তিনজন সিনিয়র ও একজন সহপাটিসহ আমরা মোট ৫ জন স্থাপত্যের ছাত্র বুয়েটের ছাত্র জীবনে খুব ডেডিকেটেড ভাবে একটি প্রচন্ড বিপ্লবী তেজে তেজোদৃপ্ত বাম ছাত্র সংগঠনের মধ্যামে একদম ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত হয়ে দেশে দ্রুত বিপ্লব ঘটানোর জন্য দিনরাত ব্যস্ত থাকতাম। তবে আসন্ন বিপ্লব ছাড়াও আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারী এরশাদকে তুমুল ছাত্র গণ আন্দোলনের মাধ্যমে গদি থেকে নামানো। সেই লক্ষ্যে আমরা দিনের প্রায় সারাক্ষণই বিপ্লবী মিটিং, মিছিল, বিক্ষোভ, পোস্টারিং, পোস্টার ডিজাইন, নানা রকম বিপ্লবী কবিতার লিটল ম্যাগাজিন ও এরশাদকে নিয়ে কার্টুন পত্রিকা ছাপানো, গভীর রাতে বিপদজনক ভাবে বিল্ডিং এর তিনতলা বা চারতলা থেকে শিম্পাঞ্জির মতো ঝুলে থেকে চিকা মারাসহ সারাদেশে নানা প্রকার প্রত্যক্ষ এবং গুপ্ত ও বেআইনি কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকতাম।
ক্লাসে সাধারণত আমরা যাই না, আমাদের বেশিরভাগ সময় কাটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন সংলগ্ন বিপ্লবী টগবগে এলাকায়। স্যারদের সাথে আমাদের সাধারণত দেখা হয় পথে-ঘাটে অথবা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা প্রকার শৃঙ্খলাভঙ্গ জনিত, রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলার কারণে ডাকা বিভিন্ন মিটিং এর টেবিলে।
এমন করতে করতে কোন অলৌকিক কারণে কেমন করে যেন একের পর এক ইয়ার টপকে সম্মানের সাথে পঞ্চম বর্ষের ফাইনাল পর্যায়ে এসে পরি ১৯৮৮ সালে। আমাদের সিনিয়র তিনজনের আগের বছরই পাস করে ফেলেছেন। আমরা তখন এই পাঁচজনে বসে ঠিক করি যেহেতু বিপ্লব আমরা পাঁচজন একসাথেই করব সুতরাং আমাদের ভবিষ্যতের স্থাপত্য ফার্মটিও এই পাঁচজন বিপ্লবী পার্টনারদের নিয়েই করা উচিত। তাতে আমাদের নিজেদের মধ্যে বিপ্লবী বন্ধনের কমরেডশীপ অটুট থাকবে ও একই সাথে জীবনধারণের জন্য দু চার পয়সা উপার্জন করার ও সুযোগ তৈরি হবে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর যিনি নিজেও তরুণ বয়সে খুব বিপ্লবী ছিলেন তাঁকে আমাদের পুরো প্ল্যানটা জানাই, তিনি আমাদের খুব উৎসাহ দেন এবং কথা দেন বিপ্লব সন্নিকটবর্তী হলে তিনিও আমাদের সাথে এসে বিপ্লবে যোগ দেবেন। তিনি আমাদের বোঝান রিভলিউশনের ক্ষেত্র তৈরি করতে খুব বেশি মানুষের দরকার হয় না, সলিড ১০-১২ জন হলেই চলে। উদাহরণ হিসেবে তিনি কিউবার রিভলিউশনের কথা উল্লেখ করেন।
তাঁর বিপ্লবী আন্তরিকতা ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার প্রমাণ হিসাবে ড্রইং রুম থেকে দৌড়ে গিয়ে বাসার ভিতর থেকে তিনি খুব পুরনো একটি খোলা বিদেশি টেলিফোন সেট এনে আমাদেরকে দেখান। ১৯৬৯ গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি নাকি USIS আক্রমণ করে এই টেলিফোন সেটটি তুলে এনেছিলেন। গুরু হিসাবে এমন শিক্ষককে পেলে বিপ্লব আর ঠেকায় কে।
যেহেতু আমরা সবাই একই ‘বিপ্লবী’ মন্ত্রের দীক্ষিত তাই আমাদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন মতান্তর দেখা গেল না, আমরা সবাই এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলাম ও একটি স্থাপত্য ফার্মের ট্রেড লাইসেন্স করার জন্য ফর্ম জোগাড় করলাম। ফর্মে ফার্মের নাম আর ঠিকানা দিতে হয়। সিদ্ধান্ত হল ফার্ম এর ঠিকানা হবে আমাদের সিনিয়র ভাইয়ের বেইলি রোডের চারতলা বাড়ির ছাদের ছোট্ট চিলেকোঠায়। আমরা হয়ে গেলাম চারজন চিলেকোঠার সেপাই।
নামটা আমিই দিলাম, প্রণয়ন। আমাদের সিনিয়র পার্টনারের ফুপা তখন সিটি কর্পোরেশনের চিফ ইঞ্জিনিয়ার, তাই খুব সহজেই ‘প্রণয়নের’ নামে আমাদের ট্রেড লাইসেন্স জোগাড় হয়ে গেল। এখন দরকার একটা চোস্ত ডিজাইনের নেম কার্ড। এমন নেম কার্ড বানাতে হবে যেন কার্ড দেখেই ক্লায়েন্ট আনন্দে চিৎপটাং হয়ে যায়, কার্ডের ডিজাইনের মধ্যেই এমন ক্রিয়েটিভিটির ঝলক ও মোজেজা থাকবে যে ক্লায়েন্ট নিমেষে বুঝে যাবে একজন দারুন মাস্টার আর্কিটেক্ট সে অবশেষে হাতের কাছে পেয়েছে।
যথারীতি আমি নেম কার্ডটি ডিজাইন করে খুব গাঢ় নীল রঙের দামি মডেল পেপারের উপরে সাদা রঙে স্ক্রিনপ্রিন্ট
করিয়ে আনলাম জোনাকি সিনেমা হলের পিছনের গলির ভিতর দৃষ্টি নামের একটি স্ক্রিন প্রিন্ট এর ফার্ম থেকে। কার্ডগুলো প্যান্টের পিছনের পকেটে চামড়ার মানিব্যাগে গুছিয়ে রেখে সারাদিনে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াই (ওই প্রথম মানিব্যাগ ব্যবহার, আগে টাকা পয়সা রাখতাম প্যান্টের পকেটে) কখন কোথায় কাকে আমার নতুন নেম কার্ড দেয়া যায়। সারাদিন ঘোরাঘুরি করেও নএম কার্ড দেয়ার জন্য তেমন প্রসপেক্টিভ লোকজন খুঁজে পাই না। তবে খুশিতে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে,
এই পৃথিবী দেখো, আমারও এখন একটি নিজস্ব নেম কার্ড আছে।
সারাদিন অফিস করে বিকেল বা সন্ধ্যাবেলায় আমাদের অবশ্যম্ভাবী নিয়মিত গন্তব্য ছিলো বুয়েট চত্বর। অগত্যা বুয়েটের জুনিয়রদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে নিজেদের নতুন কর্মজীবনের নানা রকম সাফল্যের কথা বানিয়ে ছালিয়ে বলি আর বিনা প্রয়োজনে তাদের কারো কারোকে আমার নতুন নেম কার্ড দেই। তাদের বেশিরভাগই অবাক বিস্ময় নিয়ে আমার নেম কার্ড নেড়েচেড়ে দেখে আর তাদের এই সুস্পষ্ট বিস্ময়বোধ আমাকে দারুন ভাবে পুলকিত করে। আহা এত কিছুর পরেও জীবন কত সুন্দর। মনে আছে আমাদের তিতুমীর হলের ইয়া মটু এবং প্রায় নির্বাক ও নির্মোহ ক্যান্টিন ম্যানেজারকেও বিনা প্রয়োজনের যেচে আমি আমার একটি নেম কার্ড তাকে দিয়েছিলাম। আমার নেম কার্ড পেয়ে একমাত্র তার মধ্যে আমি কোন বিস্ময়বোধ বোধ লক্ষ্য করিনি। আর দশটা ময়লা নোটের মতো তিনি নির্বিকার ভাবে আমার কার্ডটা কাঠের ড্রয়ারে রেখে দিলেন।
বলা হয়ে থাকে দুই বাঙালি একত্র হলে একটি রাজনৈতিক দল হয় আর তিনজন একত্র হলে রাজনৈতিক দলটি ভেঙে দুটো রাজনৈতিক দল হয়। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হল, আমাদের পাঁচজনের মধ্যে একজন সিনিয়র পার্টনার প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দল ত্যাগ করলেন। সরি, ফার্ম ত্যাগ করলেন। আমরা রইলাম চারজন এবং এ চারজনই এক্সক্যাডেট।
এই চারজনের মধ্যে একজন আবার বললেন বাবার পারিবারিক ব্যবসা দেখতে হবে তাই তাকে চিটাগাং থাকতে হবে। আমরা দেখলাম এইভাবে পার্টনার ক্ষয় হয়ে যেতে থাকলে ফার্মের অবস্থা ‘ পাগলা কেরোসিন ‘ হয়ে যাবে তাই আমরা চিটাগাংয়েও ফার্মের একটি ব্রাঞ্চ খুলে ফেললাম যেন তাকে হারাতে না হয়। যেহেতু পয়সা পাতি কিছু লাগেনা, মুখে মুখে ব্রাঞ্চ খুলি, সেহেতু বন্দর নগরে একটি ব্রাঞ্চ খুললে অসুবিধে কি।
ওদিকে খুব ভোরে এসে প্রতিদিন নিয়মিত ফার্মে আমি অফিস করা শুরু করি। অফিস করা মানে কোন কাজ করা নয় শুধু বসে থাকা, বিনা কারণে কাগজপত্র নাড়াচাড়া করা কাল্পনিক প্রোজেক্টের স্কেচ ফেচ করা, আর আড্ডা দেওয়া কেননা আমাদের হাতে কোন কাজ নেই। কাজ আসার কোন সম্ভাবনা ও তেমন দেখা যায় না।
পার্টনাররা আমরা কেউ বেতন পাই না, টুকটাক করে পার্ট পেমেন্ট যদি কদাচিৎ হয় আমরা তখনই সাথে সাথে সেটা অনুপাতিক হারে যার যার শেয়ারের অংশ অনুযায়ী নগদ নগদ নিয়ে নেই। আমার স্পষ্ট মনে আছে, এ প্রক্রিয়ায় একদিন আমার সর্বোচ্চ ইনকাম হয়েছিল আড়াই হাজার টাকা।
ঢাকায় আমাদের তিন পার্টনারের মধ্যে এক পার্টনার যার বাসার ঠিক উপরের চিলেকোঠায়ই আমাদের অফিস তিনি চরম বিপ্লবী হলে খুবই পরিপাটি, ছিমছাম জীবনে অভ্যস্ত এবং প্রচন্ড পাংচুয়াল। ঘুম, নাস্তা, নাওয়া, খাওয়া সবকিছু তার ঘড়ি ধরা। বিশেষ করে দুপুরের ভাত ঘুম। যেহেতু ঠিক নিচতলায়ই তার মা-বাবার ফ্ল্যাট, তাই ১২টা বাজতেই নিচতলা থেকে দুপুরের রান্নার সুগন্ধ বাতাসে ভেসে ভেসে আমাদের চিলেকোঠার অফিসে এসে হানা দেয় এবং তিনি যথারীতি ব্যপক উদাস হয়ে বারবার নিচতলায় গিয়ে খাবারের খোঁজ খবর নিয়ে আসেন। এভাবে কয়েকবার খোঁজ খবর নেয়ার পর এক পর্যায়ে তিনি খেতে বসে যান ও তারপর যথারীতি বেডরুমের দরজা বন্ধ করে শুরু হয় তার নিত্যদিনকার অত্যাবশকীয় দীর্ঘ ভাতঘুম।
আমাদের এই সিনিয়র পার্টনারের খোশ মেজাজ যখন উচ্চমাত্রায় থাকতো তখন মাঝে মাঝে তিনি আমাদের দয়া করে তার নিচের তলার খাস কামরায় ভিসিয়ারে বিদেশি আর্ট ফিল্ম দেখাতে নিয়ে যেতেন। এভাবেই একদিন তিনি আমাদের একটি বিখ্যাত জার্মান আর্ট ফিল্ম দেখার আমন্ত্রণ জানালেন। আমাদের অফিসে আড্ডা দিতে আসা এক বন্ধু ইঙ্গিতে জানালো জার্মান আর্ট ফিল্মের ‘এক্স’ মান নাকি খুবই উঁচু পর্যায় হয়ে থাকে, সুতরাং তার এ আমন্ত্রণ উপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। জার্মান বলতে তখন পশ্চিম জার্মানি বুঝাতো, তখনো পূর্ব এবং পশ্চিম জার্মানি একিভূত হয়নি। ছবিটি ছিল সম্পূর্ণ সাদাকালো কন্ট্রাস্ট এবং পুরো ছবিতে কোন নারী চরিত্র ছিল না। এ চূড়ান্ত বোরিং ছবিটি দেখার পর আমার কেন জানি প্রচন্ড পেট ফাটা হাসি পেয়েছিল। আমার শুধু ইচ্ছে করছিল বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করতে এই জার্মান আর্ট ফিল্মটির ‘এক্স’ মান কত হতে পারে।
অন্যদিকে আমার অন্য পার্টনার খুবই কালচারাল মাইন্ডেড ও জ্ঞান পিপাসু প্রগতিশীল মানুষ। বেশিরভাগ সময়ই সে অফিসে থাকে না। একাধারে সে জার্মান আর ফেঞ্চ ভাষা শেখার কোর্সের ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত। খুব নিষ্ঠার সাথে সে সাইদাবাদে বিভিন্ন সার্কাস দলের সার্কাস দেখে আর সন্ধ্যার পর কমলাপুরে যাত্রা দেখতে যায়। যতোক্ষণ অফিসে থাকে ততোক্ষণ মুজিব পরদেশী আর আকলিমা বিবির ১০০% পিওর বাংলাদেশি গানের ক্যাসেট শোনে। মুজিব পরদেশীর আশির দশকের প্রচণ্ড জনপ্রিয় যে গানটি বারবার শোনা হয় কি হয়, সেটি হচ্ছে :
আমি কেমন করে পত্র লেখি রে, বন্ধু
আমার গ্রাম, পোস্ট অফিস নাই জানা
তোমায় আমি হলেম অচেনা।
সাধক মনমোহনের মনের ব্যথা
বলা যায় না যথাতথা রে
আমি কার কাছে বলিবো ব্যথা রে
বন্ধু, কেউ নাই আমার আপনা।
১৯৮৬ সালে ঢাকার লোকসংখ্যা যখন মাত্র ৫০ লক্ষ তখন এ গানের ক্যাসেটটির নাকি ৯০ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছিল সারাদেশে।
পার্টনারের দেখাদেখি আমিও জনমানুষের সেলিব্রেটি দার্শনিক গায়ক মুজিব পরদেশী আর তরুণী গায়িকা আকিমা বিবির গানের ভক্ত হয়ে উঠি। এছাড়া নাম মনে করতে পারছি না মানিকগঞ্জ অঞ্চলের এমন এক বিখ্যাত বয়াতির একটি গান খুব বাজতো সব সময়, এটা হচ্ছে :
চিঠি দিয়া হইবেরে ডাকাতি
ও গ্রামবাসী
একদিন চিঠি দিয়া হইবেরে ডাকাতি
চিঠি দিয়ে ডাকাতি করার মধ্যে এক ধরনের প্রচন্ড বৈপ্লবিক পৌরুষ আছে যা কল্পিত বিপ্লবী হিসেবে আমাদেরকে খুব টানতো, যদিও পরে বুঝতে পেরেছি গানটিতে মোটেই বিপ্লবী তেজে বলিয়ান কোন উচ্চারণ ছিলনা বরং ওটি ছিল একটি পরম আধ্যাতিক ভাবধারার মরমি গান। যাই হোক এসব গান শোনার মাধ্যমে নিজের মধ্যেই আরেকটি প্রতিবাদী ব্যাপার ছিল, সেটা হচ্ছে শহুরে এলিট শ্রেণীর তথাকথিত প্রমিত সংস্কৃতির বিপরীতে জনমানুষের সংস্কৃতিকে সর্বসম্মুখে আলিঙ্গন করার সাহস দেখানো।
যাহোক যাহোক প্রসঙ্গে ফিরে আসি, এভাবে দুপুরবেলা দেখা যেত পুরো অফিসে আমি একলা বসে আছি ও এমডির (তখন ঘুমভাতে বিভোর) এক্সিকিউটিভ সুইভেল চেয়ার একা একা বসে দোল খাচ্ছি। কেননা সবে ধন নীলমণি মাসিক নয়শ টাকা বেতনের একমাত্র বেতনভুক্ত কর্মচারী ড্রাফটসম্যান ছোকড়াটা লাঞ্চ ব্রেকে খাবার খেতে ওর বাসায় চলে যেত , ফিরত অনেক দেরিতে। দেরি করে আসার পর তাকে জিজ্ঞেস করলে বলতো,
স্যার, নতুন বিয়ে করছি বোঝেনই তো। তাছাড়া কাজকাম তো কিছু নাই।
আমি মনে মনে ভাবি কি জিজ্ঞেস করবো, আমাদের পাঁচ পার্টনারের মধ্যে কেউই তখনো বিয়ে করিনি। বিয়ে করার সাথে দুপুরে বাসায় খেতে গিয়ে দেরি করার কি সম্পর্ক থাকতে পারে তা বোঝার মত জ্ঞান আমাদের কোন বিপ্লবীরই তখনো হয়নি। তাছাড়া ব্যাটা যে বলে অফিসে আগে ফিরে আসলে লাভ কি, আসলেই তো অফিসে কোন কাজ নেই।
তারপরও জীবনের প্রথম প্রফেশনাল জীবন খুব এনজয় করি, তবে গরমের দুপুর বেলা খুব বোরিং লাগে, একা অফিসে বসে বসে সময় কাটতে চায় না। অবশেষে সময় কাটানোর জন্য একটা বুদ্ধি করলাম। এর আগে প্রতিদিন বাসা থেকে টিফিন ক্যারিয়ারে করে মা খাবার দিয়ে দিত, এখন থেকে সেটা আনা বন্ধ করে দিলাম। মাকে খুব ভাব নিয়ে বললাম, আমি নানা রকম কর্পোরেট ক্লাইন্টদের সাথে মিটিং এ ব্যস্ত থাকি, টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার বহন করা আর সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে আমি দুপুরবেলা শান্তিনগর ও বেইলি রোডের অসংখ্য রেস্তোরার একেক দিন এক একটায় দুপুরের খাবার খেয়ে বেড়াই আর মনে মনে রিভিউ লিখি। কর্মহীন দুপুরবেলা এটাই আমার সৃজনশীলতার প্রজেক্ট।
বিকেলের কিছু আগে, সিনিয়র পার্টনার ঘুমভাত শেষ করে পরিস্কার ম্যাচিং স্লিপিং স্যুট পরে (তিনি সাংস্কৃতিকভাবে লুঙ্গি একদম বরদাস্ত করতে পারেন না) উপরে অলস পায়ে কাজকার্ম তদারকি করতে আসেন। তার সারা মুখমণ্ডলে নিরবচ্ছিন্ন ঘুম পরবর্তী একটা শান্ত, সুশৃংখল ও নির্মল সুখের ভাব বিরাজমান । অফিসে ঢোকার পর তার প্রথম কাজ হল এসব ‘গ্রাম্য’ গানগুলি বন্ধ করে দেওয়া। রবীন্দ্র সংগীত এবং মন্থর লয়ের অতুলপ্রসাদীয় গান ছাড়া অন্যান্য কোন ধরনের সংগীত তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
কি আর করা, গান বন্ধ হয়। আমি এমডি সাহেবকে চেয়ার ছেড়ে দিয়ে উঠে আমার নিজের টেবিলে এসে বসি। তারপর মনে মনে কাল্পনিক কোন প্রোজেক্ট নিয়ে ডিজাইন করতে থাকি আর ভাবি স্থাপত্য চর্চা করে মানুষ কিভাবে টিভি, ফ্রিজ (মাইক্রোওভেন তখন ছিল না), গাড়ি এসব কেনে। তখনো বিয়ে করিনি, প্রেমও করিনি, তাই বউ পালার জরিমানার হিসাব আমার তৎকালীন তালিকায় ছিলো না তবে আমি কিছুতেই কোন হিসাব মিলাতে পারতাম না।
পকেটে টাকা না থাকলেও ছোট্ট একটা গাড়ির স্বপ্ন দেখতাম । গাড়ি বলতে আমাদের স্বপ্নের সবচেয়ে চূড়ান্ত ফ্যান্টাসিতে যে গাড়ির ছবি ভেসে ওঠতো সেটা হচ্ছে দুই দরজার একটি রিকন্ডিশনড টয়োটা পাবলিক গাড়ি। বাংলাদেশে তখন সবচেয়ে কম দামি গাড়ি হচ্ছে রিকন্ডিশনড টয়োটা পাবলিকা। আর্কিটেক্টদের যেকোন সমাবেশে বা সেমিনারে সময় পার্কিংয়ে যে গাড়িগুলোকে দেখা যায় তার মধ্যে ৯০% ছিলো এই টয়োটা পাবলিকা গাড়ি। আমার দেখা মতে, শুধুমাত্র মীর মোবাশ্বের আলি স্যার আর ওয়ারেস স্যারের যথাক্রমে নীল রঙের ও হলুদ রঙের একটি করে ছোট টয়োটা স্টারলেট গাড়ি ছিল। প্রফেসর ইফতেখার মাযহার স্যারের গাড়িটিও ছিলো টয়োটা পাবলিকা। সারের গাড়িটি সব সময়ই খুব ঘন ধুলোর আস্তরণে ঢাকা থাকত। স্যার খুব মেধাবী মানুষ ছিলেন, ধুলোর প্রলেপ লেগে থাকা তার গাড়িটির এ অবস্থাকে তিনি ডিফেন্ড করতেন ব্যাক উইনশীল্ডে লাগানো খুব সুন্দর Intellectual wit সমৃদ্ধ একটি স্টিকারের মাধ্যমে, যেটিতে লেখা ছিলো,
” This Dirt is Under Scientific experiment, do not touch the car “
তবে আমাদের চার পার্টনারই দিন রাত চেষ্টা করতাম কিভাবে ক্লায়েন্ট পটানো যায়, কিভাবে একটা কাজ পাওয়া যায়। প্যান্টের পকেট ভর্তি নেম কার্ড নিয়ে কারণে অকারণে বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের কাছে যেতাম কাজের আশায়। বিয়ের আসরে, সামাজিক বা পারিবারিক নানা রকম অনুষ্ঠানে গোয়েন্দাদের মত নজরদারি করতাম কোন প্রসপেক্টিভ ক্লায়েন্ট দেখা যায় কিনা। এভাবে যদি ভাগ্যক্রমে কখনো কোন আসল অথবা নকল ক্লায়েন্টের মুখোমুখি হতাম তখন তাকে অতিশয় বিনয়ের সাথে বলতাম,
আমি একজন আর্কিটেক্ট।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্লায়েন্ট বলতেন,
জ্বি ওমুকের কাছে শুনেছি, আপনি একজন ইঞ্জিনিয়ার।
ব্যাটাদেরর উত্তরে পিত্তি জ্বলে যেতো, তবুও বহু কষ্টে ক্রোধ দমন করতাম কেননা গুরুর শিক্ষা, এ শাস্ত্রে ক্লায়েন্টের সাথে ক্রোধ সর্ব অবস্থায় বর্জনীয়, তাই খুব বিনয়ের সাথে বলতাম,
জ্বি,মানে, ইঞ্জিনিয়ার না, আর্কিটেক্ট।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাটারা আমার মৃদু ও অতি দুর্বল প্রতিবাদের তেমন পাত্তা দিতেন না, বলতেন,
জ্বি জ্বি, জানি আপনি একজন আর্কিটেকচার।
তখন চিন্তা করতাম, সম্ভ্রম রক্ষার এ তর্ক বেশি দূর আরো আগালে, আম আর ছালা তো যাবেই, সাথে পুরো আম গাছও হাওয়া হয়ে যেতে পারে। তাই নিজেকে একজন অথবা একটি আর্কিটেকচার ভেবেই অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করতাম আর ভাবতাম পাঁচ বছর এত কষ্ট করে পড়াশোনার পর শেষমেষ আমি এখন আর মানুষ নই, আমি হয়ে গেছি একটি নিরেট ও স্থবির আরকিটেকচার। আমার শরীর থেকে এদিক সেদিক প্রজেক্টেড হয়ে বেরিয়ে আসছে সারি সারি দরজা, জানালা আর বেশ কয়েকটি ঝুল বারান্দা। আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পেঁচিয়ে উঠে যাচ্ছে ধাপধাপ সিঁড়ি। আমার শরীরের ভেতরই বেডরুম, ড্রয়িং রুম, ডাইনিং রুম। মানুষ টিভি দেখছে, ভাত খাচ্ছে, বাথরুমও করছে, কারণ আমি হচ্ছি একজন আর্কিটেকচার।

বুয়েটে আমাদের ব্যাচটি ছিলো একদম ভিন্ন ধরণের একটি ব্যাচ। ১৯৮৮ সালে পাশ করা আমাদের আর্কিটেকচার ব্যাচকে ডাকা হয় ZERO BATCH বলে কেননা এতো কষ্টের ফাইনাল থিসিস সাবমিশনের শেষ পার্টে আমাদের পুরো ব্যাচকে শিক্ষকরা একত্রে সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাইকে শূন্য দিয়েছিলেন। শিক্ষকরা মাঝে মাঝে প্রচণ্ড ভাবে ইগো দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থেকেন, তাঁরা ভুলে যান তাদের হতে হয় সহানুভূতিশীল ও স্নেহপরায়ণ। প্যারাডক্স হচ্ছে, আমাদের ZERO BATCH এ-ই জন্ম নিয়েছে সারা পৃথিবীতে পরিচিত ও এদেশের স্থাপত্যকে চীরদিনের জন্যে বদলে দেয়া অনেক স্থপতি।
আমাদের চারজনের মতো আমাদের জিরো ব্যাচের আরো কয়েকজন মিলে নতুন এমন কয়েকটি এডভেঞ্চারাস স্থাপত্যের ফার্ম চালু করেছিলো। এর মধ্যে সাগর, মাকসুদ, হুদা আর আবদুল হক শাহিন মিলে ‘কর্ষক’ নামে একটি ফার্ম আর বিকাশ, রফিক আজম, বাবলা, ইয়াসিন আর আমাদের ফার্স্ট গার্ল বনু মিলে ‘স্থাপতিক’ নামে আর একটি ফার্ম চালু করেছিলো বলে মনে পড়ে। কর্ষকের এক পার্টনার এখন নিউজিল্যান্ডে ও একজন অস্ট্রেলিয়ায় প্ল্যানার হিসেবে কর্মরত , সাগর বাংলাদেশে আর মাকসুদ সিনহা এখন স্থাপত্য ছেড়ে Waste Management নিয়ে কাজ করে বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছে। অন্যদিকে স্থাপতিকের ইয়াসিন আর বনু এখন আমেরিকায় আর বাকিরা বর্তমানে নিজ নিজ ভিন্ন ভিন্ন ফার্ম চালায় এবং প্রত্যেকেই বিখ্যাত স্থপতি, এর মধ্যে রফিক আজমের খ্যাতি সারা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রাসঙ্গিক অপ্রাসঙ্গিক অনেক গল্প বলে ফেললাম, শেষমেষ আমাদের সেই রূপকথার মত স্থাপত্যের ফার্মটি সর্বমোট ১৩-১৪ মাস চলে ছিল, তারপর আমরা সবাই যার যার মত বিভিন্ন দিকে যাত্রা করি, তবে আমাদের মধ্যে সে সুসম্পর্ক ও নস্টালজিক অতীতের সুন্দর সময় গুলোর রেশ এখনো রয়ে গেছে । প্রনয়ণের যে চিটাগং ব্রাঞ্চটি ছিলো দিনশেষে সেটাই আসল প্রনয়ণ হিসেবে রয়ে গেছে, আজ সেটি চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম স্থাপত্য ফার্ম।
এখানে যে ছবিটি দেখা যাচ্ছে সে ছবিটি সত্যি সত্যি ঠিক আমাদের ওই চিলেকোঠার অফিসে টেবিল ফ্যানের বাতাস খেতে খেতে একা একা কোন এক কর্মহীন দুপুর বেলা শিল্পী নিতন কুন্ডুর বিখ্যাত অটোবি ব্র্যান্ডের সুইভেল চেয়ারে বসে দোল খেতে খেতে তোলা।
১১ জানুয়ারি, ২০২৬
https://www.mahfuzulhuqzaglul.com/