ওদিকে জাহীদের সঙ্গে দেখা হলেই বলে, কী রে, কবে প্রকাশিত হবে তোর ‘খাকি ভূতের আছর’। আমি ইনিয়েবিনিয়ে এটা-সেটা বলে এড়িয়ে যাই। কী করি… কী করি। আমি তখন মানসিকভাবে খুব ক্লান্ত হয়ে গেছি, কিন্তু আশা সম্পূর্ণ ছাড়িনি—‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। কয়েক দিন অপেক্ষা করে আমরা আবার গেলাম শেখ সাহেব বাজারের সেই খাজার আর্ট প্রেসের মালিক বিশাল হৃদয় সেলিম সাহেবের কাছে। এবার আংশিক সফল হলাম, সেলিম সাহেবের মনটা এবার একটু নরম হলো, অথবা তিনি আগের চেয়ে সাহসী হলেন। তিনি এক শর্তে রাজি হলেন, ব্লক আমরা করে আনবো যেভাবে পারি, উনি শুধু গভীর রাতে গোপনে প্রিন্ট আর বাঁধাই করে দেবেন। আমরা আবার ‘গিয়ারে’ চলে এলাম। ওখান থেকে সোজা চলে গেলাম আবার সেই নয়া পল্টনের গ্রাফিকস সিস্টেমসের হালিম সাহেবের কাছে, ভাগ্য ভালো, সেদিন উনার বড়ো ভাই রহিম সাহেব অফিসে ছিলেন না। পরিবেশ অনেকটা আমাদের অনুকূলে। হঠাৎ চোখ টিপ দিয়ে মঞ্জুর ভাই আমাকে বাইরে বসিয়ে রেখে পরম বন্ধুর মতো হালিম সাহেবের কাঁধে হাত রেখে উনাকে নিয়ে স্টুডিওর ভেতরে চলে গেলেন, তারপর ১৫-২০ মিনিট ভেতরে থেকে কী জানি ভুজুংভাজুং দিয়ে উনাকে তিনি রাজি করিয়ে ফেললেন। উনার সেই ভুজুংভাজুং আজও আমার কাছে এক অজানা রহস্য। মঞ্জুর ভাইয়ের ঝুড়িতে এমন অনেক রহস্য আছে, যারা তাঁকে চেনে তারা মাঝেসাঝে তাঁর সেসব রহস্যের স্বাদ আস্বাদন করেছে। দুই বছর পর ১৯৮৬ সালে স্থাপত্য বিভাগ ছাত্রসংসদে উনি আর আমি যথাক্রমে সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলাম। তখন স্থাপত্য ছাত্রসংসদ অনেক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছিল। মঞ্জুর ভাইয়ের পতন ছিল পাঁচতলা থেকে আর আমাকে পুলিশ ফেলে দিয়েছিল দোতলা থেকে। দুজনেরই এই পতনজনিত যোগ্যতার কারণেই বোধ হয় আমাদেরকে নির্বাচিত করা হয়েছিল।
কয়েক দিনের মধ্যেই চব্বিশটা কার্টুনের ব্লক নিয়ে সন্ধ্যার পর সেলিম সাহেবের দেওয়া সময় অনুযায়ী আমরা খাজা আর্ট প্রেসে হাজির হলাম। উনি বোধ হয় ভেবেছিলেন এই বিপজ্জনক জিনিসের ব্লক আমরা করাতে পারবো না। সেলিম সাহেব আমাদের প্রেসের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজে বাইরে থেকে মেইন গেট তালা দিয়ে দিলেন। প্রেসের ওপরতলায়ই তিনি সপরিবারে থাকতেন। কিছুক্ষণ পরই তিনি পেছনের ছোট দরজা দিয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত হাসি হাসতে হাসতে আমাদের কাছে এলেন। শুরু হলো প্রিন্ট পর্ব। সাধারণত ট্রাডল মেশিনে অনেক লেখার ফন্টের মাঝে একটা-দুইটা ব্লক থাকে, আমাদের শুধু চব্বিশটা মাঝারি সাইজের ব্লক, কোনো লেখা নেই। শুধু ব্লক প্রিন্টিংয়ের সময় আটকে থাকতে চায় না, ফর্মা থেকে বেঁকে বের হয়ে আসে। অনেক চেষ্টার পরও প্রিন্ট করা গেলো না।
উনি বললেন, ‘আপনারা চইলা যান, আগামী রাত্রে আবার চেষ্টা কইরা দেখি, তিন-চার দিন পরে ফোন দিয়েন।’
তিন-চার দিন অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য আমাদের ছিল না, দুই দিন পরই ফোন দিলাম।
উনি বললেন, ‘পরশু রাত্রে আইসা নিয়া যাইয়েন।’
মানুষ অধিক শোকে পাথর হয়, আমি অধিক সুখে পাথর হয়ে গেলাম।
মহানন্দে নির্দিষ্ট দিনে প্রায় সাত হাজার পাঁচশ টাটকা কড়কড়া খাকি ভূত নিয়ে শেখ সাহেব বাজার থেকে সোজা তিতুমীর হলে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখলাম। ভূত খাকি হলেও এই মিনি সাইজ কার্টুন পত্রিকার কাভারে ব্যবহার করেছিলাম টকটকে লাল আর নীলাভ বেগুনি রঙের পোস্টার পেপার। খাকি রঙের পোস্টার পেপার পাওয়া গেলে আমি অবশ্য খাকি রঙের কাভার করতাম।
এরপর শুরু হয় দুই টাকা দাম নিয়ে এই ‘ভূত’ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ। পরদিন বুয়েট ক্যাফেটেরিয়া দিয়ে আমাদের বিক্রির কাজ শুরু হলো। অনেক বড়ো একটা দল করে আমরা হকারের মতো ‘খাকি ভূতের আছর’ বিক্রি করতে লাগলাম। এই দলে থাকতো মঞ্জুর ভাই, হাবিব, সামিয়ান খোরশেদ, কায়সার রেজা (বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান স্থপতি), লিপন, তারেক বিন ইউসুফ (পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ড থেকে পিএইচডি করে বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী), স্থাপত্যের কামালউদ্দীন ফারুকীসহ অনেকে। ইংলিশে যাকে বলে হট কেক, বাংলায় বলে মুড়ির মতো বিক্রি… ইংলিশ বা বাংলা যেভাবেই বলি, এই ‘গরম পিঠা ভূত’ (Hot Cake Ghost) বা ‘মুড়ি ভূত’ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বজনীন কথ্য ভাষায় ‘ধুমাইয়া বিক্রি হইতে লাগলো’। ছাত্র-ছাত্রীরা প্রবল উৎসাহে সবাই কিনতে লাগলো। পরদিন শুরু হলো মধুর ক্যান্টিনে বিক্রি। তারপর বায়তুল মোকাররমে পাঁচ দল আর পনেরো দলের বিশাল বিশাল মিটিংয়ে আমরা এই ভূত ছড়িয়ে দিতে লাগলাম। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা কমিটি থেকে অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে চাহিদা আসতে লাগলো। মনে আছে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের ঢাকা কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক, জাসদ নেতা ইব্রাহিম ভাই অনেক কার্টুন বিক্রি করে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে যখন প্রথমবার ডেঙ্গু আসে, সেবার তিনি ডেঙ্গুতে ইন্তেকাল করেন। মঞ্জুর ভাই ও উনার ছোট ভাই জিয়াউদ্দিন বিক্রিতে খুব পারদর্শী ছিলেন। বাসের কডাক্টররা যেভাবে আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে দুই টাকা, পাঁচ টাকা, দশ টাকার নোট ভাঁজ করে রেখে দ্রুত ম্যাজিশিয়ানের মতো আঙুল চালনা করে ভাংতি বুঝিয়ে দিতে পারে, জিয়াউদ্দিনও সেই অদ্ভুত কায়দায় কাজটা স্মার্টলি করতে পারতো। আমি অনেকবার সেটা অনুকরণ করতে চেয়েছি; কিন্তু সব কিছু আউলা হয়ে যেতো। আমি ওদের মতো পারতাম না। কাঁধে ঝোলানো একটা কাপড়ের খুতি টাইপ ‘সাহিত্যিক’ ঝোলা ব্যাগে আমি চোখ বুজে হাতে টাকা যা আসতো তা ঢুকিয়ে দিতাম।
“এ…ই…ই… দুই টাকা, দুই টাকা… একটা ভূত দুই টাকা, ট্র্যাডিশনাল হকারের মতো বিচিত্র কণ্ঠে চিৎকার করে করে জিয়াউদ্দিন পাঁচ দল ও পনেরো দলের লক্ষাধিক লোকের মিটিংয়ে ক্রেতা আকর্ষণ করতে পারতো। ওর মতো আর কেউ এতো দ্রুত বিক্রি করতে পারতো না। প্রচণ্ড গরম আর ভিড়ের মধ্যে ক্লান্ত হয়ে গেলে আমরা দৌড় দিয়ে সাগর ভাইয়ের (চ্যানেল আইয়ের ফরিদুর রেজা সাগর) পিঠাঘর থেকে হালিম আর ঠাণ্ডা কোক খেয়ে চাঙ্গা হয়ে আসতাম। দেখতে দেখতে আমাদের সাত হাজার পাঁচশ ভূত নিঃশেষ হয়ে গেল কয়েক দিনের মধ্যেই।
মিটিংয়ের ক্রেতাদের মধ্যে কে ছাত্র, অছাত্র, নতুন বাংলা চর বা গোয়েন্দা ওই সময় আমরা চেহারা দেখলেই কেমন করে যেন চিনে ফেলতে পারতাম। গোয়েন্দারা খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সুন্দর চেহারার সুঠাম দেহের মানুষ হতো, তারা একসঙ্গে দশ কপি করে কিনতো, কথা কম বলতো। আমরা দ্রুত এদের কাছ থেকে সরে পড়তাম। মিটিং শুরু হওয়ার অনেক আগেই দুপুরবেলা আমরা সেখানে যেতাম। মিটিং চলতে থাকতো আর বিক্রি বাড়তে থাকতো। পনেরো দলের প্রধান শেখ হাসিনা বক্তব্য শুরু করলে সবাই শান্ত হয়ে যেতো বক্তৃতা শোনার জন্য আর আমারাও তখন বিক্রি বন্ধ করে দিতাম।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাসদ ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন শাহজাহান সিরাজ ভাই। এমন সহজ-সরল হাসিখুশি আমুদে মিশুক মানুষ জীবনে কম দেখেছি। নভেম্বর মাসের শেষ দিকে কয়েকশ খাকি ভূত নিয়ে গেলেন আমার কাছ থেকে, বললেন রাজশাহী গিয়েই টাকা পাঠিয়ে দেবেন। তিনি আর টাকা পাঠানোর সুযোগ পাননি। ১৯৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর এরশাদের পেটোয়াবাহিনী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে সামনের সারির এই সদা সহাস্যমুখ সুন্দর মানুষটিকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
আবুল হাসনাত ভাই তখন বুয়েটের জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি, অনেক পরে শুনেছি একদিন নাকি বিকেলবেলায় তিনি তাঁর মামার (এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী মিজান চৌধুরী সাহেব) বাসায় গিয়ে পেছন থেকে দেখলেন মামি একটা টাটকা ‘খাকি ভূতের আছর’ নাড়াচাড়া করছেন… হাসনাত ভাইয়ের ছোটবেলার সেই কবিতার কথা মনে পড়ে গেল, ‘মামী এলো লাঠি নিয়ে পালাই, পালাই’… হাসনাত ভাই আর কোনো কথাবার্তা না বলে তৎক্ষণাৎ নীরবে মামাবাড়ি ত্যাগ করেন। তারপর বহুদিন তিনি আর মামাবাড়িমুখো হননি। যেহেতু মিজান চৌধুরী সাহেব অনেক অভিজ্ঞ পলিটিশিয়ান ছিলেন, তাই রাজনৈতিক কার্টুন সহ্য করার মতো উদার মানসিকতা তাঁর ছিল আর মামিও হাসনাত ভাইকে খুব পছন্দ করতেন। তাই এ নিয়ে হাসনাত ভাইকে পরবর্তী সময়ে আর কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। ঘটনাটি আমি হাবিবের মুখে শুনেছি।
এই প্রজন্মের অনেকের কাছেই অনেক কার্টুন অপ্রাসঙ্গিক ও ‘ড্রাই’ মনে হতে পারে। কিন্তু তখনকার বাস্তবতায় এগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক ও ফোকাসড ছিল। তখনকার প্রচণ্ড উন্নাসিক, নির্মম আর অহংকারী সামরিক মনস্তত্ত্বে কার্টুন সহ্য করার মতো রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বোধ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। আমরা এর মাধ্যমেই ওদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতাম। তাই এসব কার্টুন ওদের বুকে সরাসরি রক্তপাত ঘটাতো আর ওদের উন্মাদ করে তুলতো। আমাদের ছাত্র রাজনৈতিক দর্শনের সমাজতান্ত্রিক মনমানসিকতার কারণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে আমরা সব সময় প্রধান শত্রু মনে করতাম এবং তা সম্পূর্ণ সঠিক ছিল। এরশাদসহ এশিয়া, আফ্রিকা, সেন্ট্রাল ও লাতিন আমেরিকার দেশসমূহের প্রায় সব অবৈধ সামরিক জান্তার পেছনেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসর ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও আইএমএফের কালো হাতের মদদ থাকতো। তাই আমাদের কার্টুনগুলোতে বারবার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতীকী উপস্থিতি দেখা যায়, যা এখনকার প্রজন্মের অনেকের কাছে সূত্রহীন মনে হতে পারে। ১৯৯০-এর সোভিয়েত ইউনিয়নের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের আপাত পতনের পর ইউনিপোলার বিশ্বের এই প্রজন্মের অনেকেই সেই সময়ের আমাদের চিন্তা-চেতনা হয়তো সঠিকভাবে বুঝতে পারবে না।
তখনকার সময় স্থাপত্যের ছাত্ররা খুব রাজনীতিসচেতন ছিল এবং ছাত্ররাজনীতিতে অনেকেই খুবই সক্রিয় নেতৃত্বে ছিল। স্থাপত্যের আনিসউদ্দিন ইকবাল রাফু ভাই তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের প্রধান নেতা ছিলেন। খুব সম্ভব ছাত্র ইউনিয়ন তখন বুয়েটের সর্ববৃহৎ ছাত্রসংগঠন ছিল।ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা অন্যান্য সংগঠনের চেয়ে সাংস্কৃতিক চর্চায় অনেক অগ্রণী ছিল। রাফু ভাই নিজেও বুয়েটের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। স্থাপত্যের ছাত্রদের মধ্যে মাহবুব ভাই ( ইউকসু নির্বাচিত), আনোয়ার সেলিম ভাই, মালেক সাজা ভাই, মুস্তফা খালিদ পলাশ, সঞ্জীব বড়ুয়া, তামান্না (ইউকসু নির্বাচিত), এ্যানি (ইউকসু নির্বাচিত), শিপন, রেজাসহ অনেকে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল।
আবৃত্তিকার খসরু ভাই, সাকা ভাই, শাহিন ভাই, মাহফুজ ভাই (সভাপতি), মঞ্জুর কাদের ভাই, খ ম মনিরুজ্জামান ভাই (সভাপতি), শাহিনুল খান ইতি ভাই, সোহেল শাকুর ভাই, হাবিব, সামিয়ান খোরশেদ, আমি, কায়সার রেজা, মোস্তাফিজ, মঞ্জু, জাহীদ, ইস্তিয়াক জহির তিতাস (ইউকসু নির্বাচিত), রানা জায়গীরদার, জুলকারনাইন হেলাল, জিয়াউদ্দিন, মাহবুব, আদনান মোর্শেদ, শওকত, ফারুক, বোরহান, আকমলসহ অনেকে জাসদ ছাত্রলীগ করতো। মাসুদ খান, ফরিদ, হাবিবুল্লাহ, শামিম (ইউকসু নির্বাচিত)সহ অনেকে ছাত্রদল করতো। ফরিদ পরে ইউকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছিল। তবে মাসুদ খানই ছাত্রদলের প্রধান নেতা ছিল। নিখিলদা বাকশাল ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া মোবিন বাসদ ছাত্রলীগ করতো। আমাদের ব্যাচের আব্দুল হক শাহিন ফরহাদ মাজহারের ছাত্র ফোরাম করতো। এতোটুকু ডিপার্টমেন্টে এতো নেতা, এতো কর্মী থাকলেও আমাদের মধ্যে সম্প্রীতির কোনো অভাব কোনো দিন হয়নি।
অন্যদিকে খবর পেলাম সেলিম সাহেবের খাজা আর্ট প্রেস পুলিশ রেইড করেছে, বহু কাঠখড় পুড়িয়ে সেলিম সাহেব পুলিশ ম্যানেজ করেছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সেলিম সাহেবের মতো এ রকম কতো মানুষের নিভৃত অবদান আছে, যা ইতিহাসে কোনো দিন লেখা থকবে না। পুলিশ রেইডের পর আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম এবং কিছুদিন কিছুটা লুকিয়ে থাকলাম। ‘খাকি ভূতের আছর’-এর সুবাদে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মহলে আমার কিছুটা খ্যাতি বাড়লো; যদিও প্রকৃত খ্যাতি পাওয়ার যোগ্য ছিল জাহীদের। কিন্তু জাহীদ তার মাকে খুব ভয় পেত এবং কিছুতেই প্রকাশ করতে দিলো না যে এগুলো আসলে তার কীর্তি। মনে আছে, একদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের একটা প্রোগ্রামে মধুর ক্যান্টিনে যাচ্ছি, ক্যান্টিন চত্বরের কাছে আসতেই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক নড়াইলের আব্দুল মুকিত লাভলু ভাই চিৎকার করে বলে উঠলেন, এই যে দেখো খাকি ভূত আসতেছে। তারপর অনেক দিন উনারা আমাকে মজা করে ‘খাকি ভূত’ নামে ডাকতেন। ভোজনরসিক লাভলু ভাই কার্টুন পত্রিকার সাফল্যে খুশি হয়ে আমাকে ঠাটারীবাজারে মমতাজ মিয়ার বিখ্যাত স্টার রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলেন খাওয়ানোর জন্য, সঙ্গে ছিলেন হাসনাত ভাই। তিনজন রিকশায় উঠলে আমাদের অঘোষিত নিয়ম ছিল সবচেয়ে জুনিয়রজন রিকশার মাঝে সিটের কাঁধে বসবে, তাই আমার জায়গা স্বভাবতই সেখানে হলো। আমরা এক রিকশায় তিনজন মধ্য দুপুরে মধুর ক্যান্টিন থেকে সোজা ঠাটারীবাজার রওনা দিলাম।
যেতে যেতে লাভলু ভাই বললেন, তোমাকে আজ এতো বড় পাঙ্গাশ মাছের পেটি খাওয়াবো যে প্লেটে রাখলে পেটির অর্ধেক প্লেট থেকে ঝুলে বের হয়ে থাকবে।
তখন পাঙ্গাশ মাছ খুব দামি স্বাদওয়ালা মাছ। শুধু নদীতেই পাঙ্গাশ মাছ পাওয়া যেতো, বাঙালি তখনো পুকুরে ফিড খাওয়া পাঙ্গাশ মাছ চাষ করে এর স্বাদের বারোটা বাজাতে শেখেনি। তিনি আমাকে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে স্টারের বিখ্যাত পাঙ্গাশ মাছ আর কষানো হাঁসের ভুনা মাংস খাওয়ালেন। এখানেই শেষ না… ‘পড়েছি মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে’… ভাত খাওয়ার পর উনি আমাদের স্টারের বিখ্যাত ঠাণ্ডা ফালুদাও খাওয়ালেন। উনি যদিও খুব খানেওয়ালা ছিলেন; কিন্তু আমি তখন তেমন খেতে পারতাম না, এ জন্য হাসনাত ভাই আর আমি একটা মাছের টুকরা ভাগাভাগি করে খেয়েছিলাম। আমি ছিলাম চরম শুকনা লিকলিকে মানুষ। রাফু ভাই মজা করে আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, এই, তোমার ওজন কতো আউন্স? অনেক দিন লাভলু ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, শুনেছি উনার ডায়াবেটিস হয়েছে, ইচ্ছে করলেই আর আগের মতো খেতে পারেন না। প্রকৃতি মানুষকে অনেক কিছু দিয়ে আবার তা ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
স্থাপত্যের ছাত্র মাহফুজ ভাই (বর্তমানে পোল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত) খুব সম্ভব লাভলু ভাইয়ের পরপরই কেন্দ্রীয় জাসদ ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর হাতে জাদু ছিল। তিনি খুব সুন্দর আঁকতে পারতেন। সারা দেশের ছাত্রলীগের ডজন ডজন পোস্টার তিনি ডিজাইন করতেন। মাঝেমধ্যে দু-একটা আমাকে দিতেন ডিজাইন করতে, পোস্টার ডিজাইনে উনার তুলনায় আমি ছিলাম নিতান্ত শিশু। তখন কম্পিউটারের এমন প্রচলন ছিল না, সব কিছু নিজের হাতে আঁকতে ও লিখতে হতো। গ্রাফিকস জিনিসটা তখন খুব কষ্টকর ও ক্লান্তিকর কাজ ছিল। মাহফুজ ভাই অত্যন্ত মেধাবী ও পণ্ডিত মানুষ ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা উনাকে গুরু মানতাম। উনার বড় ভাই মাহবুব ভাইও স্থাপত্যের ছাত্র এবং পরে শিক্ষক ছিলেন। মাহফুজ ভাই খুব দ্রুত আর সুন্দর ‘চিকা’ মারতে পারতেন। ‘চিকা মারা’ মানে এ প্রজন্মের অনেকে হয়তো বুঝবে না, দেয়ালে রাজনৈতিক ও স্লোগান লেখাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে বলা হতো ‘চিকা মারা’। একবার আমার মাথায় একটা আইডিয়া এলো… স্থাপত্য ভবনের পুব দিকে কার্ভ ওয়ালের টপে ‘আমরা সশস্ত্র হবো প্রতিটি মৃত্যুতে’- এই লাইনটি লেখার। কিন্তু কীভাবে সম্ভব এই কাজ করা, এতো উঁচুতে দাঁড়িয়ে কীভাবে লিখবো। মাহফুজ ভাইকে আইডিয়াটা বললাম, উনি খুব পছন্দ করলেন আইডিয়াটা।
উনি বললেন, আজ রাতেই লিখবো।
আমি তখনো বুঝতে পারছিলান না কীভাবে এতো উঁচুতে লেখা সম্ভব। অনেক রাত্রে সাদা প্লাস্টিক পেইন্ট আর মোটা ব্রাশ নিয়ে আমরা হাজির হলাম স্থাপত্য ভবনের ছাদে। তারপর দেখলাম এক অবিশ্বাস্য জাদু, ছাদে দাঁড়িয়ে শরীরকে সম্পূর্ণ নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়ে উল্টো দিক থেকে উনি ধামাধাম লিখে ফেললেন… ‘আমরা সশস্ত্র হবো প্রতিটি মৃত্যুতে’। নিচে এসে আমরা লেখাটা দেখলাম, গ্রে কংক্রিটের ওপর ঝকঝকে সাদা লেখা—সশস্ত্র মৃত্যুর উচ্চকিত আহ্বান। এই ভয়ানক ও সুন্দর কাজ আর কোনো মানুষের পক্ষে করা সম্ভব কি না আমি জানি না। সত্যিই উনি জাদুকর ছিলেন। অন্য কোনো কিস্তিতে উনার এ রকম অনেক জাদুর কথা লেখার ইচ্ছা রইলো, ইনশাল্লাহ।
এরই মধ্যে কলকাতার বিখ্যাত ‘আজকাল’ পত্রিকা ‘খাকি ভূতের আছর’ নিয়ে একটি প্রতিবেদন বের করে এবং কয়েকটা কার্টুন পুনর্মুদ্রিত করে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাদের কাছে বিপুল অনুরোধ আসতে থাকে যেন আমরা এটা আবার ছাপাই। অবশেষে ১৯৮৪ সালের অক্টোবর মাসে আমরা ‘ভূতের’ দ্বিতীয় সংস্করণ বের করি, যা সারা দেশে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়। এরশাদের শাসনের মধ্যেই আমাদের বুয়েট জীবন শেষ হয়। তাই কার্টুনগুলো যে জাহীদের আঁকা তা সাধারণ মহলে প্রায় অপ্রকাশিতই থেকে যায়। এই কাজে আমি অনেক প্রশংসা পেয়েছিলাম, যার বেশিটাই জাহীদের প্রাপ্য ছিল। জাহীদ জীবিত অবস্থায় সে প্রাপ্যটি নেয়নি।
পাস করার পর জাহীদ সাইন্স ল্যাবরেটরিতে অবস্থিত মাজহারুল কাদের ভাইয়ের ইন্ডেক্স ডিজাইন ফার্মে যোগ দেয়, অন্যদিকে স্থপতি ইকবাল হাবিবের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন একটা ডিজিটাল বাংলা ফন্ট ডিজাইনের কাজে। ইকবাল কাজপাগল মানুষ, সব সময় কিছু না কিছু নতুন আইডিয়া তার মাথায় ঘুরতে থাকে। সে ঘূর্ণন এখন প্রবলতর পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ঢাকায় বাসা থাকলেও তিতুমীর হলের ২১১ (দক্ষিণ) রুমে সিট ছিল জাহীদের। পাস করার পরও কয়েক মাস ওর আসা-যাওয়া ছিল এই রুমে।সেদিন বৃহস্পতিবার, তারিখটা মনে নেই, ১৯৯১ সালের ভাদ্র মাসের সেই দিন দারুণ আড্ডা জমেছে এই রুমের দক্ষিণের বারান্দায়। হু হু করে দখিনা বাতাস বইছে। পাঞ্জাবি আর জিন্স প্যান্ট পরে গান গাইছে জাহীদ, নির্ভেজাল গানের আড্ডা জমে উঠেছে, একক গায়ক জাহীদ, শ্রোতা স্থাপত্যের রানা, শামিম আনোয়ার (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী), ছোটখাটো মানুষ কিন্তু তিতুমীর হলের বিরাট ছাত্রনেতা রিপন (সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হলেও তার সব আড্ডাই স্থপতিদের সঙ্গে, যা আজ অবধি বহাল আছে) আর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ছাত্র রকিব। বিকেল ৩টা থেকে টানা বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাহীদ শুধু কিশোর কুমারের গানে মাতিয়ে রাখে সবাইকে। গানের শব্দে ভিড় বাড়ে, অনেক ছাত্র এসে জমা হতে থাকে চারদিক থেকে। দারুণ জমে ওঠে একক গানের আসর। যে গানটি দিয়ে সে আড্ডা শেষ হয়েছিল আজও রিপন স্পষ্ট মনে করতে পারে সেই গানটা,
চোখের জলের হয় না কোনো রঙ
তবু কতো রঙের ছবি আছে আঁকা।
দেখতে গিয়ে হারিয়ে গেলাম
গহিন আঁধার পথে আঁকাবাঁকা…
এই ‘হারিয়ে যাওয়ার’ গান শেষ হতে হতেই বিকাল ৫টা বেজে যায়। ওরা চারজন ‘অবুঝ মন’ সিনেমা দেখতে বলাকা সিনেমা হলে চলে যায় সাড়ে ৫টার শো ধরতে। অনেক অনুরোধের পরও জাহীদ ওদের সঙ্গে যেতে রাজি হয় না। তার অন্য কোনো ভয়ানক পরিকল্পনা ছিল সেদিন… কেমন আনমনা হয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে রওনা দেয় আর্কিটেকচার ফ্যাকাল্টির দিকে।
১৯৯১ সালের ভাদ্র মাসের এক ভেজা সন্ধ্যায় আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের পশ্চিম দিকের সিঁড়ি বেয়ে অনেকটা চুপিসারে একাকী উঠে যেতে দেখা যায় জাহীদকে। প্লিন্থে বসে থাকা আড্ডাবাজ জুনিয়র ফারুকের আড্ডার আমন্ত্রণে সাড়া দেয় না সে, ফারুক বুঝতেই পারেনি কী ভয়ানক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে তখন। প্রায় নিঃশব্দে তিনতলার সবচেয়ে পুব দিকের সিঁড়ির কাছের রুমে চুপিসারে একাকী বসে অভিমানী আমার এ বন্ধুটি জীবন নিয়ে একটা চরম ছেলেখেলা খেলে ফেললো। যে মানুষটি জীবনে কারো প্রতি কোনো অবিচার করেনি সেদিন নিজের ওপর চরমতম বিষাক্ত অবিচারটি করে ফেললো সে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ইমার্জেন্সিতে জাহীদ মারা যায় সেদিন রাতেই।
ফারুক, জেহাদ, মান্না তিতাস, হাসান, জেহাদ, মান্না, শাকুর, রানা, মাহফিল, শাহেদসহ অনেকেই ছুটে আসে ঢাকা মেডিক্যালে।
বুয়েটের শিক্ষকরা সাধারণত ঝামেলা এড়িয়ে চলেন, একমাত্র স্থাপত্যের শিক্ষক ড. নিজাম স্যার এগিয়ে আসেন ছাত্রদের সঙ্গে। নিজে গাড়ি চালিয়ে মেডিক্যাল কলেজ থেকে রায়েরবাজারে জাহীদের বাসায় ছোটাছুটি করেন। সেদিন তিনি চার-চারবার গিয়েছিলেন জাহীদের রায়েরবাজারের বাসায় ওর মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিতে, সঙ্গে আমাদের ব্যাচের কবিরসহ (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত স্থপতি) আরো অনেকে ছিল। কবির সবেমাত্র বিয়ে করেছে, শ্বশুরবাড়িতে আমোদ আপ্যায়নে ব্যস্ত। ওদিকে জাহীদের মা বসে আছেন কবিরের বাসায়। এ অবস্থায় এই খবর পেয়ে ওর মাথা খারাপ হয়ে যায়, ছুটে যায় ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগে। নিজাম স্যারের সঙ্গে ছুটতে থাকেন ওর মা-বাবাকে শান্ত করার কাজে। মাসখানেক আগেও নিউ ইয়র্ক থেকে কবির যখন আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল, জাহীদের প্রসঙ্গ আসতেই ও ডুকরে কেঁদে ওঠে। নিজাম স্যার বাংলাদেশের স্কাউট আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, আন্তর্জাতিক স্কাউট অঙ্গনেও তিনি খুবই পরিচিত ও সম্মানিত মানুষ। আমার জীবনে বহুবার মানুষের নানা আপদবিপদে তাঁকে এই রকম প্রকৃত স্কাউট-চেতনা নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছি। আজও দেখি।
আমরা তখন পেশাজগতে চরম ব্যস্ত। আমি জানতে পারি, ঘটনা ঘটার অনেক দেরিতে। পরদিন শুক্রবার বুয়েট সেন্ট্রাল মসজিদে তার জানাজা হয়। ইচ্ছে করলে হয়তো কোনোক্রমে টায়টায় গুলশান থেকে আমি তার জানাজা ধরতে পারতাম; কিন্তু আমি ইচ্ছা করে আসিনি।আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না ওর এভাবে চলে যাওয়া। কাঠের বাক্সবন্দি সাদা কাফনে মোড়া জাহীদের মলিন নীলাভ মুখ আমি দেখতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম ওর সদা হাস্যময় প্রাণবন্ত উজ্জ্বল মুখটিই আমার স্মৃতিতে জীবন্ত থাকুক চিরদিন।
তখন বয়স ছিল অল্প, দুঃখ তখনো তেমন করে চিনতে শিখিনি, মৃত্যূ তখন খুব অচেনা আনকোরা জিনিস। এখন এই বয়সে প্রিয়জনের অনেক মৃত্যু হ্যান্ডেল করতে করতে অনেকটা অভিজ্ঞ হয়ে গেছি। এখন আমি বুঝি সেদিন জাহীদের জানাজায় না যাওয়াটা আমার ভুল ছিল। ‘প্রতিটি আত্মাকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে…’ (সুরা আনকাবুত, ৫৭)
জাহীদ তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস বন্ধু। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, ‘আপনি এই পাগলকে ক্ষমা করে দিয়েন… পাগল যখন পাগলামি করে তখন তো তার পাপ-পুণ্য বোঝার ক্ষমতা থাকে না। হে করুণাময়, হে দয়াময়… আপনার আসীম দয়া আর সিমাহীন করুণা দিয়ে আপনি ঢেকে দিয়েন আমাদের এই পাগল বন্ধুকে।’
ইনফরমাল গানের আসরে এই গানটা জাহীদ প্রায় সব সময়ই গাইতো,
যদি কাগজে লেখো নাম, কাগজ ছিঁড়ে যাবে
পাথরে লেখো নাম, পাথর ক্ষয়ে যাবে
হৃদয়ে লেখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে…
জাহীদের বাসা ছিল রায়েরবাজারের অনেক গভীরে। জাহিদ যখন গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে, জাহীদের বাবা খুশি আর গর্বে ‘স্থপতি সৈয়দ জাহীদ হোসেন’ নামাঙ্কিত একটা ছোট্ট সুন্দর নামফলক ওদের বাড়ির গেটে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আমি জানি না আজ ২৯ বর্ষা পার করে ২০২০ সালের আজ এই আরেক বর্ষায় সেই একজন গর্বিত বাবার সেই নামফলকটি এখনো সেখানে আছে কি না। নামফলকে নাম যদি নাও থাকে, আমাদের প্রজন্মের অগণিত হৃদয়ে বন্ধু তুই লেখা থকবি চিরকাল, সে নাম কখনো মুছে যাবে না।
(আমার এ লেখাগুলো নিতান্তই আমার ছাত্রজীবনের একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার খুবই আংশিক ছায়াছবি। আমি এখানে বুয়েটজীবনের বা ছাত্ররাজনীতির ফরমাল ইতিহাস লিখতে বসিনি, সে রকম কোনো যোগ্যতাও আমার নেই। স্মৃতিস্বল্পতার কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা ব্যক্তির কথা হয়তো আমার লেখায় উল্লেখই নেই, তাই বলে সেই সব ঘটনা বা ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ নন তা কিন্তু নয়। আমার এ লেখা কেউ সিরিয়াসলি নেবেন না)
৭ জুলাই, ২০২০


