গ্রাম-পূর্ব কৈবর্তখালী, কলাখালী ইউনিয়ন, পিরোজপুর
আনসার শেখ কাঠের কাজ করে। অনেকটা জংগলার মধ্যে তার ঘর, আশপাশে কোনো ঘরবাড়ি নেই। সে একা থাকতে পছন্দ করে, কিছুটা পাগলাটে স্বভাব, স্ত্রী-সন্তানরা অনেক সময়ই তার সঙ্গে থাকে না। কেন থাকে না কেউ জানে না। সে মোটামুটি একা থাকাটা খুব উপভোগ করে। পাগলাটে হলেও আনসার শেখের পুবমুখী ঘরটা কিন্তু একটু ভিন্ন রকম। পূর্বদিকে অদূরে কালীগঙ্গা নদী থেকে সারা দিন নির্মল বাতাস এসে ভরিয়ে রাখে তার ঘরটা। ঘরের এন্ট্রি স্পেসটা অনেকটা ডাবল হাইট। এটাই তার তিন দিক খোলা চমৎকার লিভিং স্পেস, সেখানে একটা চেয়ার পাতা থাকে, আর ভেতরের কিছু অংশ দোতলা, একটা মেজেনাইন টাইপ স্পেস আছে ভেতর… বেশ ইন্টারেস্টিং স্পেস।
পুরো ঘরটাই তার নিজের ডিজাইন করা, নিজের হাতে বানানো। খুঁটি হিসেবে বেশির ভাগই সরাসরি গাছের কাণ্ডকে শেপ ও সাইজ না করে ব্যবহার করা হয়েছে। একটা বন্য ভাব আছে ঘরটির মধ্যে। পার্টিশন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে হোগলা পাতার বেড়া, (বেড়ার জন্য ব্যবহৃত হয় হোগলার ম্যাচিউরড গোড়ার শক্ত অংশ, পাটির জন্য ব্যবহৃত হয় হোগলার ওপরের দিকের পাতলা নমনীয় পাতা), কোথাও কোথাও চম্বল কাঠের তক্তা। হোগলা আর তক্তার জোড়ার ফাঁক দিয়ে চমৎকার ক্রস ভেন্টিলেশন হয়।ওপরে চালে ব্যবহার করা হয়েছে ধানের নাড়া। দক্ষিণাঞ্চলে ধানগাছের ওপরের অপেক্ষাকৃত সরু অংশকে বলে খড় বা ‘খেড়’ আর নিচের শক্ত মোটা অংশকে বলে নাড়া। নাড়া দিয়ে ঘর ছাওয়া হয় আর খড় সাধারণত রেখে দেওয়া হয় গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে। ঘরের মেঝে মাটির, প্লিন্থ বেশ উঁচু। কেননা পূর্ণিমা আর অমাবস্যায় জোয়ারের পানি প্রায়শই উঠোন ডুবিয়ে ঘরে ঢুকতে চায়।
সন্ধ্যার পরে অনেক রাত পর্যন্ত দূর থেকে আনসার শেখের দীর্ঘ টানের সুরেলা গান শোনা যায়। গান শুনে মনে হয় হয়তো বা মানুষটা খুব সুখে আছে, তবু পারতপক্ষে তার কাছে কেউ ঘেঁষে না।
আমরা এই সব হতদরিদ্র প্রান্তিক ‘নন-এলিট’ মানুষের ঘরের ত্রিমাত্রিক ফর্ম, বিন্যাস, ম্যাটেরিয়ালের টেক্সচার, গ্রেইন ইত্যাদি নিয়ে যত ভাবি, এসব ডাটা নিয়ে আন্তর্জাতিক সেমিনারে পেপার প্রেজেন্ট করে যতো হাততালি নিই; কিন্তু এই ত্রিমাত্রিক ফর্মকে ঘিরে রক্ত-মাংসের যে মানুষগুলো বসবাস করে তাদের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখমাখা জীবনগল্পের কেমিস্ট্রি নিয়ে কি সত্যিকারের সহানুভূতিশীল দরদমাখা আবেগ নিয়ে কখনো সৎ চিন্তা করি? প্রান্তিক মানুষের আবাসনের এই যুগ-যুগান্তর থেকে চলে আসা চরম মানবেতর পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য কোনো বুদ্ধিদীপ্ত গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক একটি জোরালো জাতীয় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি? নাকি এরা শুধু আমাদের ‘intellectual, professional & carreer persuit’-এর ডাটা কালেকশনের গিনিপিগ?
এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও একাডেমিক লেভেলে বেশ কিছু ভালো কাজ অবশ্যই হয়েছে, তবে career oriented অপ্রয়োজনীয় পুস্তকমুখী কাজ হয়েছে অনেক অনেক বেশি, যা বিদেশের বহু নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির শেলফে থরে থরে সাজানো আছে, কিন্তু এই ভারী ভারী পুস্তকে/থিসিসে গত ৫০ বছরেও এই মানুষদের আবাসন মানের কোনো উন্নতিই হয়নি, হবেও না; যদিও এসবকে ব্যবহার করে তাদের ক্যারিয়ার অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। এতো বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাসনের এই চরম মানবেতর অবস্থার সাসটেইনেবল উন্নতির জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, সুশীলসমাজ, রাজনীতি ও প্রসাশনকে সঙ্গে নিয়ে সুদৃঢ় কমিটমেন্টসহ একটা প্রবল ‘জাতীয় সামাজিক গ্রামীণ আবাসন আন্দোলন’ গড়ে তোলা এবং এর নেতৃত্বে অবশ্যই থাকতে হবে স্থপতিদের।
আমি অতি ক্ষুদ্র মানুষ, আর তার চেয়েও ক্ষুদ্রতর স্থপতি, ছোট মুখে হয়তো অনেক বড়ো কথা বলে ফেললাম। আমার লেখা তাই কেউ সিরিয়াসলি নেবেন না।