লুই কাহনের সালক ইন্সটিটিউট: ধ্যান মগ্ন এক বৈজ্ঞানিক সাধনালয়
"I want a space worthy of a visit by Picasso."
আমাদের ছোটবেলায় ঢাকা শহর সহ অন্যান্য শহরগুলোতে আমরা যেসব পঙ্গু ভিখারী দেখতাম বা সারাদেশে যত পঙ্গু মানুষ বা বিশেষ করে পঙ্গু শিশু ছিল তাদের বেশিরভাগেরই পঙ্গুত্বের কারণ ছিল পোলিও রোগ। তখন পোলিও রোগের ধরতে গেলে কোন চিকিৎসা ছিল না। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত পোলিও ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত এ রোগে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করত অথবা চিরতরে পঙ্গু হয়ে যেত যাদের সিংহভাগই ছিল শিশু। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেই প্রতিবছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার শিশু পোলিও রোগে আক্রান্ত হত।
তবে কিছু কিছু মহান ও মেধাবী মানুষের মধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাস চিরকালই হঠাৎ বদলে যায়, আর এভাবেই ১৯৫০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী জোনাস সালক প্রথম সফল পোলিও টিকা উদ্ভাবন করেন এবং ১৯৫৩ সালে মানবতার স্বার্থে সাহস করে নিজের ও নিজের পরিবারের ওপর পরীক্ষামূলকভাবে তার সদ্য উদ্ভাবিত টিকাটি প্রয়োগ করে পরীক্ষা চালান। ১৯৫৫ সালে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয় ও জোনাস সালকের উদ্ভাবিত পোলিও টিকা (আইপিভি) ব্যবহারের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়। সবচেয়ে মজার কথা হলো, প্রগাঢ় মানবতাবাদী এ মানুষটি সারা পৃথিবীর অসহায় মানুষের স্বার্থে তার এ আবিস্কারের ওপর কোন পেটেন্ট দাবি করেননি। পেটেন্ট দাবি করলে ১৯৫৫ সালের হিসেবেই তিনি ৭ বিলিয়ন ডলারের মালিক হতে পারতেন।
ডা: জোনাস সালক শুধু যে পরম নির্লোভ এবং সত্যিকারের মানবতাবাদী ছিলেন তা-ই নয়, তিনি ছিলেন গভীর শিল্পবোধ সম্পন্ন ও ভিন্নমাত্রার আধ্যাত্মিকতায় নিমগ্ন একজন পরিশীলিত মানুষ। সাফল্যজনক পোলিও ভ্যাকসিন উদ্ভবনের পরে ডঃ জোনাস সালক সিদ্ধান্ত নেন যে মূলত ভ্যাক্সিন সায়েন্স, মাইক্রোবায়োলজি, জিনতত্ত্ব, স্নায়ুবিজ্ঞান, ক্যান্সার, ইমিউনোলজি, মলিকিউলার বায়োলজিসহ চিকিৎসা সম্পর্কিত নানা রকম বায়োলজিক্যাল স্টাডিজ এর জন্য একটি গবেষণাধর্মী ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করবেন।
সে উদ্দেশ্যেই ১৯৫৯ সালে University of California San Diego (UCSD) এর পাশেই সারা পৃথিবীর বায়োটেক রাজধানী খ্যাত সান ডিয়েগোর লা জোলা (পরে জেনেছি সত্যিকারের উচ্চারণ হবে লা হোয়া, ওরা আমাদের বহু জায়গার নাম চিরদিনের জন্য বিকৃত করে দিয়েছে, আমি না হয় ওদের একটা নাম একটু ভুল উচ্চারণ করলাম) এলাকায় তিনি সলক ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল স্টাডিজ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। স্থপতি হিসাবে নির্বাচন করা হয় স্থপতি Luis Kahn কে। মোটামুটি একই সময়ে Luis 
Kahn আমাদের সংসদ ভবনের কাজ ও স্রষ্টাকে এক ও অবিভাজ্য সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করা ও ট্রিনিটিকে (Father–Son–Holy Spirit) প্রত্যাখ্যান করা খ্রিস্টীয় ভাবধারার রচেস্টারের First Unitarian Church এর কাজও শুরু করেন । ভাবতে অবাক লাগে, একই সময়সীমা মধ্যে তিন তিনটি মেজর প্রোজেক্টের সমান্তরাল ক্রিয়েটিভ ও দার্শনিক চিন্তাভাবনা গুলো তিনি কিভাবে তার সৃষ্টিশীল মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে ম্যানেজ করতেন।
স্থপতি লুই কাহন ও ডা: জোনস সালকের পারস্পরিক সৃষ্টিশীল নান্দনিক বোধ ও প্রায় সমকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিকতার মিথস্ক্রীয়ার সিমবায়োটিক অংশীদারত্বের একটি অতি চমৎকার উদাহরণ হয়ে আছে এ প্রজেক্টটি। দুজনেরই গভীর মানবিক দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা তাদের মেধা ও সৃষ্টিশীল কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করত এবং জন্মগত ভাবে ইহুদি পরিবারের সন্তান হবার পরেও রেজিমেন্টেড ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে গিয়ে ধর্মীয় আচার-অনুশাসনের চেয়ে মানবকল্যাণ, নৈতিকতা ও বিজ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দিতেন তারা উভয়েই। তারা চাইতেন স্থাপত্য ও বিজ্ঞান চিন্তার মধ্যে যেন একটি উচ্চতর নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং তারা উভয়েই বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা একে অপরের বিরোধী নয়, বরং এরা একে অপরকে সমৃদ্ধ করে। মানুষের দায়িত্ব হলো জ্ঞান ব্যবহার করে মানবজাতির কল্যাণ সাধন করা। বিজ্ঞান ও স্থাপত্যকে কেবল প্রযুক্তিগত প্রচেষ্টা হিসেবে নয়, বরং শিল্প, আধ্যাত্মিকতা এবং মানবতার প্রকাশ হিসেবে দেখার একটি সাফল্যজনক যৌথ প্রচেষ্টা হচ্ছে এ কাজটি, তাই বিজ্ঞান ও স্থাপত্য—দুই ক্ষেত্রেই এটি একটি কালজয়ী নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
ডা: সালক চেয়েছিলেন এমন একটি আধুনিক সায়েন্স গবেষণা ইন্সটিটিউট বানাতে যেটি হবে সারা পৃথিবীর মেধাবী বিজ্ঞানীদের জন্য একটি আধ্যাত্মিক আশ্রম বা সেঞ্চুয়ারির মতো যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশিকে সামনে রেখে বিজ্ঞান, মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতা একটি একক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়ে পরম প্রশান্তিতে ধ্যানমগ্ন হতে পারবে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই লুই কাহন আর বিজ্ঞানী ড. জোনাস সালকের যৌথ পরিকল্পনায় শুরু হয়ে প্রজেক্টটি ১৯৬৫ সালে শেষ হয। অনেক বোদ্ধার মতেই এটি বিশ শতকের আধুনিক স্থাপত্যের এক অনন্য মাস্টারপিস এবং কাহনের অন্যতম একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। কংক্রিট বিশাল ক্যানভাসের সাথে বার্মাটিকের সংযত অথচ শক্তিশালী
ব্যবহারে ডিজাইন করা এ প্রতিষ্ঠানটি সীমাহীন প্রশান্ত মহাসাগরের কাছে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞান, প্রকৃতি ও নীরবতার এক গভীর সংলাপ সৃষ্টি করেছে যা বিজ্ঞানী ও শিল্পী, উভয়েকেই বিমুগ্ধ করবে ও সাধনায় ধ্যান মগ্ন করবে। প্রজেক্টের মাঝখানের খোলা প্রাঙ্গণের সরু জলধারা দৃষ্টি টেনে নেয় অসীম সমুদ্র-আকাশের যৌথ চিত্রকল্পের দিকে, আর অন্যদিকে লুই কাহনের শক্তিশালী, পরিশীলিত ও দৃশ্যমান জ্যামিতি গবেষণাকে রূপ দেয় প্রায় ধ্যানমগ্ন এক অভিজ্ঞতায়। সাইটের বাস্তব কনটেক্সট, বিরাজমান টপোগ্রাফির পরিপূর্ণ সৃষ্টিশীল সদ্ব্যবহার ও পশ্চিম দিগন্তের সীমাহীন প্রশান্ত মহাসাগরীয় নীল জলরাশির আধ্যাত্মিক আহ্বান অপূর্ব রসায়ন সৃষ্টি করে সমগ্র ডিজাইনের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়ে এক ভিন্ন জাগতিক আবহ সৃষ্টি করে যা আমি সহ যে কোন অবজাভারকে ধীরে ধীরে আত্মস্থ করে ফেলবে।
জীবনের এবেলায় এসে আজ এখানে উপস্থিত হতে পারা আমার জন্য এক গভীর আনন্দময়তার পরিপূর্ণ অনুভূতি— এতোদিন ধরে ছবিতে দেখা স্থাপনাটি বাস্তবে খুব নীরব ও মহিমান্বিত বিস্ময় হয়ে ধরা দিল আজ। কাহনের স্থাপত্যের ভেতরে দাঁড়িয়ে মনে হলো, আমি কেবল একটি স্থাপত্য দেখছি না, বরং ক্রমশ গভীর মানবিক মেধা, সৃজনশীলতা ও সময়ের সঙ্গে কথোপকথনরত এক জীবন্ত কবিতার অংশ হয়ে উঠছি ।
ডা: সালক, লুই কাহনকে বলেছিলেন,
“I want a space worthy of a visit by Picasso.”
কোন উঁচু নান্দনিক মাত্রার স্থাপত্য তিনি লুই কাহনের কাছে আশা করেছিলেন সেটা বোঝানোর জন্য পিকাসোর নাম আসতেই পারে তবে অন্য একটি কারণও হতে পারে, যা আমি কোন বই পড়ে জানতে পারিনি, জানতে পেরেছি স্যান ডিয়াগো প্রবাসী আমার চিকিৎসক বন্ধুটির কাছ থেকে যে আমাকে আজ এখানে নিয়ে এসেছে স্থাপত্য কর্মটি
দেখানোর জন্য। চিকিৎসক বন্ধুটির কাছ থেকে জানতে পারলাম যে ডা: সালকের স্ত্রী Françoise Gilot বহু বছর ধরে আমার এই চিকিৎসক বন্ধুর নিয়মিত পেশেন্ট। Françoise Gilot ডা: সালককে বিয়ে করেন ১৯৭০ সালে, তখন ওনার বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছর তবে এ বিবাহের বহু বছর আগে এ মহিলা পাবলো পিকাসোর দীর্ঘদিনের প্রেমিকা ছিলেন ও ছিলেন পিকাসোর দুই সন্তানের মা। তিনি নিজেও প্রখ্যাত পেইন্টার ছিলেন এবং ডা: সালককে বিয়ে করার পর এ সালক ইন্সটিটিউটেই তারা থাকতেন।
ডা: সালকের স্ত্রীর সাথে পিকাসোর এ বিবাহপূর্ব সম্পর্কের কারণেও, “I want a space worthy of a visit by Picasso.” এ ইংগিতপূর্ণ বাক্যটি ডা:সালক উচ্চারণ করেছিলেন বলে স্থানীয় অনেকে ধারণা করেন, অন্তত পিকাসোর প্রাক্তন প্রেমিকা ও ড: সালকের স্ত্রীর এমনই ধারণা ছিলো। তবে ধারনাটি সর্বজন স্বীকৃত নয় ও দূর্বল বলেই আমার ধারণা।
দু’টো মতের যেটাই সত্য হোক, পিকাসো এ স্থাপত্য কর্মটির বিস্ময়কর মানের নিজস্ব শৈল্পিক প্রকাশভঙ্গি, সাফল্যজনক আধ্যাত্মিকতার মিশ্রণ ও সর্বজনীন মানবিকতাকেআত্মস্থ করার সফল প্রয়াস দেখে নিশ্চয়ই মুগ্ধ হতেন। ডা: সালকের স্ত্রী ও পিকাসোর প্রেমিকার বাঙালি ডাক্তার, আমার বাল্যবন্ধু, বিখ্যাত বিপ্লবী হাজি দানেশের নাতী, ডাঃ আবু নাসেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাকে আজ এ বিস্ময়কর সুখময় অভিজ্ঞতা মুখোমুখি করিয়ে দেবার জন্য।
মাহফুজুল হক জগলুল
২৯ জানুয়ারি, ২০২৬
সালক ইন্সটিটিউট লা জোলা, সান ডিয়েগো, ক্যালিফোর্নিয়া




