পদ্মা সেতু, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের আবেগ ও যুগ যুগের দুঃসহ ভোগান্তির গল্প: পর্ব -০১

গত কয়েক দিন ধরে অনেকেই প্রশ্ন করছেন যে পদ্মা সেতু নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মধ্যে আবেগের মাত্রা এতো অতিরিক্ত কেন? তাঁদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে আমি কিছু গল্প বলছি—

পাকিস্তান আমলের কথা, আমি তখন খুব ছোট, তবু কিছু স্মৃতি খুব ভালো মনে আছে। তেমনই একটা স্মৃতি হলো, আমার দাদা অনেক দিন আমাদের ঢাকার বাসায় বেড়িয়ে দেশের বাড়ি পিরোজপুর ফিরছেন। আমার আব্বা দাদাকে সদরঘাটে লঞ্চে উঠিয়ে দিতে গেছেন, বড়ো পুত্র হিসেবে আমাকেও সঙ্গে নিয়ে গেছেন। লঞ্চের নাম বেলকুচি, নানা রকমের ক্যাটক্যাটে এনামেল পেইন্টের ডিজাইন আঁকা কাঠের বডির মাঝারি সাইজের দোতলা লঞ্চ। বেলকুচির চেয়েও বড়ো ও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ লঞ্চ আছে, তবে বেলকুচির স্পিড সবচেয়ে বেশি। তাই ঢাকা থেকে সুদূর পিরোজপুর যেতে আমাদের এলাকার মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় তখন বেলকুচি লঞ্চ। তখনকার দিনে যারা ট্রেনে চড়তো তারা গ্রীনএরো নামের ট্রেনের স্পিড নিয়ে নানা রকম কাল্পনিক কিংবদন্তি তৈরি করে মজা পেতো, তেমনই দক্ষিণবঙ্গের মানুষ বেলকুচি লঞ্চের স্পিড নিয়ে অমন অবাস্তব সব কিংবদন্তি তৈরি করতো। তেমনি একটি আজগুবি গল্প চালু ছিল যে ইংলিশ চ্যানেল পার হতে যে হাইস্পিড কাঠের লঞ্চ বেলকুচি নাকি তাদেরও হারিয়ে দিতে পারবে (ব্রজেন দাসের সাঁতরিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার গল্প টেক্সটবুকে অন্তর্ভুক্ত থাকায় গ্রাম-গঞ্জের মানুষ ইংলিশ চ্যানেলের নাম জানতো)। তাদেরকে কে বোঝাবে যে মেঘনা, কীর্তনখোলা আর কচার মতো ভয়াবহ নদীতে এমন কাঠের বডির ছোট্ট লঞ্চে চলাচল করার মতো বিপজ্জনক ‘প্রাণী’ পূর্ববঙ্গ ছাড়া বোধ হয় এ গ্রহে আর কোথাও নেই।

তখনকার লঞ্চে সামান্য কয়েকটি কেবিন থাকতো আর বাকি সবাই ছিল ডেকের যাত্রী। তখনকার দিনের খুব ধনী ছাড়া প্রায় সবাই ডেকে যাতায়াত করতো। কবি জীবনানন্দ দাশের ডায়েরি পড়লে দেখা যায়, তিনিও এ পথে নিয়মিত স্টিমারের তৃতীয় শ্রেণির ডেকে যাতায়াত করতেন। সম্ভ্রান্ত মহিলারা যখন যাতায়াত করতো, তখন তাদের পর্দার জন্য দড়ি টানিয়ে সেই দড়ির চারদিকে কয়েকটা বিছানার চাদর ঝুলিয়ে পর্দার ব্যবস্থা করা হতো। কেউ কেউ যারা আরো স্মার্ট তারা এসব ঝামেলার মধ্যে না গিয়ে লঞ্চে উঠেই বড় একটা মশারি টানিয়ে দিতো। তখনকার দিনের মশারি ছিল সুতির কাপড়ের তৈরি, এখনকার মশারির মতো অতো ট্রান্সপ্যারেন্ট ছিল না। তাই তা দিয়ে মোটামুটি পর্দার কাজ চলে যেতো। তখনকার দিনে হোল্ডল নামে আরেকটি বস্তু ছিল। একটা সিংগেল সাইজ হোল্ডলের ভেতর একটা পাতলা তোশক, বিছানার চাদর, একটা বালিশ আর একটা সাদা মার্কিন কাপড়ের কাভার পরানো লাল লেপ সেট করা থাকতো। হোল্ডলটা হতো গাঢ় ছাই রঙের মোটা ক্যানভাস কাপড়ে বানানো। উপরোল্লিখিত সব কিছু খুব সুন্দরভাবে রোল করে এই হোল্ডলের বেল্ট দিয়ে আটকে এটাকে একটা মোটা সিলিন্ডার টাইপ সুটকেসের মতো বানিয়ে ফেলা যেতো। সুটকেসের হ্যান্ডেলের মতো হোল্ডলে আবার কয়েকটা পকেটও থাকতো, যাতে অন্যান্য জিনিসপত্র এর সঙ্গে বহন করা যায়। তাই এটাকে অনেকটা সুটকেসের মতো ব্যবহার করা যেতো। আগে জায়গা পাওয়ার জন্য দুপুরের মধ্যেই একটা হোল্ডল, একটা বাঘা সাইজের চার বাটির টিফিন ক্যারিয়ার আর দাদার নিজস্ব প্রায় প্রাগৈতিহাসিক একটা চ্যাপ্টা সুটকেস নিয়ে আমরা সদরঘাট টার্মিনালে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে হাফ হাতার টকটকে লাল জামা আর বাহুতে নাম্বারযুক্ত ডিম্বাকৃতির পিতলের ব্যাজ পরিহিত দৈত্যের মতো লম্বা লম্বা তাগড়া রেজিস্টার্ড কুলিরা অনেকটা জোর করে সব কিছু আমাদের হাত থেকে কেড়ে নিতো। ঘাটে নিয়ম ছিল, রেজিস্টার্ড কুলি ছাড়া অন্য কেউ মালপত্র বইতে পারবে না। ঘাটে ভেড়ানো লঞ্চে এসে খালি জায়গা দেখে হোল্ডল খুলে বিছানা পাতা হতো। অনেকে আবার আগে এসে চাদর পেতে জায়গা দখল করে রাখতো, পরে ভিড় বেড়ে গেলে সে জায়গা বিক্রি করে দিতো, অনেকটা ব্ল্যাকে সিনেমার টিকিট বিক্রির মতো। তবে এদের ব্যবসা ছিল আরো সহজ, কোনো টিকিট কিনতে হতো না, খালি একটা চাদর পেতে ডেকের জায়গা দখল করে রাখলেই চলতো। দুপুরে পৌঁছালেও লঞ্চ ছাড়তো বিকেল ৫টার দিকে। তাই দুপুরের খাবার লঞ্চ ছাড়ার আগেই টিফিন ক্যারিয়ার থেকে খেয়ে নিতে হতো। অল্প কিছু পয়সা দিলে লঞ্চের খাবার ঘরের লোকজন টিফিন ক্যারিয়ারের খাবার গরম করে দিতো। টিফিন ক্যারিয়ারের অর্ধেক খাবার খেয়ে বাকি অর্ধেকটা রেখে দেওয়া হতো রাতে খাওয়ার জন্য। একসময় লঞ্চ কানায় কানার ভরে যেতো আর যারা বিছানার জায়গা পেতো না তারা দাঁড়িয়ে বা কোনাকানায় কোনো রকমে বসে যাত্রা শুরু করতো, কিন্তু লঞ্চ তখনো ছাড়তো না। কেননা নানা রকমের বাণিজ্যিক মালামাল ওঠানো তখনো অনেক বাকি। নিচতলায় মানুষের সঙ্গে ছাগল বা ভেড়ার পালও মালামাল হিসেবে পরিবহন করা হতো। ছাগল আর ভেড়ার পাল কাঁঠালপাতা খেতে খেতে আর মলমূত্র ত্যাগ করতে করতে মহা আনন্দে জলযাত্রা করতো। তবে তাদের মলমূত্রের গন্ধে নিচতলার মানুষ একটা দুঃসহ অবস্থায় পড়ে যেতো, যা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন।

যেহেতু দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার কোনো সড়ক যোগাযোগ ছিল না, রেল যোগাযোগ ছিল না, কোনো বিমান যোগাযোগও ছিল না; সে কারণে লঞ্চ বা স্টিমারই ছিল মালামাল পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম। সড়কপথ তো দূরের কথা, আমাদের পিরোজপুরের বা দক্ষিণাঞ্চলের এমন অনেক জায়গা ছিল, যেখানে রিকশা ঢোকারই কোনো ব্যবস্থা ছিল না কোনো দিন। শুধু তাই-ই নয়, কোনো সঠিক সড়কই ছিল না আর বর্ষাকালে এসব মাটির রাস্তা দিয়ে হাঁটলে হাঁটু পর্যন্ত কাদায় ডুবে যেতো। একরকম প্রায় যোগাযোগবিচ্ছিন্ন দক্ষিণাঞ্চলে তাই বলতে গেলে গড়ে উঠতে পারেনি তেমন কোনো শিল্প-কারখানা। বাংলাদেশের সব শহরের জনসংখ্যা যখন হু হু করে বাড়ছে, তখন খুলনার জনসংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে আগের চেয়ে কমে গেছে। এই হলো দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান শহরের অবস্থা।

এমন দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর একসময় ৪টা-৫টার দিকে লঞ্চ ছাড়তো। লঞ্চ ছাড়ার পরও লঞ্চ ভর্তি নানা ধরনের হকারের মধ্যে কিছু কিছু সম্ভ্রান্ত হকার নামতো না, তারা নামতো লঞ্চ ফুল স্পিড দেওয়ার আগে আগে। তাদের জন্য লঞ্চের সঙ্গে দড়িবাঁধা নৌকা থাকতো, সে নৌকায় করে তারা একপর্যায়ে বিপজ্জনকভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে যেতো। কিন্তু কিছু হকার তারপরও লঞ্চেই অবস্থান করতো। লঞ্চের মধ্যে বেশির ভাগ হকারই নানা রকমের খাবার বিক্রি করতো, তবে আমার বাবা আমাদের কোনো রকম খোলা খাবার খেতে দিতেন না। কচি শসা, পাকা পেঁপে, কলা, ডাবের পানি, সিদ্ধ ডিম বা নাবিস্কো গ্লুকোজ বিস্কুট—শুধু এজাতীয় খাবারই আমাদের জন্য অনুমোদিত ছিল। তবে চাঁদপুর অথবা বরিশাল থেকে ওঠা কিছু হকার ফ্রেশ কোরানো নারকেলের সঙ্গে চিড়াভাজা মিশিয়ে একটা খাবার বিক্রি করতো। শুধু সেই খোলা খাবারের ক্ষেত্রে বাবাকে এ নিয়ম ভাঙতে দেখেছি প্রতিবার। এখনকার দিনে খুব অবাক শুনতে মনে হলেও তখন অনেক গল্পের বইয়ের হকার উঠতো লঞ্চে। শ’খানেক বই অদ্ভুত কৌশলে কাঁধের ওপর রেখে তারা উঁচু স্বরে বই আর লেখকদের নাম বলে বলে বই বিক্রি করতো। বেশির ভাগ বই-ই ছিল আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, বিমল মিত্র বা নীহাররঞ্জন গুপ্তের লেখা কিরীটী রায়ের গল্পের বই। এ ছাড়া মোকছেদুল মোমেনীন, বেহেশতি জেওর, কাছাছুল আম্বিয়া, তাজকিরাতুল আউলিয়া, সহজ নামাজ শিক্ষা ইত্যাদি নানা ধরনের ইসলামী বই আর থাকতো গোপাল ভাঁড়ের বই। ডেল কার্নেগি নামের এক ভদ্রলোকের বইও পাওয়া যেতো, যা পড়লে নাকি জীবনে ভীষণ উন্নতি করা যায়, যেমন নিমেষে কৃষক থেকে কোটিপতি হওয়া বা শ্রমিক থেকে শিল্পপতি হওয়ার সকল কলাকৌশল নাকি তাঁর বইয়ের মধ্যে বাতলে দেওয়া থাকতো। আমার যতোদূর মনে পড়ে ওই কার্নেগি সাহেবের বই-ই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হতো।

আর একধরনের ডেঞ্জারাস হকারের কথা আমার মনে আছে। সে চিৎকার করে নানা রকমের ক্যানভাস করার পর বিরাট একটা ধারালো চাকু দিয়ে কনুই থেকে কবজির মাঝামাঝি তার নিজের হাত লম্বালম্বি করে প্রায় চার-পাঁচ ইঞ্চি কেটে ফেলতো এবং কেটে সবার সামনে গিয়ে সেটা দেখাতো আর তারপর তার স্বপ্নে পাওয়া কালো মবিলের মতো দেখতে মলম লাগিয়ে তার হাত ব্যান্ডেজ করে দিতো এবং কয়েক মিনিট পর ব্যান্ডেজ খুলে তার হাত সবাইকে দেখাতো, ভিড় জমে যাওয়া যাত্রীরা সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখতো যে সেখানে ক্ষতের কোনো চিহ্নই নেই। এরপর শুরু হতো তার স্বপ্নে পাওয়া বিস্ময়কর মলম বিক্রির পালা। তবে মানুষ তার অবাক করা ভয়ংকর হাতকাটা দৃশ্য যতোটা বিস্ময়ের সঙ্গে উপভোগ করতো, মলম কেনার বেলায় তারা ততোটা তৎপর হতো না।

ব্যস্ত বুড়িগঙ্গা পার হয়ে একসময় ধলেশ্বরী হয়ে লঞ্চ প্রথমে থামতো মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিম, তারপর শীতলক্ষ্যা হয়ে একটু পরেই বিশাল মেঘনায় এসে পড়তো। তারপর মেঘনা প্রশস্ত হতে হতে ঘণ্টা দেড়েক পরে ডানদিকে প্রমত্তা পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়ে মেঘনা নামেই এগিয়ে যায়। এভাবে ঘণ্টা চার-পাঁচ চলার পর এসে পৌঁছাতো চাঁদপুর, তবে মেঘনার তীব্র স্রোতের কারণে চাঁদপুরে নামার জন্য মেঘনার পারে লঞ্চ ভিড়তে পারে না, লঞ্চ বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে ছোট ডাকাতিয়া নদীতে ভেড়ে। লঞ্চ মেঘনা থেকে ডাকাতিয়া নদীতে ঢোকার জন্য বাঁয়ে বাঁক নেওয়ার সময়টা তীব্র স্রোতের কারণে খুব বিপজ্জনক। আমি এ জায়গায় নিজের চোখে যাত্রীসহ লঞ্চ ডুবে যেতে দেখেছি।

চাঁদপুর থেকে সবচেয়ে বেশি যাত্রী উঠতো, তবে এরা প্রায় কেউই চাঁদপুরের মানুষ না, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ, যারা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী বা কুমিল্লায় থাকতো, তারা ট্রেনে চাঁদপুর এসে দক্ষিণাঞ্চলগামী লঞ্চে উঠতো। বিশেষ করে চট্টগ্রাম থেকে আগত মেঘনা এক্সপ্রেসের যাত্রীরা লঞ্চে বা স্টিমারে উঠতো এই ঘাট থেকে। ঘাটে থাকা অবস্থায়ই সাধারণত লঞ্চের ছাদে এশার নামাজের জামাত হতো আর তারপর টিফিন ক্যারিয়ারের খাবার গরম করে রাতের খাওয়ার আয়োজন চলতো। আসলে লঞ্চ যাত্রা এমনই দীর্ঘ সময় ক্ষেপণকারী ও ঢিলেঢালা গতির ছিল যে মনে হতো লঞ্চ বা স্টিমারটা এক একটা ছোটখাটো শহর, পানির ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে। এটা যে স্বল্প সময়ের যাত্রা তা মনে হতো না মোটেই। কেননা মানুষের বিছানা দিয়ে দখল করা জায়গা যখন চাঁদপুরের যাত্রীরা আস্তে আস্তে মিষ্টি কথা বলে বলে দখল করতে শুরু করতো, তখন বিশাল ঝগড়াঝাঁটি বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মারামারি লেগে যেতো, মনে হতো যেন তার বাপ-দাদার পাঁচ বিঘার উর্বর ধানক্ষেত কেউ দখল করতে এসেছে।

যারা খাবার নিয়ে আসতো না তারা লঞ্চের খাবার ঘরে ভাত খেতো। এখানে অনেক দিন পর্যন্ত মাছ বা মাংস আর ভাত-ডালসহ খাবারের ফিক্সড রেট ছিল। মাছ বা মাংস একবারই দেওয়া হতো, তবে ভাত-ডাল যে যতো খেতে পারে। তবে ফ্রি পেয়ে কেউ কেউ এতো বিপুল পরিমাণ ভাত আর ডাল খেতে শুরু করে যে পরবর্তী সময়ে সে সিস্টেম উঠিয়ে দেওয়া হয়।

চাঁদপুর ঘাটে ঘণ্ট-দু’ঘণ্টা থেকে রাতের অন্ধকারে শুরু হতো বিশাল ভয়ংকর মেঘনা নদী পাড়ি দেওয়া। মেঘনা নদী পাড়ি দিতে দেড় থেকে দু’ঘণ্টা লেগে যেতো। এ রকম ছোট কাঠের লঞ্চে যারা এই ভয়াবহ নদী পার হয়নি, তাদের এ ভয়াবহ ও অনিশ্চিত অভিজ্ঞতার কথা বোঝানো যাবে না। বিশেষ করে গ্রীষ্ম আর বর্ষাকালে এ যাত্রা ছিল আরো বেশি ভয়াবহ। বিশাল বিশাল ঢেউয়ে ঢেউয়ে দুলে দুলে উঠতো লঞ্চ। কখনো কখনো সে দুলুনি এমন ভয়াবহ হতো যে লঞ্চের মধ্যে চিৎকার আর কান্নাকাটি শুরু হয়ে যেতো। সবাই দোয়াদরুদ পড়তে শুরু করতো, অনেকে বিপদ মুক্তির জন্য জোরে জোরে আজান দিতো। এগুলো আমি কারো কাছ থেকে শুনে লিখছি না, এগুলো আমার নিজের জীবনের সরাসরি অভিজ্ঞতা। একবার গাবখান নদীতে গভীর রাতে আমাদের পুরো পরিবার বহনকারী ‘টার্ন’ নামের স্টিমার ঝড়ে কাত হয়ে অর্ধেক ডুবে গিয়েছিল। আমার মনে আছে, সেই গভীর রাতে গ্রামের জনগণ আমাদের মাঝ নদী থেকে উদ্ধার করে। আমরা সেই পরিত্যক্ত স্টিমার ছেড়ে সে রাতে শেখেরহাট গ্রামের হাই স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সে রাতে প্রচণ্ড ঝড়ে স্টিমার যখন কাত হয়ে ডুবে যাচ্ছিল, তখন আমার আব্বাকেও আমি খুব উচ্চ কণ্ঠে অমন আজান দিতে দেখেছি। সে আজানের শব্দ এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে। পরেরদিন সকালে বরিশাল থেকে আসা উদ্ধারকারী জাহাজে করে আমরা পিরোজপুরে পৌঁছাই। সে ভয়াবহ স্মৃতি আমি কোনো দিনও ভুলতে পারবো না।

অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে দেখা দিতো অন্য বিপদ। রাতের ঘন কুয়াশায় মেঘনা বা কীর্তনখোলা নদীর চোরা চরে লঞ্চ আটকে যেতো। যদি সোজাভাবে আটকে যেতো তাহলে তেমন ভয়াবহ সমস্যা হতো না, তবে লঞ্চ যদি কিছুটা কাত হয়ে চরে আটকে যেতো আর যখন ভাটির সময় পানি কমে যেতো তখন অনেক সময় সেটা আরো বেশি কাত হয়ে ডুবে যেতো। তখনকার দিনে লঞ্চ দুর্ঘটনায় মৃত্যু ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সে কারণে কুয়াশার সময় লঞ্চ খুব ধীরে ধীরে চলতো আর লঞ্চের সামনে সারেংয়ের একজন অভিজ্ঞ সহকারী লম্বা বাঁশ নিয়ে পানির গভীরতা মাপতে মাপতে অগ্রসর হতো আর সে লোক এক অদ্ভুত ছন্দে ছন্দে পানির গভীরতা অনেকটা গানের সুরে সুরে দুর্বোধ্য ভাষায় চিৎকার করে তিনতলায় অন্ধকারে উন্মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার ওস্তাদকে জানাতো আর সে অনুযায়ী হেড সারেং ঠিক করতো কোন পথে এগোবে, নাকি ইঞ্জিন বন্ধ করে পরবর্তী জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করবে। সারেং বা সুকানিদের বেশির ভাগই ছিল চট্টগ্রামের মানুষ, তাই স্পষ্টভাবে বোঝা যেতো না তারা কী বলছে। ইঞ্জিন বন্ধ করে বসে থাকাও ছিল বিপজ্জনক। কেননা সে সময়ে লাঞ্চ ডাকাতি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। লম্বা ছিপ নৌকায় করে ডাকাতরা এসে সব কিছু ছিনিয়ে নিয়ে চলে যেতো। মেঘনার ওই সব চরাঞ্চল ছিল মোটামুটি দেশের সব ধরনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এদের কাছে লঞ্চের যাত্রীরা ছিল চরম অসহায়। তারা বিনাবাক্যে সব কিছু তাদের দিয়ে দিতো শুধু শারীরিকভাবে অক্ষত থাকার আশায়। অনেক সময় ডাকাতরা কোনো কোনো যাত্রীকে হত্যা পর্যন্ত করতো। নিরাপত্তার জন্য প্রতি লঞ্চেই প্রায় অকেজো থ্রি নট থ্রি রাইফেলসহ এক জোড়া আনসার থাকতো। তাদের বেশির ভাগ মনোযোগই থাকতো লঞ্চে ব্যবসারত নানা প্রকারের হকারদের ওপর হাঁকডাক করার কাজে আর তাদের নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত কেবিন জায়গা না পাওয়া যাত্রীদের কাছে চড়া দামে ভাড়া দিতে। ডাকাত আক্রমণের সময় কেউ তাদের কোনো দিন অ্যাকশনে দেখেছে, এমন কখনো শোনা যায়নি।

অন্যদিকে লঞ্চ বা স্টিমারের মধ্যে একদল সাধারণ যাত্রীবেশী ভ্রাম্যমাণ ডাকাতও থাকতো । এরা সারাটা পথ সাধারণ যাত্রীদের মতো নিরীহ আচার-আচরণ করলেও গাবখান চ্যানেলে এলেই হঠাৎ করিতকর্মা হয়ে উঠতো। আঠারো কিলোমিটার লম্বা গাবখান চ্যানেলটি কাটা হয় ১৯১৭ সালে, যা ঝালকাঠির সুগন্ধা-বিষখালী নদীর সঙ্গে পিরোজপুরের সন্ধ্যা নদীকে সংযুক্ত করেছে। চ্যানেলটি বেশ সরু আর এর দুই মাথায় সিগন্যাল বসানো আছে। এক মাথা দিয়ে বড়ো জাহাজ ঢুকলে অন্য মাথা দিয়ে জাহাজ না ঢুকে অপেক্ষা করে। এই সরু চ্যানেলটিই এসব ভ্রাম্যমাণ ছদ্মবেশী ডাকাতের জন্য খুব অনুকূল কর্মক্ষেত্র। এখানে এলেই তারা আগে থেকে টার্গেট করা যাত্রীর জিনিসপত্র নিয়ে অকস্মাৎ পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে পেডেল স্টিমার হলে পেডেলের সামনের অংশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে না। কেননা তা করলে পেডেলের আঘাতে তাদের নিশ্চিত মৃত্যু হবে। আমি এমনও দেখেছি, গাবখানে এসে এক মহিলার কানের সোনার দুল টান দিয়ে ডাকাতটি পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আর সোনার দুলের সঙ্গে ওই হতভাগ্য মহিলার কানের অর্ধেকও সে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। মহিলার এক কান থেকে টকটকে লাল রক্ত ঝরে পড়ছে আর মহিলা যখন ঘটনা বুঝতে পেরেছে তখন চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেছে আর যাত্রীরা সব উত্তেজিত হয়ে হই হই করা শুরু করেছে; কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

অনেক সময় লঞ্চ বা স্টিমার যখন এসব ডুবন্ত চরে খুব শক্তভাবে আটকে যেতো তখন কোনো কোনো বার ১২ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্তও লঞ্চকে আটকে থাকতে হতো। তখন পানি ও খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিতো। সে সময় যাত্রীরা জেলেদের নৌকায় করে আশপাশের গ্রাম থেকে বাজার করে এনে চরের মধ্যে রান্নাবান্না শুরু করে দিতো। সে গভীর দুর্যোগের মধ্যেও একধরনের পিকনিক পিকনিক ভাব চলে আসতো তখন। সে সময় কোনো মোবাইল টেলিফোন ছিল না, আর সাধারণ টেলিফোনেও কানেকশন পাওয়া ছিল পরম ভাগ্যের ব্যাপার। তাই অন্যদিকে যাত্রীদের আত্মীয়-স্বজন লঞ্চ আসতে না দেখে চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে যেতো।

এভাবে চাঁদপুর থেকে ছাড়ার পাঁচ-ছ’ঘণ্টা পর লঞ্চ বরিশাল পৌঁছাতো, সেখানে দু-এক ঘণ্টা থেকে লঞ্চ পৌঁছাতো ঝালকাঠি, তারপর গাবখান চ্যানেল পার হয়ে কাউখালী, তারপর হুলারহাট । পিরোজপুর শহরের ঘাটের নামই হুলারহাট। হুলারহাট যখন পৌঁছাতো তখন সকাল ১০টা থেকে ১১টা । হুলারহাটে আবার কুলিদের অত্যাচার, সে অত্যাচার অতিক্রম করে মালপত্র নিয়ে কালীগঙ্গা নদীতে মাঝির বৈঠা বাওয়া নৌকায় প্রায় চার মাইল উজানের পথ, তারপর আমাদের গ্রাম উদয়কাঠি এসে আমার বৃদ্ধ দাদার নৌকা ভিড়তো, ততক্ষণে বেলা ১২টা থেকে ১টা। তার মানে লঞ্চ যদি ভাগ্যক্রমে চরে আটকে না যেতো বা কুয়াশায় দেরি না করতো তাহলে ঢাকা থেকে রওনা দেওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর দাদা বাড়িতে পৌঁছাতে পারতেন আর যখন পৌঁছাতেন ততক্ষণে অসহনীয় ভোগান্তি আর ক্লান্তিতে তাঁর শরীর সম্পূর্ণ অবসন্ন। যারা শুধু একবারের জন্য এমন যাত্রা করেছে তাদের কারো কারো কাছে হয়তো পুরো ব্যাপারটা অনেকটা পিকনিক পিকনিক মনে হতে পারে; কিন্তু যারা সারা জীবনে বারবার এমন দুঃসহ দীর্ঘ যাত্রা করতে বাধ্য হতো, তাদের কাছে এটা এমন উপভোগ্য মনে হতো না কখনো। তারা সারা জীবন এ থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজে বেড়াতো।

জলপথের এ দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রা সময়ের বিকল্প পথ খোঁজার আকাঙ্ক্ষা থেকেই আশির দশকের মাঝামাঝি বৃহত্তর ফরিদপুর, বরিশাল বা পিরোজপুর, বাগেরহাট অঞ্চলের মানুষসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ সেই প্রাচীন সিল্ক রুটের অভিযাত্রী বণিকদের মতো নিজেরা নিজেরাই ঢাকা থেকে এসব দুর্গম ও কষ্টসাধ্য দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক রুটগুলো ব্যবহার করা শুরু করে। বিখ্যাত ভাগ্যকূল জমিদারদের লঞ্চঘাটকে কেন্দ্র করে মাওয়া ফেরি চালু হয় ১৯৮৬ বা ১৯৮৭ সালে। তখন ঘাট ভেঙে গেলে বা পানিতে তলিয়ে গেলে বাসের মালিক-শ্রমিকরা নিজেরা নিজেরাই ঘাট মেরামত করে নিতো । সে সময় প্রথম দিকে শুধু সকালে আর বিকেলে দুইবার মাত্র ফেরি চলতো, তবে তার কিছুকাল আগে থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ ঢাকা থেকে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে, তারপর ধলেশ্বরীর দুটো আলাদা স্রোত ও শ্রীপুরের মুশুরগাঁও খাল পার হয়ে ভাঙা ভাঙা পথে হেরিংবন্ডের ভাঙাচোরা রাস্তায় নানা প্রকার লক্কড়ঝক্কড় মুড়ির টিন মার্কা বাস বা টেম্পোতে পার হয়ে বহু কষ্ট করে মাওয়া পৌঁছাতো , সেখান থেকে ছোট লঞ্চ বা স্পিডবোটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পদ্মা নদী পার হতো। সেখান থেকে আড়িয়াল খাঁ নদ, তারপর মোল্লারহাট বা পাটগাতিতে মধুমতী নদী পার হতো। যারা মোল্লারহাটের নদী পার হতো তারা এরপর ফকিরহাট হয়ে বাগেরহাট গিয়ে সেখান থেকে দড়াটানা নদী পার হয়ে বলেশ্বর নদের তীরে এসে অপেক্ষা করতো। বলেশ্বর পার হলেই পিরোজপুর সদর, আর যারা খুলনা যেতো তারা মোল্লারহাট হয়ে রূপসার তীরে এসে রূপসা পার হয়ে খুলনা যেতো । অন্যদিকে যারা টুঙ্গীপাড়া হয়ে পাটগাতিতে মধুমতী নদী পার হয়ে আসতো তারা নদী পার হওয়ার পর ভীষণ ভাঙাচোড়া প্রায় গ্রাম্য রাস্তা দিয়ে মাটিভাঙ্গা হয়ে নাজিরপুরে এসে নাজিরপুর নদী পার হয়ে পিরোজপুর পৌঁছাতো। আবার অন্যদিকে যারা বরিশাল যেতো তারা ভাঙ্গা থেকে শিকারপুর আর বাবুগঞ্জে সন্ধ্যা আর সুগন্ধা নদী পাড়ি দিয়ে বরিশাল পৌঁছাতো, আর যারা পটুয়াখালী হয়ে কুয়াকাটা যেতো তাদের কষ্ট ছিল বর্ণনাতীত। বরিশাল থেকে আরো পাঁচ-ছয়টা ফেরি পারাপারের দুঃসহ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হতো নিত্যদিন।

এভাবে আমাদের মতো পিরোজপুরের মানুষ অবশেষে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে যখন বলেশ্বর পারে আসতাম তখন দেখতাম ফেরি বসে আছে; কিন্তু ফেরিতে উঠতে দিচ্ছে না। কেননা সারা দিনে খুব কমসংখ্যক গাড়িই এই ফেরি ব্যবহার করতো আর ফেরি সম্পূর্ণ না ভরলে চালু করতো না। তাই ফেরির কর্মচারীরা সারা দিনই অলস সময় কাটাতো, জিজ্ঞেস করতেই বলতো সারেং নাই অথবা অন্য কোনো ঝামেলা আছে। যখন বলা হতো—

ভাইজান, ভালোমন্দ ব্যবস্থা হবে আনে, ফেরি চালু করেন।

অবশেষে ‘ভালোমন্দের’ কারণে ফেরি চালু হতো এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে আমরা ছোট বলেশ্বর পাড়ি দিতাম, নামার আগে ফেরির লোকজনের হাতে কিছু ‘ভালোমন্দ’ দিয়ে পিরোজপুর শহরে পদার্পণ করতাম। কিন্তু ততক্ষণে চরম দুঃসহ ভ্রমণ ক্লান্তিতে আমাদের শরীর ও মন সম্পূর্ণ অবসন্ন। এই ছিল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের হতভাগ্য জীবনযাপন।

চিন্তা করা যায়, নিজের দেশের রাজধানী থেকে নিজের বাড়ি ফিরতে দক্ষিণাঞ্চলের তিন-চার কোটি মানুষের জীবনে এটা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা! তাদের আর অন্য কোনো পথ ছিল না। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাদেরকে এ দুঃসহ জীবন মেনে নিতে হতো। বাস বা লঞ্চ যাতেই ভ্রমণ করি না কেন, দুটোতেই বড়ো বড়ো করে লেখা থাকতো,

সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।

আসলেই কথা সঠিক। সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য তো বেশিই; কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের সময়ের কোনো মূল্যই ছিল না। তাদের ছিল অবহেলিত স্থবির ঢিলেঢালা জীবন, চাইলেও সে জীবনে দ্রুততার কোনো জায়গা ছিল না আর তার সঙ্গে ভোগান্তির কোনো অন্ত ছিল না।

এই বাস্তবতাকে এবং এ থেকে উত্তরণের স্বপ্ন ধারণ করেই ১৯৮৬ সালে মোটামুটি বৃহত্তর ফরিদপুর আর বরিশালের লোকজন মিলে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ গঠন করা হয় এবং পদ্মা সেতুর দাবিতে নানা ধরনের আন্দোলন শুরু হয়। ছাত্র বয়সে খবরের কাগজে এদের নানা আন্দোলনের কর্মসূচি আমি আগ্রহ নিয়ে পড়তাম। এই পরিষদের শুধু একজনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আমার বাবার বন্ধুর ছোট ভাই, নাম খোকা শিকদার, তাঁকে দেখলেই বাবা জিজ্ঞেস করতেন,

পদ্মা ব্রিজ কতোদূর?

তিনি উত্তরে বলতেন যে এই ব্রিজের কথা বলার কারণেই নাকি লঞ্চে বা হাটবাজারে মানুষ তাঁকে পাগল ডাকা শুরু করেছে। এ দেশের এলিট শ্রেণির অনেকেই পদ্মা সেতুর দাবিদার প্রায় সবাইকেই একসময় পাগল ভাবতো; কিন্তু কে না জানে পৃথিবীর বড়ো বড়ো পরিবর্তনগুলো এমন দূরদর্শী পাগলদের মাথা থেকেই সর্বপ্রথম বেরিয়ে আসে।

এরপর জনমানুষের প্রচণ্ড চাপে গত প্রায় তিন দশকে আস্তে আস্তে উপরোল্লিখিত ফেরি পারাপারের নদীগুলোতে একে একে সেতু নির্মাণ হতে শুরু হয়। এভাবেই ১৯৮৯ সালে বুড়িগঙ্গা সেতু, ১৯৯৭-৯৮ সালে ধলেশ্বরীর দুটি সেতু, ১৯৯৮ সালে অস্থায়ী বেইলি ব্রিজ সরিয়ে শ্রীপুরে মুশুরগাঁও সেতু, তারপর একে একে ২০০০ সালে মোল্লারহাট সেতু, ২০০১-এ দড়াটানা সেতু, ২০০২ সালে গাবখান সেতু, ২০০৩ সালে শিকারপুর ও দোয়ারিকা সেতু, ২০০৫ সালে আড়িয়াল খাঁ ও রূপসা সেতু এবং এর আগে বলেশ্বর সেতু ও অনেক পরে পাটগাতি সেতুর কাজ শেষ হয়। কিন্তু বাকি থাকে পদ্মা সেতুর কাজ। এই পদ্মা সেতুর জন্যই সব সেতু হয়ে যাওয়ার পরও এই রুটগুলো পূর্ণতা পাচ্ছিল না, আর মানুষের চরম ভোগান্তিরও অবসান হচ্ছিল না। মাওয়া বা জাজিরা প্রান্তে এসে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো, অনেক রোগী ঘাটে অপেক্ষা করতে করতেই মৃত্যুবরণ করতো । কোনো কোনো সময় আমি নিজেই ৮-১০ ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি ফেরির জন্য। এ কারণেই পদ্মা সেতু ছিল এ পুরো প্রক্রিয়াকে পূর্ণ করার জন্য অত্যন্ত আবশ্যকীয়।

অবশেষে পদ্মা সেতু দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ যাতায়াত শুরু করেছে। প্রথম দিন তারা হয়তো একটু মাত্রাতিরিক্ত আবেগ দেখিয়ে ফেলেছে, তবে একে ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখা যেতে পারে। আজ আমার দাদা বা বাবা কেউ বেঁচে নেই; কিন্তু তাঁদের প্রজন্ম সম্মিলিতভাবে আমাদের একটি স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছে আর এ স্বাধীন দেশ পেয়েছি বলেই যে যাত্রাপথ অতিক্রম করতে আমার দাদার প্রায় ২৪ ঘণ্টা বা কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি সময় লাগতো, পদ্মা সেতু হওয়ার কারণে সে একই পথ অতিক্রম করতে আজ তাঁর পৌত্রের লাগছে মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। আলহামদুলিল্লাহ। এ কারণেই পদ্মা সেতু আর স্বাধীনতা আজ একাকার হয়ে গেছে, এ কারণেই পদ্মা সেতু আমাদের কাছে অনন্য।

এই ব্রিজের সঙ্গে বিভিন্ন স্তরে নির্মাণের সঙ্গে জড়িত সকলকে, এর ডিজাইন টিম ও উপদেষ্টা প্যানেলের সকল সদস্য যাঁরা সবাই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক ছিলেন তাঁদের সবাইকে জানাই আমার আন্তরিক অভিনন্দন। আমার শিক্ষক মরহুম জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা আর বিশেষভাবে অভিনন্দন জানাতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে, যিনি তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের দাপ্তরিক পরিসীমার বাইরে গিয়েও তাঁর ব্যক্তিগত অনমনীয় কমিটমেন্টের জায়গা থেকে খুব দৃঢ়ভাবে এ প্রকল্পটি সম্পন্ন করে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন এবং এর বাস্তবায়নেও নিজেকে জড়িত রেখেছেন একদম প্রথম থেকেই। তা না হলে এ প্রকল্পটির অবস্থা হতে পারতো চরম ভোগান্তি উদ্রেককারী প্রায় একই সময়ে শুরু হওয়া ঢাকা-জয়দেবপুর BRT প্রজেক্টের মতো অমন মাতা-পিতাহীন, যেটা কোনো দিন শেষ হবে কি না তা বোধ হয় কেউই জানে না।

ভূমিকা হিসেবে এতো দীর্ঘ আর আপাত বিরক্তিকর গল্পেগুলোর অবতারণা করলাম এ কারণে যে যুগের পর যুগ ধরে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ, দুঃসহ, বিপদসংকুল ও ভোগান্তি জর্জরিত যাত্রার কষ্টকর স্মৃতিকে প্রেক্ষাপট হিসেবে সামনে নিয়ে এসে বিবেচনা না করলে মানুষ বুঝতে পারবে না পদ্মা সেতু কেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে এমন পরম আবেগসিক্ত একটি স্থাপনা। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে তাদের কাছে যুগ যুগ ধরে চলে আসা আঞ্চলিক অবিচার ও অসহনীয় ভোগান্তির অবসান হতে চলেছে। এ কারণেই আমাদের মতো দক্ষিণবঙ্গের মানুষের কাছে পদ্মা সেতু হলো সুদীর্ঘকালের বঞ্চনা, অবহেলা আর আঞ্চলিক অবিচার ও দীর্ঘ অসহনীয় ভোগান্তির পরিসমাপ্তির প্রতীক এবং একই সঙ্গে নতুন দিনের ও নতুন স্বপ্নের সম্ভাবনার স্মারক, সে কারণে পদ্মা সেতু নিয়ে আমাদের আবেগ একটু বেশিই।

মাহফুজুল হক জগলুল
স্থপতি, ফেলো আইএবি

২৮ জুন, ২০২২

পূর্বে প্রকাশিত লিঙ্ক

আরও পড়ুন