রফিক কায়সার , বাক্সের বাইরের মানুষ

রফিক কায়সার , বাক্সের বাইরের মানুষ

১৯৭৫ সালের অগস্টের ১০ তারিখ তৎকালীন মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজে ক্লাস সেভেনে ক্যাডেট হিসেবে আমাদের ত্রয়োদশ ব্যাচের প্রথম প্রবেশ । একই বছর অক্টোবরের ১৫ তারিখ লম্বা, ছিপছিপে প্রচন্ড বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার এক অবিবাহিত যুবক বাংলার শিক্ষক হিসেবে কলেজে জয়েন করেন, তাঁর নাম রফিকুল ইসলাম। সম্ভবত এটিই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম চাকুরী। প্রায় মাস ছয়েক পরে জানতে পারলাম তাঁর আরেক নাম রফিক কায়াসার, কোনটা তাঁর আসল নাম এ রহস্যের সমাধান আজ পর্যন্ত আমার কাছে হয়নি। তবে সেই ঘোর কিশোর বয়সে একজন শিক্ষকের একটি আসল নাম আর একটি গুপ্ত নাম এ জিনিসটা তাঁকে আমাদের কাছে আরো রহস্যময় ও আকর্ষনীয় করে তোলে।

রফিফ স্যারের প্রথম ক্লাসেই ধাক্কা খেলাম। তাঁর অনন্য সুন্দর লেকচার ক্লাসের সবচেয়ে অমনোযোগী ছাত্রটিকেও এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে নিয়ে যেতো। মানুষটি সেই কিশোর বয়সেই আমাদের নিয়মিত অন্য এক জগতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতেন, সে জগত ছিল আমাদের গতানুগতিক জগত থেকে ভিন্ন। আমরা আস্তে আস্তে সেই নতুন জগতের আলোর মধ্যে প্রবেশ করতে লাগলাম। সারাদেশে ক্লাস সেভেন-এইটের ছাত্ররা যখন ডাঃ লুতফর রহমানের বিরক্তিকর আদর্শবানী মুখস্থ করছে তখন তিনি আমাদের পঞ্চাশ জন ছাত্রের হাতে ধরিয়ে দিলেন পঞ্ছাশ কপি ঝকঝকে বুদ্ধদেব বসুর ‘ আমার ছেলেবেলা ‘ । সাথে সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন রবীন্দ্র বৃত্তের বাইরে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সাড়া জগানো কল্লোল যুগের পঞ্চপান্ডবের আরও চার কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে ও জীবনানন্দ দাশকে । আমরা জানতে পারলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে রেকর্ড নম্বর পাওয়া বুদ্ধদেব বসুর অসম্ভব মেধাবী জীবনের কথা, বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতি বিজরিত পুরনা পল্টন তখন আমাদের কাছে অন্য রকম পুরান পল্টন হিসেবে নতুন করে ধরা দিলো।

জীবনানন্দ দাশকে কিশোর বয়সে আমরা চিনতাম শুধুমাত্র রূপসি বাংলার কবি হিসেবে কিন্তু স্যার আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র জীবনানন্দের অন্য জটিল এক কাব্য রূপ, ইয়েটসের কবিতার সাথে জীবনানন্দের কবিতায় রহস্যময়তা ও আধুনিকতার সাযুজ্য। স্যার গল্পে গল্পে শুনিয়ে দিলেন জীবনানন্দের দাম্পত্য জীবনের জটিলতার ও কলকাতার ট্রামের চাকায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যু বরনের সাথে আকাশলীনা কবিতার সংযোগ,

সুরঞ্জনা, ওইখানে যেওনাকো তুমি,
বোলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা:
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;

ক্লাস এইটেই তিনি আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমাদের মতোই কিশোর বয়েসে রবীন্দ্রনাথকে নীল কাগজে চিঠি দেয়া সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো সৃষ্টশীল রসিকের সাথে। পরিচয় করিয়ে দিলেন তার ‘ দেশে বিদেশে ‘ এর সাথে, আমরা বহু ভাষাবিদ ভ্রমন পিপাসু মুজতবা আলী সাথে সাথে ঘুরতে লাগলাম আফগানিস্থান,মিশর,সুয়েজ ক্যানেল, জার্মানি,ফ্রান্স হয়ে সারা বিশ্ব। তার মাধ্যমেই আমরা প্রথম শিখলাম যে শুধু ইংরেজ নয় বরং ফরাসি, জার্মান ও ইটালীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিই হচ্ছে ইয়োরোপিয় সভ্যতার অন্যতম প্রধান ধারা। তার মাধ্যমে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের নতুন জগত, অবাক বিস্ময়ে মুজতবা আলীর মাধ্যমে জানতে পারলাম ইংরেজি Admiral শব্দটি এসেছে আরবি ‘ আমির-আল-বহর ‘ শব্দটি থেকে আর Earth শব্দটি এসেছে আরবি ‘ আরদ্ ‘ থেকে। জানতে পারলাম ইংরেজি ভাষার প্রায় ৫০% শব্দই এসেছে ফরাসি ভাষা থেকে। মুজতবা আলীর লেখার মাধ্যমে আমরা পরিচিত হলাম টেক্সটবুকে প্রচলিত হিটলারের ইমেজের বিপরীতে অন্য এক ভিন্ন এডলফ হিটলারের সাথে, যে প্রেমিক, যে সংগীত সমঝদার , যে অপূর্ব সুন্দর ওয়াটার কালার করতে পারে। স্যারের মাধ্যমে আমরা পরিচিত হলাম মুজতবা আলীর রসবোধ আর রসনাবোধের সাথে, তিনি আমাদের বুঝিয়ে দিলেন পেটুক আর খাদ্য রসিক এক জিনিস নয়, প্রসঙ্গক্রমে উঠে আসতো নাটোরের কাঁচা গোল্লা, মুক্তাগাছার মন্ডা বা পোড়াবাড়ির চমচম। সংস্কৃতি ও সাহিত্যের আলোয় আমরা আমাদের দেশ ও ঐতিহ্যকে নতুন মাত্রায় চিনতে শিখলাম। আজও যখন দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরতে গিয়ে সেখানকার প্রসিদ্ধ খাবারের স্বাদ নেই বা স্থানীয় কীর্তিগাঁথার ইতিহাস শুনি তখন আমাদের পূর্বপুরুষদের সৃষ্টিশীলতার প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হই, নিজের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের প্রতি অবনত হওয়ার এ শিক্ষা স্যারের কাছ থেকেই পেয়েছি।

সত্যি কথা বলতে গেলে রবীন্দ্রনাথকে তিনি আমাদের একেবারে বেটে গুলে খাইয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের উপর পূর্ববঙ্গের জল,মাটি ও মানুষ এবং বাউল গানের প্রভাব নিয়ে স্যার আমাদের বিস্তারিত বলতেন। শুধু সাহিত্যিক ও কবি রবীন্দ্রনাথ নয়,তার পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বৃটিশ-ভারতের প্রথম আইসিএস অফিসার রবীন্দ্রনাথের বড়ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নতুন বউঠান কাদম্বরীদেবী এবং তার সাথে রবীন্দ্রনাথের অজানা সম্পর্কের ইশারা, ঠাকুর পরিবারে লবন আমদানির ব্যবসার খবর, ঠাকুর পরিবারের মালিকানায় ভারতের প্রথম ব্যাংকের কাহিনীসহ নানান তথ্য গল্পের ভিতর দিয়ে তিনি আমাদের শুনাতেন। এছাড়া পিতৃস্মৃতির লেখক রবীন্দ্রনাথের সেক্রেটারি বড়ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার নানান গুনের কথা, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা চার্লস এন্ড্রুজের সাথে তার নানান ঘটনা বা ঠাকুর বাড়ির মেয়েদের নতুন ধারায় শাড়ি পরার ধরন আর তার সাথে প্রথম ব্লাউজ ব্যবহারের প্রচলন- এ সব আমরা অবাক বিস্ময়ে শুনেছি স্যারের কাছ থেকে । শুনেছি নোবেল পুরস্কারের সমস্ত টাকাটাই তিনি ব্যয় করেছেন বোলপুরে শান্তিনিকেতনে পানীয় জল সরবরাহ করা আর পাতিসরের কৃষকদের জন্য তার উদ্ভাবিত কৃষিব্যঙ্ক চালু করার কাজে। আমাদের নঁওগা জেলার পাতিসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন গোরা , চিত্রা, পূর্ণিমা, সন্ধ্যা, ঘরে-বাইরেসহ অনেক লেখা। গল্পে গল্পে স্যার রবীন্দ্রনাথকে আমাদের একেবারে নিত্যদিনের চেনা মানুষ করে তোলেন। কলেজ থেকে বেড়িয়ে বুয়েটে ছাত্রাবস্থায় যখন ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতা কেন্দ্রিক বিকাশমান নাগরিক ‘ বাবু সংস্কৃতির ‘ ইতিহাস নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বিখ্যাত উপন্যাস ‘ সেই সময় ‘ পড়ি তখন মুচকি হেসে লক্ষ্য করি এর অনেক তথ্য ও ঘটনাই স্যার বহু বছর আগেই আমাদের শুনিয়ে রেখেছেন।

আধুনিক বিশ্ব সাহিত্যের মধ্যে তিনি প্রায়সই আমাদের আর্নেস্ট হেমিংওয়ের প্রসঙ্গ টানতেন, তাই ওই বয়সেই আমরা তার The Old Man And The Sea আর অন্যদিকে আলেক্স হেলির Roots ও পাবলো নেরুদার লেখা সম্বন্ধে জানতে পারি। কাজী নজরুল ইসলামের সিন্ধু কবিতা পড়াতে গিয়ে স্যার আমাদের সমুদ্র মন্থন, মন্থনে অমৃত আর কালকূট বিষ উঠে আসা, সৃষ্টি রক্ষার্থে মহাদেব শিবের সেই বিষ পান করে নীলকন্ঠ হওয়াসহ একে একে মহাভারত,রামায়ন ও অন্যান্য পৌরানিক গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে মাতিয়ে রাখতেন। ব্যক্তিগত ভাবে আমার সেই ঘোর অনেক প্রলম্বিত ছিল যার ফলে পরবর্তিতে মহাভারত,রামায়ন,বেদসহ অন্যন্য পৌরানিক বিষয়ের প্রতি আমার আকর্ষন অনেক বেড়ে যায়, যা এখনও কার্যকর আছে। চতুর্দশ ব্যাচের বিপ্লব রঞ্জন সাহাকে ইসলামিয়াত ক্লাসের পরিবর্তে স্যার লাইব্রেরিতে বসিয়ে রুটিন মাফিক নিয়মিত মহাভারত পড়াতেন।

জাতীয় শিক্ষাক্রমকে পাস কাটিয়ে সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত কলেজ কর্তৃপক্ষকে রাজি করিয়ে কিভাবে এইসব তিনি আমাদের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিলেন তা আমার কাছে এখনও বিস্ময়কর মনে হয়। শুধু পড়ানোই নয় আমাদের বার্ষিক পরীক্ষায় গ্যাটে, দান্তে, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ মুজতবা আলীসহ বিশ্ব সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের দিকপালদের জীবনীর উপর পরীক্ষা দিতে হতো ।

আমরা শুনতাম বাংলা সাহিত্যের দুরূহতম লেখক কমল কুমার মজুমদার হলেন স্যারের প্রিয় লেখক কিন্তু আমাদের কাছে তার সম্বন্ধে তিনি মুখ খুলতেন না, বোধ হয় আমাদের বয়স তখন তার লেখা অনুধাবনের জন্য সঠিক ছিল না । আরো শুনতাম আহমদ ছফা নামের ঢাকার এক তরুন উদিয়মান লেখক তার খুব ঘনিষ্ঠ, তবে তার সম্বন্ধেও তিনি আমাদের সাথে আলাপ করেনি কখনো। ‘ ছফা ‘ কোন সফিস্টিকেটেড সাহিত্যিকের নাম হতে পারে তা গ্রহন করা তখন আমার জন্য বেশ কষ্টকর ব্যপার ছিল, কিন্তু একজন লেখক তো শুধু শুধু স্যারের মনো জহুরির নজরে আসতে পারে না সে আগ্রহেই একাদশ শ্রেনীতে আমি আহমদ ছফার ‘ নিহত নক্ষত্র ‘ বইটি পড়ে ফেলি । পরবর্তিতে আমি আহমদ ছফার প্রকাশিত প্রায় সব লেখাই পড়েছি এবং আজ আমি আহমদ ছফাকে এদেশের অন্যতম প্রধান স্বাধীন ও সঠিক চিন্তাবিদ বলেই মনে করি, কিন্তু মাত্র ৫৮ বছর বয়সেই আহমদ ছফা মৃত্যু বরন করেন। স্যার একটি কথা প্রায়ই বলতেন, কাজী নজরুল ইসলাম মাত্র ৪৩ বছর বয়সেই লেখক হিসেবে শেষ হয়ে যান, বঙ্গবন্ধুকে ৫৫ বছর বয়েসেই হত্যা করা হয়- ইতিহাসের একটি নির্মম পরিহাস যে বাঙালি মুসলিম প্রতিভা কেন যেন পরিপূর্ণ বিকশিত হবার আগেই শেষ হয়ে যায় , আহমদ ছফার ক্ষেত্রেও স্যারের এই আশঙ্কার সূত্রটি আবার নির্মম ভাবে সত্য প্রমানিত হয়।

ইতিহাসের টেক্সটবুকে আমরা যখন সুলতানি আমল, মোগল শাসন বা শওকত আলি, মোহাম্মদ আলি, আলিগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, খেলাফত আন্দোলন , তথাকথিত বঙ্গভঙ্গ, পাকিস্তান আন্দোলনসহ প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্য বিষয় পড়ছি স্যার তখন আমাদের শোনাচ্ছেন ইতিহাসের পিছনের অন্য এক ইতিহাস, গতানুগতিক ইতিহাসের বিপরীতে আমরা জানতে পারলাম তথাকথিত বঙ্গভঙ্গের পিছনের সমাজত্বাতিক রসায়নের বিশ্লেষন অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দি, শরৎবসু, আবুল হাশেমসহ সমমনাদের অবিভক্ত বাংলা গঠনের পরিকল্পনা ও প্রস্তাবের অজানা ইতিহাস আর সুভাস বসুর লোমহর্ষক সশস্ত্র অভিযানের গল্প। প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসকে প্রশ্ন করার স্পর্ধা ও ইতিহাসকে তীর্যক ভাবে দেখার শিক্ষা সেই কৈশোরেই স্যার আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।

স্যার জয়েন করার বছর খানেকের মধ্যেই আমাদের কলেজ লাইব্রেরির চেহারা পালটে ফেললেন। শুধু তা ই না আমাদেরকে রেফারেন্স সহ উৎসাহিত করতে থাকলেন সুন্দর সুন্দর বই পড়তে । আমরা দস্যু বনহুর, মাসুদ রানা, কুয়াশা সিরিজ ফেলে গোগ্রাসে পড়তে লাগলাম রবীন্দ্রনাথ, মোপাসাঁ, মুজতবা আলী, সুকুমার রায়, অবনী ঠাকুর, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শিবরাম চক্রবর্তী, মানিক বন্দোপাধ্যায় ,শক্তি চট্টোপাধ্যায়সহ নতুন নতুন লেখকের বই। নিজের অজান্তেই আমরা বদলে যেতে থাকলাম, তখন বুঝতে পারিনি স্যারই খুব যত্নের সাথে আমাদের বদলে দিচ্ছেন।
ক্লাসের লেকচার ছাড়া অন্য সময় স্যার কথা বলতের খুব ছোট ছোট বাক্যে, কিন্তু সেই সুন্দর বাক্যগুলো আজও মনে গেঁথে আছে, যেমন, কোন কিচু ভালো লাগলে বলতেন,

উপভোগ করলাম বা প্রীত হলাম।

বাৎসরিক ইন্টার হাউস আর্ট এন্ড ক্রাফটস কম্পিটিশনে কিছু নকল ছবি দেখে স্যার মাত্র চারটি শব্দের যে তীক্ষ্ণ বাক্যটি বলেছিলে চল্লিশ বছর পরেও আমার আজও তা হুবহু মনে আছে,

” অনুকরণ একটি অক্ষম প্রয়াস “

হুমাইয়ূন আহমেদের প্রকাশিত দ্বিতীয় উপন্যাস শঙ্খনীল কারাগার ( যদিও লেখার ক্ষেত্রে এটাই তার প্রথম উপন্যাস) তখন আমরা অনেকেই পড়ে ফেলেছি কিন্তু বিষয়টা কলেজ ক্যাম্পাসে রহস্যময় ও আলোচিত হয়ে উঠলো তখনই যখন শোনা গেল ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নামটি রফিক স্যারের কবিতা থেকে তাঁর বন্ধু হুমাযূন আহমেদ নিয়েছেন। এব্যাপারে প্রশ্নের উত্তরে স্যার সবসমই মৃদু হাসি হেসেছেন, মুখে কিছু বলেননি । এই মৃদু হাসি রহস্য আরো বাড়িয়েছে মিমাংসা করেনি কখনো। তবে হুমায়ূন আহমেদ তার নিজের লেখায় লিখেছেন,
” সোমেন চন্দের লেখা অসাধারণ ছোটগল্প ‘ইদুর’ পড়ার পরই নিম্নমধ্যবিত্তদের নিয়ে গল্প লেখার একটা সুতীব্র ইচ্ছা হয়। ‘নন্দিত নরকে’ ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘মনসুবিজন’ নামে তিনটি আলাদা গল্প প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লিখে ফেলি। নিজের উপর বিশ্বাসের অভাবের জন্যেই লেখাগুলি দীর্ঘদিন আড়ালে পড়ে থাকে। যাই হোক, জনাব আহমদ ছফা ও বন্ধু রফিক কায়সারের আগ্রহে ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হয় মাস ছয়েক আগে। এবারে প্রকাশিত হলো ‘শঙ্খনীল কারাগার। “

গল্পে গল্পে স্যার পরিচয় করিয়ে দিইয়েছিলেন আমাদের কিশোরগঞ্জের সন্তান উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায় ও সত্যজিৎ রায়-এই তিন প্রজন্মের মেধা আর সৃষ্টিশীলতার অনবদ্য ইতিহাস। চিনিয়ে দিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের আর এক সন্তান, দেবব্রত বিশ্বাস বা জর্জদাকে। তখন কিশোর বয়সে আমরা হেমন্ত,মান্নাদে,কিশোরকুমারের গান শুনতাম , স্যার আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেনছিলেন কুমিল্লার সন্তান আর ত্রিপুরার রাজকুমার শচীন কর্তার মাতালকরা এক অদ্ভুত অনানুসিক কন্ঠস্বরের সাথে। এসবের মাধ্যমে আমরা আস্তে আস্তে বদলে যেতে থাকলাম অথবা স্যার হয়তো আমাদের বদলে দেবার সুদূর প্রসারী মিশন নিয়েই বনভূমি ঘেরা বিচ্ছিন্ন ঐ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদেরকে বেছে নিয়েছিলেন।
সাহিত্য বা ইতিহাসের প্রতি তেমন আগ্রহী নয় এমন ছাত্ররাও স্যারের ক্লাসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর লেকচার শুনতো। খেলাধুলায়ও স্যারের আগ্রহ ছিল অনেক। তখনকার দিনে টেলিভিশনে লাইভ ক্রিকেট খেলা তেমন দেখানো হতো না কিন্তু রেডিওতে স্যার টেস্ট ম্যাচের কমেন্ট্রি শুনতেন,ক্যাডেটদের মধ্যে যারা ভালো ক্রিকেট খেলতো তাদের সাথে ম্যাচ নিয়ে আলোচনা করতেন । আমাদের ব্যাচের হাসান ফেরদৌস কোকো ছিল আমাদের প্রজন্মের সেরা ফুটবল খেলোয়াড়, কোকোকে স্যার একদিন প্রশংসা করে বলেছিলেন, পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার চেয়ে চার-পাঁচজন ডিফেন্ডারকে কাবু করে একটি সুন্দর গোল করা কম মেধার কাজ নয়। একজন শিক্ষকের মুখে ফুটবলে গোল করার সাথে সম্পর্কিত মেধার সাথে ক্লাসে ফার্স্ট বয়ের ঈর্ষনীয় মেধার এমন সরাসরি তুলনা জীবনের প্রতি আমাদের দৃষ্টিকে অনেকটাই বদলে দেয়।

আমাদের ক্লাসের স্যারের সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র ছিল আবু নাসের ( পরবর্তিতে যুক্তরাস্ট্র থেকে মেডিসিনের উপর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে সান ডিয়াগোতে নিজেই একটি হাসপাতাল পরিচালনা করছে ) , শুধু যে তুখোড় ছাত্র হবার কারনে ও প্রিয় ছিল তা নয়, প্রিয় হবার আর একটি কারন ছিল ,সেটা হচ্ছে আবু নাসের ছিল তেভাগা আন্দোলনের কিম্বদন্তি নেতা হাজী দানেশের নাতি । ক্লাসে আবু নাসেরের সাথে নানান আলাপে আলাপে স্যার আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতেন এদেশের শোষিত অবহেলিত কৃষকদের তেভাগা ও টঙ্ক আন্দোলন, নানকার ও নাচোল বিদ্রোহসহ কৃষক আন্দোলনের অজানা অনেক সংগ্রামী ইতিহাসের সঙ্গে।

স্যারের স্মৃতি শক্তি অসাধারন, প্রতিটি ছাত্রের নিজনিজ মেধা ও সক্ষমতা সম্বন্ধে তাঁর সম্যক ধারনা ছিল। একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে, এক ক্লাসে তিনি একে একে সবাইকে জিজ্ঞেস করছিলেন জীবনে কে কি হতে চায়, আমি বলেছিলাম আমি সাংবাদিক হতে চাই। বছর খানেক পরে আবার সবাইকে তিনি একই প্রশ্ন করলেন, ততদিনে চঞ্চল কিশোরদের মতো আমাদের অনেকেরই স্বপ্ন বদলে গেছে, সেবার আমি বলেছিলাম ,আমি কৃষিবিদ হতে চাই ( যতদূর মনে পড়ে, আমাদের ক্লাসের লিজেন্ড গোলাম মাওলা আমাকে ভুজংভাজুং দিয়ে বুঝিয়েছিল যে আমরা দুইজন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবো কেননা সেখানে নাকি ছাত্রাবস্থায় ক্ষেতে কাজ করলে ঘন্টা অনুযায়ী অনেক টাকা আয় করা যায় ), স্যার সাথে সাথে আমাকে পাকড়াও করলেন, রাগত স্বরে যা বললেন তা আমার আজও মনে আছে,তিনি বলেছিলেন,

আমার স্মৃতি যদি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করে থাকে তবে এর আগে তুমি বলেছিলে তুমি সাংবাদিক হবে, আমি খুব খুশি হয়েছিলাম, তোমার এই ডিগবাজির কারন কি ?
ধরা পরা আসামীর মতো অসহায় ভাবে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তখন আমার মুখে আর কোন উত্তর ছিল না।

১৯৮১ সালে সরাসরি শিক্ষক হিসেবে স্যারকে ছেড়ে আসার ঠিক চল্লিশ বছর পর আজ বুঝতে পারি গল্পের পর গল্প বলতে বলতে খুব সযত্নে আমাদের অজান্তেই তিনি আমাদের মধ্যে বপন করেছিলেন সুগভীর শিক্ষা ও চিন্তার বীজমন্ত্র যা আজ পর্যন্ত আমাদের মন ও মননকে বিস্তৃত ও পরিশীলিত করে চলেছে। এখন বুঝি গল্পগুলো ছিল নিছকই অনুষঙ্গ মাত্র, আসল ছিল গল্পের মধ্যে লুকানো সুগভীর শিক্ষা । আজ চল্লিশ বছর পর শারীরিক ভাবে স্যারের কাছ থেকে অনেক দূরে বসে জীবনের এ স্তরে এসে আমাদের উপর স্যারের প্রভাব আগের থেকে অনেক স্পষ্ট দেখতে পাই, আসলে দূরে গেলেই প্রকৃত মানুষটিকে অনেক স্পষ্ট ও পরিপুর্ণভাবে বোঝা যায়,

” Is not the mountain far more awe-inspiring and more clearly visible to one passing through the valley than to those who inhabit the mountain? ” Kahlil Gibran

আমার এ লেখাটি মোহগ্রস্ত কোন শিষ্যের আবেগপ্রসূত গুরু বন্দনা নয় আর সে কারনেই স্যারের সব চিন্তা ও বিশ্লেষনের সাথে আমি যে সবসময় একমত তা কিন্তু না, স্যারের অনেক চিন্তার সাথেই আমার দ্বিমত আছে কিন্তু মজার ব্যপার হচ্ছে স্যারের চিন্তা ও মতামতের বিপরীতে চিন্তা করার যে শক্তি ও সাহস এবং প্রচলিত মত,পথ ও প্রথাগত দর্শন ও দৃষ্টির যে বাক্স সেই বাক্সের বাইরে গিয়ে পৃথিবীকে দেখার,বোঝার ও নিজের আপন দর্শন ও বোধ নিয়ে সৃষ্টিশীল জীবনাচরণের যে শিক্ষা সে শিক্ষা আমি সহ অজস্র ছাত্ররা কিন্তু পেয়েছে এই স্যারের কাছ থেকেই। এখানেই শিক্ষক হিসেবে স্যার অনন্য । জীবনের শেষদিন কুশিনগরের শিষ্য আনন্দের প্রশ্নের উত্তরে গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন,

” আত্ম দীপ ভব, আত্ম শরন ভব, অনন্য শরন ভব”,

নিজেকে প্রদীপ করে তোল। সেই আলোয় নিজের পথ খুঁজে নাও।

ঠিক তেমনই, প্রকৃত শিক্ষকের মতো তিনি কখনো তার আপন চিন্তা ও দর্শনের মধ্যে তার ছাত্রকে বন্দি রাখতে চাননি বরং তাকে শিখিয়েছেন যেন সে আপন আলোয় পথ চলতে পারে , আলোর বাইরে আলো দেখতে পারে, তিনি আমাদের জন্য বাক্সের বাইরে চিন্তার নতুন জানালা খুলে দিতে চেয়েছেন,একারনেই, রফিক কায়সার চিরকালই আমার কাছে আলোর বাইরে আলো দেখানো মানুষ, বাক্সের বাইরের তাকাতে শেখানো মানুষ। বাক্সের বাইরের মানুষ।

মাহফুজুল হক জগলুল
এম সি সি ১৩ তম ব্যাচ
ক্যাডেট নম্বর, ৬৯০
১৯৭৫-১৯৮১
ফজলুল হক হাউজ

জানুয়ারি ২৫, ২০২৩