প্রায় দুই সপ্তাহ হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রে আছি ছোট ভাইয়ের নিউ জার্সির বাসায়। আমি ঠান্ডা খুব অপছন্দ করি কিন্তু মনে হচ্ছে ঠান্ডা আমাকে তারচেয়ে বেশি পছন্দ করে, এখানে এখন তাই তাপমাত্রা মাইনাস ১২ সেলসিয়াস পর্যন্ত পেয়েছি। সে কারণে মোটামুটি গৃহবন্ধী জীবন কাটাতে হচ্ছে, অবশ্য তেমন খারাপ লাগছে না,কেননা অনেকদিন পরে লম্বা আর নিরবিচ্ছিন্ন বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছি আর নিম্ন তাপমাত্রায় সাব ট্রপিক্যাল মানুষদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ কম হয় বলে ব্যক্তিগত ভাবে মনে হচ্ছে।
সারাদিন বিশাল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর ভিতর দিয়ে দেখছি লম্বা লম্বা শতবর্ষী কনিফেরাস গাছের বন ছেয়ে আছে শুভ্র সাদা বরফে। আমরা প্রায়ই বলে থাকি অতিরিক্ত ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন ও নিরেট নগরায়নের ফলে পশ্চিমা জগত থেকে প্রকৃতি হারিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এখানে ঘরের সামনেই তুষার ঢাকা লোকালয়ে দেখতে পাচ্ছি বন থেকে বেরিয়ে আসা এক জোড়া হরিণ, নিয়মিত নিঃসঙ্গ একটি লেজ ফোলা ব্যস্ত শেয়াল আর দলে দলে চঞ্চল কাঠবেড়ালি গাছের কোটর থেকে নেমে এসে তুষারের উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে
সারাদিন, মানুষকে এরা তেমন ভয়ও পায় না। এখানকার মানুষ যেহেতু তাদের কখনো আক্রমণ করে না তাই মানুষকে ভয় পেতে তারা শেখেনি। এদের সরকার গাজায় পাখির মতো লক্ষ শিশু হত্যা করছে কিন্তু পশুপাখির প্রতি এরা আবার অতিরিক্ত সদয়। আসলে সব সভ্যতার মধ্যেই নানা রকম প্যারাডক্সিক্যাল চরিত্র বিরাজমান থাকে। আমাদের দেশের শহুরে সমাজেও দেখেছি, বাড়ির কাজের মানুষের উপর দরদ নেই কিন্তু পোষা বেড়ালের উপর দরদ ষোল আনার উপর আঠারো আনা।
আসলে অতিরিক্ত বিশ্রামের কারণে বেশি কথা লিখে ফেলছি, লিখতে গিয়ে এক জিনিস লিখে ফেলছি বিস্তৃত অনেক জিনিস। লিখছিলাম নিউ জার্সি ছোট ভাইয়ের বাসায় অবস্থানের কথা। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ভাইটি মোটামুটি আমার উল্টা স্বভাবের। ছোটবেলা থেকেই খুবই অর্গানাইজড আর কঠোর পরিশ্রমী। সারাদিন ল্যাপটপ অন করে বাসা থেকেই অফিস করছে, এই বিদেশ বিভূঁইয়ে আমার মতো বড়ভাইয়ের জন্য কাচকি মাছ, চিংড়ি মাছের মালাই কারি আর আলু দিয়ে করল্লা ভাজি করছে। আমার কাপড়চোপড় ওয়াশিং ও ড্রাই করে দিচ্ছে। মেশিন দিয়ে ঘরের সামনের রাস্তা থেকে বরফ পরিস্কার করছে, গাড়ির ব্যাটারি বদল করছে, ভ্যাকিউম ক্লিনার দিয়ে বারবার ঘর পরিস্কার করছে, অনলাইনে আমাকে এটাসেটা কিনে দিচ্ছে, Martin Logan hybrid electrostatic speaker এ আমার প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত শোনাচ্ছে, আরো কত কি। এভাবে কাজ করতে করতেই আর আমাকে নিরেট অলস বসে থাকতে দেখে একটা বিরাট বাক্স ভর্তি একগাদা পুরনো ফ্যামিলি ফোটোগ্রাফ বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
দেখো এগুলা, মজা পাবা।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম আমার বহু পুরনো দিনের সব ফটোগ্রাফ যেগুলোর অস্তিত্ব আছে বলেই আমার কোন ধারণা ছিল সেগুলো সে সযতনে গুছিয়ে রেখেছে নিজের দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে তার তুষার ঘেরা ঘরের মধ্যে। অনেকগুলো ভুলে যাওয়া ছবির মধ্যে দুটি ছবি এখানে শেয়ার করলাম, আমার নিজেরই ধারণা ছিলো না এমন
ছবির কোন অস্তিত্ব আছে। একটি ছবি আমার বিয়ের আর অন্য ছবিটিতে ১৯৮৭ সালের দিকে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে ফ্রেন্ডস ক্লাব মাঠের পাশে আমাদের সদ্যনির্মিত বাড়ির (খুব সম্ভবত, আর্কিটেক্ট নাসির ভাই আর স্ট্রাকচারাল ডিজাইনার বিটু ভাইয়ের প্রথম কাজ) ছাদে বসে আছে আমার মা আর একমাত্র ছোট বোন, ছবিতে দেখা যাচ্ছে আমাদের বাড়ির আসেপাশে তেমন কোন কন্সট্রাকশন নেই, আমাদের ছাদ থেকে তখন বিশাল খোলা মাঠের ভিতর দিয়ে সোজা ময়মনসিংহ রোড দেখা যেতো।
মাহফুজুল হক জগলুল
ফ্লোরহ্যাম পার্ক, নিউ জার্সি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬