কালীগঙ্গা নদীর পশ্চিম পারে অনেক গ্রাম। এগুলোর মধ্যে অন্যতম দারিদ্র্যপীড়িত গ্রাম হলো রাজারকাঠি। এই রাজারকাঠি গ্রামের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষটির নাম বোধ হয় আলম হাওলাদার। বাবা জয়নাল হাওলাদারের মৃত্যু হয় তার শৈশবে। তাই চরম দারিদ্র্যে নিমজ্জিত চার ভাই আর দুই বোনের তাদের এ সংসারের কোনো ভাই-বোনেরই পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি। কোনোক্রমে মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়তে পেরেছিল আলম। তারপর সেই শিশু বয়স থেকেই তার নির্মম জীবনসংগ্রামের শুরু, যা আজও একই রকম নির্মমভাবেই চলমান। বাবার মৃত্যুর পর আলমের মায়ের জায়গা হয়নি তাঁর স্বামীর ভিটায়। ছোট দুই ছেলেকে নিয়ে তাঁকে চলে যেতে হয় তাঁর বাপের বাড়ি নাজিরপুরে আর দুই বোনকে বাল্যবিবাহ দিয়ে কোনোক্রমে পার করে দেওয়া হয় দৃশ্যপট থেকে। শুধু এক ভাই যে আলমের কাছে থাকে সে পাগল।
আলম দিনমজুরের কাজ করে, যে ডাকে তারই কাজ সে করে দেয়। যখন কেউ ডাকে না তখন কালীগঙ্গা নদীতে মাছ ধরে, সেই মাছ সে দাউদপুর হাটে বিক্রি করে। আলমের স্ত্রী বিউটি বেগমও ইউনিয়ন পরিষদের রাস্তা বা মাটির কাজে দিনমজুরের কাজ করে। কাজটি একজন মহিলার জন্য অমানুষিক পরিশ্রমসাধ্য আর অমানবিকও। তবে সে কাজও সব সময় জোটে না, যখন সে কাজ জোটে না তখন বিউটি বেগম যে কাজ পায় তাই করে।
আলম আর ওর স্ত্রীর দুই মেয়ে। খুব আদর করে সুবাস ছড়ানো ফুলের নামে তাদের নাম রেখেছে ওরা জুঁই আর যূথী। বড়ো মেয়েটি ক্লাস টেনে পড়ে আর ছোট ফুটফুটে পরির মতো দেখতে মেয়েটি ক্লাস টুতে পড়ে। আলম তার নিজের জীবনের অসহনীয় দারিদ্র্য আর বঞ্চনার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছে পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তা। তাই হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও এখন পর্যন্ত সে তার দুই মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। কতো দিন চালিয়ে যেতে পারবে তা অবশ্য সে জানে না।
ওপরে পাখির বাসার মতো ছেঁড়া পলিথিন আর ভাঙা টিনের দোমড়ানো-মোচড়ানো ঝুপড়িটাই ওদের চারজনের ঘর, এই পৃথিবীতে ওদের একমাত্র ঠিকানা। হয়তো এ বর্ষায়ই এ ঘরটি ভেঙে পড়বে অথবা হয়তো ভাগ্য ভালো থাকলে আগামী বর্ষা পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে, কে জানে। ওদের চারজনের জন্য একটি মোটামুটি চলনসই ঘর তৈরি করে দিতে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা প্রয়োজন, যা আলমের মতো মানুষ সারা জীবনেও উপার্জন করতে পারবে না, যদি না বনে-জংগলে সে কোনো গুপ্তধন খুঁজে পায়।
তাহলে সে কী করবে?
এক পর্যায়ে আর সহ্য করতে না পেরে সে হয়তো এনজিও থেকে লোন নিয়ে ঘর বানাবে; কিন্তু তার জীবনেও সে এই উচ্চ চক্রবৃদ্ধির ঋণ শোধ করতে পারবে না। ঋণ পেয়াদাদের ভয়ে এক পর্যায়ে সে হয়তো দিনের বেলা পালিয়ে থাকবে কালীগঙ্গার ওপারে, গভীর রাতে বাড়ি ফিরবে। তারপর এনজিওদের তৎপরতা যখন আরো বেড়ে যাবে তখন তার প্রিয়তম স্ত্রী আর আদরের দুই কন্যাকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রেখে স্বরূপকাঠির বাওয়ালিদের সঙ্গে গোলপাতা কাটতে ফেরারি হয়ে চলে যাবে সুন্দরবনের গনিন কোনো অঞ্চলে।
আমরা অনেকে মিলে যদি অল্প অল্প অনুদান দিয়ে সম্মিলিতভাবে আলম, বিউটি, জুঁই আর যূথীর জন্য একটি ঘর বানিয়ে দিই, তাহলে এই পরিবারটি রক্ষা পায়। তাহলে হয়তো ওপরের গল্পটি অন্যভাবে লেখা যেতে পারে। গল্পটা এখন কোন দিকে যাবে তা অনেকটা হয়তো নির্ভর করছে আমাদের ওপর। ইচ্ছে করলে আমরা অনেকেই এ গল্পের মোড় ঘোরানো এক একটি চরিত্র হতে পারি। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা এ গল্পের একটি চরিত্র হতে চাই কি না?
১১ আগস্ট, ২০২২