আমি কোথাও যাবো না

আসন্ন মৃত্যুর নরম তোশকে হাত-পা টানটান করে
শুয়ে আছেন বৃদ্ধ,
তাঁকে ঘিরে স্বজনদের গুনগুন জটলা,
তাদের চোখে ভেজা দুঃখ, দেহ ভাষায় নিঃশর্ত সমর্পণ।
কারো কারো কপালে অবশ্য কিছুটা বিরক্তির ভাঁজ,
বিনা কারণে এরা ছোটাছুটি করছে এদিক-সেদিক,
কারো কারো হাতে চকচকে হরলিক্সের বৈয়ম,
বেদানা-আঙুর, গাছপাকা শবরি কলা।
বিদেশ ফেরত একজনের হাতে একঝাঁক তাজা গোলাপ ফুল
তিনি ব্যস্ত চোখে সঠিক মাপের ফুলদানি খুঁজছেন।
বৃদ্ধের নাকে সরু সাপের মতো লিকলিকে ফিডিং পাইপ,
মুখে ঘোলাটে অক্সিজেন মাস্ক,
খাবার কিম্বা ফুলের সুগন্ধ, সবই তার জন্য বারণ,
তবু এতো কিছু এরা কেন এনেছে তিনি ভাবতে চেষ্টা করেন,
বৃদ্ধ বুঝতে পারেন, এগুলো যতোটুকু না পথ্য
তার চেয়ে অনেক বেশি সাইনবোর্ড,
ভালোবাসার সাইনবোর্ড।
ভালোবাসা, আদর, আনুগত্য, বিনয়,
একমাত্র মায়ের ভালোবাসা ছাড়া সব কিছুতেই
এখন সাইনবোর্ড খুব প্রয়োজন।
ভাবতে ভাবতে ঘোরের মধ্যেই বৃদ্ধের মৃদু হাসি পায়,
তাই তার ঠোঁট ঈষৎ নড়ে ওঠে,
ঠোঁট নড়তেই সবাই ‘পানি পানি’ বলে চিৎকার,
তার ঠোঁট বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে,
সবাই উৎসুক চোখে স্থির তাকিয়ে থাকে।
একঘেয়ে অপেক্ষার এবার বুঝি মাহেন্দ্রক্ষণ,
কিন্তু বৃদ্ধ কারো চোখে চোখ রাখেন না,
তিনি জুলুজুলু চোখে তাকিয়ে থাকেন জীর্ণ ছাদের দিকে।
সমগ্র জীবনের পরিচিত ভূতগুলো
আস্তে আস্তে সব ফিরে আসছে,
তিনি বেশ মজা পাচ্ছেন।
নোনা ধরা ছাদের পলেস্তারার ছায়ায় ছায়ায়
চলচ্চিত্রের মতো তিনি দেখতে থাকেন চেনা চেনা মুখ,
এ ছাদেরই ঢালাই মিস্তিরি রশিদ মোল্লা,
রড বাধাইকর আবুয়াল,
প্লাস্টারের জাদুকর চাপাইয়ের পেয়ার মোহাম্মদ,
আহহ, কাজ শেষে গভীর রাতে কী সুন্দর বাঁশি বাজাতো
পেয়ার মোহাম্মদ।
পাড়ার মুয়াজ্জিন সাহেবকেও দেখতে পাচ্ছেন এক কোণে,
অন্ধকার রাতে যিনি লুকিয়ে আসতেন পেয়ারের বাঁশি শুনতে,
বাঁশি শেষে কী দরদ দিয়ে দাউদ নবীর বাঁশির গল্প শোনাতেন।
দূরে, আবছা আলোয় লাজুক ঘোমটা পরে মা বোধ হয় দাঁড়িয়ে,
একবারের মতো বাবার দৃঢ় প্রশান্ত মুখখানাও
বুঝি দেখলেন তিনি।
অতিথি মুখগুলোকে উন্মুখ হয়ে খুঁজতে থাকে তার দৃষ্টি,
সত্যি বলতে গেলে, তিনি বেশ উপভোগ করেন এই পুনর্মিলন।
ক্লাস সেভেনে পানিতে ডুবে গিয়েছিল যে মোবারক,
তাকেও চিনতে পারছেন এবার,
মোবারকের বাহারি স্ট্যাম্পবুকটা চুরি করেছিল সে,
মোবারক কি ওটা ফেরত চাইতে এসেছে?
বিন্দু বিন্দু অনুশোচনা তার ঘোলা চোখের কোনায় কোনায়
জমা হতে থাকে,
এক জীবনের কতো পাপ, কতো স্খলন,
কতো ক্লেদ, কতো গ্লানি,
পাপেরা সব একে একে ভূত হয়ে ফিরে আসছে,
বৃদ্ধের চোখে এখন আদিগন্ত পরিব্যাপ্ত পাপের এনিমেশন।
কিন্তু তাকে তেমন ভীত মনে হলো না,
কেননা, তিনি এখন প্রকৃতির অঙ্ক বুঝতে পারছেন,
সরল সূত্রের মতো তিনি দেখতে পারছেন,
প্রকৃতি মানুষকে অবশ্যই তার আপন মুদ্রায় পরিশোধ করবে,
পর্বতের নিচ থেকেও পাপ একদিন ঠিকই উঠে আসবে।
তার সমগ্র মুখাবয়বে ক্রমশ ফুটে উঠছে
অজস্র বিক্ষিপ্ত অনুতাপ রেখা,
তার চোখ বেয়ে গলিত মোমের মতো
টলটল করে গড়িয়ে পড়ছে পরিতাপ,
তিনি তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত দু’হাত তুলে ক্ষমা চাইতে চাইলেন,
কিন্তু তার হাত নড়লো না।
হঠাৎ কোত্থেকে যেন প্রিয় দাদাজানের সৌম্যকান্তি
মুখখানা ভেসে আসলো,
কী অদ্ভুত ভালো মানুষ ছিলেন দাদাজান,
ছোট শিশুদেরও তিনি সম্বোধন করতেন আপনি আপনি বলে,
কী প্রগাঢ় বিনয়ের সাথে তিনি পাঠ করতেন,
‘আমি নির্দোষ নই, মানুষের মন তো অবশ্যই মন্দ কর্ম প্রবণ,
কিন্তু তিনি নন যার প্রতি তার প্রভু দয়া করেন।’
প্রত্যহ সকাল ও সন্ধ্যায় কী গভীর বিনীত বিশ্বাসে
তিনি উচ্চারণ করতেন,
‘আমার প্রভু তো অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।
বৃদ্ধ অনুভব করলেন সারা জীবনের পাপকে পিছনে ফেলে
সর্বব্যাপী দয়া ও ক্ষমার এক স্নিগ্ধ আলোর ওপারের আলো
তাকে আস্তে আস্তে ঘিরে ধরছে,
এক অভূতপূর্ব জ্যোতির্ময় ভীত-বিহ্বলতায়
তিনি দয়া আর ক্ষমাকে আলিঙ্গন করলেন।
অতিপ্রাকৃত এক পরম তৃপ্তি তার সমগ্র সত্তাকে ভিজিয়ে দিলো,
একই সাথে তিনি ক্লান্ত ও উজ্জীবিত বোধ করতে লাগলেন।

ঘিরে ধরা উদ্বিগ্ন মানুষগুলো হঠাৎ সব সরে দাঁড়ালো,
এখন তার মাথার ওপর পুরু চশমা পরা ভাবলেশহীন একখানা গোলাকার মুখমণ্ডল,
তীব্র ডেটলের গন্ধ,
ইনি নিশ্চয়ই ডাক্তার সাহেব।
বৃদ্ধ ভাবতে থাকেন,
ডাক্তার সাহেবদের নিঃশ্বাসে এতো ডেটলের গন্ধ কেন?
আচ্ছা,
ভালোবাসার মানুষগুলোর গায়ে তো কেমন আচ্ছন্ন করা মায়াবী গন্ধ থাকে,
যারা ভালোবাসতে জানে তাদের গায়ে কী
তীব্র ডেটলের গন্ধ থাকতে নেই?
ডাক্তার সাহেবের প্রিয়তম স্বজনেরা নিশ্চয়ই তার গায়ে
কখনো ডেটলের গন্ধ পান না,
কী আশ্চর্য,
এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো না জেনেই তাকে চলে যেতে হচ্ছে,
এর কোনো মানে হয়?

তার খুব জানতে ইচ্ছে করছে,
তার এই ছোট্ট বিছানাকে ঘিরে জগতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যে ভালোবাসাগুলো বিশাল সাইক্লোনের মতো
এখন ক্রমশ পুঞ্জীভূত ও প্রসারিত হতে হতে
আকাশের ওপারের আকাশকেও ছুঁয়ে যাচ্ছে,
ওই অনন্ত মহাকাশের প্রতিটি অণু-পরমাণু কী এই অবোধ ভালোবাসাগুলোর সাথে যুক্ত নয়?
উদাত্ত কণ্ঠে বৃদ্ধের বলতে ইচ্ছা করছে,
হে মহাবিশ্ব, হে অনন্ত নক্ষত্রমালা, হে ঘূর্ণায়মান নীহারিকা পুঞ্জ,
আমি যতো ক্ষুদ্রই হই আমাকে ছাড়া তোমরা কিন্তু অসম্পূর্ণ,
আর আমি,
এই ক্ষুদ্র আমি,
আমিও তোমাদের ছাড়া পূর্ণ নই।
তোমরা আসো, আমাকে আলিঙ্গন করো,
চলো আমরা পরিপূর্ণ হই।

তার ছোট্ট বিছানাকে ঘিরে উৎকণ্ঠিত মানুষগুলোর দিকে তিনি এবার চোখ ফেরান,
মৃত্যুর বিছানায় মানুষ বোধ হয় প্রথমবারের মতো
জগতের দর্শনকে বুঝতে শেখে।
তার জিহ্বা নড়ছে না,
তবু প্রিয় দার্শনিকের মতো তার বলতে ইচ্ছে করছে,
মানুষের ভালোবাসা এতো অবুঝ কেন?
নিশ্চিত নিয়তি জেনেও তোমরা এতো উদ্বিগ্ন কেন?
তোমরা যে এতো বিপুল ভালোবাসা নিয়ে আমাকে ঘিরে আছো,
তোমরা কী জানো না,
ভালোবাসা মানুষকে কখনো সুখী করে না,
ভালোবাসা একটি বিরাট যুদ্ধক্ষেত্র
ভালোবাসা সুযোগ পেলেই তোমাকে আহত করবে,
তোমাকে রক্তাক্ত করবে,
ভালোবাসার মানে প্রতিনিয়ত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা,
প্রতি মুহূর্তে হারিয়ে ফেলার ভয়,
ভালোবাসা তোমাকে পরিতৃপ্ত করবে, কখনো সুখী করবে না।
সুখ যখন বুঝবে তুমি তাকে খুঁজছো
সে চপল কিশোরীর মতো পালিয়ে বেড়াবে,
তুমি যখন তাকে একদম খুঁজবে না
সে তোমাকে ঠিক খুঁজে নেবে।

তার হাত হঠাৎ নড়ে ওঠে, কড়া গুনতে গুনতে তেরোতে এসে স্থির হয় তার আঙুল,
তিনি তেরোজন পৌত্র-পৌত্রী রেখে যাচ্ছেন,
তেরোটি বিপুল সম্ভাবনাময় পুষ্পপল্লবিত বৃক্ষ।
শেষবারের মতো চোখ বুঝবার আগে,
তার সন্তানদের কথা তার তেমন মনে আসে না,
তার শুধু মনে আসে তেরোটি বাড়ন্ত বৃক্ষের মুখ।
এই প্রথম নিজেকে খুব পরিতৃপ্ত মনে হয় তার,
মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে তার বলতে ইচ্ছে করছিল,
তোমরা কাঁদছো কেন,
আমি এখন তৃপ্ত, আমি এখন সুখী,
কারণ আমি এখন হারিয়ে ফেলার ভয় হারিয়ে ফেলেছি,
যে হারিয়ে ফেলার ভয় থেকে মুক্ত, সে সুখী।
যে পাপকে স্বীকার করতে পারে, সে সুখী।
যে তার প্রভুর দয়ার প্রতি আস্থা রাখে, সে সুখী।
আমি আর কখনো হারিয়ে যাবো না,
এই বৃক্ষদের মাঝেই আমি নিরন্তর বিকশিত হবো,
ফুল, ফল, পাতা ও শিহরিত বীজের গাত্রে গাত্রে,
সূর্যালোকের পরম তাপে তাপে,
ঘোরলাগা জোছনার মায়ায় মায়ায়,
প্রলম্বিত হয়ে হয়ে,
পূর্ণিমার জোয়ার জোয়ারে,
মৃত্তিকার অমৃত সুঘ্রাণে সুঘ্রাণে,
আদিগন্ত পল্লবিত ও প্রসারিত করবো আমি আমার অস্তিত্ব।
আমি আছি, আমি থাকবো, আমি কোথাও যাবো না।

মাহফুজুল হক জগলুল
১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

আরও পড়ুন