আমাদের প্রথম টেলিভিশন

খুব সম্ভবত ১৯৬৮ সালে মোহাম্মদপুরের কলেজগেটের বাসায় থাকতেই আব্বা প্রথম টেলিভিশন কেনেন। আমি তখন ছোট, তবে অনেক ঘটনা যে কোনো কারণেই হোক মনে আছে। মনে আছে, আমরা কয় ভাই অবাক বিস্ময়ে টেলিভিশন নামের এই জাদুর বাক্সের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আমাদের ছোটদের চেয়েও অনেক বেশি অবাক বিস্ময়ে হাঁ করে টেলিভিশন দেখতো আমাদের গ্রাম থেকে আসা মেহমানরা। আমার মনে আছে, আমার এক চাচা দু-তিন দিন অবাক হয়ে টেলিভিশন নামের এই অবাক বাক্সের ম্যাজিক দেখার পর আমাকে খুব গোপনে ডেকে নিয়ে চুপিচুপি দুটি প্রশ্ন করেছিল। প্রশ্ন দুটি ছিল এমন :

‘এতোগুলো মানুষ এই ছোট্ট বাক্সের মধ্যে একসঙ্গে থাকে কীভাবে?’
আর
‘এতো পাতলা এন্টেনায় ফিতার মতো তারের ভেতর থেকে বাক্সের মানুষদের জন্য ভাত আর তরকারি আসে কীভাবে?’

তখন টেলিভিশন সেট ছিল অনেকটা আসবাবপত্রের মতো। আমাদের টেলিভিশনটা ছিল দেখতে অনেকটা মাঝারি কাঠের ক্যাবিনেটের মতো , লম্বা লম্বা চারটা গোল কাঠের পায়া ছিল, ফোল্ডিং জানালা ছিল, ফোল্ডিং জানালা সরিয়ে নিলে টিভি স্ক্রিন দেখা যেতো, টিভি দেখা শেষ হলে আমরা আবার যত্ন করে জানালা আটকে দিতাম।

টেলিভিশিন শুধু ঢাকাতেই দেখা যেতো, ঢাকার বাইরে টেলিভিশন দেখা যেতো না। তখন টেলিভিশন ছিল সাদাকালো, সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টেলিভিশন চলতো। তখনকার হিসাবে রাত ১০টা ছিল অনেক রাত। ঢাকা শহরের বেশির ভাগ মানুষই ১০টার আগেই ঘুমিয়ে পড়তো।

সোমবার টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধ থাকতো। পরিবারের সবাই একত্রে বসে টেলিভিশন দেখতো। রিমোট নামের কোনো বস্তুর কথা কেউ জানতো না। কেননা তখন শুধু একটাই চ্যানেল ছিল, তাই চ্যানেল বদলানো কী জিনিস তা কেউ বুঝতো না। তখন ক্যাবল লাইন ছিল না। এন্টেনা নামের এক বিদঘুটে এলিয়েন টাইপ বস্তু ছিল। এন্টেনাটা ছাদের ওপর বাঁশ দিয়ে লাগানো থাকতো, যার বাঁশ যতো উঁচু তার ভিউ ততো ক্লিয়ার। সেখান থেকে ফিতার মতো তার এসে টিভি সেটের পেছনে যুক্ত হতো। বাতাসে বা ঝড়বৃষ্টিতে যখন ওই বাঁশ ঘুরে যেতো, তখন টিভি স্ক্রিন ঝিরঝির করতো আর সে সময় পরিবারের একজন সাহসী মানুষকে ছাদে পাঠানো হতো। বাসায় সাহসী মানুষের কোনো অভাব থাকতো না। সেদিনগুলোতে আমাদের বাসায় এমন কোনো দিন ছিল না যখন দু-চারজন থেকে কখনো কখনো আট-দশজন আত্মীয়স্বজন বা গ্রামের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর লোকজন আমাদের বাসায় থাকতো না। ছোটকাল থেকেই নাগরিক সফিস্টিকেশনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সগর্বে একটা ডাবল বেড আমাদের ড্রইংরুমে সব সময় শোভা পেতো। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, টেলিভিশন দেখা শেষ হলে কেউ না কেউ ড্রয়িংরুমে মশারির দড়ি নিয়ে ছোটাছুটি করছে মশারি টানিয়ে ঘুমানোর আয়োজন করার জন্য, আর কেউ কেউ আমাদের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমাচ্ছে। তখনকার দিনে এটা মোটামুটি স্বতঃসিদ্ধ ছিল যে গ্রাম বা মফস্বল থেকে এসে ভাই-বোনেরা বা ভাগনে-ভাইপোরা মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর তার ভাই, বোন ,মামা বা চাচার বাসায় থাকবে। বাসার  এইসব সাহসী মানুষদের থেকে একজন ছাদে উঠে নানা রকম কলাকৌশল করে বাঁশ এদিক-সেদিক ঘুরিয়ে ছাদ থেকে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতো,

‘হইছে?’

তখন বারান্দা থেকে কল্লা বের করে বাসার আরেকজন হয়তো বলতো,

‘পুরাপুরি হয় নাই, আর একটু বাম দিকে মোচড় দাও।’

একটু পরে ওপর থেকে আবার আওয়াজ আসতো,

‘এইবার হইছে?’

নিচে থেকে তখন কেউ উত্তর দিতো,

‘না, হয় নাই , আগের চাইতে খারাপ, এইবার ডান দিকে এক পোয়া মোচড় দাও।’

এভাবে ডান-বাম চলতো অনেকক্ষণ, ততক্ষণে ছাদে যে গেছে তার অবস্থা হয়তো কাহিল, সে হয়তো বৃষ্টিতে ভিজে ছ্যাড়াব্যাড়া হয়ে গেছে। এভাবে অনেক ট্রায়ল অ্যান্ড এররের পর একসময় হয়তো টিভির ঝিরঝিরি দূর হতো, স্ক্রিন আবার স্পষ্ট হয়ে আসতো। আর তা যখন না হতো, তখন তিন ব্যাটারির চায়নিজ টর্চ খোঁজা হতো, টর্চের ভেতর চান্দা মার্কা ব্যাটারি ঢুকিয়ে এবার সাধারণত আগেরজনের চেয়ে বয়স্ক ও অপেক্ষাকৃত সিরিয়াস আর একজন সাহসী মানুষ ছাদে গিয়ে এন্টেনায় টর্চ মেরে দেখতো বাতাসে তার ছিঁড়ে গেছে, ছেঁড়া তার আবিষ্কারে সে পুলকিত ও গর্বিত, ততক্ষণে পুরো ঘটনা দ্বিতীয় সাহসীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে , প্রথম সাহসী তার ব্যর্থতায় কিছুটা ম্রিয়মাণ। তখন অনেক হাঁকডাক করে বাঁশ নামানো হতো, তার জোড়া দেওয়া হতো, তাদের চাঙ্গা করতে কেতলিভর্তি চা বানানো হতো, একটা মজার পিকনিক ভাব চলে আসতো বাসার মধ্যে। যখন তার জোড়া দেওয়া হতো, বাঁশ আবার আগের মতো লাগানো হতো, ততক্ষণে হয়তো দেখা যেতো সে প্রোগ্রাম শেষ হয়ে গেছে অথবা টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেছে। সে ছিল এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার সময়, যা এখনকার প্রজন্মকে বোঝানো যাবে না।

২৮ এপ্রিল, ২০২১

আরও পড়ুন