জায়নামাজনামা

আমার দাদা ছিলেন একই সাথে মাদ্রাসা ও স্কুল শিক্ষক। ১৯৭২ সালের তিনি যখন ইন্তেকাল করেন তখন তার বয়স ৯০ পার হয়ে গেছে। আমাদের গ্রামের যে মসজিদে তিনি দীর্ঘকাল ইমামতি করতেন সেই মসজিদের মেঝে ছিল মাটির। স্থানীয়ভাবে বানানো হোগলার পাটি মাটির উপর বিছিয়ে সকলে নামাজ আদায় করতেন। বহুকাল ব্যবহারের ফলে হোগলাগুলো চকচক করত, বিশেষ করে সিজদার জায়গাটায় কালো দাগ হয়ে যেত। শৈশবে মনে আছে ঐ মসজিদে যখন ঢুকতাম, অভ্যন্তরের হালকা আলোয় হোগলা পাটির দাগ গুলোর দিকে তাকিয়ে এক ধরনের অচেনা আধ্যাত্মিক অনুভূতি আমার মনের মধ্যে জাগতো। পুরনো সেই মাটির মেঝের মসজিদ এখন আর নেই, সেখানে এখন দোতলা বিশাল পাকা মসজিদ, ফ্লোরের হোগলার জায়গায় চকচকে বেইজ কালারের গ্লেজড টাইলস ।

এখন আসি ঢাকায় আমার উত্তরার মসজিদের কথায়, যেখানে আমি নামাজ পড়ি। ২৫ বছর আগে যখন উত্তরায় আসি মসজিদটি তখন অনেক ছোট ছিল, এখন সেটি চারতালা বিশাল মসজিদ হয়েছে এবং এর কলেবর আরো বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। মসজিদটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন শহিদুল্লাহ সাহেবের করা, পরবর্তীতে কমিটি যখন জানতে পারলো আমি স্থপতি তখন আমাকে দিয়ে বর্ধিত অংশের ডিজাইন করিয়ে নিয়েছে। তবে আজ সে বর্ণনা দেওয়ার জন্য এখানে লিখতে বসিনি, লিখতে বসেছি আমাদের শহুরে এলিট মসজিদ গুলোর কিছু অস্বস্তিকর এলিটিস্ট খাইসলতের বর্ণনা দিতে যেগুলা আমার হজম করতে খুব কষ্ট হয়।

উত্তরায় আমাদের মসজিদের মেঝের একটি অংশ ইতালির তুসকানির খনি থেকে আনা ফাইন গ্রেইন্ড পলিশড কারারা মার্বেল দিয়ে নির্মিত। বাকি অংশে দুই ফুট বাই চার ফুট সাইজে ঘন কারুকার্য খচিত চকচকে দামী জায়নামাজ টাইলস বসানো। এখানেই শেষ নয়, সেই টাইলস এর উপর আছে পুরু লাল রংয়ের কারুকার্যময় মোটা এক্রেলিক ফাইবারের নরম জায়নামাজ ডিজাইনের কার্পেট বসানো। কার্পেটের উপর আছে সাদা পরিষ্কার চাদর। এখানেও শেষ নয়, সাদা চাদরের উপর সিজদার জায়গায় দেয়া ছিল আলাদা এক ফুট প্রশস্ত লম্বা চাদর যেন সিজদাটা সেই আলাদা চাদরের উপরে পড়ে। এত কিছুর পরেও দেখা যায় তারাবির নামাজে কিছু নামাজীরা বিশাল বিশাল আধা কাঠা সাইজের ব্যক্তিগত জায়নামাজ নিয়ে এগুলোর উপর বিছান। বিছান বলার চেয়ে বরং দখল নেন বলাই বোধহয় অধিক যুক্তিযুক্ত হবে। কেননা এইসব জায়নামাজ যারা আনেন তারা পছন্দ করেন না তাদের জায়নামাজে অন্য কেউ দাঁড়াক যদিও বিশাল সাইজের জায়নামাজে কোন কোন ক্ষেত্রে তিনজন মানুষও দাঁড়াতে পারেন। মেঝেতে পড়তে পড়তে এত আরামদায়ক জিনিস থাকার পরও এর উপর ব্যক্তিগত জায়নামাজ বসানোর কি প্রয়োজন, আমার বোধে আসে না।

রাসুল সা: বলেছেন মানুষ হিসেবে প্রত্যেকটি মানুষ চিরুনির দাঁতের মতো সমান। হাদিসে আছে নামাজের সময় নামাজীরা নিজেদের মধ্যে কোন ফাঁক রাখবেন না কেননা ফাক রাখলে সে ফাঁকে শয়তান এসে দাড়ায়। মানুষে মানুষের মধ্যে যখনই দূরত্ব তথা ফাঁকা জায়গা থাকবে সেখানেই অসাম্য এসব ভিড় করবে আর অসম্য মানেই অশুভ আর যা অশুভ তা-ই শয়তানের প্রতীক। ইসলামের যে সুমহান সার্বজনীন সাম্যের দর্শন সেই দর্শনের ফিজিক্যাল মিনিফিসটেশন এই নামাজের কাতারে দাঁড়ানোর ভেদাভেদহীন পার্টিসিপেশনের মধ্যেই প্রকাশিত হয়। কিন্তু এইসব জায়নামাজধারী দখলদারদের জন্য নামাজীদের মধ্যে সাম্যের এই প্র্যাকটিস ভীষণভাবে বাধাগ্রস্থ হয়।

সামনের কাতারে যখন জায়গা খালি হয় নিয়ম অনুযায়ী সেখানে নামাজীদের এগিয়ে গিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করার কথা কিন্তু এলিটনামাজি যেহেতু জায়নামাজ বিছিয়ে জায়গাটা দখল করে নামজারি করে ফেলেছেন সুতরাং তিনি এদিক-ওদিক কোন দিকে নড়েন না। নামাজ শুরু হলে আশেপাশের মুসল্লিরা যখন কাতারের মধ্যে ফাঁক দূর করার জন্য এলিট নামাজির পাশে এসে দাঁড়ান তখন সে বেচারা নামাজির অর্ধেক সেজদা পরে মোটা জায়নামাজের উপর আর অর্ধেক পরে ফ্লোরে। কোন কোন ক্ষেত্রে এলিট জায়নামআজধারী নামাজীর পাশে যদি কোন শ্রমজীবী বা গরীব মানুষ থাকেন তারা ভয়ে ওই এলিট নামাজীর জায়নামাজে আসতেই সাহস পান না, ফলশ্রুতিতে পুরো নামাজের মধ্যে এক ধরনের আনকমফোর্টেবল বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। আমি যেহেতু অনেক সময় লুঙ্গি পরে মসজিদে যাই সেক্ষেত্রে ওইসব এলিট নামাজীদের পাশে যখন দাঁড়াই তারা আমার দিকে এমন তাচ্ছিল্যের চোখে তাকায় যে তার ও আমার মাঝে ঐ ফাঁকা জায়গা পূরণ করার সাহস আমি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলি, বাধ্য হয়ে তখন সামনে বা পিছনের কাতারে গিয়ে দাঁড়াই যেখানে আশেপাশে কোন জায়নামাজ নেই।

এসব কারণেই মসজিদে জায়নামাজ ধারী দেখলেই আমার মনের মধ্যে কেমন জানি অস্বস্তি বোধ জাগে আর প্যারাডক্সিকয়ালি চরম ইসলাম বিরোধী কবি হুমায়ুন আজাদের কবিতার কিছু লাইন মনে পড়ে, উনি বলেছিলেন,

আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক
সব সংঘ-পরিষদ; চলে যাবে, অত্যন্ত উল্লাসে
চ’লে যাবে এই সমাজ-সভ্যতা-সমস্ত দলিল

মসজিদের অস্বস্তি নিয়ে লিখতে গিয়ে এমন একজন ইসলামবিরোধী মানুষের উক্তি রেফারেন্স হিসেবে আনায় আমার আবার বড় ধরনের কোন কবিরা গুনাহ হয়ে গেল কিনা কে জানে, কিন্তু মনের উপর তো আমার হাত নেই, তাই আমার যা মনে আসে তাই আমি কোনরকম না লুকিয়ে লিখে ফেললাম।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় রাসুল সা: জীবনের অধিকাংশ সময় মাটির উপরই সিজদাহ করতেন। কারণ, তাঁর মসজিদের মেঝেই ছিল মাটির বা শীলা খণ্ডের । মসজিদের ছাদও ছিল খেজুর ডালের। বৃষ্টির সময় মসজিদের ভিতরে পানি পড়ত তখন তিনি পানি ও কাদাতেই সিজদাহ করেছেন ও এ অবস্থায় তাঁর কপাল ও নাকে পানি ও কাদার চিহ্ন লেগে ছিলো, বুখারি, মুসলিমসহ অন্যান্য হাদিস গ্রন্থে এমন উল্লেখ আছে।

পরিশেষে বলতে চাই, একটা কথা এ বয়সে এসে বারবার আমার মনে পড়ে, সেটা হচ্ছে, ছোটবেলায় গ্রামের হোগলা বিছানো মাটির মেঝের মসজিদের ঢুকে যে আধ্যাত্মিক অনুভূতি আমার মধ্যে অনুভব করতাম আজকালকার বিশাল বিশাল প্রাসাদসম তথাকথিত আধুনিক ডিজাইনের মসজিদের চকচকে পরিসরে আমি কখনো সে আধ্যাত্মিকতা অনুভব করিনি, তবে পুরোটাই হয়তো আমার একান্ত নিজের ক্ষুদ্রতা ও বিভ্রম, দয়া করে আমার দ্বারা প্রভাবিত হবেন না।

মাহফুজুল হক জগলুল
২৫,০৩,২০২৫

আরও পড়ুন