এক অন্ধ বাস ড্রাইভার,
ডানে কর্কট বামে মকর ক্রান্তিরেখার ঠিক মাঝখান দিয়ে
বিষুবরেখা বরাবর সোজা পশ্চিম দিকে
বিরামহীন তার বাস চালিয়ে চলেছে।
তার মুখমণ্ডলে কোনো অভিব্যক্তি নেই,
তার মাংসপেশিতে প্রান্তরের কোনো উত্তেজনা নেই,
তার হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়েও বেশ কিছুটা
ধীর ও নিয়ন্ত্রিত,
অসহ্য রকম প্রশান্ত ও নিত্যকার গোরখোদকের
মতো নির্বিকার তার মুখচ্ছবি।
বাস যতো এগোচ্ছে,
তার গুচ্ছ গুচ্ছ লম্বা চুল
আস্তে আস্তে ধূসর থেকে শাদা হয়ে যাচ্ছে।
তার কপালে দীঘল বলিরেখার খাঁজগুলো
গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে,
ক্রমশ সামনের দিকে নুয়ে পড়ছে তার মেরুদণ্ড।
বাসে অনেক যাত্রী,
তারাও অধিকাংশ অন্ধ ও অবিচলিত ।
কেউ কেউ যারা অন্ধ নয়
তারাও কলমের কালি মেখে নিয়েছে তাদের দুচোখে
যেন সহযাত্রীরা কিছুতেই তাদের চক্ষুষ্মান না ভাবে।
এক যাত্রায় পৃথক ফল শাস্ত্রবিরুদ্ধ,
বুদ্ধিমানেরা কখনো শাস্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না,
শাস্ত্র বদলে গেলে তখন তারা পক্ষ বদলায়,
অন্ধত্বই এ যাত্রার শুদ্ধতম শাস্ত্রাচার।
বাসভর্তি দলবদ্ধ সব অন্ধ যাত্রী নিয়ে
আদিম গুহার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা প্রকাণ্ড সরীসৃপের মতো
হঠাৎ নিঃশব্দে বাস এসে থামলো ঠিক আমার সামনে।
বাসস্ট্যান্ডে শুধু আমি একা দাঁড়িয়ে,
আমার হাতে কোনো লাগেজ নেই,
আমার মস্তিষ্কের মধ্যে কোনো গন্তব্য নেই,
আমার শরীরের ভাষায় যাত্রার কোনো প্রস্তুতি নেই,
এতো অপ্রস্তুত তবু কেন আমি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি,
আমি ঠিক মনে করতে পারছি না।
ড্রাইভার আমার আপাত স্থবিরতায় একই সঙ্গে বিস্মিত ও বিরক্ত।
অন্যদিকে একজন অন্ধ ড্রাইভার কী করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে
আমি খুব মনোযোগ দিয়ে সেটা বুঝতে চেষ্টা করছি।
শুধু ড্রাইভার একা নয়,
অন্ধকার সারি সারি গর্তের মতো জানালার ওপাশ থেকে
বাসের সব অন্ধরাও গভীর বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে
শুধুমাত্র আমার অবাঞ্ছিত খোলা চোখ দুটোকে লক্ষ করে,
তাদের চোখে সীমাহীন অস্বস্তি আর শঙ্কা,
মনে হচ্ছে যাত্রাপথে চোখ খুলে রাখাটা এক ভয়াবহ পাপাচার।
ওদের কোটরাগত যমজ চোখগুলোতে আমার প্রতি এখন সুস্পষ্ট কুণ্ঠা ও চাপা ভীতি,
তারা তাদের অনাগত সুখদ গন্তব্যের সাফল্য-সম্ভার
চক্ষুষ্মান কারো সঙ্গে ভাগাভাগি করতে ভয় পাচ্ছে,
আমার সংশয় ও বিলম্বে ওরা ক্রমশ অরক্ষিত বোধ করছে।
আমার এক পা মোচড় খাওয়া প্রকাণ্ড শেকড়ের মতো খামচে ধরেছে মাটি,
আর অন্য পা আলতো করে তুলতে যাচ্ছি বাসের ধাতব পাদানিতে।
আমি এখনো বুঝতে পারছি না কোথায় যাবো,
তবে আমি টের পাচ্ছি,
সরীসৃপের তীক্ষ্ণধার নখরের মতো পা ফেলে
আমাকে ছেড়ে এখনই ধীরে ধীরে বাস আবার চলতে শুরু করবে,
আমার বরাদ্দ সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে,
শেষ মুহূর্তে আমার সামনে অভিলাষের সব চকচকে রত্নপাহাড় উঁকি দিচ্ছে,
তারপরও আমি পুনর্বার আমার গন্তব্য কোথায় এবং কেন
তা গভীরভাবে মনে করার চেষ্টা করছি।
এরই মাঝে হঠাৎ অবাক হয়ে লক্ষ করছি,
আমার মাথার চুলগুলো এখন ওদের মতোই একটি একটি করে দ্রুত
শাদা হতে শুরু করেছে,
আমার মুখের চামড়া ক্রমশ ভয়ানকভাবে কুঁচকে যাচ্ছে,
আমার দৃষ্টি আস্তে আস্তে গভীর গন্তব্যহীন অন্ধকারের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে,
সর্বগ্রাসী এক মায়াবী নেশা আমার মস্তিষ্ককে দ্রুত ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে,
আমি প্রাণপণ আমার দুচোখ খোলা রাখার চেষ্টা করছি,
এবং ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে চিৎকার করে বলতে চেষ্টা করছি,
চক্ষুষ্মান হওয়াটা কোনো অপরাধ নয়, বরং চোখ বুজে থাকাটাই মহাপাপ,
পথ যতো দীর্ঘ হোক তবু নিজের আলোয় আমি পথ খুঁজে নিতে চাই।
আমি বিড়বিড় করে আরো অনেক কিছু বলতে চাচ্ছিলাম,
কিন্তু ওরা আমার কোনো কথা শুনছে কি না আমি ঠিক বুঝতে পারছি না,
কেননা ততোক্ষণে আমাকে ফেলে রেখে অন্ধ ও শঙ্কিত বাস
হন্তদন্ত হয়ে আবার খুব দ্রুত চলতে শুরু করেছে।
0 Comments