আমার মতে মানব সভ্যতার সর্বপ্রথম শিল্প হচ্ছে রন্ধনশিল্প আর আমাদের সভ্যতার ইতিহাসে চীনারা খাবার নিয়ে যে অনন্যমাত্রার মহাবিচিত্র উদ্ভাবনী সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছে অন্য কোন জাতি তার ধারে কাছেও নেই। চীনে মোট ২২টি প্রদেশের ৯০% এরও বেশি হল হান জাতির মানুষ, বাকি আরো আছে তিব্বতি, মঙ্গোল, উইঘুর, ছুয়াং, মিয়াও, য়ি এবং আরও অনেক ছোট ছোট জাতি। এছাড়া এ ২২ প্রদেশের মধ্যেও সাংস্কৃতিক অনেক গ্রুপ ও সাবগ্রুপ আছে আর এদের সবারই আছে ভিন্ন ভিন্ন বিচিত্র সব রেসিপির প্রাচুর্যময় ইতিহাস।
তবে, সমস্যা একটা আছে, একজন মুসলিম হিসেবে ইচ্ছে করলেই দোকানের সামনে খাচায় সাজানো অসংখ্য জ্যান্ত প্রাণী, জ্যান্ত মাছ বা শরিসৃপ থেকে বেছে নিয়ে সাথেসাথেই বলা যাবে না,
মামা, এইটা এইটা এখনই হলুদ, মরিচ,সয়াসস, গোল মরিচ, লাল মরিচ আর আপনাদের গুপ্ত সব পারিবারিক মসলা দিয়া রাইন্ধা দেন।
কেননা, আমাদের জন্য হালাল আর হারামের একটা প্রশ্ন থাকে। এছাড়া মনে হতে পারে শুধু স্টিমড ফিস বা সাথে লাল টকটকে মরিচ দিয়া ভাজা সবুজ বিন তো নিরাপদ মুসলিম ফুড হিসেবে খাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু না, এতোও ঝামেলা আছে, এদের রান্নার একটা সাধারণ উপাদানই হচ্ছে পর্ক অয়েল, অর্থাৎ শুকরের চর্বির তেল। তাই দেখতে নিরিহ হালাল খবার মনে হলেও তার মধ্যে অত্যন্ত পরিত্যায্য শুকরের উপাদানের উপস্থিতির সম্ভাবনা উচ্চমাত্রার।
প্রথমত চেষ্টা করি চীনা বন্ধুদের নিয়ে খেতে যেতে, তা হলে ওরা ওদের আগেভাগে ভালো করে বুঝিয়ে দেয় পর্ক অয়েল না দিতে, পাত্র ধুয়ে নিতে আর আমাদের হালাল প্যারামিটারের মধ্যে রেসিপি সিলেক্ট করতে। কিন্তু সব সময় তো হাতের কাছে চীনা বন্ধু থাকে না তখন গুয়াংজু শহর হলে আরব বা টার্কিশ খাবার খেতে চাইলে চলে যাই ই শা-বে-লুতে। ইংরেজিতে লেখে Xiaobei Lu, Xiao অর্থ ছোট আর Bei অর্থ উত্তর। অর্থাৎ শা-বে-লু মানে উত্তরের ছোট সড়ক। গুয়াংজু শহরের শা-বে-লু হচ্ছে আরব ও আফ্রিকান ব্যবসায়ী, ছাত্র এবং পর্যটকদের জবরদস্ত ঘাঁটি। পুরো এলাকার রাস্তাজুড়ে বিভিন্ন হালাল রেস্তোরাঁ, আরব কাবাব, শাওয়ারমা, সোমালি–নাইজেরিয়ান খাবারের দোকান ছড়ানো। অনেক এলাকায় আরবি ভাষায় সাইনবোর্ডসহ সুগন্ধি, পোশাক ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দোকানও রয়েছে। সন্ধ্যার পর এলাকাটা প্রচণ্ড প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, শীশা ক্যাফে, ছোট আরবিক চা ও কফি শপ ও নাইট স্ন্যাকের স্টলগুলো লোকেলোকারণ্য হয়ে ওঠে।
কিন্তু চীন দেশে এসে আরব দেশের খাবার খাওয়ার কোন মানে হয় না, খেতে চাই চীনা হালাল খাবার আর তখনই খুঁজে খুঁজে শিনঝিয়াংয়ের উইঘুর রেস্তোরাঁ গুলোয় হানা দেই। সত্যি কথা বলতে গেলে চীনের হোটেল সিলেক্ট করার সময়ই নিশ্চিত করে নেই আশেপাশে ৫/১০ মিনিট হাটা পথের মধ্যে মুসলিম রেস্টুরেন্ট আছে কিনা। চীনের পশ্চিম সীমান্ত এলাকার তিব্বত মালভূমির পশ্চিমে এ প্রদেশটি হলো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। এদেরকে প্রধানত একটা তুর্কী উপজাতি বা নৃতাত্ত্বিক গ্রুপ বলা যায়। এদের সাথে খিরগিস্তান, কাজাকিস্তান, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া ও ভারতেরও সীমান্ত আছে। এছাড়া এখানে সিল্করুটের বিখ্যাত মেল্টিং পট কাশগর শহর অবস্থিত এখানে অবস্থিত, এ কাশগরের সাথে পাকিস্তানের স্ট্রেটেজিক ভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ সরু একটি সীমান্ত হাইওয়ে আছে। বিপদসংকুল কারাকোরাম পর্বতশ্রেণীর উপর দিয়ে একটি সড়কটি যুক্ত করেছে এ দুই দেশকে।
গত দুইদিন চীনা বন্ধুদের সাথে সেদ্ধ, পাতি সেদ্ধ বা অতি সেদ্ধ নানান পদের চীনা ডিশ খাবার পর, ঠিক করলাম আজ রাতে উইঘুর কাবাব রেস্তোরাঁয় খেতে যেতে হবে। স্বাদের কিছুটা ভিন্নতা দরকার। আমার হোটেল থেকে ৫/৭ মিনিট হাটলেই গুয়াঞ্জুর পুরনো রেল স্টেশনের দক্ষিণ-পশ্চিমে Zhanqian Heng রোডের আশেপাশের কয়েকটি রাস্তায় এই উইঘুর, উজবেক, তাজিক, খিরগিজ, আজারবাইজানী, তুর্কেমিনিস্তানী সহ তাবৎ মধ্য এশিয়ানদের আড্ডা। সাথে আছে লম্বা লম্বা রাশান আর দাগিস্থানি আর দাড়িওয়ালা চেচেন। তবে এরা যেহেতু প্রায় ৭০ বছর সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিলো সে কারণে এরা সবাই রুশ ভাষা বোঝে তাই এ পাড়াগুলোর সব সাইনবোর্ডই রুশ ভাষায় লেখা।রেস্তোরাঁর বাইরে দুই উইঘুর যুবক সমানে কাবাব বানাচ্ছে। তাদের বিপরীতে আছে থরে থরে সাজানো ধাতব শিকে বা কাঠের কাঠিতে সাজিয়ে রাখা অসংখ্য
টাইপের টুকরো টুকরো মাংস। মাংসের মধ্যে পাবেন ল্যাম্ব, বিফ, মাটন, চিকেন, কবুতর, মুরগীর চার আংগুল সহ শুধু ঠ্যাং, কলিজা, গিলা, কিডনি, চর্বি, নাড়ি ভুঁড়ি, গরু ও খাসির জিহ্বাসহ আরো বহু জিনিস , তবে এক বিফ বা ল্যাম্বের মধ্যেই পাবেন সবচেয়ে বেশি ভ্যারাইটি। সাধারণত এগুলো জিরা, মরিচ, লবণ দিয়ে সিজন করা থাকে। মধ্য এশিয়ার কাবাবে জিরার গুড়ার স্বাধের উপস্থিতি খুবই প্রকট। জিড়ার গন্ধের মাধ্যমেই মধ্য এশিয়ার কাবাব তার উপস্থিতি জানান দেয়।
শরীরের এক অংশের মাংস একরকম এবং মাংস কাটার নানা রকম পদ্ধতির কারণের টেস্ট পরিবর্তিত হয়ে যায়। একই গরুর মাংসের ফাইবারকে আড়াআড়ি পাতলা স্লাইস করলে স্বাদ একরকম আর ফাইবারের সমান্তরালে স্লাইস করলে স্বাদ একদম ভিন্নতর। ল্যাম্বের টি-বোনের স্বাদ একরকম আর আবার রানের মাংসের টুকরার স্বাদ অন্যরকম। এছাড়া সাজানো আছে নানান পদের মাশরুম, যেমন, শিটাকে (Shiitake) মাশরুম, অয়েস্টার মাশরুম (Oyster Mushroom), এনোকি (Enoki Mushroom) মাশরুম, বাটন মাশরুম (Button Mushroom)। আমার পছন্দ এনোকি মাশরুম। এক বান্ডেল লম্বা ম্যাচের কাঠির মতো দেখতে এ মাশরুমের ক্রাঞ্চি স্বাদ দারুন। আর আছে কিছু মাছ। মধ্য এশিয়দের রেস্তোরাঁয় মাছ খাওয়া আর নিরামিষাশীর ঘরে মুরগী মসাল্লাম খেতে চাওয়া একই মাত্রার বোকামি, গ্রামে যাকে বলে, শুধু রাম বলদেরা দুধ নেই ঘরে, চিনি-পাতা দই খোঁজে। আমিও তাই উইঘুর রেস্তোরাঁয় সবসময় মাছ এড়িয়ে চলি।
খাবার অর্ডার দেয়ার এখানে অনেক ঝক্কি আছে। রেস্তোরাঁর ঢোকার আগেই আপনাকে একটা বিরাট বাস্কেট ধরিয়ে দেয়া হবে। আপনি ইচ্ছে মতো শিকে গাঁথা কাচা মাংস, মাশরুম বা অন্য যা পছন্দ তাতে তুলতে থাকবেন। আমি প্রথমেই তুলে নিলাম, শিনঝিয়াংয়ের আদিগন্ত তৃনভূমিতে বেড়ে ওঠা ল্যাম্বের টি-বোন। মঙ্গোলিয়া ও মধ্য এশিয়া সংলগ্ন অঞ্চলের প্রাকৃতিক তৃণভূমিতে বেড়ে ওঠা ল্যাম্বের মাংসের স্বাদ পৃথিবীর অন্য কোথাও মিলবে না। তারপর নিলাম বোনলেস মাটন বটি কাবাবের একটা শিক, তবে এদের বটির সাইজ আমাদের থেকে ছোট আর অনেক বেশি চর্বি মিশ্রিত। একটি চিকেন শিক, একটা গরুর পেছনের পায়ের মাংসের শিক, দুটো ইনোকি মাশরুমের বান্ডেল।
আপাতত এইটুকু নিয়ে পুরো বাস্কেটটি ইয়া লম্বা এক ব্যস্ত টুপিওয়ালা উইঘুর যুবকের কাছে জমা দিলাম। তার পাশেই আর দুই যুবক মাথায় টুপি দিয়ে সমানে হরে কম্বিনেশনের স্পাইস দিয়ে কাবাব বারবিকিউ করে যাচ্ছে। এখানে কর্মরত অমুসলিম ছেলেরাও টুপি পড়ে আর অমুসলিম মেয়েরা পরে হিজাব।
উইঘুর যুবক ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল,
ভেলি স্পাইসি অল লো স্পাইসি?
( ওরা র উচ্চারণ করতে পারে না, তাই ভেরি হয়ে যায় ভেলি, অর হয় অল)
গুরুজনের সব সময় বলতেন এবং ধর্মগ্রন্থেও পড়েছি, মধ্যপথই শ্রেষ্ঠ পথ, তাই আমি বললাম,
মিডিয়াম স্পাইসি এন্ড ওয়ান ব্রেড।
এই উইঘুর গোল রুটিকে ওরা বলে, নাং। হতে পারে এই নাং শব্দটির টি থেকেই নান রুটি শব্দটি এসেছে, কেননা মোগলাই খাবার বলতে আমরা যেগুলো চিনি এগুলো আসলে মোগলদের আবিষ্কার নয়, মগলদের একদম নিজস্ব মৌলিক কোন খাবার ছিল না।মুঘলদের সব খাবারই মধ্য এশিয়া,পারস্য এবং তুরস্ক থেকে আনা। ইনফ্যাক্ট মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবুর ভারতীয় কোন খাবরই পছন্দ করতেন না। ভারতে তার পছন্দের মাত্র দুটি খাবার ছিল, একটি আম আর অন্যটি তরমুজ। বাবুর সবসময় কাবুল, সমরখন্দ, বোখারার আর তার জন্মভূমি ফারগানার খাবারের জন্য আফসোস করতেন। যা হোক, উইঘুর রুটির কথায় ফিরে আসি, এগুলো সব মাটির তন্দুরে ধীরে বেক করা হয়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস হচ্ছে রুটির মাঝখানে কারুকার্যময় নকশা। এই নকশার জ্যামিতিক ছাপ যেন এদের হাজার বছরের সংস্কৃতির নিঃশব্দ স্বাক্ষর। সোনালী রঙের রুটিগুলো চার ধারে শক্ত আর ভেতরে নরম, অনেকটা আমার নিজের চরিত্রের মত। সারা রুটিতে এলোমেলো ভাবে তিল ছড়ানো, যার গায়ে মাখা প্রাচীন সিল্ক রুটের নিজস্ব ঘ্রাণ। প্রতিটি কামড়ে কামড়ে যেন শিনজিয়াংয়ের উষ্ণতা আর ইতিহাসের স্বাদ।
সবকিছু রেডি করে যখন খাবার সামনে দেয়া হল একটি রুটিসহ তখন দেখলাম রুটির চেহারা কিছুটা বদলে গেছে। কেননা রুটির উপর তখন দেয়া হয়েছে অনেক রকম মসলা, লাল মরিচের গুঁড়ো সাথে তাদের সেই সিগনেচার আইটেম, জিরার গুড়ো। কাউন্টারে যে নিরীহ রুটিটি দেখেছিলাম সেটি এখন বেশ স্পাইসি আর লাল টসটসে। খেতে শুরু করার সময় দেখলাম আমার টেবিলে এক ইয়া লম্বা এক ইরানি লোক এসে বসেছে, তার অর্ডারও দেখলাম মোটামুটি আমার মত শুধু মাশরুমের অনুপস্থিতি। এছাড়া দেখলাম কিছু অরিজিনাল চাইনিজ তারাও গোগ্রাসে খাচ্ছে। ইরানি যুবক বলল এরা সবাই ঝাল উইঘুর খাবার খায় মদের নেশা বাড়ানোর জন্য। ঝাল খাবার খেলে নাকি মদ খেয়ে আনন্দ বেশি। পাশের টেবিলে বসা ছিল আমার মতোই হালাল খাবার খেতে আসা মাঝ বয়সী এক ইন্দোনেশিয় দম্পতি। তারা বলল, ইস্ট লন্ডনে যেসব বাংলাদেশী ও ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে সেখানেও বহু ব্রিটিশ মদ্যপায়ী ভিড় করে শুধু এই একই কারণে। ইরানি আর ইন্দোনেশিয়র কাছ থেকে জ্ঞান নিয়ে বেশ সমৃদ্ধ হলাম, জগতের কত কিছুই যে জানার বাকি।
খেতে বসে দেখলাম সবকিছুতেই হালকা ঝাল আর জিরার গন্ধ, এমনকি রুটি তেও একই স্বাদ। খেতে কিন্তু ভয়ঙ্কর ভালো লাগছে। পটাপট খেতে শুরু করলাম। কিন্তু একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করলাম নিজের মধ্যেই, খেতে আসলাম মাংস কিন্তু সবচেয়ে ভালো লাগছে ইনোকি মাশরুমের বারবিকিউ। বাধ্য হয়ে আরো দুই বন্ডল ইনোকি মাশরুম শোকেস থেকে বের করে ঝুড়িতে ভরে উইঘুর যুবকের কাছে দিলাম তাড়াতাড়ি বারবিকিউ করে দেয়ার জন্য।
খেতে খেতে দেখলাম পেটের মধ্যে ঝালের তেজ বেশ জড়ালো হচ্ছে আস্তে আস্তে। বাধ্য হয়ে একটা ঠান্ডা জিরো কোক নিলাম, তবে একটা জিনিস আমাকে ভাবিয়ে তুলল, কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করে ১৪৯২ সালে, কিন্তু আমেরিকা আবিষ্কারের আগে সারা পৃথিবীর মানুষ মরিচ চিনত না। আলু, আনারস, টমেটো, অ্যাভোকাডো, পেপে এসবও চিনতো না। এসব না হয় বাদ দিলাম, কিন্তু ৬০০ বছর আগে মরিচের অনুপস্থিতিতে এ ব্যাটারা খাবারে এত ঝাল তৈরি করতো কি দিয়ে?
খাওয়া শেষ করে যখন হাঁটতে হাঁটতে হোটেলের দিকে যাচ্ছি, রাত তখন বাজে প্রায় সাড়ে বারোটা, পুরোটা রাস্তা গমগম করছে তখনো, মনে হচ্ছে চীন দেশ নয়,যেন মধ্য এশিয়ার কোন শহরে আমি। সারা শরীরে একটা তৃপ্তির স্বাদ, কিন্তু প্রবল স্পাইসের কারণে পেট টা কেমন গরম গরম লাগছে। ঝাল স্পাইসের ফাইনাল জানার জন্য আগামীকাল সকালের প্রাতঃক্রিয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বোঝা যাবে সিল্ক রুট কতটুকু নিজের মধ্যে নিতে পেরেছি আর কতটুকু বের করে দিতে হচ্ছে।
এই গমগম করা মধ্য এশিয়ার আবহ সমৃদ্ধ চত্বর ছেড়ে হোটেলে যেতে ইচ্ছে করছিল না। এখান থেকে আমার হোটেল ৮ থেকে ১০ মিনিট হাটার পথ। ভাবলাম, বরং আরো কিছুক্ষণ এদের আনন্দ আমিও উপভোগ করি। এত রাতেও পুরো রাস্তা মানুষ ঘোরাঘুরি করছে। কেউ কেউ পা লম্বা করে বসে বসে চুরুট টানছে। পাশে টার্কিশ ক্যাফের আউটডোর সিটিংয়ে বসে বহু লোক কফি খাচ্ছে আর গল্প করছে। কয়েকজনকে দেখলাম খুব নিবিষ্ট মনে দাবা খেলছে। শিশুরা এদিকে দুঃখটা ছুটি করছে। হিজাব পরা মায়েরা আশেপাশের দোকান থেকে এটা সেটা কিনছে। এখানে সবচেয়ে যেটা বেশি বিক্রি হয় সেটা হল বেআইনি ভিপিএন। এক মাসের জন্য একটা ভিপিএন নিতে ৩০ আরএমবি লাগে, বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় সাড়ে পাচশ টাকার কিছু বেশি। ভিপিএন না থাকলে চীন সীমন্তের মধ্যে ফেসবুক বা ওয়াটসঅ্যাপ কাজ করে না, গুগলও কাজ করে না। Google এর জন্য ওদের বিকল্প হল Baidu, WhatsApp বিকল্প WeChat আর ফেসবুকের কাছাকাছি হচ্ছে Weibo, এছাড়া এখানে আরো দুটি জিনিস আছে যা মুসলিম এলাকা বাদে চীনের অন্য কোন জায়গায় মিলবে না, তার একটি হচ্ছে বেআইনি মানি চেঞ্জার। একটা ব্যাগ হাতে হিজাব পরা উইঘুর মহিলারা বসে থাকে, তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে এমন একটা বিচিত্র কিছু থাকে যে দেখলেই বুঝা যায় যে এরা মানি চেঞ্জার। এরা ডলার ভাঙ্গিয়ে চাইনিজ কারেন্সি করেদেয় এবং তাদের দেয়া কারেন্সিগুলো যে নকল নয় তার গ্যারান্টি হিসেবে প্রত্যেকটি নোটে তাদের নির্দিষ্ট পিচ্চি সাইজের গোল সিল মেরে দেয়। আর একটা জিনিস হলো ভিক্ষুক। সারা চীনে মুসলিম এলাকা বাদে আমি আর কোথাও কোন ভিক্ষুক দেখিনি। এবার এমন একজন মর্ডান ভিক্ষুক দেখলাম, যার সামনে টাকা পয়সা নেয়ার কোন ভান্ড নেই, আছে দুটো কিউআর কোড প্রিন্ট করা ছোট প্ল্যাকার্ড। যারা যারা দান করতে চাচ্ছে তাকে ডিজিটালি দান করে যাচ্ছে। সারা পৃথিবীর অতি দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আসছে, এরাই বা আসবে না কেন।
মুসলিম ভিক্ষুকদের ব্যাপারে আরেকটা গল্প বলি, বহুদিন আগে চীনে আমি এক কেন্দ্রীয় মসজিদে জুম্মার নামাজের পর কিছু ইয়া তাগড়া তাগড়া বিশাল শরীরের আফ্রিকান ভিক্ষুক দেখেছিলাম, যাদের ছবি তোলার কারণে তারা আমাকে তেড়ে এসে মারতে চেয়েছিল। তাদের তাড়া খেয়ে, মসজিদ চত্বর থেকে আমি এক চীনা বন্ধুর সহায়তায় দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলাম। সে বন্ধুটা পরে আমাকে বলেছিল, ওই আফ্রিকান ভিক্ষুকদের মধ্যে অনেকেই দেশে ভালো ব্যবসা বা চাকরি করে, পার্ট টাইম কাজ হিসেবে এরা মসজিদের সামনে ভিক্ষা করে, সে কারণে তারা ভয় পায় তাদের ভিক্ষাবৃত্তির ছবি কোনভাবে যদি সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে দেশে চলে যায় তাহলে তাদের জন্য সেটা খুব সম্মানহানীকর হবে। সেকারণেই তারা আমাকে ধোলাই দিতে চেয়েছিল।
এমন জমজমাট পরিবেশের মধ্যে একটা লম্বা ব্ল্যাক ডায়মন্ড গ্রানাইটের পাবলিক বেঞ্চে আমি বসলাম, হাতে তখনো সেই জিরো কোকের অর্ধেক ভর্তি ক্যান। আমি এখন একজন নিবিষ্ট অবজারভার,
আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ
খেলে যায় রৌদ্র ছায়া, বর্ষা আসে বসন্ত।
কারা এই সমুখ দিয়ে আসে যায় খবর নিয়ে,
খুশি রই আপন মনে, বাতাস বহে সুমন্দ।
বেঞ্চের সামনে কয়েক উইঘুর বৃদ্ধ তরমুজ আর আনারের জুস বিক্রি করছে। পাশেই এক যুবক বিক্রি করছে আখের রস। পাশের দোকানেই উইঘুর বুড়ো-বুড়ি বিক্রি করছে ওদের ঐতিহ্যবাহী দুধ-চা, ওরা বলে Nang Tea. বামদিকে দেখলাম রাস্তার মোড়ে তিন-চার জন উইঘুর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা নানান রকমের বাদাম আর শুকনো ফল বিক্রি করছে। তাদের প্রত্যেকটি অস্থায়ী ট্রলির উপর বিশাল স্তুপ করা আখরোট, বাদাম, পিস্তাচিও, হ্যাজেলনাট, পাইন নাট, চিনাবাদাম, এপ্রিকট সাজানো। বাদাম বিক্রেতাদের মধ্যে লাল গাউন পরা এক বৃদ্ধা দেখলাম আমার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন পরিচিতের হাসি দিচ্ছে। আমি কিছুটা অবাক হলাম, উইঘুর কোন মানুষকে তো আমি চিনি না, উনি এত পরিচিতের হাসি দিচ্ছেন কেন, যদিও আমার চেহারার মধ্যে একটা মঙ্গোলয়েড ভাব আছে। হাসি দিয়েই তিনি থামলেন না, দেখলাম তিনি আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। এসে হাত-পা নাড়িয়ে চাড়িয়ে যা বললেন তার অর্থ হচ্ছে,
তুমি যে আধ খাওয়া ক্যান কোকটা রেখেছো, সেটা আমাকে দিলে আমি খেতাম।
বৃদ্ধার আকস্মিক এ আচরণে আমি কিছুটা বিস্মিত হয়ে গেলাম , সাথে সাথে আমি কোকটা তার হাতে তুলে দিলাম। বৃদ্ধা দুইবার মাথা নত করে শি-শিয়ে, শি-শিয়ে বলে কোকের ক্যান টা নিয়ে আবার তার বাদামের ট্রলির পেছনে চলে গেল। কিছুক্ষণ এভাবে বসে থেকে পথ চাওয়ার আনন্দ উপভোগ করে একপর্যায়ে আমি হোটেলের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলাম। সামান্য হেটেই পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি বৃদ্ধা আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন, হাসির ফাঁকে তার ফোকলা দাঁত দেখা যাচ্ছে । তখনো তার ঠোঁটের কাছে ধরা আমার সেই জিরো কোকের ক্যান। তার বাদামের ট্রলিতে না হলেও চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকার মালামাল আছে। তারপরও তিনি আমার কাছ থেকে অর্ধেক ক্যান কোকটা কেন নিলেন, আমি বুঝতে চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। জগত বড়ই রহস্যময়।
২১ এপ্রিল, ২০২৬
গুয়াংজু, চীন
