক্তধারাসিংহলি, ইওরোপীয় ,আরব, মুসলিম ও খৃষ্টানসহ বহু রক্তধারার মাধ্যমে বহু মাত্রিক সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক ঐতিহ্যের অনেকগুলো ধারা এসে জমেছে তার রক্তের মধ্যে ও একই সাথে তার মনন এবং মনস্তত্ত্বে । যেহেতু বাওয়ার উদার আধুনিক মন সকল সাংস্কৃতিক ধারা ও উপাদানকেই সম্মান ও একান্ত আপন করে নিতে শিখেছে আর সেটাই জীবনের এক পর্যায়ে এসে প্রচন্ড শক্তি নিয়ে নতুন মানের ও নতুন মাত্রার এক সৃষ্টিশীলতা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে । এখানেই বাওয়ার রক্তধারায় মিলিত বিভিন্ন ধারার সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্ব সম্মিলিত ও মিশ্রিত একটি বেগবান ধারা হয়ে

 ট্রপিক্যাল জলবায়ুর ও এর সাথে জন্ম নেয়া নানান নৌসর্গিক উপাদান ও আবহগুলোর নিয়ামক গুলোকে আমলে নিয়ে সিন্থেসাইজড হয়ে এর সাথে তার আধুনিক ইউরোপীয় শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা তাকে নিয়ে গেছে অনন্য এক নক্ষত্রছোঁয়া আত্মবিশ্বাসে সমুজ্জ্বল স্থাপত্য রীতি দিকে ,যার চুড়ান্ত প্রকাশ হয়ে জন্ম নিয়েছে বাওয়ার বিখ্যাত ট্রপিক্যাল মর্ডানিজমের ধারা , যা অস্বাভাবিক রকমের সাবলীল আর একই সাথে ট্রপিক্যাল জলবায়ু ও এর পারিপার্শ্বিকতার সাথে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ । বাওয়ার স্থাপত্য বর্ণনা করতে গিয়ে এক ইংরেজ স্থাপত্য সমালোচক তাই বলেছেন, ‘a new, vital—and yet essentially Sri Lankan—architecture’

বাওয়ার এ স্থাপত্যধারার মধ্যে নিত্যদিনের সাধারণ মানুষের গৃহের আটপৌরে ভাবটি খুব সুন্দরভাবে বিদ্যমান ,সেখানে নেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতা বা একটি নির্দিষ্ট স্টাইলের অতিরিক্ত ক্লিনিক্যাল পরিপাটি উপস্থাপন, তবে সবকিছু ঘিরেই আছে এক অসাধারণ  মাত্রার গভীর শিল্পবোধের পরিশীলিত উপস্থিতি ।

আগেই উল্লেখ করেছি জেওফ্রি বাওয়া ১৯৪৮ সালে লুনু গঙ্গা এস্টেটে তার একান্ত নিজস্ব প্রস্তাবিত বাগান বাড়িতে একদম নিজের মতো করে ল্যান্ডস্কেপের এক্সপেরিমেন্ট শুরু করেন। লেকের ওপারে ছিলো তার ভাই বেভিস বাওয়ার বাগানবাড়ি। লুনুগঙ্গা গড়ার পেছনে সেটাও ছিলো একটা অনুপ্রেরণা। সেই থেকে ২০০৩ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই লুনুগঙ্গা এস্টেটই ছিলো তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা, তার আপন সৃষ্টিশীলতার গভীরতম মাধুরি মিশিয়ে গড়ে তোলা তার নিজস্ব বাগানবাড়ি বা কান্ট্রি হাউস। বাওয়া তার

একদম নিজস্ব নতুন মাত্রার অদ্ভুত সৌন্দর্যবোধ এবং অনেক অপরিচিত সৃষ্টিশৈলীর মিশেল ঘিটিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার নানান ঘরানার উঁচুমানের শিল্প, ভাষ্কর্য ও অন্যান্য নানা পরিশীলিত শৈল্পিক উপদানগুলোকে একত্র করেছে এখানে। বহুদিনের স্বপ্ন ও আকাঙ্খা গুলোকে বাস্তব রূপ দিয়ে একদম নিখুঁত স্থানে বসিয়ে যে অন্য মাত্রার অপরূপ আবহ ও দৃশ্যকল্প এস্টেটটিতে তৈরি তিনি করেছেন তা এক কথায় অনন্য ।

ছাত্র জীবনে প্রফেসর মোবাশ্বের আলী স্যরের একটা কথা আমার খুব মনে পড়ে, তিনি বলেছিলেন ,

সত্যিকার সুন্দর সৃষ্টিকর্ম দেখলে মানুষের মধ্যেই এক ধরনের সৃষ্টিশীলতা তৈরি হয়। তুমি ভেনিসের রাস্তা দিয়ে হেটে গেলে, তুমি যখন বেরিয়ে যাবে তখন তুমি আর আগের মানুষটি থাকবে না। তুমি আগের চেয়ে অনেক বেশি সৃষ্টিশীল আর সৃষ্টিক্ষম মানুষ হয়ে বেরিয়ে আসবে।

লুনুগঙ্গায় হাটতে হাটতে আমার বারবার স্যারের সেই কথাগুলোই মনে হচ্ছিলো । আমি বুঝতে পারছিলাম এখানে যতোই হাটছি ততোই আমি সমৃদ্ধ হচ্ছি , সৃষ্টিক্ষম হচ্ছি । মহান শিল্পীরা বাওয়ার মতো এভাবেই পৃথিবী থেকে চলে যাবার পরও তাদের সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে মানুষকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ও সমৃদ্ধ করে যেতে পারেন।

এস্টেটটা কিনেই তিনি প্রথমে এখানাকার প্রায় সব রাবার গাছ কেটে ফেলেন। বৃটিশরা এদেশে বানিজ্যিক ভাবে রাবারের চাষ শুরু করে, বাওয়া মনে করতেন এই রাবার গাছ শ্রীলঙ্কার নিজস্ব বনজ প্রকৃতির মাঝে ঔপনিবেশিক আগ্রাসন। বাওয়া অন্য আর কোন গাছ কাটেননি, শুধু্মাত্র রাবার গাছ কেটেছেন। বর্তমানে যেখানে যেখানে বিস্তৃত ঘাসের প্রাঙ্গণ আছে আগে সেখানে সেখানেই ছিলো সারি সারি রাবার গাছ। প্রখ্যাত শ্রীলঙ্কান স্থপতি ও বাওয়া ট্রাস্টের ট্রাস্টি স্থপতি চান্না দাসাওয়াতি বলেছেন যে পাগলের মতো একের পর এক রাবার গাছ কেটে ফেলায় চারপাশের গ্রামের মানুষেরা ভিড় জমায় বাওয়ার ঐ আপাত পাগলামী দেখতে। তারা মনে করতে থাকে এই লোকটি পাগল ,তা না হলে কোন সুস্থ মানুষ এমন মূল্যবান অর্থকরী বারার গাছ কেটে ফেলতে পারে না। তবে এতে অন্য একটা উপকার হয়। শ্রীলঙ্কার গ্রামীণ মানুষেরা নাকি ঐতিহ্যগত ভাবেই পাগলদের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল, বাওয়াকেওকেও তারা পাগল হিসেবে নেয় ও এজন্য তাকে খুব সহজে আপন করে নেয়। সেভাবেই খুব কম সময়ের মধ্যেই বাওয়া আশেপাশের গ্রামীন মানুষদের কাছে খুব জনপ্রিয় ব্যাক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। দেখা যাচ্ছে কখনো কখনো পাগলামী করারও অনেক উপকারিতা আছে।

বাওয়া চেয়েছিলো প্রাকৃতিক হালকা ঢালের ভূমিরূপের ট্রপিকাল বন্য উদ্ভিদ ঘেরা বনভূমির ভিতর তার নিজস্ব আরেকটি স্বপ্নের বাগান ডিজাইন করা। বাগানের ভিতর যেনো আর একটি বাগান, যে বাগান চারদিক ঘিরে থাকবে আদিম বন্য প্রাকৃতিক, যে বাগান প্রকৃতিকে অধিগ্রহণ করবে না, বিরক্তও করবে না বরং দুইয়ে মিলে এক নতুন প্রকৃতি তৈরি করবে যা হবে একে অপরের পরিপূরক। এ দুই বাগানের বুদ্ধিদীপ্ত ও সৃষ্টিশীল সিন্থেসিসের মধ্যে উদ্ভিদ, ভাস্কর্য , স্থাপত্য, স্থাপনার সাথে সাথে মানুষ ও মানুষের কল্পনা শক্তি ও রুচিশীলতাও  আশ্চর্যজনক ভাবে এক একটি উপাদান হিসেবে যুক্ত হয়েছে।পুরো লুনুগঙ্গা এস্টেটটি এখন চালায় একটা ট্রাস্ট। ২০০৩ সালে জেওফ্রি বাওয়ার মৃত্যুর অনেক আগেই ১৯৯৩ সালে বাওয়া নিজেই তার অনেক বন্ধু ও স্থপতিদের নিয়ে লুনুগঙ্গা ট্রাস্ট নামে এই ট্রাস্ট গঠন করেন। এই ট্রাস্টই এখন লুনুগঙ্গার সবকিছু দেখভাল করে। ২০১৮ সাল থেকে এ ট্রাস্টের আর্ট ও আর্কাইভাল কালেকশনের কিউরেটর হিসেবে আছেন স্থপতি শায়ারি ডি সিলভা। এর আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় আর্ট গ্যালারির দায়িত্বে ছিলেন। এ ট্রাস্ট যে শুধু এস্টেটের দেখভাল করে তাই না। এ ট্রাস্টের আগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায়ই বাওয়ার জন্মশতবার্ষিকীতে লুনুগঙ্গায় নানা ধরনের আর্ট ইনস্টলেশন স্থাপন করেন। এর মধ্যে আছে হ্রদের ঢেউকে চিত্রিত করে স্থাপনা আর গাছ থেকে ঝুলিয়ে রাখা বিশাল আকারের উইন্ড চাইম। এরা কিছু কিছু রিকনস্ট্রাকশন ও কনজাভেশনেরও কাজ করে এখানে। সবচেয়ে বড় কাজ যেটি তারা করেছে সেটা এক কথায় অসাধারণ, সেটি হচ্ছে এনা ডি সিলভার জন্য ১৯৬০ সালে কলম্বোতে ডিজাইন করা বাওয়ার বিখ্যাত সেই ইন্ট্রোভার্ট হাউজটি আক্ষরিক ভাবেই হবহু এই লুনুগঙ্গায় এনে আবার রিকনস্ট্রাকশন করেছে । এ বাড়ির অসাধারণ রিকনস্ট্রাকশনের গল্প পরে বলবো, কেননা সেটা আর এক চমকপ্রদ লম্বা কাহিনী।

বাওয়ার স্মৃতিপটে জেগে ছিলো ইতালীয় মধ্যযুগের বাগানের ডিজাইন। সেখানে বাগানের ভিতর থাকে আর একটি বাগান, সেটি হয়ে ওঠে একান্ত নিজস্ব স্পেস। আসলে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খৃষ্টীয় আশ্রমের ডিজাইন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই এ চরিত্রটি এসেছে । এসব আশ্রমে কিছু একান্ত প্রায় গোপন এলাকা থাকে যেগুলো পারগোলা বা কিছুটা গুহার মতো প্রতিমা কোর্টইয়ার্ডের ভিতর দিয়ে বাগানের ভিতর আর একটি বাগান তৈরি করা হয়। তবে রেনেসাঁ গার্ডেনের প্রধান চরিত্র হচ্ছে সিমিট্রি ,সেটা কিন্তু বাওয়া মেনে চলেননি। তার কাজের মধ্যে সিমিট্রি তেমন কোন গুরত্বই পায়নি । ইতালীয় বাগানের মধ্যে থাকা ভাস্কর্য, ছোট জলাশয়, সিড়ির ধাপ, উন্মুক্ত ট্যারেস এর সবই বাওয়ার লুনুগঙ্গায় আছে তবে তা আছে অন্য ভাবে , ইতালীয় চরিত্র নিয়ে নয় বরং নিজস্ব ট্রপিক্যাল চরিত্র নিয়ে । 

৩য় পর্ব

ইতালীয় বাগানের মতো বাওয়ার বাগানে আমি কোন ফোয়ারার উপস্থিতি দেখিনি কেননা অতি নাটকীয়তা বাওয়া এড়িয়ে গেছেন সারাটা জীবন বরং প্রতিটি ডিজাইন উপাদানের মধ্যে একটা যাপিত আটপৌরে ভাবই বাওয়াকে আমাদের কাছে বেশি আপন ও বেশি প্রিয় করে তুলেছে। তার কাজে তেমন করে ফোয়ারা না থাকলেও বৃষ্টির পানিকে তিনি বারবার তার ডিজাইনে ব্যবহার করেছেন অপূর্ব সৃজনশীলতার সাথে। বিশেষ করে কলোম্বোর প্যারাডাইস রোডে বাওয়ার স্টুডিওতে (যা এখন গ্যালারি ক্যাফেতো রূপান্তরিত করা হয়েছে) ঢোকার পথে দু’টি উন্মুক্ত করিডোরের মাঝে লাল টালির ঢাল বেয়ে যখন বৃষ্টির পানি নিচের সরু আয়তাকার জলাধারের উপর পড়ে তখন তা হয়ে যায় ফোয়ারার চেয়েও অনেক সুন্দর প্রাকৃতি ও মানুষের সমন্বয়ে সৃষ্টি হওয়া নতুন মাত্রার এক ফোয়ারা।

বাওয়ার দরোজা বা জানালায় রঙ উঠে গেলে বা রঙ জ্বলে গেলে বাওয়া আমাদের মতো ‘আধুনিক’ স্থপতিদের ন্যায় মোটেও বিব্রত নন। রঙ উঠে যাবে, বাগানের সিঁড়িতে কিছু শেওলা জমবে, দেযালের প্লাস্টার একদম মার্বেল গাত্রের মতো মসৃন হবে না, একটু অমসৃন থাকতে পারে, সেখানে মাঝে মাঝে রঙ উঠে যেতে পারে , বাইরের দেয়াল শেওলায় সবুজাভ হয়ে যেতে পারে এতে বাওয়া চিন্তিত নন বরং এতেই বাওয়া স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বাওয়ার দর্শনে আমরা ও আমাদের স্থাপত্য সবই প্রকৃতির অংশ আর প্রকৃতির মতোই আয়ুর সাথে সাথে এটা কিছুটা বদলে যাবে এটাই তো স্বাভাবিক। সবকিছু সুপারলেটিভ হবার দরকার নেই । কেননা প্রকৃতি সুপারলেটিভ অপছন্দ করে। রবীন্দ্রনাথকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো যে তার মতে সর্বশ্রেষ্ট বই কোনটি, উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “Nature abhors superlatives.” ঠিক তেমনই বাওয়া আমাদের বর্তমান স্থপতিদের মতো নিজের ঘরকে পাঁচ তারকা হোটেলের মতো অতি পরিপাটি রেখে অতিমাত্রার সুপালেটিভ পার্ফেকশনের দিকে মনযোগ দেননি বরং প্রকৃতির মতো সহজাত আবয়ব নিয়ে তার সহজিয়া স্থাপত্য সাজিয়েছেন। প্রকৃতিকে অনুসরণ করে ও প্রকৃতিকে আবর্তন করে যে স্থাপত্য সেটাই সফল স্থাপত্য কেননা  “In nature, nothing is perfect and everything is perfect.”  এ দর্শনটি বাওয়ার মনন ও মনস্তত্ত্বে কাজ করেছে একদম প্রথম থেকেই, সেকারণে পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক পরিবেশ, উপস্থিত উপাদান সমূহ ও কনটেক্সট বাওয়ার ডিজাইনে সহায়ক ও সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে , বাঁধা হিসেবে বিবেচিত হয়নি কখনো, এখানেই বাওয়ার অনন্য।

লুনুগঙ্গা এস্টেটের কয়েকটি ভবন নিয়ে বর্তমানে খুব সীমিত পরিসরে কান্ট্রি হাউস হোটেল চালু আছে। শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত বুটিক হোটেল গ্রুপ , টিয়ারড্রপ হোটেলস এটার ব্যবস্থপনায় আছে। টিকেট কিনে দর্শনার্থীরা এখানে গাইডেড ট্যুরের মাধ্যমে পুরো লুনুগঙ্গা ঘুরে দেখতে পারে তবে কিছু কিছু এলাকা শুধুমাত্র হোটেলের  

লুনুগঙ্গায় নেমেই সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি খাতির যত্ন পেয়েছি।  শুধু হোটেলের বোর্ডারদের জন্য নির্ধারিত রুম বা বাওয়ার বিখ্যাত ট্রপিকাল বাথরুম, যেখানে বাথরুমের ভিতর থেকে বিশাল গাছ উঠে গেছে আকাশের দিকে সেখানেও গিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখার বিশেষ সুযোগ আমরা পেয়েছি। যে কয়েকজন হোটেল বোর্ডারদের দেখেছি তারা সবাই ছিলো শেতাঙ্গ ইউরোপীয় বা উত্তর আমেরিকার নাগরিক।

লুনুগঙ্গার মূল গেটের কাছেই একটা ঘন্টা আছে। ঘন্টা বাজিয়ে কিছুক্ষন অপেক্ষা করলে সাদা হাফহাতা জামা আর নিপাট সাদা লুঙ্গি পরিহিত একজন হাসিখুশি গাইড এসে নিয়ে যাবে কিছুটা উঁচুতে অবস্থিত টিকেট কাউন্টারের দিকে। শ্রীলঙ্কায় শিক্ষিতের হার প্রায় ৯৪% তাই এখানে লুঙ্গি পরা সাধারণ মানুষদের মধ্যে অনেকেই ইংরেজি বলতে পারে। সিড়ি ভেঙে উপরে উঠেই দেখা মিলবে পোর্টিকোর পাশে একটা গ্লাস হাউসের মতো স্থাপনা।ইচ্ছে করলে এ গ্লাস হাউসও ভাড়া নেয়া যায়। এই গ্লাস হাউসের একটা অংশ ওভার হ্যাং করা যার নিচেই পার্ক করা থাকতো জেওফ্রি বাওয়ার বিখ্যাত ও প্রিয় রোলস রয়েস গাড়িখানা । এ জায়গাটার পাশেই বিশাল একটা র‍্যাপিস পামের ঝাড় পুরো জায়গাটাকে ঘিরে রেখে অন্য একটা মাত্রা দিয়েছে। পরে দেখেছি পুরো লুনুগঙ্গা এস্টেটেই এই রেপিস পাম নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাগানো হয়েছে। রেপিস পাম ছাড়াও লুনুগঙ্গার নানা জায়গায় লাগানো বিভিন্ন রকমের পাম গাছ; যেমন এরেকা পাম, পিচ পাম, সাইকাস পাম, ফ্যান পাম, শ্রীলঙ্কার সত্যিকারের ট্রপিক্যাল আবহাওয়ায় এগুলো একেবারে সবুজে সবুজে ফুলেফেপে ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিক। লুনুগঙ্গার একটা প্রধান সৌন্দর্যই হচ্ছে এইসব বিভিন্ন গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিকে থেকে বেরিয়ে আসা সূর্যের আলোর বিভিন্ন রকম খেলা আর সেই আলোরে বিপরীতে তৈরি হওয়া মায়াময় ছায়ার আলপনা । আলোছায়ার এ খেলা বাওয়াকে ভীষনভাবে আকর্ষণ করতো। বাওয়া বলতেন, সবকিছুর উপর তাকে সবচেয়ে আকর্ষণ করে, ‘the effect of sunlight filtering through the leaves’.

এখানেই এক কোণায় বসানো আছে বিশাল একটা তামার পাত্র যার মধ্যে মাছ ধরার জাল তৈলাক্ত তরলে ডুবিয়ে রাখা হতো যেনো সহজে জালগুলো নষ্ট না হয়ে যায়। এখানে ছাদে ঝুলছে বাওয়ার ডিজাইন করা বার্ড কেজ ডিজাইনের ঝুলন্ত লাইট শেড যেটা বাওয়া তার অন্যান্য আরো অনেক প্রজেক্টে ব্যবহার করেছেন।  এই গ্লাস হাউস ভবনটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আপাতভাবে টালির ছাদের ট্র্যাডিশনাল দেখতে হলেও এর স্ট্রাকচার কিন্তু আধুনিক , সেকারণে এ ভবনের নিচের অংশ অনেকটাই ফাঁকা, আর এছাড়া এ ভবনে ওনেক বেশি গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে অন্য ভবনগুলোর তুলনায় । এখানেই বাওয়ার আমন্ত্রণে সাপ্তাহিক আড্ডায় তার অনেক বন্ধুরা এসে থাকতেন । তবে স্ট্রাকচার যতোই আধুনিক হোক না কেন স্ট্রাকচারের সীমা তাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারেনি কখনো, তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো সাইটের কন্টেক্সট ও সাইটের ভাষা আর অন্যান্য বিষয় যেগুলো মানুষের মনস্তাত্ত্বকে স্পর্শ কর, বাওয়া তাই বলে ওঠেন ,

“Buildings inherit meanings from their milieu and acquire meanings through use. A building grows from an appreciation of the site and an understanding of the aspirations of the client: the rest is movement, spatial manipulation, the framing of views, the choice and disposition of materials, and the play of light.” 

 

আজকাল স্থাপত্যে সাস্টেইনিবিলিটির কথা খুব সোনা যায়, বাওয়ার স্থাপত্যের মজাটা হলো তার কাজগুলো সহজাত প্রবৃত্তির কারনেই সাস্টেইনিবল , খুব সচেতনভাবে সাস্টেইনিবিলিটি এখানে বাইরে থেকে আরোপিত হয়নি বরং ভিতর থেকেই উদ্ভূত হয়েছে আপনা আপনি।

গ্লাস হাউস আর পোর্টিকোর অন্যদিকেই বাওয়ার বাগান ঘর, প্রাথমিক ভাবে যদিও এটা ছিলো বাগান রক্ষণাবেক্ষণের নানান যন্ত্রপাতি ও জিনিসপত্র রাখার ঘর তবে বাওয়া এটাকে লুনুগঙ্গায় তার নিজস্ব কাজের ঘর বানিয়ে ফেলেন। এ বড় বাগান ঘরটি বাওয়ার বিখ্যাত সেই ট্রপিকাল মর্ডানিজমের ধারার একটা ভালো উদাহরণ। বেশিরভাগ বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালই আসেপাশের এলাকা থেকেই সংগ্রহ করা, একদম প্রথমেই যা বলেছিলাম, জিন্স ট্রাউজারের সাথে খাদি পাঞ্জাবিতে জেওফ্রি বাওয়াকে মানায়, এমনই তার ডিজাইনের অপরূপ সিন্থেসিসের ক্ষমতা। এখানেও সেটা হয়েছে, ভবন ট্রপিকাল মর্ডানিজমের ধারক হলেও এর ইন্টেরিয়র অনেকটা ক্লাসিকাল কলোনিয়াল ওলন্দাজ আদলে ডিজাইন করা। বাগান ঘরের বাইরের গ্রাভেল আর সিমেণ্ট ব্লকের ছককাটা পথ ঘরের ভিতর ঢুকেই হয়ে গেছে একই রকম দাবার বোর্ডের মতো সাদাকালো কোনাকোনি ছককাটা সিমেন্টের মেঝে। সারা শ্রীলঙ্কা ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করা নানা গৃহ উপদান এখানে এনে সংযুক্ত করা হয়েছে। একটা দোকানের সামনের অংশের কাঠের কাঠামো এখানে এনে একটা বিশাল বে উইন্ডো তৈরি করে বসানো হয়েছে , তবে বসানোর সময় ফ্রেমের মধ্যকার কাঠ বদলিয়ে সেখানে জুড়ে দেয়া হয়েছে কাঁচ। অন্য অংশে ফ্রেমের মধ্যে থাকা সেই খুলে নেয়া কাঠই ব্যবহৃত হয়েছে তবে সে কাঠের উপর নীল আর সাদা হালকা রঙ করা । মোটামুটি দোকান থেকে তুলে আনা কাঠের ফ্রেমই এ ভবনের স্কেল ও আকার নির্ধারন করেছে। সব মিলিয়ে এক নতুন আর পুরাতনের মিলনে গড়ে উঠেছে এক ভিন্ন মাত্রা অপরূপ স্থাপত্য, স্থানীয় উপাদান দিয়ে তৈরি স্থাপত্যের এমন পৌরুষদীপ্ত আত্মবিশ্বাসী নান্দনিক বৈভব এর আগে দক্ষিণ এশিয়া দেখেনি কখনো।

কাঁচের জানালার পাশেই উনিশ শতকের একটি রেলওয়ে স্টেশন বেঞ্চ রাখা হয়েছে, রুমের মাঝখানে অপূর্ব সুন্দর একটা বিশাল জোড়া বিহীন নিরেট কাঠের টেবিল বসানো, এতোবড় নিরেট কাঠের টেবিল আমি আমার জীবনে আগে কোথাও দেখিনি। টেবিলের উপর আকাশ থেকে আলো এসে পড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছ। টেবিলের শেষ মাথায় খাড়া সিঁড়ি মেঝে থেকে সোজা ১৫/১৬ ফিট উঠে গেছে। ওদিকে গ্রিলহীন কাঠের ফ্রেমের একটি জানালা। জানালার সামনেই বসানো ক্লাসিক্যাল ডিজাইনের কাঠের অপূর্ব একখানা ‘লাভ চেয়ার’ বা ‘পার্টনার চেয়ার’ যে চেয়ারে বসে প্রেমিক আর প্রেমিকা মুখোমুখি চোখে চোখ রেখে বসতে পারে। এর কাছেই একটা চৌকোনা কফি টেবিল, এরকম টেবিল বাওয়া তার বিখ্যাত বেনতেতো বিচ হোটেলের জন্য ডিজাইন করেছিলেন। এর পাশেই দেয়ালে ইলেক্ট্রিক সুইচ কিন্তু সেগুলো বাওয়ার অতি প্রিয় শ্রীলঙ্কার শিল্প আন্দোলনের বিখ্যাত “কলম্বো ৪৩” গ্রুপের পেইন্টার আইভান পেরিসের একটি ছোট্ট পেইন্টিং দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। পুরো ঘরটাই নানা রকমের কৌতুহলোদ্দীপক লৌকিক ও ঐতিহাসিক সংগ্রহ দিয়ে ভরা ।

 

এর মধ্যে অন্যতম হলো অষ্টাদশ শতাব্দির একটা হলুদাভ বৌদ্ধ মূর্তি। বুদ্ধ মূর্তির পাশেই চেন্নাইয়ের চোলামন্ডল আর্টিস্ট পল্লীর শিল্পী নন্দগোপালের তৈরি হিন্দু দেবতা শিবের অত্যন্ত সুন্দর একটি আধুনিক ধাতব ভাস্কর্য। দুই ধর্মের দুই প্রধান পুরুষ পাশাপাশি সাজানো এখানে। বিমুর্ত রূপের এ ভাস্কর্যটিতে মহেদেব শিব তার পৌরানিক বাহন নন্দী নামের ষাঁড়ের উপর বসে আছেন। সব মিলিয়ে এক অপূর্ব পরিবেশ।  তবে সিড়িটা খাড়া, বেশ খাড়া, এক একটা রাইজারের উচ্চতা ১২” এর কম না, বরং বেশিও হতে পারে।

এ গার্ডেন হাউসের একটা ঐতিহাসিক মূল্যও আছে। এখানে বসেই বাওয়া শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা বন্দারানায়েকাকে পার্লামেন্ট ভবনের পাশেই ডিজাইন করা প্রেসিডেন্ট হাউজের ড্রইং দেখিয়ে তা এপ্রুভ করিয়ে নেন। গার্ডেন হাউজের কাঠের ফ্রেমের কাঁচের দরোজা দিয়ে বের হলেই বাওয়ার প্রিয় সেই রেড ট্যারেস। গার্ডেন হাউজ বা বাগান ঘর আর স্টুডিওর সামনেই ল্যাটেরাইটের ( লাল ছোট নুড়ি পাথর আর লাল মাটির মিশ্রণ) বেশ বড় এই ট্যারেসের নামই রেড ট্যারেস। এই ট্যারেসের একদম কোনায় চৌকোনা কঙ্ক্রিটের উপর পাতার ছাপ বসানো টেবিলে বাওয়া এসে বসতেন। এটা ছিলো বাওয়ার দুপুরের খাবারের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। বিশাল বিশাল বৃক্ষের সুশীতল ছায়া আর পাতার ঝিরিঝিরি শব্দের মাঝে লাল রঙের পাথুরে মাটির  ট্যারেসে বসে বসে বহু সময় ধরে বাওয়া খাবার খেতেন আর  কিছুটা সামনে অবস্থিত দেদ্দুয়া হ্রদ বা বাওয়ার ডিজাইন করা জলবাগানের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতেন এখানে বসেই। এখানে বসে বাওয়ার এস্টেটের ভিতরের ধান ক্ষেতও দেখা যায়। একটা কাসার ঘন্টা ঝুলানো আছে এখানে, কাউকে ডাকতে হলে বাওয়া ঐ ঘন্টা বাজাতেন। পুরো লুনুগঙ্গায় এরকম বিভিন্ন ধরনের চোদ্দটা ঘন্টা আছে।

সারা এস্টেটে নির্দিষ্ট জায়গায় জায়গায় এমন নানা আকার ও ডিজাইনের ঘন্টা ঝুলানো আছে। যখন কিছুর দরকার পড়তো তখন এ ঘন্টাগুলো বাজিয়ে বাজিয়ে বাওয়া এস্টেটের মানুষদের ডাকতেন। এক একটা ঘন্টা এক এক ধরনের সংকেত দিতো। এস্টেটে যারা কাজ করতেন তারা বুঝতেন কোন ঘন্টাধ্বনির কি নির্দেশনা। বাওয়া বিশ্বাস করতেন চিৎকার করে ডাকলে বা বৈদ্যুতিক কলিং বেল বাজালে বিরাজমান প্রাকৃতিক পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। মধুর ধাতব ঘন্টা ধ্বনির কম্পন প্রকৃতির শব্দের সাথে মিশে যাবে, প্রকৃতিকে বিরক্ত করবে না। একেক ঘন্টার একেক রকম ধাতব আওয়াজ। শুধু রেড ট্যারেসের ঘন্টাটা ভিন্ন রকমের। সেটা ভিন্ন আকৃতির মোটা পিতলের একটা পাতের তৈরি। সে ঘন্টার মাঝখানে আঘাত করলে এক রকম আওয়াজ হয় আবার দুই কোনায় আঘাত করলে অন্য রকম আওয়াজ হয়। আসলে বাও‍য়া একদম চরম খুঁটিনাটি পর্যায়েও তার সৃষ্টিশীলতা ঢেলে দিতে ভোলেননি। এতো পরম মমতা দিয়ে পৃথিবীর কয়জন স্থপতি কাজ করেছে কে জানে।

৪র্থ পর্ব

রেড ট্যারাসের একপাশে একটি ঢালের উপর ডিজাইন করা হয়েছে ৩ লেভেলের স্টুডিও ভবন। ভবনের ছাদে এখানেও সেই লাল পোড়া মাটির টালি। কোনটা চৌচালা আর কোনটা দোচাল করে সুন্দর উপর-নিচ কম্পোজিশন করে বসানো। এটিও থাকার জন্য ভাড়া দেয়া হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে একদম প্রথমে এটা ছিলো মুরগী খাঁচাঘর। বাওয়ার মেধাবী ছোঁয়ার পরবর্তীতে তা হয়ে উঠেছে আধুনিক স্থাপত্যের অনন্য উদাহরণ। এই মুরগীর খাঁচাঘর থেকেই পরবর্তীতে বাওয়ার ডিজাইন করা শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত পার্লামেন্ট ভবনের ফর্মটা এসেছে বলে অনেকেই মনে করেন। কেননা এটা ডিজাইন করার কিছু পরেই বাওয়া পার্লামেন্ট ভবন ডিজাইন করেন। এখানে প্রত্যেকটি ঘরে বাওয়া তার কলম্বো সাইটের পরিত্যক্ত জিনিসপত্র নিঃসংকোচে ও দাপটের সাথে ব্যবহার করেছেন। তার মেধাবী কম্পোজিশনে সে পরিত্যক্ত জিনিসগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক , আধুনিক ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আনা বা উপহার পাওয়া নানান এন্টিক ডেকর আইটেম বা আর্টিফ্যাক্টস দিয়ে তিনি সাজিয়েছেন স্টুডিওটিকে। শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বিভিন্ন দেশজ ঘরবাড়ির অংশবিশেষ, কাঠের পুরাতন দরোজা, জানালা, কাঠের কারুকাজ করা থাম ইত্যাদি নানা রকমের জিনিস এনে তিনি সেগুলো বসাতেন লুনুগঙ্গা বিভিন্ন ভবনে ও ইন্টেরিয়র স্পেসের মধ্যে। একটি ছোট সিড়ি নেমে গেছে নিচের লেভেলের বৈঠকখানায়। সে বৈঠকখানার দেয়ালে শোভা পাচ্ছে তার নানান কাজের ড্রয়িংয়ের ব্লুপ্রিন্ট, এর মাঝে কান্দালামা হোটেলেরও কিছু ড্রয়িং আছে। স্টুডিওর সাথেই লাগানো একটা সুন্দর কোর্টইয়ার্ড। টালির ছাদের আবাস, তার সাথে সংযুক্ত কোর্টইয়ার্ড আর তারপরেই বিশাল সবুজ মাঠ আর গাছগাছালির সমাবেশ, এভাবেই একের পর এক বৃহত্তর স্পেসের দৃশ্যপটে এসে ট্রান্সফরমেশন হয়ে যায় বাওয়ার স্থাপত্য কর্মের মধ্যে থাকা মানুষের হৃদয় । এখানে বাওয়া যতটুকু স্থপতি তার চেয়ে অনেকে বেশি মনস্তত্ত্বের দক্ষ কারিগর।

রেড ট্যারেস থেকে অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে এগুলেই সামনে প্রজাপতি জলাশয় বা  Butterfly Pool আর কৃষ্ণ প্যাভিলিয়ন বা Black Pavilion, এই সিড়িগুলো শেওলা ধরা আর বৃষ্টির সময় খুব পিচ্ছিল হতে পারে, তবে বাওইয়া চেয়েছেন পুরো জিনিসটা প্রাকৃতিক থাকুক।

সিঁড়িতে শেওলা ধরুক। ট্রপিকাল জলবায়ুতে কনক্রিটের উপর শেওলা ধরবে এটাই তো স্বাভাবিক। সিড়ির ধাপগুলোর পাশেই এখানে সেখানে অনেকগুলো সাইকাস পাম গুচ্ছ গুচ্ছ হয়ে এলিয়ে আছে। প্রজাপতি জলাধারের পূর্বে দিকেই ব্ল্যাক প্যাভিলিয়ন। কখনো বাঁধানো আর কখনো সোজা একটা পেভড পথ ওয়াটার গার্ডেনের পাশ দিয়ে চলে গিয়ে ব্ল্যাক প্যাভিলিয়নকে যুক্ত করেছে। জলাধার ভরে আছে ছোট ছোট শাপলা ফুলে। অত্যন্ত সুন্দর পশ্চিমমুখী এ প্যাভিলিয়নটি ধাতব ফ্রেমের মাঝে গ্রামীণ কাঠের কাজ করা দরোজার পাল্লা বসিয়ে সেই ধাতব ফ্রেমকে আর্চ শেপে বাকিয়ে তৈরি করা হয়েছে ছায়া প্রদানকারী এ অপরূপ প্যাভিলিয়নটা। এখানে বসার জন্য আছে একটা লম্বা দুই ধাপের ঢালাই কনক্রিটের গ্যালারি বেঞ্চ। এ বেঞ্চে বসে অনির্দিষ্টকাল ধরে জলাধার পরিবেষ্টিত এলাকার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এটাই ছিলো বাওয়ার সকালে বই পড়া আর বিকেলের চা খাওয়ার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। তবে এতো সুন্দর প্যাভিলিয়নটির নাম ব্ল্যাক প্যাভিলিয়ন কেন তা আমি বুঝতে পারিনি।

জলাশারের উপর দিয়ে একটা সেতু আর রাস্তা চলে গেছে, বাওয়া এ পথের নাম দিয়েছিলেন ব্রড ওয়াক, এ পথটি বাগানের পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে গেছে। এই এক্সিস বরাবরই ব্ল্যাক প্যাভিলিয়ন বসানো। এই এক্সসিসের মাঝামাঝি একটা বিচিত্র ডিজাইনের ধাতব সূর্যঘড়ি বসানো আর ঘড়ির দক্ষিণেই একটি অর্ধ গোলাকার কনক্রিট বেঞ্চ। বাওয়ার বন্ধু নিহাল অমরাসিঙ্গে এ সূর্যঘড়িটি ডিজাইন করেছেন গাড়ির পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতি ওয়েল্ডিং করে জোড়া লাগিয়ে।  ঘড়িটি একটি কুকুরের আবয়বে তৈরি, কুকুরের নাকের ছায়া সময় নির্দেশ করার কথা।

ব্রড ওয়াক বরাবর হাটলেই একটু পরে চোখে পড়বে এক টুকরো ধানের ক্ষেত। আমরা যখন হাটছিলাম তখন ক্ষেতে পাকা ধান দেখেছি, দেখেছি অনেক মুনিয়া পাখি সে ধানক্ষেতে জমায়েত হয়েছে। ব্রড ওয়াকের মাঝামাঝি অল্প হেটে দারুচিনি পাহাড় থেকে ওয়াটার গেটে যাবার জন্য বাওয়া তার এককালীন ডেনিশ পার্টনারের কথায় ভিন্ন ভিন্ন ধাপে কতোগুলো সিঁড়িগুলো বানিয়েছিলেন।

সেখান থেকেই একটা প্রশস্ত হাটার পথ চলে গেছে দেদ্দুয়া হ্রদের দিকে। গাইড বললো এইটা সেই ওয়াটার গেট। এখানে বেশ কয়েটি প্রশস্ত কনক্রিটের ধাপ নেমে গেছে হ্রদের পানিতে।

ধাপের পাশেই বসানো হয়েছে আলসভাবে বসে থাকা একটা চিতাবাঘের ভাস্কর্য। দেখে মনে হয় যেনো চিতাবাঘ পাহারা দিচ্ছে এ এলাকাটাকে।

চিতাবাঘের ভাস্কর্যটি উচু বেদির উপর এমন সুচিন্তিত ভাবে বসানো হয়েছে যে অনেক দূর থেকেও হ্রদের পানির বিপরীতে চিতবাঘের ফর্মটাকে দেখা যায়। এ জায়গাটা বাওয়ার অতিথিদের খুব প্রিয় ছিলো ,বিশেষ করে অস্ট্রেলীয় শিল্পী ডেভিড ফ্রেন্ড আর ডেনিশ স্থপতি উলরিক প্লেসনার এখানে বসে সিগার খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখতে পছন্দ করতেন।

এখান থেকেই নৌকায় করে হ্রদের আপ্পালাদুয়া ও হন্দুয়া দ্বীপে যাওয়া যায়। লেকের ওপারে বাওয়ার দুই বন্ধুরও বাগান বাড়ি ছিলো। আগেই বলেছি বাওয়ার ভাই বেভিস বাওয়ার বাগান বাড়িও ওপারে। যারা হোটেলের অতিথি তারা ইচ্ছে করলে এখান থেকে নৌকা করে ওদিকে ঘুরতে যেতে পারে। ওয়াটার গেট এলাকার তীরের কিছু এলাকা বাওয়ার পরিচিত সেই চেকারবোর্ড স্টাইলে কনক্রিটের চৌকোনা ব্লক আর ঘাসের চৌকোনা ব্লকের মাধ্যমে করা।

এখান থেকে আগালে গাছগাছালির ভিতর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে একটা অদ্ভুত ধরনের ভাস্কর্য, বাওয়ার তামিল সহযোগীর বানানো এ ভাস্কর্যের নাম তিনি দিয়েছিলেন,  ‘হিন্দু প্যান’। এটা আসলে বিখ্যাত ইংলিশ রূপকথার চরিত্র পিটার প্যানের সাথে হিন্দু পৌরাণিক চরিত্রের মিশ্রণ, তাই বাওয়া ভাস্কর্যটিকে এই নামে ডাকতেন। বাগানের অন্য স্থানে নৃত্যরত হিন্দু পৌরানিক দেবতা নটরাজের পায়ের নিচে বামন আসুরসহ একটি মূর্তিও বেদির উপর বসানো আছে।

ব্রড ওয়াক দিয়ে আরো পশ্চিমে হেটে গেলে বিরাট নিরবিচ্ছিন্ন মাঠ। মাঠের মাঝে মাঝে প্রাচীন কিছু গাছ। গাছের মধ্যে অল্প কিছু রাবার গাছও আছে যেগুলো বাওয়া কাটেননি। এ রাবার গাছগুলোর পাশেই পাহাড়ের গা ঘেঁষে একটা সিঁড়ি উঠে গেছে, সিঁড়ির উপর বাঁয়ে ঝুলে আছে বিশাল একটা প্রাচীন সাইকাস পাম আর ডানদিকে গুচ্ছগুচ্ছ পিকক ফার্নের ছড়াছড়ি। এ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলেই লাল গ্রাভেলের ট্যারেসের পাশেই বাওয়ার ডিজাইন করা ব্লু প্যাভিলিয়ন । ব্লু প্যাভিলিয়ন নাম হবার কারণ হয়তো এর নীল রঙের দু’টো কলাম  আর পছনের কাঠের জানালার নীল রঙ।  ব্লু প্যাভিলিয়ন তিনদিক পরিবেষ্টিত কনক্রিটের বেঞ্চে বসে তাকালেই নিচে এস্টেটের খাবার পানির কূপ দেখা যায়। কূপের পাশেই একটা অর্জুন গাছ।

শ্রীলঙ্কার গ্রামীণ মানুষের প্রাচীন বিশ্বাস যে কূপের কাছে অর্জুন গাছ থাকলে অর্জুন গাছের শেকড় কূপের পানি পরিশুদ্ধ করে দেয়।আমাদের দেশের মানুষ অর্জুন গাছের ছাল সারারাত পানিতে চুবিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে সেটা খায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনের জন্য। অর্জুন গাছ থেকে ঠিক কূপের মাঝ বরাবর ঝুলে আছে আরও একটি কাসার ঘন্টা। এখান থেকেই শুরু করে সামনের দিকে ষোড়শ শতাব্দীর প্রাচীন চীনের মিং সাম্রাজ্যের অনেকগুলো মন্দিরের উপাসনা মটকা বা জার  স্থাপন করে পুরো জায়গাটাকে এক অন্য রকমের মাত্রা দেয়া হয়েছে। এখানটাকে বাওয়া বলতেন plain of Jars ।

Plain of Jars থেকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে গেলেই কিছুটা বনভূমির ভিতর দিয়ে যেতে হয়। এ জায়গাটা এ এস্টেট কেনার প্রাথমিক পর্যায়ে চিতাবাঘ আর অন্যান্য বন্য প্রাণী অধ্যুষিত ছিলো । এখানে বিচিত্র ধরনের বেশকিছু গাছ আছে, শ্রীলঙ্কানরা ওদের ভাষায় এ গাছগুলোকে বলে দাওয়াতা গাছ। এই গাছগুলে একশ ফিটেরও বেশি উঁচু হয় তবে এদের যে জিনিসটা বাওয়াকে আকর্ষন কররেছিলো সেটা হচ্ছে এদের শেকড়ের সুন্দর আবয়ব ও কাঠামো ।

এ গাছগুলোর শেকড়গুলো মাটি থেকে ম্যাংগ্রুভ গাছের মতো অনেক উপরে উঠে থাকে। এগুলো আসলেই ম্যাংগ্রুভ গাছ , কিন্তু উঁচু জায়গায় লাগানোর পরেও গাছগুলো তাদের ডি এন এ এর নির্দেশ অনুযায়ী প্রয়োজন না হলেও মাটি থেকে অনেক উঁচুতেই উঠে আছে।  এদের শেকড়ের ভিতর দিয়ে বাঁদর বা অন্যান্য প্রাণিরা অনায়াসে চলাফেরা করতে পারে। কোন কোন শেকড়ের ভিতর দিয়ে ইচ্ছে করলে মানুষও ঢুকে যেতে

পারে। সব মিলেয়ে এ গাছগুলোর মধ্যে একটা আদিম বা প্রাগৈতিহাসিক ভাব আছে যেটা বাওয়াকে ভীষণ আকর্ষণ করতো। এ শ্রেণির গাছের শেকড় দিয়ে পৃথিবীর অনেক ডিজাইনারই ফার্নিচার ডিজাইন করেছেন, তবে লুনুগঙ্গায় আমি এ ধরনের কোন ফার্নিচার দেখিনি।

৫ম পর্ব

আগে লিখেছিলাম এনা ডি সিলভা হাউস নিয়ে লিখবো।এবার আসি সেই বাড়ির গল্পে। লুনুগঙ্গায় আছে এনা ডি সিলভার ইন্ট্রভার্ট হাউস। তবে এই একই বাড়িটি একসময় এখান থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরের কলম্বোর সিনামন গার্ডেনে একটি ছোট প্লটে অবস্থিত ছিলো। ঘটনাটি বিশ্বাস

করতে কষ্ট হলেও এটা বাস্তব সত্য ঘটনা। জীবনের এক পর্যায়ে এনা ডি সিলভা বাড়িটি একটি হাসপাতাল প্রজেক্টের কাছে বিক্রি করে দেন ও তারা এটাকে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় একটি বহুতল হসপাতাল কমপ্লেক্স বানানোর উদ্দেশ্যে , তখনই এ লেখায় আগেই উল্লেখ করা জেওফ্রি বাওয়া ট্রাস্টের নিবেদিত স্থপতিরা বাওয়া ও তার স্থাপত্যের প্রতি পরম আবেগ আর ভালবাসা নিয়ে এগিয়ে আসেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন বাড়িটিকে

এখান থেকে খুলে নিয়ে লুনুগঙ্গায় পুনরায় নির্মাণ করবেন। স্থাপত্য ও একজন স্থপতির প্রতি কি সীমাহীন ভালোবাসা থাকলে এমন একটি কাজ করা সম্ভব তা চিন্তা করলেই ওদের প্রতি শ্রদ্ধায় চোখে পানি চলে আসে। প্রত্যেকটি টাইলস, প্রত্যেকটি গ্রানাইট স্ল্যাব , প্রত্যেকটি বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালের উপর নিজেদের হাতে মার্কিং করে আবার তা সেই নির্দিষ্ট মার্ক অনুযায়ী লুনুগঙ্গায় পূনর্স্থাপিত করা হয়েছে সীমাহীন নিপুণতায় । একারণে লুনুগঙ্গায় অবস্থিত এনার ডি সিলভার পুনর্নির্মিত বাড়িটি নিজেই নিজে একটা জীবন্ত জাদুঘর।

ডিজাইনার এনা ডি সিলভা এবং তার স্বামী ওসমুন্ডের জন্য ১৯৬০ সালে জেফ্রি বাওয়া বাড়িটি ডিজাইন করেছিলেন। এনা ডি সিলভা নিজেই ছিলেন শিল্পী। এ মহিলা  শ্রীলঙ্কার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মহলে খুব উঁচু আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী । বিশেষ করে কান্দির প্রাচীন কারুশিল্প ও বাটিক শিল্পকে সারা পৃথিবীর কাছে তিনি পরিচিত করে বিপুল সুনাম অর্জন করেন। তিনি ছিলেন জেওফ্রি বাওয়ার বড়ভাই বেভিস বাওয়া পরিচিত আর এই বেভিস বাওয়াই তাকে অনুরোধ করেন জেওফ্রি বাওয়াকে তার বাড়ির ডিজাইনের কাজটি দেবার জন্য। এনা ডি সিলভা জেওফ্রি বাওয়াকে কাজ দিতে রাজি ছিলেন না। তিনি বলতেন যে প্লেবয় জেওফ্রি বাওয়া সারাদিন গলায় সিল্কের স্কার্ফ পরে তার দামী কনভার্টেবল রোলস রয়েস নিয়ে কলম্বোর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় , তাকে এ কাজ দেয়া যাবে না। তারপরও বেভিস বাওয়ার অনুরোধে অবশেষে তিনি জেওফ্রি বাওয়াকে কাজ দেন ও পরবর্তীতে আনা ডি সিলভাও বাড়ির ডিজাইনে জড়িয়ে যান ও বাওয়ার ভক্ত হয়ে ওঠেন।

এ বাড়িটি সে সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিলো একটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ডিজাইন। শীলঙ্কার মিশ্রিত সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে এটি ছিলো এক অভাবনীয় কাজ। ডিজাইনটি একদিকে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অপূর্ব নীরিক্ষা। এ বাড়িতে যে যেসব কন্সেপ্ট ও উপাদান তিনি ব্যবহার করেছেন পরবর্তীতে বাওয়ার বহু কাজে তা বারবার ফিরে ফিরে এসেছে আর এর মধ্য দিয়ে বাওয়ার বিখ্যাত ট্রপিক্যাল মর্ডানিজমের ধারনাটি শক্তিশালী ভিত পেয়েছে।

পুরোনো ঔপনিবেশিক বাড়িগুলতে যে কোর্টইয়ার্ড থাকতো তাকে বাওয়া এ ছোট প্লটে একটি আরবান কোর্টইয়ার্ড হিসেবে একদম কেন্দ্রে রেখে পুরো সাইটকে কাজে লাগিয়ে ও অদ্ভুত মুন্সিয়ানার মাধ্যমে আলো ও বাতাস এনে এর মাধ্যমে এক অপরূপ ডিজাইন উপহার দিয়েছে, যা একই সাথে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিকতাকে সংযুক্ত করছে ও বাড়ির বাসিন্দাদের দিয়েছে নতুন প্রাণবন্ত জীবন।

এখানেই প্রথম দেখা যায় আনার বাড়ির বড় বড় পার্টিতে সবাই ঘরের ভিতর বসতে চাচ্ছে না , সবাই জড়ো হচ্ছে মাঝখানের এই আরবান কোর্টইয়ার্ডে। আনা ডি সিলভা নিজেই অবাক হয়ে যান বাওয়া এই কোর্টইয়ার্ডের ক্ষমতা দেখে। কোর্টইয়ার্ড, বারান্দা, করিডোর, এইসব স্পেস গুলোকে বাওয়া খুব গুরুত্ব দিতেন আর সেটাকে চিন্তার মধ্যে নিয়েই একটি ভবনকে তিনি কিভাবে দেখতে চাইতেন সেটা তার নিজের এ কথায় দিয়েই বোঝা যেতে পারে, “A building can only be understood by moving around and through it, and by experiencing the modulation, and feel the spaces one moves through – from outside into verandah, then rooms, passages, courtyards.

এ ভবনে ব্যবহৃত ইটের দেয়ালের প্লাস্টার, মোটা মোটা কাঠের থাম এবং পলিশহীন গ্রানাইটে মেঝে আর অতি পরিচিত ঢালু ছাদের পোড়ামাটির লাল টালি সব মিলিয়ে এক অন্য স্থাপত্যের জন্ম দিয়েছে যদিও এ সব বিল্ডিং মেটেরিয়ালগুলোই শ্রীলঙ্কানদের কাছে বহুকাল ধরেই পরিচিত ছিলো কিন্তু বাওয়ার মাধ্যমে তা সম্পূর্ণ নতুন একটি আবহ পেয়েছে, পেয়েছে অভূতপূর্ব এক মাত্রা ও আত্মপরিচয় সম্বৃদ্ধ এক নতুন স্থাপত্য ধারা।

লুনুগঙ্গা দেখতে দেখতে একপর্যায়ে ঢুকে গেলাম সেই প্রাচীন দারুচিনি বাগানের ভিতর। গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম , দারুচিনি গাছের কান্ডের দারুচিনির ছাল কই। সে কি কি  জানি বললো, বুঝতে পারলাম না। আমি বরং এগিয়ে গিয়ে একটা দারুচিনি পাতা ছিড়ে তার গন্ধ নিতে চেষ্টা করলাম। তেমন কোন গন্ধও পেলাম না । গাইড তখন আমাকে বললো ,পাতার বোটা চাবিয়ে দেখতে। আমি কিছুটা বিশ্বাস আর আবিশ্বাসের দোলাচলের মধ্যে পাতার বোটায় আলতো করে কামড় দিলাম । আসলেই, তখন সত্যি সত্যি দারুচিনির স্বাদ পেলাম মুখের ভিতর। এভাবে দারুচিনি বাগানের ভিতর দিয়ে হেটে সামনে আসলেই চোখের সামনে খুলে যাবে বিশাল ঘাসের মাঠের বিস্তৃত সিনামন হিল বা দারুচিনি পাহাড় । সিনামন হিল পেরিয়ে দেদ্দুয়া হ্রদের অপর অংশ দেখা যাচ্ছে। এ সিনামন হিলেই গত শতাব্দীর নব্বই দশকের মাঝামাঝি বাওয়া লুনুগঙ্গায় তার সর্বশেষ ভবনটি বানিয়েছিলেন। সেটার নাম হচ্ছে সিনামন হিল হাউস ।

এ সিনামন হাউসের সামনের দিকে লাল টালির ছাদযুক্ত একটা খোলা ঘর বা loggia hall আছে যেটাকে স্টুডিও ও ওয়ার্কশপ বানিয়ে বিখ্যাত শ্রীলঙ্কান শিল্পী ও ভাস্কর লাকি সেনানায়েকা, যিনি একইসাথে ছিলেন বাওয়ার সহকর্মী ও বন্ধু তিনি ১৯৭০ সালের ওসাকা এক্সপোতে শ্রীলঙ্কা প্যাভিলিয়নের সামনে বিশাল আকারে বোধিবৃক্ষের পাতার আকারের একটা ভাস্কর্য বানিয়েছিলেন ও তা ওসাকায় স্থাপন করেছিলেন। এই সেনানায়েকে ছিলেন মৌলিকভাবে অত্যন্ত সৃষ্টিশীল ও মেধাবী একজন শিল্পী । ইনি বাওয়ার অনেক কাজের সাথেই যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে গল শহরের কাছে বিখ্যাত লাইট হাউস হোটেলের বিশ্ববিখ্যাত সিঁড়ির রেইলিংযের মুরাল বা ভাস্কর্যটি বানিয়েছিলেন তিনি ।

লুনুগঙ্গা দেখার পরের দিনই গলে গিয়ে সেটা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। এ ভাস্কর্যের বর্নণা এখানে দিচ্ছি না। তবে সেটা এক কথায় অসাধারণ। সম্পূর্ণ অন্য জগতের শিল্পকলা বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। লাকি সেনানায়েকে মানুষটিও কিন্তু ছিলেন অসাধারণ । কেতাদুরস্ত ইউরোপীয় পোশাক পরিহিত বাওয়ার সাথে থেকেও একজন ট্রপিক্যাল জলবায়ুতে বসবাসকারী মানুষের পোশাক যেমন হবার কথা ঠিক তেমনই ছিলো তার পোশাক।  খালি গায়ে শুধু একটা তাঁতের লুঙ্গী পরে কাজ করতেন পাগলের মতো আর সৃষ্টি করে যেতেন বিশ্বের শ্রেষ্ট সব শিল্পকর্ম ।

সিনামন হাউজের কথা বলতে বলতে অন্যদিকে চলে গেলাম। আবার সিনামন হাউসের কথায় ফিরে আসি। বর্তমানে এই সিনামন হাউস হলো দুই বেডরুমের একটা কটেজ আর সেনানায়েকের সেই ওয়ার্কশপ এখন এই কটেজের ওপেন লজিয়া হিসেবে সংযুক্ত। সিনামন হিল হাউস যেহেতু লুনুগঙ্গা এস্টেটের একদম দক্ষিণাংশে অবস্থিত তাই এখান থেকে হ্রদের অন্য অংশটা দেখা যায়। দেখা যায় হ্রদের ওপারে বাওয়ার বন্ধু রিকো আর হুগোর বাগানবাড়ি, যারা উভয়েই লুনুগঙ্গা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই ওপারে তাদের বাগান বাড়ি গড়ে তুলেছিলেন । সিনামন হাউজের সামনের ঘাসের প্রাঙ্গণটি অনেক বড় তাই এখান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়।

এর কাছেই আর একটা আর্চ শেপড ইটের স্ট্রাকচার আছে, এটা একটা পানির ট্যাঙ্ক  আর উইন্ডমিল। আসলে কখনো এমন উইন্ডমিল, কখনো ইংলিশ দুর্গের আদলের ইটের পানির ট্যাংক, কখনো ইউরোপীয় রূপকথার অতি পরিচিত চরিত্র পিটার প্যানের নতুন মুখাবয়বের উঁকি দেয়া আবক্ষ মূর্তি, কখনো চীনা মন্দিরের উপসনার মটকা ,কখনো গাছ থেকে ঝুলে থাকা কাসার ঘন্টা, কখনো দেদ্দুইয়া হৃদের বিশাল জলরাশির পটভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা মাইকেল এঞ্জেলোর বিখ্যাত ডেভিডের অনুরূপ ভাস্কর্য – সব কিছুই এক অদ্ভুত জাদুতে শ্রীলঙ্কার ট্রপিকাল ভূপ্রকৃতিতে মিলেমিশে নতুন একটি পরিচিতি পেয়েছে। মানব সভ্যতার ভিন্ন ভিন্ন সব সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্য উপাদানকে একত্রে নিয়ে স্থাপত্যের উদার যে দর্শনের ভিতর দিয়ে নিজস্ব সংস্কৃতি, শিল্প, জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির সাথে ইউরোপীয় শিল্প, নন্দনতত্ত্ব ও স্থাপত্যকে মিলিয়ে নতুন স্থাপত্য ধারার যে ঐক্যতান বাওয়া নক্ষত্রস্পর্শী সাফল্যের সাথে জন্ম দিয়েছেন দিন শেষে সেটাই হলো ট্রপিক্যাল মর্ডানিজম।

সিনামন পাহাড়ের উন্মুক্ত মধ্য প্রাঙ্গণ বরাবর হেটে এগিয়ে গেলেই আরও একটা প্রাঙ্গণ উন্মুক্ত হবে আর সেখানে গেলেই চোখে পড়বে বাওয়ার নিজের বাড়ি দক্ষিণাংশ । দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে এটাই ছিলো তার অবকাশ যাপনের বাড়ি যদিও এটি তৈরি করা হয়েছিলো সেই ১৯৩০ সালের দিকে। এটা কেনার আগে বাওয়া তার অনেক বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের এখানে নিয়ে আসেন তাদের মতামত জানার জন্য। ১৯৪৮ সালে এটা কিনে ফেলার পর বাওয়া প্রথমেই যে কাজটি করেন তা হচ্ছে , তিনি এটার প্রবেশ পথ পশ্চিম থেকে দক্ষিণ দিকে নিয়ে আসেন।

তবে এখান থেকে বাড়ির দক্ষিণাংশ দেখা গেলেও এখান থেকে বাড়িতে ঢোকা যাবে না। ঢোকার আগে অনেকটা টানেল স্পেসের ভিতর দিয়ে যাওয়া যায় । এই স্পেসের বিশাল দেয়ালে সেই লাকি সেনানায়েকের আঁকা বিশাল একটা পেইন্টিং আছে। পেইন্টিংটিতে গ্রিক পৌরাণিক কাহিনীর ট্রোজান যুদ্ধের সেই বিখ্যাত একিলিসের হত্যার কাহিনীটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গ্রিক পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী একিলিসের মা শিশু একিলিসকে অমরত্বের নদী স্টিক্স নদীতে ডুবিয়ে তার পুরো শরীর অমর করে আনেন কিন্তু নদীতে ডোবানোর সময় একিলিসের শুধু পায়ের গোড়ালিটি নদীর পানীতে স্পর্শ করাতে ভুলে যান । সেই থেকে একিলিসের সমগ্র শরীর অমর হলেও তার পায়ের গোড়ালিটি নশ্বর থেকে যায় আর যুদ্ধের সময় মহাবীর একিলিস তার গোড়ালিতেই তীর বিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এখানে রঙ তুলি দিয়ে সেনানায়েকে সে কাহিনীকেই ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে প্রশ্ন তো থাকতেই পারে, লাকি সেনানায়েকার মতো নিজস্ব শেকড় সম্পৃক্ত মানুষ কি নিজে থেকে কখনো এই গ্রেকো-রোমান মিথোলজি বা মহাকাব্য নিয়ে কাজ করতেন নাকি বাওয়াই তাকে এ পথে যেতে প্রভাবিত করেছেন তার নিজের ইউরোপিয় শেকড়ের টানে।

সেনানায়েকে এখানে যে সব চরিত্র সৃষ্টি করেছেন অনেকটা একই রকমের চরিত্র তিনি ভাস্কর্যের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছে গলের লাইট হাউস হোটেলের সেই বিখ্যাত সিঁড়ির রেইলিং ডিজাইন করতে গিয়ে যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি।

শেষ পর্ব

লাকি সেনানায়েকের পেইন্টিংযুক্ত ওই করিডোরের মধ্য দিয়ে বের হলেই সামনে পড়বে সুন্দর গেট হাউস সুইট। পুরো লুনুগঙ্গায় মোট যে ছয়টি সুইট আছে এটা তার মধ্যে অন্যতম। এ ভবনের টানা এক ফ্লাইটের সিঁড়ির শেষে রট আয়রনের যে রেইলিংটি আছে সেটি খুব সুন্দর। এটি ওলন্দাজ আমলে জাফনার একটি ভবনে ছিলো ,বাওয়া সেখান থেকে এটা নিয়ে আসেন। এমনি ভাবে বাওয়া সারা শ্রীলঙ্কায় যেখানে যতো সুন্দর ও ঐতিহ্যবাহী উপাদান পেয়েছেন তা তুলে নিয়ে এসে তাকে নতুন জীবন দিতে চেয়েছেন তার ডিজাইনের মাধ্যমে। এখান থেকে এগিয়ে গেলেই লাল গ্রাভেলের সাউদার্ন ট্যারেস ।

এ ট্যারেসের ঠিক মধ্যখানে বাওয়ার নিজের বাড়িতে প্রবেশ দ্বার আর বিপরীত দিকে সিনামন হিলের উপর থেকে বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায় । দেখা যায় বহুদূরে মাঝ বরাবর একটা মটকা বসানো, এটি পুরো ল্যান্ডস্কেপ্টাকে একটা সীমানা দেয়, একটা অন্যরকম মাত্রা দেয়। এর ডানেই একটা ছোট পাহাড় আর সে পাহাড়ের উপর একটা ধবধবে সাদা বৌদ্ধ স্তুপ । ভোরেরবেলা পাহাড়ের পুর্ব দিক থেকে যখন সূর্য ওঠে তখন এ স্তুপটি আলোতে ঝলমল করতে থাকে। বাওয়া একটা গোলাকার কঙ্ক্রিটের টেবিলে সকালের কফি খেতে খেতে এ দৃশ্যটি উপভোগ করতেন প্রতিদিন।

এ দৃশ্যটিকে পৃথিবীর এ অংশের বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ট দৃশ্য বলে অভিহিত করেছেন বহু স্থপতি, বহু গার্ডেন ডিজাইনার ও বহু ল্যান্ডস্কেপ স্থপতি । এ দৃশ্যটি নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে, বহু বর্নণা হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বইয়ে। আরো সত্যি করে বলতে গেলে এই দৃশ্যটিই বাওয়াকে স্থপতি হতে অনুপ্রাণিত করেছে।

সাউদার্ন ট্যারেসের শেষ মাথায় বাথরুম কোর্টিয়ার্ড এটি প্রধান বেডরুমের সাথে সংযুক্ত । এর মাঝামঝি একটা স্পেস তৈরি করা হয়েছে আর সেখান থেকে ওয়াল ক্রিপারে আচ্ছাদিত দেয়ালের ভিতর থেকে একটা রোমান মুখমণ্ডলের ভাস্কর্য উঁকি দিচ্ছে, এটি আসলে রোমান সম্রাট অগাস্টাসের ভাস্কর্য । এখান থেকে পিছনে ফিরে ঢুকতে হবে বাওয়ার বাড়ির প্রধান প্রবেশ পথে, প্রবেশ পথে ঢুকেই দেখা যাবে প্রবেশ পথের ওপারে আর একটা প্রবেশ পথ দিয়ে হ্রদের অন্য দিক দেখা যাচ্ছে। আসলে বাড়িটি এমন ভাবে বসানো যে লুনুগঙ্গা উপদ্বীপের দু’দিকের হ্রদের দৃশ্যই বাওয়ার ঘর থেকে সুন্দরভাবে দেখা যায়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে না দেখলে বাওয়ার ডিজাইনের পেছনের গভীর ও বিস্তৃত চিন্তাশীলতাকে অনুভব করা সম্ভব না।

একদিকে বাওয়ার বাড়ির বৈঠকখানা অন্যদিকে করিডোরের মাঝখান দিয়ে একটা এক্সিস চিন্তা করলে এটা খুব সুন্দর ভাবে ওদিকের সেই প্রশস্ত প্রাঙ্গণ আর উত্তরদিকের দারুচিনি পাহাড় বা সিনামন হিলের ঢালের উত্তর ট্যারেসকে অদ্ভুত সুন্দর ভাবে দৃশ্যমান করে তোলে। দুদিকে ভিস্তা দিয়েই বাওয়া তার নিজের বাড়িকে ডিজাইন করেছেন। এখান থেকেই দেদ্দুয়া হ্রদকে পরিপূর্ণ ভাবে অবলোকন করা যায়। সত্যি কথা বলতে গেলে এই সিনামন হিল আসলে আরো উঁচু ছিলো।  বাওয়া এটাকে কেটে অনেকটা সমান করেছেন যেনো তার ভিলার দুদিক থেকে পরিপূর্ণ ভাবে হ্রদের ঝলমল করা বিশাল জলরাশির অপরূপ দৃশ্য বাঁধাহীন ভাবে দেখা যায়। আগেই বলেছি মূলত বাওয়া চেয়েছে বাগানের ভিতরে আর একটি বাগান তৈরি করতে।

ভদ্রতা, সৌজন্যতা ও বুদ্ধিদীপ্ততা বাওয়ার চরিত্রের উল্লেখযোগ্য উপাদান হলেও অন্যদিকে বাওয়া চরিত্র ছিলো খুবই জটিল। লুনুগঙ্গায়ও এই দুই চরিত্রের উপস্থিতিই লক্ষ্য করা যায়। তিনি চানননি তার এ বাগান বাড়ি চকচকে ,ঝকঝকে ও মাত্রাতিরিক্ত পরিপাটি একটা পার্ক হোক। এখানে প্রতিটি দৃশ্যপট, প্রতিটি চত্বর যেনো এক একটি আলাদা কবিতা। সে কবিতায় একক ব্যক্তির তৃষ্ণা যেমন মেটে আবার দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দও পাওয়া যায় । এখানে নিজস্ব মাটির ঐতিহ্য যেমন উপস্থিত আবার ইউরোপীয় ক্লাসিক্যাল ধারাও এক অপূর্ব মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে মিলেমিশে একাকার হয়ে অন্যভাবে উপস্থিত।

আবার ফিরে আসি বাওয়ার বাড়ির বর্ণনায়, গুচ্ছ গুচ্ছ কয়েকটি কিউবের সমন্বয়ে বানানো হয়েছে বাওয়ার নিজের বাড়ি । আধুনিক আদলে হলেও এ চারকোনা ঘরগুলোর ছাদ কিন্তু সেই শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির লাল টালির তৈরি। এই লাল টালির চাল বাওয়ার ডিজাইনের একটি সিগনেচার উপাদান। আধুনিক কিউবের কম্পোজিশনের সাথে চৌচালা বা দোচালা লাল টালির চাল ধিরে ধিরে হয়ে উঠেছে বাওয়ার ট্রপিকাল মর্ডানিজমের একদম অবিচ্ছেদ্য ডিজাইন উপাদান। দোচালা ছাদের এ বাড়ির কিছুটা সরু প্যাসেজের ভিতর দিয়ে হেটে এগুলেই একপাশে চোখে পড়বে সাজানো একটা ছোট রোমানেস্ক বিশপ মূর্তি , সারা পৃথিবী থেকে জড়ো করা বাওয়ার অজস্র সংগ্রহের মধ্যে এটি একটি । এ প্যাসেজের ভিতর দিয়েই পৌঁছে যাওয়া যায় প্রধান লিভিংরুমে। লিভিংরুমে ঝুলছে সুন্দর একটি ক্লাসিক্যাল ডিজাইনের ঝাড়বাতি, বাওয়ার সেই ফরাসি কাজিন তাকে এটা উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন।

রুমের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নানান ধরনের পুরনো শ্রীলঙ্কান ফার্নিচার । রুমে ঢুকে বাম পাশেই রয়েছে খুব সুন্দর পুরনো একটি পর্তুগিজ কাঠের কারুকাজ সম্বৃদ্ধ বড় সোফা চেয়ার, তার সমনের সাদা কার্পেটের উপর গোলাকার পুরু কাঠের ক্লাসিক্যাল ডিজাইনের সেন্টার টেবিল, দু’দিকে দু’টো সাদা কভারের সোফা আর তার পাশেই একটা  কাঠের সিন্দুক। সোফার পিছনেই মহাকাশের দিকে তাক করা শতাব্দী পুরনো একটা টেলিস্কোপ । সেটার উপরে দেয়ালের ভিতর চৌকোনা জায়গা করে নেয়া এলকোভের ভিতর শোভা পাচ্ছে বাওয়ার বন্ধু এক অস্ট্রেলীয় ভাস্করের বানানো বিখ্যাত গ্রীক মহাকবি হোমারের লেখা ওডেসির প্রখ্যাত সেই ট্রোজান ঘোড়ার দারুন সুন্দর একটা ভাস্কর্য । ভাস্কর্যটিতে দেখা যাচ্ছে গ্রীক সেনারা দলে দলে ট্রোজান ঘোড়ার পেটের ভিতর থেকে ট্রয় নগরে নেমে পড়ছে। সামনে দুই জানালার মাঝে এক কোনায় একটা এবোনি রাইটিং ডেস্ক, ডেস্কের উপর একটা মাঝারি শেডযুক্ত টেবিল ল্যাম্প । ডেস্কের পাশেই অত্যন্ত সুন্দর ও অভিনব ডিজাইনের একটী পুরনো হাতলযুক্ত চেয়ার যার সাথে সংযুক্ত রয়েছে বিরাট দু’টো শিংয়ের একটা মহিষের মাথার খুলি।

টেবিলের সাথেই একটা দারুন কাজ করা কলোনিয়াল পিরিয়ডের কাঠের চেয়ার। এর পাশেই বিখ্যাত পেইন্টার কে, রামানুজনের আঁকা বড় আকারের একটা পেইন্টিং। পেইন্টিংটির নাম স্নেক প্যালেস। পুরো পেইন্টিং জুড়ে একটা বিশাল সাপের দেহের ভিতর একটা বিশাল লম্বা প্রাসাদের ছবি । এ ধরনেই পেইন্টিংই ছিলো রামানুজনের বিশেষত্ব, সে উপমহাদেশের নানান পৌরানিক ও লোকজ কাহিনীর চরিত্র নিয়ে পশ্চিমা Baroque স্টাইলে পেইন্টিং করতে পছন্দ করতো । চেন্নাইয়ের এ পেইন্টারকে পরবর্তীতে বাওয়া তার অনেক কাজের সাথে জড়িত করেন । ১৯৭১ সালে বাওয়া যখন ভারতের মাদ্রাজে তার অফিস খোলেন তখন বিখ্যাত কোন্নেমারা হোটেলের কাজ করার সময় সেখানকার তিনটি মুরালের কাজ এই রামানুজনকে দিয়ে করিয়ে নেন। আসলে বাওয়ার সংগ্রহে ছিলো এ উপমহাদেশের ও সারা পৃথিবীর অজস্র বিরল সব আর্টিফ্যাক্টস আর লুনুগঙ্গার বিভিন্ন ভবনে বিশেষ করে তার নিজের ভিলায় এগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এখানে সেখানে। ওদিকে রুমের সাথে ওদিকে আচ্ছাদিত বিরাট খোলা স্পেস থেকে বাইরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাচ্ছে। সেখানে মনে হচ্ছে বাইরের ল্যান্ডস্কেপ অলসভাবে ঢুকে পড়েছে বাড়ির ভিতরে , দূর থেকেই একটা ভীষণ ঝাঁকড়া রেপিস পামের গুচ্ছ দেখা যাচ্ছে আর তার পাশেই একা দাঁড়িয়ে একটা লম্বা ফ্যান পাম যেটা প্রায় রুমের সিলিং ছুঁতে চাচ্ছে ।

বর্তমানে এখানে হোটেল বোর্ডাররা ছাড়া সাধারণ দর্শনার্থীদের যেতে দেয়া হয় না। তবে উত্তরপশ্চিম দিকে অবস্থিত Northern Terrace এ কয়েকটি গার্ডেন প্যাভিলিয়ন ভিতর দিয়ে যাওয়া  যায়। এ গার্ডেন প্যাভিলিয়নগুলো বাওয়ার আকাঙ্ক্ষিত সেই শাস্ত্রীয় ইতালীয় ভিলার ল্যান্ডস্কেপের আদলে ডিজাইন করা। কতোগুলো দেয়াল, পরিকল্পিত সবুজ প্রাঙ্গণ, ইতালীয় ক্লাসিকাল ভাস্কর্যের উপস্থিতি আর বেশ পরিণত ঢালের উঁচু Patio ( এর বাংলা প্রতিশব্দ বোধ হয় বহিঃপ্রাঙ্গণ হতে পারে) তে বসে পুরো বাগানের একাংশের দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ, সব মিলিয়ে এ জায়গাটা বাওয়ার স্মৃতির  সেই রোমান ভিলার স্মৃতিকেই মনে হয় বাস্তবায়ন করেছে অবশেষে। এখানে অনেক কনক্রিটের ঢাকাই বেঞ্চ সাজানো। সবগুলো বেঞ্চেই এমনভাবে শেওলা ধরে আছে, মনে হয় যেনো ওগুলোও চারপাশের বৃক্ষের মতোই আদিম প্রকৃতিরই অংশ। জেওফ্রি বাওয়া যেনো স্থপতি নন, বরং প্রকৃকেই নতুনভাবে সাজাতে বসেছেন এক অভিনব দায়িত্ব নিয়ে, আর এ সাজাতে গিয়ে তিনি প্রকৃতির ঘুম ভাঙাতে চাননি একটিবারের জন্যও। বাওয়ার ভিলা, মাঝে সুন্দর প্রাঙ্গণ, সে উঁচু প্রাঙ্গণে ক্লাসিক্যাল প্যাটার্নের রিটেইনিং দেয়াল দিয়ে ধরে রাখা আর তার নিচেই কিছুটা বনভূমি পেরিয়ে সেই পরিচিত দেদ্দুয়া হ্রদ।

রিটেইনিং দেয়ালের উপর বসানো হয়ে ইঊরোপ থেকে নিয়ে আসা অষ্টাদশ শতাব্দীর দু’টি ক্ল্যাসিক্যাল ধারার নগ্ন পুরুষ দেহের ভাস্কর্য ,যা আসলে মাইকেল এঞ্জেলোর ডেভিড ভাস্কর্যের অনুকরণে বেশ কিছুটা ভিন্ন আদলে বানানো। এ দু’টি ভাস্কর্য ভিলা থেকে হ্রদের দৃশ্যকে একটা ফ্রেমের মধ্যে ধারন করতে সহায়তা করে। অনেক স্থপতিই বলেছে এখান থেকে হ্রদের যে দৃশ্য দেখা যায় তা শুধু এই পুরো লুনুগঙ্গা এস্টেটের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য তা ই নয়, এটা পুরো শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ।

এ প্রাঙ্গণেই রয়েছে বাওয়া খুব প্রিয় ফাঙ্গিপানি (আমার কাছে মনে হয়েছে আমাদের কাঠ গোলসাপেরই একটা প্রজাতি) গাছ । গাছ না যেনো একটা বিশাল ভাস্কর্য। বাওয়ার ছোঁয়ায় বিচিত্র এ গাছ আর গাছ থাকেনি, এটা হয়ে গেছে চতুর্দিকে প্রসারিত ও প্রলম্বিত একটি জীবন্ত ভাস্কর্য। আসলে দীর্ঘকাল ধরে গাছের ডালে বিভিন্ন ওজনের ভারি বস্তু ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে গাছের ডালের এমন শৈল্পিক কম্পোজিশন ও আকার দেয়া হয়েছে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় আসলে এখানে দুটো গাছ একত্রে লাগানো হয়েছে, সেকারণে দু’টি গাছ স্বাভাবিক ভাবেই দুদিকে প্রসারিত হয়েছে ও সব মিলিয়ে একটা অপরূপ বৃত্তাকার আবয়ব নিয়েছে।

লুনুগঙ্গাকে বলা যায় বাওয়ারই ব্যক্তি সত্তার সম্প্রসারিত সেলফ পোর্ট্রেইট। লুনুগঙ্গার প্রতিটি জিনিসে, প্রতিটি জায়গায় যে সুগভীর ডিটেইলের সাথে বাওয়া অগ্রসর হয়েছেন তা থেকেই বোঝা যায় ব্যক্তি বাওয়ার চরিত্রিক উপাদানগুলো। কি তিনি পছন্দ করতেন, কি তিনি দেখতে ভালোবাসতেন তা ফুটে উঠেছে লুনুগঙ্গার প্রতিটি উপাদান ও স্পেসের উপস্থিতিতে।  কিছু  কিছু কাজ এতো ডিটেইলে করা যে হতবাক হয়ে যেতে হয়। ধরা যাক একটি ছোট জানালার কথা, একটা নিরেট দেয়ালের মধ্যে অনেকটা বেমানান ভাবে এ জানালাটা বসানো। বাড়ির ভিতর থেকে দেখলে আসল রহস্য বোঝা যাবে, জানালাটা এমন ভাবে বসানো হয়েছে যেনো টয়লেটে বসে যে কেউ চোখের লেভেল থেকে জানালার ভিতর দিয়ে বাইরের বাগানের দৃশ্য দেখতে পারে।

এখন কথা হলো বাওয়ার কাজের সবকিছুই কি ভালো লেগেছে? কোথাও কোন অসম্পূর্ণতা কি লক্ষ্য করিনি?  আমার মতো ক্ষুদ্র একজন স্থপতির জন্য বাওয়ার মতো বিশাল মাপের একজন স্থপতির অসম্পূর্ণতা মাপতে চাওয়া আমার চিন্তার বেদম ঔদ্ধত্যের পরিচায়ক বলে বিবেচিত হবে নিশ্চিত। তারপরও চিন্তা যতোই ঔদ্ধত্যপূর্ণ হোক চিন্তাকে তো বন্ধ করা বা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই সেটা বলেই ফেলি। লুনুগঙ্গা বা কলম্বোতে বাওয়ার নিজের বাড়ির স্থাপত্য ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন দেখে মনে হয়েছে বাওয়ার বসবাসের স্পেস গুলোতে পারিবারিক ভাবে বেড়ে ওঠা শিশু বা কিশোরদের কোন জায়গা নেই। বাওয়ার নিজস্ব সব ঘর গুলোই ডিজাইন করা হয়েছে তার পরিশীলিত ও সংস্কৃতিবান বন্ধু, বান্ধব বা তার চেয়েও অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ মানুষদের সাথে আড্ডা বা সময় কাটানোর জন্য। সত্যিকারের স্বাভাবিক পারিবারিক গার্হস্থ জীবনের আবহ সেখানে সামান্য হলেও অনুপস্থিত বলে আমার মনে হয়েছে। চিরকুমার বাওয়ার জীবনাচরণ নিয়ে অনেক কানাঘুষা আছে। বাওয়ার ভাই, বিখ্যাত ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্ট বেভিস বাওয়াও ছিলেন চিরকুমার ও স্বঘোষিত সমকামী। যৌবনের তুমুল প্লেবয় বাওয়াকে পরবর্তী জীবনে সমকামী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অনেকে। বিখ্যাত ও চরম বিতর্কিত জীবনাচরণে অভ্যস্ত সমকামী অস্ট্রেলিয় পেইন্টার ডোনাল্ড ফ্রেন্ডের সাথে বাওয়ার সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা বলাবলি হয়। লুনুগঙ্গায় স্থাপিত ইউরোপ থেকে নিয়ে আসা মাইকেল এঞ্জেলোর সেই বিখ্যাত ব্যালেন্স, হারমোনি আর নগ্ন পুরুষ শরীরের নিখুঁত ফর্মের জন্য বিখ্যাত ডেভিডের দু’টি ভিন্ন আদলের ছোট অনুকরণ ভাস্কর্য বাওয়ার সমকামী চরিত্রেরই প্রতিফলন বলেও অনেকে মনে করে। লুনুগঙ্গার আশেপাশের বয়স্ক গ্রামীন মানুষদের স্মৃতিতে আজও মনে আছে বাওয়া এখানে প্রায়শই প্রেত নৃত্যের অনুষ্ঠান (Devil Dance) আয়োজন করতেন, এর পিছনে তার কি দার্শনিক বা আধ্যাত্মিক ভিত্তি ছিলো আমার জানা নেই। তারপরও জেওফ্রি বাওয়ার তুলনা জেওফ্রি বাওয়া নিজেই । শুধু শ্রীলঙ্কায় নয়, বাংলাদেশসহ সারা দক্ষিণ এশিয়া, তথা সারা বিশ্বের ট্রপিক্যাল অঞ্চলগুলোর জন্য জেওফ্রি বাওয়া আজীবন হয়ে থাকবেন স্থপত্যের পরম এক পথিকৃৎ। এ অঞ্চলগুলোর স্থপতিদের জন্য আপন জলবায়ু ও আপন সাংস্কৃতিক গৌরব ও আত্মপরিচয় নিয়ে এগিয়ে যাবার প্রধান পথদর্শী প্রেরণা পুরুষ এই জেওফ্রি বাওয়া।

বাওয়ার বাড়ি থেকে অনেকটা এগিয়ে গেলেই ঘাসের ভিতর প্রায় মিশে যাওয়া একটা সাধারণ পাথর দেখা যাবে। এখানে বাওয়া ঘুমিয়ে আছেন বলা যায় । কোন এপিটাফ নয়, কোন নির্দেশক চিহ্ন নয় , সামান্য এক টুকরো সাধারণ পাথর দিয়ে চিহ্নিত করা যায় বাওয়ার কবর , আবার সে অর্থে এটা কবরও না। বাওয়ার দেহ নয়, শুদুমাত্র তার দেহভস্ম এখানে সামাধিস্থ করা হয়েছে যেখান থেকে তার প্রিয় দেদ্দুয়া হৃদের বিশাল জলরাশির দৃশ্য দেখা যায়। বাওয়ার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা এই লুনুগঙ্গায়ই বাওয়া বেছে নিয়েছেন তার চীর বিশ্রামের স্থান যেখানে তিনি সুদীর্ঘ পঞ্চাশটি বছর কাজ করে কাটিয়েছেন। যার ভিতর দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে হেটে বেড়াতেন, হাটতে হাটতে কোথাও কোথায় থামতেন, বসতেন, বিশ্রাম নিতেন, কখনো কফি, কখনো জিন আর কখনো সিগারের ধোঁয়ায় ডুবে যেতেন তার নিজের সৃষ্টি করা লুনুগঙ্গার সীমাহীন মায়াময় জগতে। জগতের কোন তাড়া তাকে এখানে স্পর্শ করতে পারতো না তখন, এখনো পারে না।

আমাদের পুরো লুনুগঙ্গা ট্যুর একসময় শেষ হলো । আমাদের তখন নিয়ে আসা হয়েছে বাওয়ার ভিলার পাশের ছাদযুক্ত খোলা বারান্দায় বা এটাকে একটা loggia space বলা যেতে পারে।  সেখানে এসে সবাই বিশ্রামের জন্য  বসলাম। তখন জোহরের নামাজের সময় হয়ে গেছে । দুপুরের খাবার দিতে তখনো কিছুটা বাকি, এই ফাঁকে আমি অজু করে এসে বাওয়ার বাড়ির সবুজ লনের এক কোনায় একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ঘাসের উপর জোহর আর আসরের নামাজ একত্রে পড়ে ফেললাম। আমাদের সফর সঙ্গিরা কেউ কেউ একটু অবাক হয়ে আমার কান্ডকারখানা দেখছিলো , সেটা আমি বুঝতে পারছিলাম। বহু বছর ধরে এগুলোতে আমি অভ্যস্থ হয়ে গেছি। আমার একদিকে দেদ্দুয়া হ্রদের বিশাল জলরাশি, অন্যদিকে জেওফ্রি  বাওয়ার বাড়ি, সামনে ঘন বন, মাথার উপরে বিশাল গাছের ছায়া আর সিজদার সময় আমার কপাল ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রাঙ্গণের নরম সবুজ ঘাস। হ্রদ থেকে একটা মোলায়েম বাতাস এসে সারা শরীর ও মন জুড়িয়ে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে এক ধরনের অপূর্ব মনোরম পরিবেশ। এ পরিবেশের মধ্যে কোন আধ্যাত্মিকতার উপাদান ছিলো কিনা আমি জানিনা তবে আমার মনের মধ্যে অপূর্ব এক ধরনের অপার্থিব প্রাশান্তি অনুভব করছিলাম। এতো সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে আসার জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিতে দিতে আমি আমার সফরের সংক্ষিপ্ত নামাজ শেষ করলাম।

স্থাপত্য আসলে প্রধানত একটি মনস্তাত্ত্বিক শিল্প। একটি স্পেস, তার ভলিউম, তার মধ্যে আলো আর ছায়ার খেলা, পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির সাথে তার সংযোজন ও বিযোজন এবং একাত্বতা ও সবশেষে প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে নতুন অস্তিত্বের ডাইমেনশন ও অনুভূতির যে আবহ একজন স্থপতি  মানব মনে তৈরি করতে পারে সেখানেই তার সৃষ্টিশীলতার সার্থকতা। সব স্থপতিরা এতোগুলো ভিন্ন-ভিন্ন মাত্রার উপাদান নিয়ে এই জটিল জাদুর খেলা খেলতে পারে না। শুধুমাত্র মহান স্থপতিরাই এটা পারেন। তারাই জানেন সেই ডিভাইন অনুপাত, সমীকরণ ও পরিমিতির মাত্রা। জেওফ্রি বাওয়া হলেন সেই বিশাল মাপের মহান স্থপতি। মানব মনে ভালো স্থাপত্য কি ভীষণ রকমের প্রভাব রাখতে পারে তার সরাসরি প্রমান পেলাম দুপুরে লাঞ্চের সময়।

বাওয়ার ভিলার সংযুক্ত সবুজ ঘরের মঝে কঙ্ক্রিটের গ্রিড কাটা উঁচু প্রাঙ্গনের পাশে লম্বা আচ্ছাদিত করিডোরের মতো বারান্দায় আয়োজন করা হয় আমাদের সবার জন্য দুপুরের খাবার। খাবারের পরিবেশনার মধ্যেও শিল্পের ছোঁয়া, উজ্জ্বল ট্রপিক্যাল নানান রঙের শৈল্পিক কম্পোজিশন। সবুজ, হলুদ লাল, নানা রঙের খাবার। ছোট ছোট বাটিগুল সর নারকেলের মালা দিয়ে তৈরি। খাবারগুলো এমন সুন্দরভাবে এনে সাজানো যে দেখেই খুধা উদ্রেক করে। তবে ক্লাইমেক্স থাকলে যেমন এন্টি ক্লাইমেক্সও থেকে, সেরকম এন্টি ক্লাইমেক্স হিসেবে নাজিল হলো সেই গিবসন। লাঞ্চে আমার পাশেই এসে বসলো প্রায় নির্বাক কোরিয়ান স্থপতি সেই গিবসন গানসাপ রিহ। গিবসনকে আমার পাশে বসতে দেখেই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো । এ ব্যাটা তো কোন কথাই বলবে না, আমার দিকে একবারের জন্য তাকাবেও না । ইরেজিতে বলে A drunk man’s words are a sober man’s thoughts,  আমারও ছোটবেলা থেকে এরকমই একটা অভ্যাস আছে, সেটা হলো মেজাজ খারাপ হলে নিজে

নিজে মনে মনে বিরামহীন কাল্পনিক কথোপকথন করা, আমি ভিতরে ভিতরে সেই drunk man এর মতো এতো অভদ্র তা বাইরে থেকে কেউ বুঝতে পারে না। আমি মনে মনে গিবসনকে বলতে লাগলাম,

ব্যাটা বোবার বোবা, এতো জায়গা থাকতে তুই আমার পাশে আইসা বসলি ক্যান? অন্য কোথাও যা। তোর মতো ভোম্বলের পাশে বসার আমার কোন ইচ্ছা না । ভাগ এখান থেকে।

তবে , বেশিক্ষণ আমি আমার নিজের সাথে নিজের কথা বলা চালিয়ে যেতে পারলাম না। দেখলাম আমাকে অবাক করে দিয়ে গিবসন আমার সাথে পরম বন্ধুর মতো কথা বলতে শুরু করেছে। ও বললো,

সারাটা ছাত্র জীবন কেটেছে রাস্তায় রাস্তায় , র‍্যাডিক্যাল বাম ছাত্র সংগঠনের সদস্য হয়ে সরকার আর মার্কিন সৈন্যদের উপস্থিতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে করে। ক্লাসে কখনো ঠিকমতো লেকচার শুনিনি। গাড়িতে আগুন , হাতবোমা আর মিছিল করে কেটেছে আমার স্থাপত্যের ছাত্র জীবন। জেওফ্রি বাওয়ার বিষয়ে জানার সুযোগ ছাত্র জীবনে পাইনি , এতোদিন পরে এসে বাওয়ার কাজ নিজ চোখে দেখে প্রাণটা ভরে গেলো ।

আমি মহা বিস্ময়ে ওর কথা শুনছিলাম আর অনুভব করছিলাম কিভাবে ওর সাথে হুবহু আমার ছাত্র জীবনের অভিজ্ঞতা মিলে যাচ্ছে। আমি বললাম,

আরে, আমারও তো একই অবস্থা, ১৯৮২ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত ও পাশ করার পরেও নব্বই পর্যন্ত সারাটা ছাত্র জীবন কেটেছে এরশাদ বিরোধী সেই স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বামধারার ছাত্র রাজনীতি করে রাস্তায় রাস্তায়। কয়দিন ক্লাস করেছি মনে করতে পারিনা। আন্দোলন করতে গিয়ে অমানুষিক পুলিশী নির্যাতন ভোগ করেছি, জেলও খেটেছি ।

এরপর শুরু হলো আমাদের দু’জনার মধ্যে মার্ক্সবাদ, হেগেল, লেনিনবাদ, স্ট্যালিন, ট্রটস্কি, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চুটিয়ে আলাপ। লুনুগঙ্গায় ঢোকার আগের আর পরের গিবসনের মধ্যে এতো তফাত । জেওফ্রি বাওয়ার অসাধারণ স্থাপত্য গিবসনের মনের সব দরোজা খুলে দিয়েছে, ভাল স্থাপত্যের এটাই কাজ। ভালো স্থাপত্য মানুষের মনের মধ্যে অভূতপুর্ব প্রভাব রাখতে পারে। আগের গিবসন আর লুনুগঙ্গার গিবসন সম্পূর্ণ আলাদা এক মানুষ । সেই থেকে আজ পর্যন্ত গিবসনের সাথে আমার সম্পর্ক বদলে গেলো। এখনো আমাদের প্রায়ই ফোনে আলাপ-সালাপ হয়।

লুনুগঙ্গা থেকে আমরা যখন ফিরে আসছি তখন শেষ বিকেল। সূর্য আস্তে আস্তে ঢলে পড়ছে। সারাদিন এতো হাটাহাটির পরও কোন এক অদ্ভুত কারণে আমরা কেউ তেমন ক্লান্ত বোধ করছি না। আমাদের মাইক্রোবাস খুব দ্রুত ছুটে চলেছে কলম্বো শহরের দিকে। সন্ধ্যার পরপরই আমাদের যোগ দিতে হবে শ্রীলঙ্কা ইন্সস্টিটিউটের অনষ্ঠানে । যতই আগাচ্ছি ততোই শহর ও এর অবকাঠামো আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, তবে আমার চোখ সেগুলো দেখছে কিন্তু আমার মস্তিস্ক ও আমার হৃদয় তখনো সম্পূর্ণভাবে জেওফ্রি বাওয়ার দখলে। মাথার মধ্যে বারবার ঘুরছে বাওয়ার সেই কথা,

“I have a very strong conviction that it is impossible to explain architecture in words – I have always enjoyed seeing buildings but seldom enjoyed reading explanations about them – as I feel, with others, that architecture cannot be totally explained but must be experienced.”

আমি সেই experience এ সম্পূর্ণ অবগাহন করে অদ্ভুত এক ভালোলাগা ঘোরের মধ্যে কখন ব্যস্ত কলম্বো নগরে এসে পৌঁছুলাম , সঠিকভাবে তা মনে করতে পারি না। শুধু এতোটুকু বুঝতে পারি – লুনুগঙ্গায় ঢোকার আগের আমি আর লুনুগঙ্গা থেকে বেরিয়ে আসা আমি আর এক নেই।

মাহফুজুল হক জগলুল

১০ মার্চ, ২০২০


			
আরও পড়ুন