তেঁতুলতলা মাঠ এবং আমার কলাবাগানের সোনালি শৈশব

তেঁতুলতলা মাঠ এবং আমার কলাবাগানের সোনালি শৈশব

কতো বয়স পর্যন্ত মানুষ তার ছোটবেলার স্মৃতি মনে করতে পারে? ১৯৭০ সালে আমি ছিলাম মাঝারি সাইজের একটি লিকলিকে বালক । এতো ছোট বয়সের স্মৃতি মানুষের মনে থাকে কি না আমি জানি না। তবে যেকোনো কারণেই হোক আমার স্পষ্ট মনে আছে বড়দের নকল করে আমরা বিশ-পঁচিশজন বাচ্চাকাচ্চা একত্র হয়ে,

তোমার আমার ঠিকানা,
পদ্মা,মেঘনা, যমুনা।

বলে বলে লাফিয়ে লাফিয়ে লেক সার্কাস গার্লস স্কুলের কাছে একটা মাঝারি মাপের পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বি একচিলতে মাঠ ঘিরে ঘিরে মিছিল করতাম। ১৯৭০-এর সেই মিছিলগুলোই খুব সম্ভবত ছিল আমার জীবনের প্রথম মিছিল। তখন এই মাঠটির কোনো নাম ছিল কি না আমার মনে নেই। তবে মনে আছে, প্রতিদিন বিকেলবেলা আর ছুটির দিনে আমরা ছোটরা এবং আমাদের চেয়েও যারা বড়ো তাদেরও অবধারিত গন্তব্য ছিল এই মাঠটি। এখানে আমরা ফুটবল খেলতাম, ডাংগুলি খেলতাম, সাতচারা খেলতাম। চারা ছুড়ে মেরে মেরে সিগারেটের প্যাকেটের তাস দিয়ে খেলতাম। তবে ফুটবলই বেশি খেলতাম। মনে আছে, আমাদের তখনকার ফুটবলগুলো পরিপূর্ণ গোল ছিল না, কেমন জানি একটু টাল খাওয়া আকার ছিল এগুলোর। কেননা তখনকার ফুটবলগুলো জুতার ফিতার মতো ফিতা দিয়ে চামড়ার গোলাকার খোলসের মধ্যে পাম্প দেওয়া ব্লাডার চেপে ভরে আটকে দেওয়া হতো। সেজন্য এগুলো পরিপূর্ণ গোল হতো না। নিজেদের বানানো কাঠের ব্যাট আর টেনিস বল দিয়ে ৮/১০টা ইটের ওপর ইট বসিয়ে উইকেট বানিয়ে ক্রিকেটও খেলতাম আমরা এই মাঠে। সকাল ১১টার দিকে লেক সার্কাস গার্লস স্কুলের টিফিন টাইমে এই মাঠের পশ্চিম অংশে তেঁতুল গাছের নিচে কিচিরমিচির করা ছাত্রছাত্রীরা ভিড় করতো আইসক্রিম, আচার, চটপটি আরো নানা পদের খাবার কিনতে। এই ছোট্ট মাঠটি ছিল আমাদের পাড়ার ছেলেদের এবং বড়দেরও সকল কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র।

প্রখ্যাত স্থপতি কাজি নাসির ভাইয়ের একটি পোস্টে ম্যাপে যখন বর্তমানে প্রচুর আলোচিত তেঁতুলতলা মাঠের লোকেশনটা চিনলাম সঙ্গে সঙ্গে আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। আরে, এই তো আমার সেই মাঠ। আমার কলাবাগানের সোনালি শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত সেই সুন্দর মাঠ। তখন আমার বয়স ৭/৮ বছর। হালকা হালকা অনেক কিছু মনে আছে। তবে মাঠের একদম পশ্চিম মাথায় একটা ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছ ছিল, এটা খুব স্পষ্ট মনে আছে । আর মনে আছে, গাছের নিচে এক বৃদ্ধ আইসক্রিমওয়ালা সারা দিন মাথায় বয়ে বেড়ানো আইসক্রিমের বাক্স নিয়ে বসে থাকতেন আর ম্যাজেন্টা রঙের আইসক্রিম বিক্রি করতেন। আইসক্রিমের দাম ছিল এক আনা । স্পেশাল একটা আইসক্রিম ছিল, যেটার অর্ধেক ম্যাজেন্টা আর অর্ধেক সাদা। সেটার দাম একটু বেশি ছিল। আমরা সাধারণত কম দামেরটা খেতাম। মাঠের পুব মাথায় একটা ছোট মুদির দোকান ছিল। আমার মনে আছে, সেই দোকানে তিন পয়সার খুবই সুস্বাদু শুকনো সন্দেশ পাওয়া যেতো। আমাদের বাসায় যখন গ্রাম থেকে আসা গুরুজন আত্মীয়রা চলে যেতেন তখন তাঁদের লাইন ধরে পা ছুঁয়ে সালাম করার নিয়ম ছিল। আর সালামের পর তাঁরা আমাদের হাতে ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে কিছু খুচরো পয়সা ধরিয়ে দিয়ে যেতেন আর আমরা সেই পয়সা নিয়ে এক দৌড়ে এই দোকানে গিয়ে সন্দেশ কিনে খেতাম। আজও চোখ বন্ধ করলে আমি সেই সন্দেশের স্বাদ টের পাই।

তেঁতুলতলা মাঠের কথা উঠতেই হু হু করে তখনকার হাজারো শৈশব স্মৃতি এসে ভিড় জমিয়েছে আজ আমার মাথায়। আমি ছাড়া এসব স্মৃতির কোনো মূল্য আর কারো কাছে থাকার কথা নয়। তাই এ নিয়ে লেখার কোনো মানে হয় না, অপ্রয়োজনীয় জিনিস। তারপরও কেন জানি খুব লিখতে ইচ্ছে করছে। প্রায় সব মানুষই তো মাঝে মাঝে অনেক অপ্রয়োজনীয় কাজ করে, করে না?

১৯৭০ সালে আমরা তখন কলাবাগানের লেক সার্কাসে একটা দোতলা টিনের বাসায় মাত্র উঠেছি। দক্ষিণে বিশাল একটা পুকুর, পুকুরের উত্তর-পশ্চিম কোনায় একটি মাত্র গাছ, বিশাল একটা প্রাচীন কালোজাম গাছ। তার উত্তরে বিরাট একটা মাঠ, তারও উত্তরে আমাদের এই বিশাল দোতলা ওই পুরোনো টিনের ঘর। বিশাল ল্যান্ডস্কেপ সামনে রেখে যেন টিনের দোতলা তাজমহল দাঁড়িয়ে। সব মিলিয়ে প্রায় তিন বিঘার ওপর ঢাকা শহরের ভেতর দেয়ালঘেরা এক নিজস্ব পৃথিবী। হু হু করে দক্ষিণ দিক থেকে বাতাস আসতো, বর্ষাকালে পুকুর উপচিয়ে মাঠটি পানিতে ডুবে যেতো, কালোর ওপর হলুদ ছোপ ছোপ মোটা মোটা ডোরা সাপ আর টাকি মাছ সেই পানিতে ঘুরে বেড়াতো। বাসগৃহ থেকে বাথরুম আর পাকের ঘর আলাদা। বর্ষার সময় কাঠের তক্তা দিয়ে সাঁকোর মতো বানিয়ে তার ওপর দিয়ে চলাচল করতে হতো। বাড়ি টিনের হলেও নামখানা ছিল বেশ খানদানি—‘বরিশাল কটেজ’। বাড়িওয়ালা ছিলেন বরিশালের মানুষ, তাই এই নাম তিনি দিয়েছিলেন। আমাদের বাড়িও ছিল বরিশাল (তখনকার পিরোজপুর মহকুমা )। তখন আমরা চার ভাই। আমার দেড় বছরের ছোট বাহলুল, আমার চার বছরের ছোট বুলবুল আর আমার আট বছরের ছোট টুটুল। আমাদের সব ভাইয়ের নামের এই অন্তমিল নিয়ে পাড়ার পোংটা ছেলেরা নানা ধরনের হাসি-তামশা করতো । পাড়ার পোলাপান আমাদের দেখলেই বলতো,

বরিশাইল্লা ভূত, খাতা ভইরা মুত।

ওই বয়সে আমার খুব কান্না পেতো এ কথাগুলো শুনে। আমার মনে আছে, আমি মনে মনে আল্লাহকে বলতাম,

ও আল্লাহ, দুনিয়ায় এতো জায়গা থাকতে তুমি আমাদের বরিশালের মতো ভূতের দেশে কেন জন্ম নেওয়াইলা।

তবে এখন অবশ্য পুরো উল্টোটা মনে হয়। বাড়িওয়ালা আব্বাকে খুব খাতির করতেন এবং অস্বাভাবিক কম ভাড়া নিতেন। বরিশাল কটেজের ঠিক উল্টো দিকের বাড়িটি ছিল বিরাট দোতলা পাকা বাড়ি। বাড়িটি ছিল আব্বার বন্ধু আউয়াল চাচার। তিনি পুলিশের বড় গোয়েন্দা ছিলেন। তাঁর দুই ছেলে ছিল, বড় খোকন আর ছোট খোকন। বড় খোকনের হাতেই আমি জীবনে প্রথম মাসুদ রানার ‘নীল আতঙ্ক’ বইটা দেখি। আমি তাকে যখন জিজ্ঞেস করি মাসুদ রানা কী ধরনের গল্পের বই? সে আমাকে নাক সিটকে বলেছিল,

‘তুই বুঝবি না, এটা প্রাপ্তবয়স্কদের বই।’

তার নাক সিটকানো দেখে ‘প্রাপ্তবয়স্কদের বই’ কথার অর্থ কী তা জিজ্ঞেস করার সাহস আমার তখন হয়নি। পাড়ায় আমাদের চেয়ে যারা একটু বড়ো তারা যখন ছোটদের ওপর কোনো কারণে বিরক্ত হতো বা কোনো ব্যাপারে আমরা একটু তর্ক করতাম তখন প্রায়ই তারা রেগে গিয়ে বলতো,

‘উচিত কথা কইয়া দিমু।’
উচিত কথাটা কী তা জিজ্ঞেস করলে মুচকি হাসি দিতো; কিন্তু খোলাসা করে কিছু বলতো না । দীর্ঘদিন পাড়ায় একত্রে থাকার পরও ‘উচিত কথাটা’ আসলে কী তা জানতে পারিনি, তবে কিছুদিনের মধ্যে আমরাও একই পরিস্থিতিতে পড়লে বলে উঠতে শুরু করলাম,

উচিত কথা কইয়া দিমু।

যদিও অন্যদের সঙ্গে আমাদের তফাত ছিল। অন্যরা জানতো ‘উচিত কথাটা’ আসলে কী। কিন্তু আমরা না জেনেই উচিত কথার ভয় দেখাতাম ।

কিছুদিন পর যখন এই দুই খোকন ভাইদের সঙ্গে খাতির হলো, তখন একটা জিনিস জানতে পারলাম। তা হচ্ছে, বরিশাল কটেজে নাকি অনেকেই ভূত দেখেছে এবং কয়েক বছর আগে নাকি এ বাড়ির দোতলায় কড়িকাঠের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ফাঁস দিয়ে এক মহিলা আত্মহত্যা করেছে। মাঝে মাঝেই নাকি এলাকার বুড়ো-বুড়িরা সেই মহিলাকে দোতলার বারান্দায় দেখতে পায়। সে কারণে কেউ নাকি ভুলেও এ-বাড়ি ভাড়া নেয় না। এতো দিনে আমাদের কাছে পরিষ্কার হলো, কেন বাড়িওয়ালা আব্বার কাছ থেকে এতো অস্বাভাবিক কম ভাড়া নিতেন আর অতিরিক্ত খাতির করতেন। তবে ততো দিনে আমরা এ বাড়িটিকে ভালোবেসে ফেলেছি আর ভূতের কথা শোনার পর থেকে একটা লাভ হলো। দুটো খাট একত্র করা হলো। আমরা চার ভাই আর আব্বা-আম্মা, আমরা সবাই একটা বিশাল খাটে রাতে ঘুমাতে লাগলাম।

কলাবাগানে এসেই আব্বা আমাকে লেক সার্কাস স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। ওটা ছিল প্রধানত একটা গার্লস স্কুল, তবে কোন বিচিত্র কারণে কিছু ছেলেও সেখানে পড়তো। গার্লস স্কুলে পড়তে আমার খুব লজ্জা লাগতো। কিন্তু আব্বা আমার এ লজ্জাকে মোটেও পাত্তা দিতেন না। মনে আছে ক্লাস থ্রিতে ঐ স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় আমি সেকেন্ড হয়েছিলাম আর স্কু্ল কর্তৃপক্ষ অনেক বড় বড় ফন্টে প্রিন্ট করা একটি বড় রূপকথার বই প্রাইজ হিসেবে আমাকে দিয়েছিলো। স্কুলে আমাদের ইসলামিয়াত টিচার ছিলেন লম্বা দাড়িওয়ালা এক মোটা হুজুর টাইপ  মানুষ। তাঁকে মনে আছে অন্য কারণে, তিনি পুরো ক্লাস টাইমে নিজস্ব বানানো একটা টুথপিক দিয়ে খুব মনযোগ দিয়ে দাঁত খোঁচাতেন আর দাঁত খুঁচিয়ে যে ময়লা বের হতো সেটা তিনি পুট করে খেয়ে ফেলতেন। এছাড়া আর অস্বাভাবিক শুকনো একজন টিচার ম্যাডামের কথা মনে আছে , যদিও তাঁর নাম মনে নাই তবে তার মেয়ের নাম মনে আছে । মেয়েটি আমাদের বয়সি ছিলো , নাম ছিলো বাচ্চি। এমন বিচিত্র নাম আমি জীবনে আর শুনিনি। ম্যাডাম আমাদের পাড়ায়ই থাকতেন আর প্রায়ই তিনি ক্লাস টাইমে আমাকে তাঁর বাসায় পাঠাতেন তার জন্য মাথা ব্যথার ট্যাবলেট নিয়ে আসার জন্য। এতো ছাত্রের মধ্যে শুধু আমাকে ট্যাবলেট আনতে পাঠানোর জন্য নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো আর তাই আমার অন্য সহপাঠিরা যখন ক্লাসে কঠিন পড়াশোনায় ব্যস্ত আমি তখন বুক ফুলিয়ে স্কুলের মাঠ পেরিয়ে স্কুল গেট খুলে আমাদের পাড়ায় যাচ্ছি ট্যাবলেট আনার জন্য। যেহেতু ম্যাডামের বাসার পাশেই আমাদের বাসা ছিলো তাই ট্যাবলেট নিয়ে ফিরে আসার সময় এক ফাঁকে আমি আমাদের বাসায় ঢুকে মায়ের সাথে দেখা করে আসতাম। স্কুল টাইমে আমাকে হঠাৎ বাসায় দেখে মা খুব অবাক হয়ে যেতেন। মাকে অবাক করে দিতে ঐ বয়সে কার না ভালো লাগে। তবে একটা জিনিস খুব অবাক লাগতো, নিজের মেয়ে থাকতে ম্যাডাম আমাকেই কেন তাঁর বাসায় ট্যাবলেট আনতে পাঠাতেন। পরবর্তী জীবনের অনেক অমিমাংসিত বিষয়ের মতো এ বিষয়টিও অমিমাংসিত থেকে গেছে।

স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে আমরা স্কুলের বাইরে বেরিয়ে তেঁতুলতলা মাঠের বিশাল তেঁতুল গাছের নিচে বসে বসে চটপটি, আইসক্রিম, আচার, ঝালমুড়ি ইত্যাদি খেতাম। প্রতিদিন টিফিনের জন্য মা একটি সিকি (২৫ পয়সা বা চার আনা) দিতেন, তাতেই অনেক রকম গিজগিজ করা জীবাণুমিশ্রিত খাবার খেয়ে আমরা পেট ভরিয়ে ফেলতাম। বৃদ্ধ সেই আইসক্রিমওয়ালারা চৌকস ম্যাজিসিয়ানের মতো অদ্ভুত ভঙ্গিতে কুয়াশার মতো ঠাণ্ডা ধোঁয়া ওঠা ছোট কাঠের বাক্স থেকে রঙিন রঙিন আইসক্রিম বের করে আনতেন। এই আইসক্রিমে কোনো ক্রিম থাকতো না। এগুলো ছিল স্যাকারিন দিয়ে মিষ্টি করা লাঠির মাথায় রঙিন এক খণ্ড বরফ। শুধু বরফ হলেও এর স্বাদ কেন যেন ছিল অতুলনীয়। পরিণত বয়সে শৈশবের সব কিছুই বোধ হয় অতুলনীয় মনে হয় ।

এ সময়টাতেই এ অঞ্চলের হাজার হাজার পরিবারের মতো আমাদের পরিবারও তখন আস্তে আস্তে মধ্যবিত্তের পরিসরে শহুরে নাগরিক হয়ে উঠছিল। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা একজন স্কুল ও মাদ্রাসা শিক্ষকের জ্যেষ্ঠ সন্তান প্রচণ্ড সংগ্রামী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আমার আব্বা, ধীরে ধীরে সচ্ছল মধ্যবিত্ত নাগরিক পরিবারের প্রতিনিধি হয়ে উঠছেন এবং পরিবারে পিছিয়ে থাকা সদস্যদের আপ্রাণ চেষ্টা করছেন টেনে তুলতে। সেই সময়ে এক একটি নতুন শহরকেন্দ্রিক মোটামুটি টিকে যাওয়া মধ্যবিত্ত পরিবারকে কেন্দ্র করে পাঁচ-ছয়টি পিছিয়া থাকা মফস্বল বা গ্রামীণ পরিবার ঢাকার নাগরিক পরিসরে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম চালিয়ে যেতো। ঢাকার পরিবারটি হতো তাদের এই সব সংগ্রামের নিউক্লিয়াস। আব্বা আর মা ছিলেন তেমনই একটি নিউক্লিয়াস পরিবারের প্রধান। তাই সেদিনগুলোতে আমাদের বাসায় এমন কোনো দিন ছিল না যে দু-চারজন থেকে কখনো কখনো আট-দশজন আত্মীয় বা গ্রামের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর লোক আমাদের বাসায় থাকতেন না। ছোটকাল থেকেই নাগরিক সফিস্টিকেশনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সগর্বে একটা ডাবলবেড আমাদের ড্রয়িংরুমে সব সময় শোভা পেতো। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, কেউ না কেউ ড্রয়িংরুমে মশারির দড়ি নিয়ে ছোটাছুটি করছে তার বিকট মশারি টানিয়ে ঘুমানোর আয়োজন করার জন্য, আর কেউ কেউ আমাদের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমাচ্ছে, বাকিদের জন্য ফ্লোরে টানা বিছানা। সে জন্যই এখনকার ছেলেমেয়েদের মতো আমাদের ছোটদের তখন নিজস্ব কোনো রুম বা নির্দিষ্ট কোনো বিছানা ছিল না। মেহমানের সংখ্যার ওপর ঠিক হতো কোন রাতে আমরা কোন বিছানায় কার সঙ্গে ফ্লোরে, না খাটে ঘুমাবো। তখনকার দিনে এটা মোটামুটি স্বতঃসিদ্ধ ছিল যে গ্রাম বা মফস্বল থেকে এসে ভাই-বোনরা বা ভাইগনা-ভাইপোরা মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর তার ভাই-বোন, মামা বা চাচার বাসায় থাকবে। এ সময় এসব সংগ্রামী মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্য থেকে দ্রুত নতুন আকাঙ্ক্ষা আর নতুন স্বাধিকারবোধ ও অত্মপরিচয়ের তীব্র চাহিদা ক্রমশ জমাট বাঁধছে আর বদলে দিতে চাইছে আমাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মানচিত্র। এ গল্পগুলো আসলে পূর্ববঙ্গের শত শত বছরের পিছিয়ে থাকা বাঙালি মুসলমানের আত্মপ্রতিষ্ঠা ও আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের ও যুদ্ধের গল্পেরই অংশ। সে হিসেবে আমাদের পরিবারের গল্প আসলে এ রকম অগুনিত মধ্যবিত্ত পরিবারেরই ধীরে ধীরে স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে ওঠার গল্প।

তখন লেক সার্কাস স্কুলের পেছন থেকে এখন যেখানে পান্থপথ সে পর্যন্ত ছিল বিশাল বিল। স্কুলের পেছন থেকে তাকালে শুক্রাবাদ ও বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়িটা দেখা যেতো (তখন অবশ্য জানতাম না ওটা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি)। বাবা যখন তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করতেন তখন তাঁদের আলাপে একটু পরপর এই নামটি শুনতাম। বর্তমান পান্থপথের মাথায় অর্থাৎ বিলের উত্তর-পশ্চিম কোনায় ছিল OK SPORTS নামের বিরাট লম্বা একটা টিনের ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান। শুক্রাবাদের সঙ্গে কলাবাগানের কেন জানি প্রায়ই মারামারি হতো। শীতকালে শুক্রাবাদ থেকে দলে দলে মানুষকে দেখেছি লাঠিসোঁটা, বল্লম ইত্যাদি দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ব্যাপক চিৎকার-চেঁচামেচি করতে করতে শুকনো বিলের ওপর দিয়ে এসে লেক সার্কাসের উত্তর দিকে আক্রমণ করতো। হৈ-হুল্লোড়, চেঁচামেচি যতোটা হতো, মারমারি ততোটা হতো না। সেই আক্রমণকারী দলের সঙ্গে বল্লম হাতে আমাদের পাড়ার ডাকপিয়নকেও দেখা যেতো। তখনকার দিনে চিঠি আর টেলিগ্রাম ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যম। তাই ডাকপিয়নকে সবাই চিনতো আর খাতির করতো। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার ছিল যে, ওই বল্লমধারী আক্রমণকারী ডাকপিয়নকে পরের দিনই দেখা যেতো আমাদের পাড়ায় নির্ভয়ে চিঠি বিলি করে বেড়াচ্ছে আর এপক্ষের লোকরা কেউই তাকে কিছু বলছে না। আমার কাছে মনে হতো বল্লম হাতে ওই সব মারামারি ছিল একধরনের খেলা। গ্রিনরোড আর কলাবাগানের মাঝের বিল শুকিয়ে গেলে সেখানেও আমরা ফুটবল খেলতাম। কেননা তখন বিলের সে মাঠ ছিল আমাদের তেঁতুলতলা মাঠের চেয়ে কয়েক গুণ বড়ো; আর তখন তেঁতুলতলা মাঠ চলে যেতো মেয়েদের দখলে। বর্ষাকালে যখন আমাদের ওই মাঠ ডুবে যেতো তখন আমরা আবার আমাদের প্রাণপ্রিয় তেঁতুলতলা মাঠে ফিরে আসতাম। আমার এখনো মনে আছে, ফুটবল ক্লাবের চাঁদা ছিল আট আনা। কলাবাগান আর কাঁঠালবাগানের মাঝামাঝি বিলের মধ্যে দ্বীপের মধ্যে একটা বাড়ি ছিল, সেখানে প্রায়ই সিনেমার শুটিং হতো। শুটিং শুরু হলে আমরা ফুটবল খেলা ফেলে রেখে শুটিং দেখতে যেতাম। একদিন শুটিং দেখতে গিয়ে আবাক হয়ে দেখি, আমাদের পাড়ারই একজন শুটিংয়ে অভিনয় করছেন। তিনি ছিলেন সুমিতা দেবী। কলাবাগানের উত্তর-পশ্চিম দিকে তিনি থাকতেন।

তেঁতুলতলা মাঠের পুব দিকেই ছিল দুলাল ভাইদের সম্মুখে উঠোনওয়ালা সুন্দর দোতলা রঙিন টিনের ঘর। দুলাল ভাইরাও আমাদের মতো বরিশালের মানুষ ছিলেন। সে বাড়ির বিপরীতেই ছিল বড় খোকন-ছোট খোকনদের দালান আর তার বিপরীতে ছিল আমাদের টিনের প্রাসাদ—বরিশাল কটেজ। অর্থাৎ তেঁতুলতলা মাঠের ৩/৪টা ঘরের পরেই ছিল আমাদের ঘর। মাঠের উত্তর-পুব কোনায়ই ছিল খাড়া পুকুরঘাটসহ ছোট্ট একটা সুন্দর মসজিদ। খুব ভোরে আমরা ছোটরা লাল মলাটের সেপারা হাতে ঘুমকাতর চোখে হাঁটতে হাঁটতে আরবি পড়তে যেতাম এ মসজিদে। মোটামুটি আমাদের তখনকার ওই পাড়াটা ছিল অনেকটা গ্রাম আর শহরের কাঠামোগত একটা মজার মিক্সচার। পাড়ায় এমন অনেক টিনের ঘরও ছিল, যেগুলোর গ্রামের মতো কমন উঠোন পর্যন্ত ছিল। মসজিদের পাশেই ছিল সেলিম ভাইদের ঘর। সেলিম ভাইদের ঘরের কথা মনে আছে। কেননা সে ঘরে উনারা মাখন বানাতেন। মনে আছে, কী সুন্দর ঘিয়ে রঙের মাখন চৌকোনা সাইজে কেটে কেটে লাল প্রিন্ট করা পাতলা পেপার দিয়ে প্যাক করে রাখতেন। সেই মাখনের ঘ্রাণ আজও টের পাই। মনে আছে মনির ভাইয়ের আব্বার কথা, মোটাসোটা, মাথায় টাক ভদ্রলোক ছিলেন খুব জবরদস্ত শখের মাছ শিকারি। বিভিন্ন জায়গায় তিনি মাছ ধরতে যেতেন। বিশাল একটা মেরুন রঙের এনফিল্ড মোটরসাইকেলে লম্বা লম্বা হুইলওয়ালা বিদেশি বড়শি সাইডে ঝুলিয়ে বিকট শব্দে তিনি পাড়ায় ঢুকতেন। তাঁর মোটরসাইকেলের আওয়াজ শুনতেই আমরা জানালার পর্দা সরিয়ে উঁকি দিতাম। তিনি ছিলেন আমাদের কাছে অ্যাডভেঞ্চার গল্পের চরিত্রের মতো ভীষণ ইন্টারেস্টিং মানুষ।

আরেকজন বড় ভাইয়ের কথা মনে আছে; কিন্তু তাঁর নাম বা চেহারা মনে নেই। শুধু মনে আছে, তিনি খুব লম্বা ছিলেন আর আমাদের বাসার ৩/৪টা বাসার পুব দিকে উনাদের বাসা ছিল। উনার কথা মনে আছে, কেননা উনি আমাদের কাছে ছিলেন সায়েন্টিস্ট ভাই। উনার পড়ার টেবিলে আমি একগাদা টিকটিকির সাদা কঙ্কাল দেখেছিলাম। আমরা শুনতাম, ওগুলো নিয়ে উনি গবেষণা করেন। এমন একটা কথাও চালু ছিল যে, উনার কাছে নাকি ছোট শিশুদেরও কঙ্কাল আছে, সেগুলো নিয়েও নাকি উনি গভীর রাতে গবেষণা করেন। সত্য-মিথ্যা যা-ই হোক, উনি ছিলেন আমাদের কাছে পরম শ্রদ্ধেয় এক ভয়ংকর রহস্যময় চরিত্র। উনার কাছে আমরা ঘেঁষতে চাইতাম। কেননা তাঁর চরিত্রের রহস্যময়তা আমাদের চুম্বকের মতো টানতো, আবার কখন তিনি আমাদের কঙ্কাল বানিয়ে দেন এ ভয়ে ভীষণ ভয়ও লাগতো। তবে উনি আমাদের ছোটদের মোটেই পাত্তা দিতেন না, তাই তাঁর কাছে ঘেঁষা এতো সহজ ছিল না। তবে একবার সুযোগ এসেছিল। তখন টিভিতে বিখ্যাত সুইস কাহিনি ‘উইলিয়াম টেল’ সিরিজ দেখানো হতো। সে সিরিজে উইলিয়াম একটা বালকের মাথার ওপর লাল রঙের একটা আপেল রেখে তার বিখ্যাত ক্রসবো (বাংলায় বলে আড় ধনুক, একটা বন্দুকের মাথায় ধনুক লাগিয়ে বন্দুকের ট্রিগার টিপে তীর ছুড়ে মারার অস্ত্র) দিয়ে তীর ছুড়ে আপেলটা নিমেষে দুই খণ্ড  করে ফেলে। আমাদের সেই সায়েন্টিস্ট বড়োভাইকে একদিন দেখলাম কাঠ দিয়ে একদম উইলিয়ামের সেই ক্রসবো বানিয়ে পাড়ার রাস্তায় হিরোর মতো ঘুরছেন আর ১৫/২০ জন কাচ্চাবাচ্চা তাঁর পিছু পিছু কিচিরমিচির করতে করতে তাঁকে অনুসরণ করছে। তাঁর হাতে ওই ক্রসবো দেখে বিস্ময়ে আমরা হতবাক। মনে হতে লাগলো যেন টিভির বাক্স থেকে উইলিয়াম বের হয়ে আমাদের পাড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো তখনই যখন তিনি উইলিয়ামের মতো তাঁর হাতের টিপ পরীক্ষার জন্য কেন যেন আমাকে পছন্দ করে ফেললেন। আমি খুব লিকলিকে ছিলাম বলেই বোধ হয় আমাকে তাঁর জুতসই টার্গেট হিসেবে পছন্দ হয়েছিল। দেখলাম যে সায়েন্টিস্ট ভাই কখনো আমাকে পাত্তাই দিতেন না তিনি আমার সঙ্গে খুব খাতির শুরু করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর ভয়াবহ পরিকল্পনা বুঝতে পারলাম, সেটা হচ্ছে উইলিয়াম টেলের মতো আমার মাথায় আপেল রেখে তিনি তাঁর ক্রসবো দিয়ে তীর ছুড়ে আপেল দ্বিখণ্ডি করবেন। যেহেতু তখন আপেল এতো সুলভ ছিল না, শুধু মৃত্যুপথযাত্রী রোগী দেখতে যাওয়ার সময়ই আপেল আর আঙুর কেনা হতো। আর টার্গেট হিসেবে প্রাথমিকভাবে আপেল অনেক কঠিন, তাই উনি ঠিক করলেন আমাকে তেঁতুলতলা মাঠের পশ্চিম প্রান্তের তেঁতুল গাছের কাণ্ড বরাবর দাঁড় করিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে (যেন নড়াচড়া না করতে পারি) একটা আস্ত জাম্বুরা আমার মাথায় রেখে উনি তীর ছুড়ে জাম্বুরা দ্বিখণ্ডিত করবেন (জাম্বুরা দ্বিখণ্ডিত করা নিশ্চয়ই সম্ভব না)। এ পরিকল্পনা বোঝার পর আমার অবস্থা তো যাকে বলে ভয়ানক ‘কাহিল’। এক দৌড়ে কী করে সেদিন সায়েন্টিস্ট ভাইয়ের কাছ থেকে পালিয়ে ঘরে চলে এসেছিলাম তা আমার হুবহু মনে নেই, তবে মনে আছে এর পর থেকে সাইয়েন্টিস্ট ভাইকে দেখলেই আমি দৌড়ে পালিয়ে যেতাম। তবে তিন আমার দিকে মোটেও ভ্রক্ষেপ করতেন না। খুব সম্ভবত তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে বেইমানি করার কারণে তিনি আমার ওপর খুবই বিরক্ত ছিলেন, অথবা আমার মতো বিজ্ঞানবিমুখ ছারপোকা নিয়ে তিনি মোটেই ভাবতেন না।

কলাবাগানে থাকতে যখন ঝড় আসতো, বিশেষ করে রাতে ঝড়ের বিপৎসংকেত থাকলে আব্বা ওই দোতলা টিনের ঘরে থাকা নিরাপদ মনে করতেন না। তখন আমরা সকলে মিলে আমাদের ঘরের ঠিক উল্টো দিকে আব্বার বন্ধু পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের বড়ো অফিসার আউয়াল চাচার বাসায় চলে যেতাম। ঝড় না থামা পর্যন্ত, কখনো কখনো অনেক রাত পর্যন্ত আমরা সেখানে থাকতাম। মাঝে মাঝে আমাদের সঙ্গে পাড়ার অন্যান্য পরিবারও ওই বাড়িতে আশ্রয় নিতো। এ ব্যাপারে আউয়াল চাচার পরিবার কখনো বিরক্ত হতো না, বরং একটা মজার পিকনিক পিকনিক পরিবেশ তৈরি হতো। সবচেয়ে মজা পেতো মনে হয় ছোট খোকন আর বড় খোকন। তারা খুব হাঁকডাক করে স্বেচ্ছাসেবকের মতো সবার খোঁজ-খবর নিতো, বড়ো গামলায় সবাইকে মুড়ি খেতে দিতো। এ রকম পরিস্থিতিতে আব্বা আর আউয়াল চাচা অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করতেন। যতোটুকু বুঝতাম তাদের বেশির ভাগ আলাপের বিষয়বস্তুই ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে।

মনে আছে, একবার একটা খুব বড়ো ঝড় হয়েছিল। সেটা ১৯৭০ সালের শীতকালের কথা। সেই ঝড় খুব ভয়াবহ ছিল আর সেবারই আমরা সারা রাত আউয়াল চাচার বাসায় ছিলাম। বড়ো হয়ে শুনেছি, ১৯৭০-এর ১৩ নভেম্বরের ওই ঘূর্ণিঝড় ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড়। ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় তিন লাখ মানুষ এই ঝড়ে নিহত হয়। আমাদের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরেও ওই ঝড় আঘাত হানে। আমার দাদা-দাদি, নানা-নানিসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন পিরোজপুরে থাকতো। সকাল হতেই আব্বা তাদের খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তখন ঘরে ঘরে টেলিফোন ছিল না। কুরিয়ার সার্ভিস ছিল না। চিঠি দিলে ভাগ্য ভালো থাকলে সে চিঠি পৌঁছাতে আট-দশ দিন লাগতো। সদরঘাট থেকে কাঠের লঞ্চে পিরোজপুর যেতে চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগতো। তিনবেলার খাবার বিশাল টিফিন ক্যারিয়ারে নিয়ে আমরা সপরিবারে লঞ্চে উঠতাম।

সকাল হতেই দেখলাম পাড়ার চেহারা বদলে গেলো। বয়স্করা রেডিও কানে লাগিয়ে ব্যস্তভাবে ঝড়ের সংবাদ শুনতে লাগলো আর পাড়ার তরুণ-যুবকরা দলেবলে হৈহৈ করতে করতে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে উপদ্রুত এলাকার মানুষের জন্য ত্রাণ জোগাড় করতে লাগলো। শুনলাম, পাড়ার কয়েকজন বড়োভাই চর তমিজুদ্দিন নামের এক জায়গায় যাবেন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে। মানুষের নাম তমিজুদ্দিন, কফিলুদ্দিন ইত্যাদি হতে পারে, কিন্তু কোনো জায়গার নাম তমিজুদ্দিন হতে পারে এটা বুঝতে আমাকে বেশ ধাঁধার মধ্যে পড়তে হয়েছিল। তখনকার দিনে ছোটদের একটা বেশ সুবিধা ছিল, এখনকার মতো সারা দিন বাবা-মায়ের নজরবন্দি হয়ে থাকতে হতো না। আব্বা বাটা সু কোম্পানিতে চাকরি করতেন, তাঁর অফিস ছিল টঙ্গীতে, সকাল সোয়া ৭টায় অফিস শুরু। বাটার পুরান ঢাকাইয়া ড্রাইভার ছোট খান (ছোট খান কেন নাম হয়েছিল জানি না, যদিও শারীরিক আকারে সে ছিল বিশাল) তার বিশাল নীল রঙের শেভ্রোলেট ভ্যানগাড়ি নিয়ে তেঁতুলতলা মাঠের কোনায় এসে হর্ন দিতো সকাল ৬টায় (মা তার আগে ঘুম থেকে উঠে আব্বার জন্য নাশতা আর দুপুরের খাবার তৈরি করে টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে দিতেন)। আব্বা অফিস থেকে ফিরতেন রাত্র ৭/৮টার পর। তাই আমাদের ওপর খবরদারি করার তেমন কেউ থাকতো না সারা দিন। স্কুল বন্ধ থাকলে সারা দিন কী করছি, কোথায় ঘুরছি, মা-বাবারা তার খোঁজ-খবর রাখতেন না, শুধু তিনবেলা খাবার সময় আমাদের খোঁজ পড়তো, তখন মাথা গুনে আমাদের খাবার দেওয়া হতো। এ ছাড়া সারা দিন ছিল আমাদের অবাধ স্বাধীনতা। সুতরাং আমাকে কেউ না ডাকলেও আমি এ রকম একটা ত্রাণ পার্টির পিছু পিছু বাড়ি বাড়ি ঘু্রতে বশিরউদ্দিন রোড দিয়ে কাঁঠালবাগানের দিকে চলে গেলাম। দেখলাম, অর্থ সাহায্য তেমন কেউ করলো না, তবে বেশির ভাগই পুরোনো কাপড় ত্রাণ হিসেবে দিলো।

ওই ঘটনার ষোলো-সতেরো বছর পরে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আমি যখন যুবক বয়সে, আমার পাড়ার বড়োভাইদের মতো ত্রাণের জন্য রাস্তায় নেমেছি, তখনো দেখেছি বেশ একটা বড়ো অংশের মানুষ ত্রাণ হিসেবে পুরোনো কাপড়চোপড় দিয়ে ভরিয়ে ফেলতো। তারা কী কখনো চিন্তা করে দেখেছে, এই সব শহুরে ডিজাইনের কাপড়চোপড় ওই সব হতভাগ্য অসহায় মানুষের কী কাজে আসবেয় যাই হোক, শৈশবে ফিরে আসি। দেখতে দেখতে প্রচুর পুরোনো কাপড় ত্রাণ হিসেবে জড়ো হয়ে গেলো। নিজের বয়সের চেয়েও অনেক বেশি ভাব ধরা বড়োভাইরা যারা আমাকে এতোক্ষণ তাদের দলে নিতেই চায়নি, তারাও আমার কাঁধে এক বোন্দা পুরোনো কাপড় ঝুলিয়ে দিলো। এই প্রথম নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে লাগলো। আসলে ছোটদের সামান্য গুরুত্ব দিলেই তাদের দিয়ে অনেক ভালো কাজ করিয়ে নেওয়া যায়। আমাদের সমাজ এখনো এই গুরুত্বপূর্ণ সত্যটা বুঝে উঠতে পারেনি, ছোটদের বিনা কারণে ধমকাধমকি আর তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করলে যেন গুরুজনত্ব বৃদ্ধি পায় না। যাই হোক, বিকেলবেলা ত্রাণদলের সারা দিনের প্রধান অর্জন সব একত্র করে তেঁতুলতলা মাঠে জড়ো হলাম। পাহাড়ের মতো উঁচু বিশাল পুরোনো কাপড়ের স্তূপ দেখে নেতারা এই প্রথম বেশ ভড়কে গেলেন। নেতারা যখন ভড়কে যান, তখন তাঁদের প্রধান কাজ হয় ছোটদের ওপর রাগ দেখানো। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হলো। নেতারা আমাদের পিচ্চিদের সবাইকে ঝাড়ি দিয়ে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলো আর তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় তারা তিন-চার দলে ভাগ হয়ে গেলো। এরপর কী হয়েছিল আমি বলতে পারবো না। আমি জানি না এতো বস্তা বস্তা ত্রাণের কাপড় নিয়ে তখনকার দিনে কীভাবে তারা চর তমিজুদ্দিন নামের অচেনা দুর্গম চরে গিয়েছিল।

ঘূর্ণিঝড়ের পর খবরের কাগজে ঝড়ের তাণ্ডবের সব বিস্ময়কর আর মর্মান্তিক ছবি ছাপা হতে লাগলো। খবরের কাগজ বলতে আমরা শুধু চিনতাম ইত্তেফাক। কেননা সবাই ইত্তেফাক পড়তো। মনে আছে, আমাদের ছোটদের দল সবাই মিলে একত্রে ইত্তেফাক পড়ার চেষ্টা করতাম কিন্তু অনেক কষ্টে সশব্দে বানান করে করে পড়তে পারলেও প্রথম পাতার খবর কী করে পরের পাতায় খুঁজে পেতে হয় কলামের শেষে দেওয়া রহস্যজনক সেই সংকেত আমরা সবাই মিলেও আবিষ্কার করতে পারতাম না। তাই আমাদের জীবনের প্রথম খবরের কাগজ পাঠ প্রথম পাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো ।

প্রখ্যাত চিত্রকর পরিতোষ সেনের পুরান ঢাকার শৈশব স্মৃতি নিয়ে লেখা বিখ্যাত বই ‘জিন্দাবাহার’-এর কথা অনেকেরই জানা। পরিতোষ সেন সারা জীবন তাঁর জিন্দাবাহারের স্মৃতিকে সযত্নে আগলে রেখেছেন। কিন্তু তিনি জিন্দাবাহারে ফিরে যেতে চাননি কোনো দিন। কেননা তাঁর ভয় ছিল কালের পরিক্রমায় পরিবর্তিত জিন্দাবাহারের রূপ তাঁকে কষ্ট দেবে। তিনি চেয়েছেন তাঁর স্মৃতিতে বয়ে বেড়ানো জিন্দাবাহারই বেঁচে থাকুক। আমিও লেক সার্কাসের স্মৃতিকে সযত্নে বয়ে বেড়িয়েছি আমার সারা জীবন। কিন্তু আমি একা একা চুপি চুপি বারবার ফিরে গেছি লেক সার্কাস আর তেঁতুলতলা মাঠের আশপাশে। শেষবার গিয়েছিলাম মাস তিনেক আগে। ইঞ্জিনিয়ার বিটু ভাইয়ের কলাবাগান অফিস থেকে বের হয়েই ভাবলাম দেখে আসি একবার আমার শৈশবের সেই লেক সার্কাস। আসলে পরিতোষ সেনই ঠিক ছিলেন, না গেলেই ভালো হতো। একমাত্র তেঁতুলতলা মাঠ ছাড়া পুরো এলাকাটিকে আর চেনা যায় না। সেই বিশাল মাঠের প্রান্তের বরিশাল কটেজের জায়গায় এখন বিশাল এক অ্যাপার্টমেন্ট, এতো বড়ো অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স, মনে হয় এক বিশাল অন্ধকার পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আউয়াল চাচার বাড়িটি দেখলাম ভেঙে এক ডেভেলপার নতুন বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ি বানাচ্ছে। মসজিদটা এমন বড়ো হয়েছে যে, মনে হয় আমাকে ধাক্কা দিতে চাচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্য হলাম যখন দেখলাম লেক সার্কাস স্কুলের এন্ট্রি গেট এখন দক্ষিণ দিকের পরিবর্তে সম্পূর্ণ উলটো দিকে পান্থপথ দিয়ে সরাসরি, যেখানে তখন ছিল বিশাল বিলের শুরু।

অনেকেই ভাবতে পারে মাত্র ৭/৮ বছর বয়সের এতো কথা কী করে মনে আছে! আমি নিজেই আসলে আশ্চর্য হই কী করে এতো কথা মনে আছে। আসলে যেকোনো কারণেই হোক সুখময় স্মৃতি মনে হয় আমাদের মস্তিষ্কের মেমোরি সেলে অনেক গভীরভাবে গেঁথে থাকে। তবে সব কিছু যে মনে আছে তা কিন্তু নয়। গুচ্ছ গুচ্ছ অনেক কিছু খুব মনে আছে, আবার অনেক জায়গাই একদম ফাঁকা। যেমন আমি মনে করতে পারি না আব্বা কেন মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডের একতলা বিশাল বাড়ি ছেড়ে আমাদের নিয়ে কলাবাগানের ওই টিনের দোতলা ঘর বরিশাল কটেজে এসে উঠেছিলেন। আমার মনে আছে, মোহাম্মদপুরে আমাদের বাসায় টেলিভিশন ছিল, কিন্তু কলাবাগানে এসে আমরা কেন অন্যের বাসায় টেলিভিশন দেখতে যেতাম, এটা আমি মনে করতে পারি না । আমার মনে নেই মোহাম্মদপুরে আমি কোন স্কুলে পড়তাম, কিন্তু আমাকে এক প্রাইভেট টিউটর বাসায় এসে পড়াতেন তার কথা ঠিকই মনে আছে, কিন্তু তাঁর চেহারা একদম মনে নেই। তাঁর একটি কথা কেন যেন আবার খুব স্পষ্ট মনে আছে। তিনি বলতেন, তিনি বিখ্যাত গায়িকা আনজুমান আরা বেগমের মেয়েকে পড়ান আর সেই মেয়ে নাকি খুব ভালো ছাত্রী, আমার মতো অমনোযোগী আর দুষ্ট না। এ কথা বারবার বলে তিনি আমাকে নিয়মিত কটাক্ষ করতেন। Childhood Amnesia নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁরা বলেন, মানুষ আড়াই বছর বয়স থেকে তার স্মৃতি কিছু কিছু মনে করতে পারে। গবেষকরা দেখেছেন, ৫ থেকে ৭ বছর বয়সের মধ্যে শিশুরা ৬০ শতাংশেরও বেশি ঘটনা মনে রাখতে পারে, কিন্তু ৮ ও ৯ বছর বয়সের মধ্যে এটি ৪০ শতাংশেরও কম হয়ে যায়। এই কমে যাওয়া স্মৃতিগুলো কিন্তু একদম হারিয়ে যায় না, মস্কিষ্কের কোথাও না কোথাও জমা থাকে এবং কখনো কখনো তা হুট করে আবার বেরিয়ে আসতে পারে।

১৯৭৭ সালে নাসা মহাশূন্যে ভয়েজার নামে একটা মহাকাশযান পাঠায়। সেই ভয়েজারে আছে গোল্ড প্লেটেড কপার দিয়ে বানানো একধরনের রেকর্ড, সেই রেকর্ডের নাম দিয়েছে তারা গোল্ডেন রেকর্ড। সেই রেকর্ডে আছে শতধিক ছবি আর প্রকৃতি থেকে নেওয়া অনেক ধরনের বাছাই করা শব্দ। যেমন—বাতাসের শব্দ, সমুদ্রের শব্দ, বৃষ্টি আর ঝড়ের শব্দ, পাখির ডাক আর তিমি মাছের অদ্ভুত চিৎকারসহ অনেক কিছু। এই গোল্ডেন রেকর্ডে আছে নানা দেশের গানও। এখন পর্যন্ত ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে ভয়েজার। পরবর্তী নক্ষত্রের কাছাকাছি যেতে ভয়েজারের আরো ৪০,০০০ বছর লাগবে। তখন হয়তো পৃথিবী থাকবে না, হয়তো এই সৌরজগৎও থাকবে না। কিন্তু ভয়েজারের রেকর্ডে পাখির ডাক, বৃষ্টির শব্দ, সমুদ্রের শব্দ আর মানুষের হাসির শব্দ ভয়েজারে রয়ে যাবে। হয়তো কোনো একদিন কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী আমাদের পৃথিবীর এই সব সম্মিলিত আনন্দমুখর শব্দ আবিষ্কার করে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবে। তেমনি একদিন হয়তো তেঁতুলতলা মাঠ থাকবে না, তেঁতুল গাছটি থাকবে না, সেখানে তৈরি হবে বিশাল ঝকঝকে থানা ভবন, যার হাজত প্রতিদিন শত শত অপরাধী অথবা সন্দেহের বশে আটকটকৃত মানুষের অস্থায়ী বাসস্থান হবে। থানার সামনে ডজনখানেক দুর্ঘটনায় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া জং ধরা আর ধুলোর আস্তর পরা গাড়ি পড়ে থাকবে, গেটে দাঁড়িয়ে থাকবে ইউনিফর্ম পরা সশস্ত্র সেন্ট্রি আর কিছু ধূর্ত দালাল। সব থাকবে কিন্তু এখানে যে একটা প্রাণবন্ত মাঠ ছিল, সারা দিন যেখানে কিচিরমিচির করা পাখির মতো শিশু আর কিশোরেরা খেলা করতো তার কোনো চিহ্ন থাকবে না। শুধু আমার মতো কিছু মানুষের হৃদয়ে তেঁতুলতলা মাঠের শৈশব স্মৃতি থেকে যাবে। আমার মনে হচ্ছে, আমি নিজেই সেই নিসঙ্গ ভয়েজারে বয়ে যাওয়া সেই গোল্ডেন রেকর্ড । নিসঙ্গ ভয়েজারের মতো আমার মস্তিষ্ক আর হৃদয়ে নিজের অজান্তেই একা একা বয়ে বেড়াচ্ছি তেঁতুলতলা মাঠ আর কলাবাগানে আমার সোনালি শৈশবের হাজারো মধুর ছবি আর শব্দ, যে শব্দ কোনো দিন কেউ আর শুনতে পাবে না।

এ লেখাটায় যাঁদের গল্প বললাম তাঁদের এবং তাঁদের ছাড়াও তখনকার এ পাড়ার কারোর সঙ্গেই আমার আর যোগাযোগ নেই। কেননা ১৯৭১ সালের একদম প্রথম দিকে আব্বা কলাবাগানের বাড়ি ছেড়ে দেন আর আমাকে গার্লস স্কুল থেকে অনেক দূরের শাহীন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। সেই সব মানুষের মধ্যে কে কে বেঁচে আছেন তাও জানি না। এ লেখা যদি কোনো না কোনোভাবে তাঁদের কেউ পড়েন, তাহলে আমি চাইবো তাঁদের সঙ্গে আবার নতুন করে মিলিত হতে। যদি একজনের সঙ্গেও আমার আবার দেখা হয় তাহলে আমি খুব খুশি হবো।

এ লেখাটা লেখার পর একটু আগে জানতে পারলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরসারি হস্তক্ষেপে আমার সোনালি শৈশবের প্রধান বিচরণভূমি তেঁতুলতলা মাঠ এ যাত্রায় রক্ষা পেয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অশেষ ধন্যবাদ। ধন্যবাদ আন্দোলনকারী সমাজসচেতন নাগরিকবৃন্দকে আর ধন্যবাদ এলাকার মানুষদের এবং বিশেষত শিশুদের, যারা সময়মতো ব্যাপারটা সকলের গোচরে না আনলে আমাদের ভয়াবহ ক্ষতি হয়ে যেতো। আমারও অনেক ক্ষতি হয়ে যেতো। এ মুহূর্তে আমাদের এ মুমূর্ষু শহরের এ ধরনের আর একটিও ক্ষতি সহ্য করার মতো শক্তি অবশিষ্ট নেই ।

মাহফুজুল হক জগলুল
২৮ এপ্রিল, ২০২২

 

আরও পড়ুন