ক্যান্টন নামা

চাইনিজ নাম গুয়াংজু। বৃটিশরা এ শহরের নাম দিয়েছিলো ক্যান্টন। পার্ল নদী বিধৌত পার্ল ডেল্টায় অবস্থিত এ নগর দক্ষিণ চীনের সবচেয়ে বড় নগর। ঢাকা শহরের সাথে একটা মিল হচ্ছে ঢাকা আর গুয়াংজু একদম প্রায় একই ভৌগোলিক অক্ষাংশে অবস্থিত। এছাড়াও এ শহরের সাথে ঢাকার অনেক মিল আছে বা ছিলো। একারণে এখানকার জলবায়ু অনেকটা হুবহু ঢাকার মতো। আমি প্রথম এ শহরে আসি ১৯৯৫ সালের অক্টোবর মাসে, তারপর গত ২৮ বছরে মনে হয় ত্রিশ বার এ শহরে এসেছি। ২৮ বছর আগে প্রথমবার যখন গুয়াংজু আসি তখন এ শহরকে যে অবস্থায় দেখেছি আমাদের বর্তমান ঢাকার অবস্থা প্রায় সেরকম।

যেহেতু আমাদের স্থাপতি ও টাউন প্লানাররা উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন তাই তাদের বিশ্লেষণ ও বিবেচনায় এসব শহরের উদাহরণ খুব কম উল্লেখ করা হয়। ওনারা কথায় নিউইয়র্ক বা লন্ডনের উদাহরণ দেন। আমার মনে আছে আরবান ডিজাইন পড়াতে গিয়ে ইফতেখার মাঝহার স্যার কথায় কথায় ম্যানহাটনের ফিফথ এভিনিউ এর কথা বলতেন।  পূর্ব দিকে তাকাতে আমাদের বেশির ভাগ অধ্যাপক,  বিশেষজ্ঞ ও জ্ঞানীরাই অনভ্যস্ত অথবা একে ফ্যাশনেবল মনে করেন না।

আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি গুয়াংজুর সাথে ঢাকার অনেক মিল তাই এখান থেকে নগর পরিকল্পনা,  আরবান ল্যান্ডস্কেপ ও নগর ব্যবস্থাপনায় আমাদের অনেক কিছু নেয়ার থাকতে পারে।গতরাতে গিয়েছিলাম গুয়াংজুর আনাতোলিয়া নামের টার্কিশ রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে। নামকরা এ রেস্টুরেন্টটি একটি অতি প্রাচীন দোতলা চাইনিজ ট্রাডিশনাল রো হাউজের ভিতর অবস্থিত।  এক ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার পর এখানে টেবিল পাওয়া যায়। শহরের হাজারো মুসলিম পর্যটক এখানে ভিড় জমায় মশলাযুক্ত হালাল খাবারের আশায়।

আজকে আমি অবশ্য এতো বিশদ আলোচনা করার জন্য লিখতে বসিনি। শুধু এই ছবি দু’টো দিচ্ছি। ছবি দু’টি ভালো করে লক্ষ্য করুন। ছবিতে প্রাচীন দোতলা চাইনিজ ট্রাডিশনার বিল্ডিং গুলোর ফাঁক দিয়ে গুয়াংজু শহরের আধুনিক ল্যান্ডমার্ক ২৭০ মিটার উঁচু IGC Tower কে দেখা যাচ্ছে। এই IGC Tower অত্যন্ত আপ ক্লাস শপিং প্লাজা ও করপোরেট টাওয়ার কিন্তু এর ১০০ ফুটের মধ্যেই স্বগর্বে দাঁড়িয়ে আছে এক সারি প্রাচীন চাইনিজ ট্রাডিশনাল ঘর।

আমাদের শেখার ব্যাপারটা এখানেই।

সেটা হচ্ছে, উন্নয়নের নামে অথবা উন্নয়নকে অযুহাত হিসেবে নিয়ে আশেপাশের সব প্রাচীন, ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাকে ভেঙে দিতে হবে এটা এটা কোন কাজের কথা নয়।  এটা এক ধরনের চরম মূর্খতা।

কথা হচ্ছে, ওরা যেটা পারে আমরা সেটা পারিনা কেন?এখানে Adaptive Reuse বা Re-purposed Architecture এর কনসেপ্ট কাজে লাগানো হয়েছে। প্রাচীন রো হাউস গুলো হয়েছে অনেক দামি রেস্টুরেন্ট ও পর্যটন কেন্দ্র যা থেকে বাড়ির মালিক ও সরকার উভয়েই আগের চেয়ে অনেক বেশি রাজস্ব আয় করছে। পুরো এলাকার আরবান ডিজাইন করা হয়েছে নতুন আর পুরাতন স্থাপত্যকে নিয়ে একটা দারুন ইনক্লুসিভ এপ্রোচ নিয়ে যা সবার জন্যই হয়েছে win win situation এবং এতে গুয়াংজু নগরের পরিবেশ ও এর বুদ্ধিবৃত্তিক মানও অনেক বেড়েছে সারা পৃথিবীর কাছে।

এখন চিন্তা করে দেখুন,  আমরা এর বিপরীতে কি করছি।

সামনে ভাঙার লিস্টে আছে কমলাপুর, টিএসসি, নিপা বিল্ডিং সহ বহু ভবন। আমলা, প্রজেক্ট প্রকৌশলী আর রাজনীতিবিদদের এ মূর্খ মনস্তত্ত্বের বিপক্ষে মাঝে মাঝে দাঁড়ায় শুধু এদেশের স্থপতি সমাজ আর হাতেগোনা কিছু ইতিহাসবিদ ও সুশীল সমাজের অল্প কয়েকজন ।

আমি খুব অবাক হয়ে ভাবি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান অর্জন করে, একই ক্লাসরুমে ক্লাস করে, একই ছাত্রাবাসে একই রুমে ৪/৫ বছর বন্ধুর মতো কাটিয়ে এদেশের বিশাল প্রকৌশলী সমাজ এব্যাপারে আমাদের সাথে কখনো দাঁড়ায় না কেন? বরং উল্টো দেখি সারাদেশের হেরিটেজ ভবনগুলো ভাঙার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ থাকে সীমাহীন। প্ল্যানারদেও সেভাবে আমরা পাই না আমাদের হেরিটেজ রক্ষার আন্দোলনে।

এর কারণ কি?

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর পাঠ্যক্রমে কোন ঘাটতি?

বুদ্ধিবৃত্তি ও রুচি এ যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সব পেশাজীবিকে সাথে না পেলে অচিরেই আমাদের সব হেরিটেজ স্থাপনা গুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

মাহফুজুল হক জগলুল

গুয়াংজু

১৮ অক্টোবর, ২০২৩

আরও পড়ুন