কায়রোতে হযরত হুসাইনের মস্তক সমাধি
ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম পণ্ডিতদের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর হচ্ছে মোহাম্মদ সাঃ এর ইন্তেকালের পরের সময়কালের মুসলিমদের নিজেরদের মধ্যে নানা রকম অন্তর্ঘাত, যুদ্ধ, গুপ্ত হত্যা ও রাসুল সাঃ এর শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত দীর্ঘ ভাতৃঘাতী রক্তাক্ত কলহের বিষয়টি নিয়ে একাডেমিক আলোচনা করা। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি বেশিরভাগ পণ্ডিতরাই চান এ সময়কালের ঘটনাবহুল বিষয়গুলো কোন না কোন ভাবে এড়িয়ে চলতে। ইসলামের ইতিহাসে কারবালার যুদ্ধ ও ইমাম হোসেনকে হত্যা এমনই এক বেদনাবিধুর ও অস্বস্তিকর অধ্যায় কেননা যুদ্ধের উওভই পক্ষেই ছিলেন সাহাবিরা। এ যুদ্ধের পর তাঁর পবিত্র দেহ থেকে তাঁর মাথা চরম নিষ্ঠুরতার সাথে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিলো, ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণ ভাবে প্রমাণিত না হলেও বলা হয়ে থাকে, সেই মাথাটিই পরবর্তীতে কায়রোতে এনে সমাহিত করা হয়। যদিও তাঁর মূল কবর ইরাকের কারবালায়, মিসরের বহু মানুষ, বিশেষ করে শিয়া মুসলিমদের কাছে কায়রোর এ মাজার খুবই সম্মানের স্থান ও সারা পৃথিবী থেকে আসা মুসলিমদের একটি আবেগ সম্বৃদ্ধ ‘আধ্যাত্মিক’ মিলন কেন্দ্র।
প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ বছরের পুরনো কায়রোর বিখ্যাত খান আল খালিলি বাজারের পাশেই অনন্য স্থাপত্যশৈলী ও অসাধারণ ইসলামী শিল্প, কারুকাজ এবং সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ হুসেইন মসজিদের ভিতরেই ইমাম হোসেনের এ মাজার। বিখ্যাত ফাতেমীয় খিলাফতের আমলেই এই মাজার নির্মিত হয়। ফাতেমীরা শিয়া মতালম্বী ছিলেন এবং শুধু তাই ই না ফাতেমীরা রক্ত ধারার দিক দিয়ে ইমাম হুসেইনের বংশধর ছিলেন, একারণে তারা ইমাম হুসেইনের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে এ মাজার নির্মাণ করেন। ফাতেমীয়দের কাছে ও এখন পর্যন্ত বিশেষভাবে শিয়াদের কাছে এ মাজার শুধু একটি ধর্মীয় স্থানই নয়, বরং ইতিহাস, বিশ্বাস ও ভালোবাসার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক যদিও বর্তমান মিশরের মুসলিমদের মধ্যে ৯০ শতাংশই হচ্ছে শাফি মাঝহাবের অনুসারী সুন্নি মুসলিম আর শিয়ারা জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশের কাছাকাছি। তবে শুধু ভালোবাসা বা আবেগ নয় ,অনেক পণ্ডিতরাই মনে করেন যে এ মাজারটির অবস্থান বা এ মাজারেকে কেন্দ্র করে যে কিম্বদন্তি ছড়িয়ে আছে তা ফাতেমীয় শাসকদের কাছে যতোটা না আবেগের ব্যাপার তার চেয়ে এটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রিয় ক্ষমতার রসায়নের ব্যাপার।
সুন্নিদের কাছে আহলে বাইত অর্থাৎ রাসুল সাঃ এর বংশধর বা নিজের ঘরের সদস্য হবার কারণে হজরত হুসাইনের বিশাল মর্যাদা ও ভালবাসা রয়েছে যদিও সুন্নিরা শিয়াদের মতো তাঁকে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী বা শিয়াদের মতো একই রকম ইমাম হিসেবে মনে করে না। আশুরার চল্লিশ দিন পর আরবাঈন নামে হযরত হুসাইনের কারবালার মাজারে দু’কোটির বেশি মানুষ সমাগম হয় ,সে তুলনায় কায়রোর এ মাজারে আশুরা পরবর্তী সময়ে ভক্তদের সমাগম সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম, তবে কম হলেও এখানে বিশাল সংখ্যক শিয়া ভক্ত জমায়েত হয় এমনকি ২০১৬ সালে মিশর সরকার মাজার প্রাঙ্গনে জনসমাগম নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলো।
তবে ইমাম হুসাইনের মস্তকের এ কাহিনী ও ইতিহাস নিয়ে কিন্তু ইসলামী ঐতিহাসিকদের মধ্যে দু’টো মত প্রচলিত আছে। সেটা হচ্ছে,
আগেই উল্লেখ করেছি ৬১ হিজরি বা ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে ইমাম হুসাইন (আ.) মহররম মাসে কারবালায় ইয়াজিদের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বাধ্য হন এবং এক পর্যায়ে আশুরার দিনে অর্থাৎ ১০ই মহররমের দিন ৭২ জন সঙ্গী সহ শাহাদত বরণ করেন। তখন তাঁর মাথা অতি নিষ্ঠুরতার সাথে তাঁর দেহ থেকে কেটে বিচ্ছিন্ন করে ইয়াজিদের নির্দেশে কুফা এবং পরে দামেস্কে পাঠানো হয়। সেখানে উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদের দরবারে ইমাম হুসাইনে আঃ মাথা তার কাছে উপস্থাপন করা হয়। এভাবে কয়েক দিন দামেস্কে রেখে দেয়া হয়। এ পর্যায়ে একটি মত হচ্ছে ইয়াজিদ এক পর্যায়ে কিছুটা অনুতপ্ত হয়ে তাঁর মস্তক কারবালায় পাঠিয়ে দেন আর অন্য আরেকটি মত হচ্ছে ইমাম জয়নুল আবেদীন আ. অথবা অন্য কোনো বিশ্বস্ত অনুসারী ওনার মাথা কারবালায় নিয়ে যান এবং সেখানে তাঁর দেহের সঙ্গে পুনরায় সমাহিত করেন।
দ্বিতীয় মতটি হচ্ছে, ৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ ৩৬৫ হিজরিতে ফাতেমীয় শাসক আল-মুইজ ওনার মাথা দামেস্ক থেকে গোপনে কায়রো নিয়ে আসেন ও কায়রোর “মসজিদ আল-হুসাইন” তা সমাহিত করেন। এ মতের বিশ্বাসীরা বিশ্বাস করেন, এই মসজিদেই ইমাম হুসাইনের আ. পবিত্র মাথা রয়েছে এবং এ কারণে এই স্থানটিকে পবিত্র ও অলৌকিক শক্তির কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচনা করে তারা।
গত ৫ এপ্রিল সপরিবারে গিয়েছিলাম এ মসজিদ ও মাজারে। আগেই বলেছি অত্যন্ত ব্যস্ত ও কলাহল মুখর প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো বাজার, ক্যাফে ও রেস্ট্যুরেন্টে পরিপূর্ণ এলাকার পাশেই এর অবস্থান এবং কাছেই বড় রাস্তা পার হলেই বিখ্যাত ও বিশাল সাদা পাথরের কোর্টইয়ার্ডযুক্ত আল আজহার মসজিদ। ৯৭০ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয় আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, তুলনামূলক বিচারে সেকারণে কায়রোর এ আল আজহার ইউরোপের প্রধান প্রাধান শিক্ষাপীঠদের চেয়েও অনেক প্রাচীন, কেননা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১০৯৬ খ্রিস্টাব্দে আর কেম্ব্রিজ ১২০৯ খ্রিস্টাব্দে।
হুসেইন মসজিদের বিপরীতেই সরু গলির ভিতর বিশাল অজু আর টয়লেট বিল্ডিং। সেখান থেকে সবাই অজু করে মসজিদের বিশাল গেট দরোয়াজা পাড় হয়ে হয়ে মসজিদের ভেতরে ঢুকলাম। গেটে দেখলাম লম্বা আরবি গালাবিয়া পরা ও চেক ডিজাইনের কুফিয়া মাথায় দিয়ে এক বৃদ্ধ পাহারাদার চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছে আর তার পাশে স্থানীয় কয়েকজন বৃদ্ধ বসে বসে টানা গল্প গুজব করে যাচ্ছে যদিও গল্পগুজবের মাঝেই তাদের ডান হাতে তজবি গোনা চলছে একই তালে।
মসজিদে ঢুকেই এর বিশালত্ব অনুভব করা যায়। মসজিদের মেঝে সুন্দর হালকা সাদা এবং সবুজ রঙের ফ্লোরাল ডিজাইনের মিশরীয় কার্পেটে মোড়ানো। সারিবদ্ধ গলাকার থামের উপর সারিবদ্ধ অসংখ্য গম্বুজে দিয়ে মসজিদের ছাদ তৈরি হয়েছে। নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে দিয়ে গম্বুজের মাঝে বিশাল বিশাল ঝারবাতি বসানো। মসজিদের ছোট্ট মিম্বরটি নানা রঙের পাথরের সমাবেশ ঘটিয়ে অত্যন্ত সুন্দর ক্যালিগ্রাফি এবং কারুকার্যময় ভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। অত্যাধিক রঙের পাথরের ব্যবহারের পরেও ডিজাইনটা বেশ পরিমিত মনে হয়েছে আমার কাছে। আমরা যখন ঢুকেছি তখন জোহরের জামাত শেষ হয়ে গেছে । মসজিদে মুসল্লি অনেক কম, তার মধ্যেই অনেককে দেখেছি বিশ্রাম নিচ্ছে, কেউ কেউ বিশ্রাম নিতে নিতে মসজিদের সাদা মার্বেলের গোলাকার থামের সাথে হেলান দিয়ে ঘুমিয়েই পড়েছে, শিশুরা দৌড়াদৌড়ি করছে। জামাতের পরে মসজিদের অভ্যন্তরকে মনে হয়েছে যেনো জনসমাগম পূর্ণ একটি পরিশীলিত ও পবিত্র আরবান স্পেস।
বিশাল হুসেইন মসজিদের ভিতর মেহরাবের পেছন দিকে মাঝারি আকারের মাজার কক্ষ। মসজিদ থেকে মাজারে ঢোকার পথে বিশাল ধাতব কারুকার্য খচিত একজোড়া পুরু কালো কাঠের দরজা। মাজারের মেঝেতে খুব ঘন কারুকার্যময় নানা বর্ণের মার্বেলের কাজ। মার্বেলের মধ্যে হলুদ, খয়েরি সহ বিভিন্ন বিরল রঙের পাথরের সমাহার। মেঝের ডিজাইনকে অতিরিক্ত বা ইংরেজিতে যাকে বলে ওভার ডিজাইন বলে মনে হয়েছে। দরোজার ওপারের মসজিদের মধ্যে যে একটা সিমপ্লিসিটির আবহ ছিলো এখানে সেটা অনুপস্থিত। অতিরিক্ত ভক্তিতে অনেক সময় ডিজাইন তার সিমপ্লিসিটি হারিয়ে ফেলে মাত্রাতিরিক্ত জটিল হয়ে ওঠে। মাজার স্পেসের মাঝখানে খুব নিঁখুত কারুকাজের ধাতব রূপালি ও সোনালি গ্রিল দিয়ে কবরটি ঘেরেয়া। কবর ঘিরে থাকা এ গ্রিলের ডিজাইনটি মদিনার রাসুল সাঃ রওজার গ্রিলের প্রায় অনুরূপ ডিজাইনের। এভাবে প্রায় একই ডিজাইন করারও নিশ্চই কোন প্রতীকী কারণ আছে।
কবরের উপরে বিশাল গম্বুজের খুবই ঘন কারুকার্যময় ক্যালিগ্রাফি সমৃদ্ধ বিশাল বক্র তলদেশ দেখা যাচ্ছে, তার নিচে ঝুলছে বিশাল বৃত্তাকার দুই সারির ঝাড়বাতি। যতোদূর জানি রাসূল সাঃ তার মৃত্যুর আগে খুব কঠোরভাবে সাহাবীদের বলে গিয়েছিলেন কবরের উপর যেন গম্বুজ না বানানো হয়। যদিও রসুলের নিজের রওজার উপরই অটোমান রাজত্বের সময় বিশাল সবুজ গম্বুজ বানানো হয়েছে। ওহাবীরা কবরের উপরে গম্বুজ বানানোর ঘোর বিরোধী, এ কারণেই বর্তমান সৌদি আরবের ক্ষমতাসীন ওহাবীরা আগের সব কবরের উপর থেকে গম্বুজ ভেঙে ফেলেছেন। তুর্কীদের শক্ত অবস্থানের কারণে বর্তমান মদিনার সবুজ গম্বুজ টি তারা এখনো ভাঙতে পারেননি।
যাই হোক, কথা বলতে বলতে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছি। এই মাজারের প্রসঙ্গে ফিরে আসি, মাজারের ভিতর প্রচুর মানুষ অন্তত ধ্যানমগ্ন ভাবে দোয়া, দরুদ, জিকির এবং মিলাদ পড়ছে। মাজারের একটি অংশ কাঠের পার্টিশন দিয়ে আলাদা করা, পার্টিশোনার ওপাশ মহিলা ভক্তদের জন্য নির্ধারিত। কিছু কিছু ভক্তদের মধ্যে দেখলাম কেমন একটা ভিন্ন রকমের ভাব, যেটা অন্য কোথাও দেখিনি। বিশেষ করে লাঠি হাতে একজন কালো আলখেল্লা পড়া ভক্তকে দেখলাম তিনি চিৎকার করে কি কি যেন বলছেন, আক্রমণাত্মক তার দেহ ভঙ্গি । আমি যখন ফটো তুলছিলাম তখন আমার দিকে রাগী রাগী ভঙ্গিতে তিনি তাকাচ্ছিল ও দুর্বোধ্য ভাষায় কি কি যেনো বলছিলো, বিশেষ করে তার হাতে লম্বা লাঠি থাকায় আমার কিছুটা ভয় ভয় লাগছিলো। একসময় মিশর ছিলো শিয়া ফাতেমীয় খলিফাদের অধীনে কিন্তু এখন মিশরে শিয়ারা মাত্র জনসংখ্যার শতকরা ১ ভাগ , একারণেই হয়তো তাদের আকাশ্চুম্বী ভক্তিবোধ আর সংখ্যালঘু হবার কারণে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তাদের মধ্যে কিছুটা অস্বাভাবিক আচরণের জন্ম দিয়েছে। এ অবস্থায়ইএকজন ভক্তকে দেখলাম মাজারের গ্রিলের সামনের সিজদা করছেন আর অন্যরা হাত উঠিয়ে অনেক কিছু কামনা করছেন মাজারের কাছ থেকে কেননা শিয়ারা বিশ্বাস করে, ইমাম হুসাইন আঃ শহীদ হওয়ার পরও রুহানিভাবে জীবিত আছেন এবং এখনো সত্যের পক্ষে লড়াই করা মানুষদের সাহায্য করে থাকেন। অনেকে শিয়াই স্বপ্নে তাঁর সাহায্য পাওয়ার ঘটনা হরহামেশা বর্ণনা করে থাকেন।
মাজারের চারপাশের দেয়ালের মার্বেলের উপর ক্যালিওগ্রাফি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, নিখুত এবং সুস্পষ্ট, দেখে মনে হয় লেজার দিয়ে করা। পিরামিডের দেশে নানা রঙের ক্লাসিকাল হাইরোগ্লিফিক্স কাজ মিশরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দেখার পর মাজারের ভেতরের সাদা মার্বেলের উপরে খয়রি রঙের অত্যাধিক নিখুঁত ক্যালিগ্রাফির কাজ আমার কাছে কেমন জানি বেমানান মনে হচ্ছিলো।
তবে রাসুলের রক্তধারার উপর শিয়াদের ভক্তিবাদের ও আলৌকিতা আরোপের ব্যাপারটি বুঝতে হলে তাদের বিশ্বাসের কাঠামোটি বুঝতে হবে। কিছু উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিস্কার হতে পারে। যেমন, শিয়ারা বিশ্বাস করে, ইমাম হুসাইনসহ বারো ইমামই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অদৃশ্য জ্ঞান বা ইলমে লাদুন্নি রাখতেন, ওনারা কেউই সাধারণ মানুষ নন। ইমাম হুসাইন আঃ এর দোয়া কখনোই ফেরত যায় না। তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলে তা কবুল হবেই। শিয়ারা বিশ্বাস করে, কারবালায় যেখান থেকে ইমাম হুসাইন শহীদ হয়েছিলেন, সেই মাটি “তুরবায়ে হুসাইনি” অর্থাৎ অলৌকিক গুণসম্পন্ন। ঐ মাটি মানুষকে রোগমুক্ত করার অলৌকিক ক্ষমতা রাখে। শিয়ারা বিশ্বাস করে, ইমাম হুসাইনের শহাদতের দিনটি একটি মহা গুরুত্বপূর্ণ মহাজাগতিক ঘটনা, ঐ দিন আকাশ ও পৃথিবী আক্ষরিক অর্থে কেঁদেছিলো, সেকারণে সেদিন আকাশ রক্তবর্ণ ধারণ করেছিলো ও আকাশ থেকে রক্তবৃষ্টি বর্ষণ হয়েছিলো।
সাধারণ বাঙালি মুসলিমরা প্রচন্ডভাবে ব্যক্তিগত ভাবে শিয়া মতাদর্শের অনুসারী মীর মোশারফ হোসেনের বিষাদসিন্ধুর কাব্যের অনেক অবাস্তব মিথলজিকাল তথ্য ও আবেগ দ্বারা প্রভাবিত তাই সাধারণ বাঙালি মুসলিম (ইসলামী পণ্ডিত শ্রেণি ততোটা নয়) শিয়া মতবাদের ব্যাপারে এতোটা কট্টর নয়। শিয়াদের ব্যাপারে সবচেয়ে কট্টর বিরোধী হচ্ছে ওহাবি ও সালাফিরা (যারা রাসুল সাঃ এর সময়ের পরের তিন প্রজন্মের পর অন্য কাউকে বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য করে না)। এদের মধ্যে কট্টর এমন উপদলও আছে যারা মনে করে চল্লিশ জন শিয়াকে হত্যা করতে পারলে জান্নাত নিশ্চিত।
মাজার প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে এসব নানান জটিল ও অস্বস্তিকর ঐতিহাসিক জিনিসগুলো ভাবছি, ভাবছি শিয়া সুন্নিদের মধ্যে বিরোধ হাজার বছর পার হয়ে গিয়েছে এবং এদের মধ্যে বিরোধ একবিংশ শতাব্দীতেও এসে মনে হয় আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর শেষ কোথায়? এসব ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বিরোধকে অতিক্রম করে আমার মাথার মধ্যে একটি জিনিসই বারবার ঘুরছিলো। সেটা হচ্ছে হযরতের অতি আদরের কন্যা ফাতেমা ও অন্যদিকে রাসুল সাঃ এর অত্যন্ত প্রিয় হযরত আলির দুই সন্তান, হাসান ও হুসাইন ছিলেন রাসুল সাঃ এর পরম প্রিয় পাত্র। শিশুকাল থেকেই তারা আপন নানার আদর যত্নে মানুষ হয়েছেন। রাসুল সাঃ যখন নামজে সিজদায় যেতেন তখন এরা দু’জন তাঁর ঘারের উপর বসে পড়তেন, কিন্তু রাসুল সাঃ রাগ করতেন না, ওদের ঘার থেকে পরম যত্নের সাথে নামিয়ে পাশে রেখে নামাজ শেষ করতেন। সেই পরম আদরের দুই নাতির একজনকে বিষ পানে হত্যা করা হয় আর অন্যজনকে হত্যা করে তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আল্লাহ চাননি রাসুল সাঃ এর সরাসরি নিকটবর্তী কোন পুরুষ উত্তারাধিকার থাকুক। দুই নাতিকে যেমন মৃত্যু বরণ করতে হয়েছে , রাসুল সাঃ এর একমাত্র পুত্র ইবরাহিমও বাল্য বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। এটাই হয়তো আল্লাহর ডিজাইন। এসব বিপদজনক চিন্তা করতে করতেই পরম ভালবাসা ও সম্মানের সাথে ইমান হুসাইনের মাজারে সালাম জানিয়ে আমি ওখান থেকে বের হয়ে আসলাম।
আগেই বলেছি এটা মুসলিমদের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর ঘটনাবহুল সময়কাল। বিবাদমান উভয় পক্ষেই রাসুল সাঃ এর ঘনিষ্ঠ সাহাবিরা ছিলেন, তারপরও এমন নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটতে পেরেছে। ঐতিহাসিক ভাবে কতোটা সিত্যমিথ্যা জানিনা, বলা হয়, উমর ইবনে সাদ যিনি ইয়াজিদের বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন, তার সেনাদের তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন খুব তাড়াতাড়ি হুসাইন (রাঃ) কে হত্যা করতে, যাতে তারা সময়মতো আসরের নামাজ আদায় করতে পারেন। সাহাবিদের এ দ্বিমুখী ও পরস্পর বিরোধী মনস্তত্ত্বের ব্যখ্যা কে দেবে? এখানেই মুসলিম পণ্ডিতদের অস্বস্তি আর এড়িয়ে যাবার প্রবণতা।
মানুষ হিসেবে আমাদের সুবিধা হলো আমারা মনের মধ্যে যা চিন্তা করি বাইরের মানুষ তা জানতে পারে না, বুঝতেও পারে না। শুধু একজন সব জানেন , তিনি হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা। এজন্য তার একটি নাম হচ্ছে আলিমুস সুদুর অর্থাৎ ‘যিনি অন্তরের জ্ঞান রাখেন’। সাহাবীদের নিয়ে ঐ মাজারে উপস্থিত ভক্ত মানুষেরা আমার মাথার এসব বিপদজনক চিন্তার কথা যদি জানতে পারতো তাহলে তারা আমার কি অবস্থা করতো কে জানে। তবে আমরা চাই বা না চাই, দিনশেষে ইতিহাস ও নৈতিকতার সত্যকে মকাবেলা করাই বুদ্ধিমানের কাজ কেননা সত্য হাজার বছর পরে হলেও তার নিজস্ব চেহারা নিয়ে সামনে এসে হাজির হবেই।
মাহফুজুল হক জগলুল
১৮,০৪,২০২৫



