আমি একসময় খুব আলপনা আঁকতাম। ভালো খেলোয়াড়দের যেমন খেপে খেলতে নিয়ে যায়, আমাকেও তেমন বন্ধুবান্ধব বা বড় ভাইয়েরা নিয়ে যেতো নানা অনুষ্ঠানে আলপনা আঁকতে। এর মধ্যে দুটি একস্ট্রা মজা ছিল—এক, সবাই খুব খাতির করতো, আমিও বেশ ভাব নিতাম—চা, দামি সিগারেট আর সঙ্গে নানা রকম উপাদেয় চর্ব্য-চোষ্য, লেহ্য-পেয়। দুই, বিভিন্ন পরিবেশে বিচিত্র মজার মজার অভিজ্ঞতা হতো। প্রতিবছর সবচেয়ে বড়ো আলপনাগুলো আঁকতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির লাল ওপেন করিডরে, যখন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন নবীন বরণ অনুষ্ঠান করতো। আমি অন্য বিভিন্ন বাম সংগঠনের জন্যও এঁকে দিতাম। তবে সবচেয়ে বড়োটা আঁকতাম জাসদ ছাত্রলীগের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে, যেহেতু আমি এই সংগঠন করতাম। লাল করিডরের ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর ক্রিম কালার দারুণ
ফুটতো। এই আলপনাগুলো আঁকতাম রাত তিনটার পর। গভীর রাতে একা আলপনা আঁকার অন্য রকম একটা গা ছমছমে অনুভূতি ছিল, সঙ্গে ফ্লাস্কে গরম দুধচা আর উপস্থিত দলের দু-চারজনের সঙ্গে নিস্তব্ধ রাতের আড্ডাবাজি, আহ্ সেই যে দিনগুলো!
১৯৮৬ সালে আমার ১৬টি আলপনার একটা প্রিন্ট সংকলন সেট বের হয়। সংকলনটির নাম ছিল ‘নৈবেদ্য’। প্রকাশক ছিল আমাদের দুই বছরের জুনিয়র, স্থাপত্যের ছাত্র মাহবুব। প্রতি সেট ২০ টাকা। ১৯৮৬ সালে ২০ টাকা অনেক টাকা। তখন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিতুমীর হলে ৪.২৫ টাকায় দুপুরে ভরপেট লাঞ্চ পাওয়া যেতো। কয়েক দিনের মধ্যেই একুশের বইমেলায় এই সেট কয়েক হাজার কপি বিক্রি হয়ে গেলো। আমি কিছুটা বিখ্যাত হয়ে উঠলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে বিখ্যাত হওয়া খুব মজার অভিজ্ঞতা।
বাংলা একাডেমির প্রশাসনিক শক্তি তখন এখনকার মতো ছিল না। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সর্বদা টগবগিয়ে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর বুয়েটের অনেকটা পেটের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় বাংলা একাডেমিকে আমরা অনেকটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটা সম্প্রসারিত ক্যাম্পাস মনে করতাম। একুশের বইমেলায় যেখানে খুশি সেখানে টেবিল-চেয়ার নিয়ে বসে পড়তাম। অনেকটা যেন আমাদের নানা বাড়ির উঠান, বাধা দেওয়ার সাহস কারো নেই। কিন্তু হঠাৎ কিছুটা সাহস দেখালেন নতুন ডিজি প্রখ্যাত কবি ও গীতিকার প্রফেসর আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তিনি তখনো চার্জ বুঝে নেননি, সবেমাত্র এরশাদ কর্তৃক মনোনীত হয়েছেন (এরশাদ কর্তৃক মনোনীত যেকোনো পদধারী লোককেই আমরা আমাদের শত্রুপক্ষ বা সরল বাংলায় দালাল মনে করতাম এবং তাঁদের সঙ্গে সে রকম আচরণই করতাম)। তাই নতুন প্রাপ্তিতে তাঁর রক্ত কিছুটা গরম ছিল বোধ হয় তখন। হঠাৎ একদিন তিনি তাঁর পাইক-পেয়াদা নিয়ে মেলায় হাজির হলেন। আমাদের খোলা আকাশের নিচের অনুমোদনহীন টেবিল-চেয়ারের স্টল দেখে মনে হয় ঠিক করলেন তাঁর গরম ভাব দেখানোর জন্য আমারই সবচেয়ে উপাদেয় হবো। তিনি আমাদের কাছে এসে প্রচণ্ড শুদ্ধ বাংলায় যা বললেন তার মোদ্দা কথা হচ্ছে—কোনো অনুমোদনহীন
স্টল থাকতে পারবে না, আমাদের এখনই উঠে যেতে হবে। আমি দেখলাম, উনাকে এখন ভালো ডোজ দিতে হবে, তা না হলে মহাবিপদ। আমি আশপাশে তাকিয়ে দেখলাম, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বহু কর্মী ঘুরে বেড়াচ্ছে মেলায়, অবস্থা আমাদের অনুকূলে।
আমি খুব জোরে চিৎকার করে বললাম,
মুক্তিযুদ্ধে আপনার ভূমিকা কী, জাতি জানতে চায়?
(মানুষকে ভড়কে দিতে চাইলে আমরা প্রায়ই ‘জাতি জানতে চায়’—এই ধরনের বাক্য ব্যবহার করতাম) । আমার ডোজে ভালো কাজ হলো। ইতিমধ্যে আমাদের চারদিক থেকে অনেকে জড়ো হয়ে গেলো। দু-একজন রসিক যুবক টুকটাক স্লোগান দিতে শুরু করলো। পাইক-পেয়াদাদের মধ্যে যারা পূর্ব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তারা নীরবে সরে পড়লো… ডিজি সাহেব আর কোনো উচ্চবাচ্য না করে সটকে পড়লেন। এরপর থেকে মেলায় আমার আলপনা আর স্থাপত্য ছাত্র সংসদের একুশে সংকলন বিক্রিতে আর কোনো আসুবিধা হয়নি ।
আমাদের অনেকের প্রাথমিক বিপ্লবী রাজনৈতিক গুরু ছিল স্থাপত্যের ছাত্র সামিয়ান খুরশেদ।সে ছিল প্রচণ্ড পণ্ডিত কিন্তু চরম নিভৃতচারী, অনেকটা জাসদের রহস্য পুরুষ দাদা সিরাজুল ইসলাম খানের মতো। সে আমার আলপনা আঁকা ও সংকলনে খুব বিরক্ত হলো. আমাকে একদিন ডেকে বললো,
আমাদের হাতে থাকবে শ্রেণিশত্রু খতমের হাতিয়ার, গ্রেনেড, আগ্নেয়াস্ত্র, গায়ে বারুদের গন্ধ, তোর হাতে মেয়েলি তুলি, ব্রাশ আর গায়ে রঙের গন্ধ, তুই তোর বিপ্লবী দ্রোহের ইমেজ নষ্ট করে ফেলছিস।
আমি মিনমিনিয়ে বললাম,
যুদ্ধটা তো সুন্দরের পক্ষেই। সুন্দরের সঙ্গে বিপ্লবের বিরোধটা কোথায়?
ও বললো,
তোর ওই নৈবেদ্য ফৈবেদ্য বাদ দে। পার্টির কাজে মন লাগা।
আমরা তখন স্লোগান দিই,
আমরা সশস্ত্র হবো প্রতিটি মৃত্যুতে।
শ্বেত ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে লাল ব্যারিকেড গড়ে তোলো।
লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই।
গত এক শতাব্দী ধরে উপমহাদেশে বামপন্থীদের কমন স্লোগান ছিল—দুনিয়ার মজদুর এক হও, এক হও। আমরা সেই স্লোগান বদলিয়ে ফেললাম। আমরা বলতে লাগলাম,
দুনিয়ার মজদুর এক হও, লড়াই করো।
লড়াই ছাড়া আমাদের কোনো কথা নাই। শুধু লড়াই চাই। আমি তখন এমন একটি বিপ্লবী টগবগে সংগঠনের সিনিয়র নেতা, এ রকম বিপ্লবী বারুদ গন্ধময় আবহের ভেতর আমাকে কি এই সব মেয়েলি আলপনা ফালপনা টাইপ ম্যারম্যারা জিনিস মানায়? সামিয়ানের কথাই সঠিক। গুরু কখনো ভুল করে না।
মজার কথা হলো, বছর পেরোতে না পেরোতেই গুরু প্রবল সব প্রেমের কবিতা লিখতে শুরু করলো। ক্লাসে আসা মোটামুটি বন্ধ করে দিলো, সারা দিন কাটায় নজরুল ইসলাম হলে দম বন্ধ করা এক রুমে, কবিতাই তখন তার জীবন ও জগৎ। শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ তখন সবেমাত্র প্রকাশিত হয়েছে। এই বইটি তার সর্বক্ষণের সঙ্গী, সারা দিন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এই বই পড়ে। তার কবিতার প্রধান বিষয় বাংলার চিরায়ত প্রাকৃতজনের প্রেম ও সহজাত দর্শনচিন্তা। আমাকে ডেকে নিয়ে রুম বন্ধ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওর লেখা প্রাকৃতজনের প্রেমের ঘোরলাগা কবিতাগুলো শোনায়।আমি অবাক বিস্ময়ে ওর অদ্ভুত সুন্দর সেসব কবিতা শুনি। সত্যি কথা বলতে গেলে আমার একটু হিংসাও হয়। কেননা আমিও একটু-আধটু লিখতাম, ওর লেখার কাছে আমাকে নিতান্ত শিশু মনে হতে লাগলো।
আমার কানে আজও ওর কবিতার সেই সব মায়াবী শব্দগুচ্ছ ভেসে আসে। যে মানুষ আমার আলপনা আঁকা সহ্য করতে পারতো না সে কবিতার টানে এক স্টেজে এসে পড়াশোনাই ছেড়ে দিলো। কুমিল্লা চলে গেল বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে। তার আর স্থপতি হওয়া হয়নি। কবি হয়াও হয়নি। বিপ্লবীও হতে পারেনি। কয়েক বছর আগে অনেকটা নীরবেই তার মৃত্যু হয়, আমরা তেমন কেউ তার খোঁজ রাখিনি। তখন আমাদের প্রিয় কবিতার বই ছিল নির্মলেন্দু গুণের ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’। প্রকৃত কবিরা তাঁর সমসাময়িক কালের যুগযন্ত্রণাকে ধারণ করতে পারেন। সামিয়ানের মতোই আমাদের কালের আমরা শেষমেশ না হতে পারলাম ভালো গৃহী ,না হতে পারলাম শুদ্ধ বিপ্লবী। কেবল মাত্র বিপ্লবের দাহ আর স্বপ্নকাতর নস্টালজিয়া নিয়ে কাটিয়ে দিলাম সীমাবদ্ধ ও অপ্রস্তুত গার্হস্থ্য জীবন। দিনশেষে নির্মলেন্দু গুণের সেই ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ মতোই কিছু একটা হয়েই রইলাম।
আমি শুধু সামরিক আদেশ অমান্য করে হয়ে গেছি
কোমল বিদ্রোহী, প্রকাশ্যে ফিরছি ঘরে
অথচ আমার সঙ্গে হৃদয়ের মতো মারাত্মক
একটি আগ্নেয়াস্ত্র, আমি জমা দেই নি।
(নির্মলেন্দু গুণের ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ গ্রন্থের ‘আগ্নেয়াস্ত্র’ কবিতা থেকে)
অনেকটা গান পয়েন্টে বহু বছর পর ৭/৮ ফিট ডায়ামিটার ছবির এই আলপনাটি আমি আঁকি প্রায় দুই বছর আগে আমার ভাইঝির গায়েহলুদে, এরপর আর আলপনা আঁকিনি। ভুঁড়ি হয়ে যাওয়ায় বসে আলপনা আঁকা এখন এক বিরাট দিকদারি ব্যাপার, তবে আমার মেয়ের বিয়ে এখনো বাকি, সর্বশেষ শুধু সেই আলপনাটি আঁকার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি, ইনশাল্লাহ।
২৮ জুন, ২০২০




