হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে গতকাল বিকেলে আজারবাইজানের এই নাখচিভানে এসেছি। এটি আজারবাইজানের একটি ছিট মহল। খ্রিস্টান অধ্যুষিত ও শত্রুর ভাবাপণ্য আর্মেনিয়ার পেটের মধ্যে অবস্থিত এই নাখচিভান, দেশের মূল ভূখণ্ড হতে ৪২ থেকে ৪৪০ কিলোমিটার দূরত্বে বিচ্ছিন্ন। এটা পৃথিবীর বৃতত্তম ল্যাণ্ডলকড ছিটমহল বা এক্সক্লেভ। বাংলাদেশী কেউ এখানে আসবে শুনলেই তারা চিন্তিত হয়ে ওঠে। ভাবে এ ব্যাটারা এই পাণ্ডব বর্জিত দেশে কেন যাবে। নানান রকম সন্দেহ করে। অনলাইনে টিকিট দেয়া বন্ধ
করে দিয়েছে মাসখানেক আগে। অবশেষে অনেক কষ্ট করে স্থপতি মোজাহেদ বেগের এক পরিচিত আজারবাইজানিকে ধরে টিকিট কেটেছি, তাও ফিজিক্যালি বাকু এয়ারপোর্টের দুই নম্বর টার্মিনালে গিয়ে এক ঝগড়াটে মহিলার সাথে অনেকক্ষণ তর্ক বিতর্ক করে। প্রথমে সে বলল বাংলাদেশীদের জন্য টিকিট হবে না। তারপর আমার আজারবাইজানি আর ওই মহিলার মধ্যে অনেকক্ষণ তর্কাতর্কির পর, সে রাজি হল। তারপর বলল ক্রেডিট কার্ডে পেমেন্ট নেয়া যাবে না। এরপর শুরু হলো দ্বিতীয় দফার
সেমিফাইনাল তর্কাতর্কি। বহুক্ষণ এটা চলার পর উপস্থিত হোল মেগা ফাইনাল, অর্থাৎ তৃতীয় পর্যায়ের তর্কাতর্কি, সেটা হচ্ছে তার ক্ষুদ্র কাচের জানালার ফুটো দিয়ে আঙ্গুল ঢুকিয়ে তার ক্রেডিট কার্ডের পজ মেশিনের পিন নম্বর চাপতে দেয়া নিয়ে। সামান্য চড়ুই পাখি ঢোকার মতো লএমন একটা ফুটোর ভিতর দিয়ে তার মেশিন বের হয় না, আবার আমার হাতও ঢোকে না ওই ফুটো দিয়ে, তখন আমি বললাম দয়া করে আমাকে কাউন্টারের ওদিকে একটু আসতে দাও, আমি পিন নাম্বার চাপ দেই। সে কিছুতেই দেবে না, বলল রাষ্ট্রিয় নিয়ম নেই। তারপর চললো আরো অনেকক্ষণ তর্কাতর্কি। অবশেষে উপায় না পেয়ে অনেক কসরত করে আমি আমার এক আঙ্গুল ঢুকিয়ে বললাম,
তুমি চোখ বন্ধ কর,আমার পিন নাম্বার দেখানো যাবে না, এটা আমার রাষ্ট্রের নিয়ম।
এবার সে তর্ক না করে আমাকে অবাক করে দিয়ে সত্যি সত্যি চোখ বন্ধ করল। তারপর অনেক কষ্টে পিন নাম্বার চাপ দিলাম হাতে নাখচিভানের কাঙ্ক্ষিত টিকিট পেলাম।
আজারবাইজানের মূল ভূখণ্ডের সাথে রাশিয়া, জর্জিয়া আর্মেনিয়া ও ইরানের সীমান্ত আছে, কিন্তু নাখচিভানের সাথে ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তুরস্কের মাত্র ১১ কিলোমিটার এর একটি বর্ডার আছে। এ অঞ্চলটি নিয়ে অনেক যুদ্ধ হয়েছে, তবে এখন কিছুটা নিরব। এ এলাকার যত গ্রামে গিয়েছি সেখানেই দেখেছি কম বয়সী যুবকদের ছবি

রাস্তার পাশে টাঙিয়ে হাতে মালা দিয়ে রাখা হয়েছে, অর্থাৎ এরা সবাই যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেছে। জাতীয়তাবাদ নিজের প্রয়োজনে মানব সভ্যতার সব দেশে দেশে এইসব সাধারণ গ্রামের সাধারণ কৃষক শ্রমিকের সন্তানদের যুদ্ধে পাঠায় এবং এভাবেই কম বয়সে তাদের মরতে হয়। তখন জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এদেরকে বীর খেতাবে ভূষিত করে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করে। এত যুদ্ধের কারণে আজারবাইজানে ছেলেতে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা অনেক বেশি।
আমি এতদূর থেকে এসেছি কয়েকটি কারণে, তার মধ্যে একটি হলো এখানকার মিথলজি অনুযায়ী নূহ নবীর নৌকা এখানে ভিড়ে ছিল। নুহু নবীর সমাধিও এখানে আছে বলে এখানকার সবাই বিশ্বাস করে। নাখচিভানে এসেই প্রথম আমি গিয়েছি তাঁর ঐ কথিত সমাধিতে। এছাড়া এখানেই আছে কোরআনে বর্ণিত আসহাবে কাহাফ (Ashab-al-Kahf) এর গুহা যা এখানকার মানুষ হাজার বছর ধরে বিশ্বাস করে আসছে। খ্রিস্টীয় লিজেন্ড হিসেবে Seven Sleepers of Ephesus দের গল্প আছে, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের পন্ডিতের ধারণা দুটি আসলে একই মানুষদের গল্প।
গতকাল বিকেলে এসে পৌঁছেছি আজারবাইজানের বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড এই নাখচিভানে। এখানকার নূহের সমাধির ইনচার্য জায়নাবের ভাস্য মতে নাখচিভান শব্দটি নাকি এসেছে এসেছে নূহচিবান শব্দ থেকে। এর অর্থ হচ্ছে নূহের শেষ আশ্রয়স্থল। চারদিকের ভূরাজনীতি, যুদ্ধের স্মৃতি আর পাহাড়ঘেরা নীরবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই অঞ্চল যেন ইতিহাস, মিথলজি ও বাস্তবতার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। বহু সংঘাতের সাক্ষী এই ভূখণ্ড আজ অনেকটাই শান্ত, কিন্তু বাতাসে এখনো যেন পুরনো যুদ্ধের গন্ধ ভেসে বেড়ায়।
আগেই বলেছি এখানকার মানুষের হাজার বছরের বিশ্বাস—নূহ (আ.)-এর নৌকা নাকি এই অঞ্চলের পাহাড়ে এসে থেমেছিল। এখানেই রয়েছে তাঁর সমাধির স্মৃতি, আছে আশহাবে কাহাফের গুহা নিয়ে লোককথা, যেগুলোকে ঘিরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি গড়ে উঠেছে। আমি সেই মিথ, ইতিহাস ও মানুষের বিশ্বাসকে কাছ থেকে অনুভব করতে চেয়েছিলাম বলেই এতো ঝামেলা করে প্লেনে চড়ে এখানে আসা, কেননা সর্বাজনের দুই অংশের মধ্যে আর্মেনিয়া থাকার কারণে সরাসরি সড়কপথে যাতায়াতের অনুমতি দেয় না। বাকু থেকে আকাশ পথে নাখচিভান পঞ্চাশ মিনিটের যাত্রা।
নাখচিভানে পৌঁছেই প্রতজমেই গিয়েছিলাম নূহ নবীর সমাধিতে। সমাধিটি দোতলা, নিচ তলায় কথিত উপর তলায় একটি ছিদ্র দিয়ে কবর করা হয়েছে, যদিও অন্ধকারের কারনে তাকিয়ে তেমন কিছু দেখা যায় না। সেখানে একজন গাইড দাঁড়িয়ে থাকে। গাইড মহিলাটির নাম হল শবনম। আমি তাকে বললাম এত বড় একজন নবীর কবরের উপর দাঁড়িয়ে আছি, এটা কি ভালো হচ্ছে। সে নির্বিকার ভাবে বলল কোন অসুবিধা নাই এটাই নিয়ম। তারপর সে আমাকে পশ্চিমে তুরস্কের আরারাত পর্বত হয়ে কিভাবে নূহ নবীর নৌকা হাছা পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে এখানে এ ভুমিতে নোঙর ফেলেছে তার বিস্তারিত বর্ণনা দিল। সে আরো বললো সেই প্রাচীনকালে নাকি কাস্পিয়ান সাগর কৃষ্ণ সাগর এবং আমাদের হিমালয়ের কাছে তখন ছিল তেথিস সাগর, তারা সব একত্রে একটি মহাসাগর ছিল। এ কারণে এসব পাহাড়ের মধ্যে এখনো সামুদ্রিক প্রাণীর ফসিল পাওয়া যায়। আফ্রিকার সোমালিয়ান প্লেটের অংশ ভেসে ভেসে ইউরেশিয়ান প্লেটকে ধাক্কা দিয়ে কিভাবে হিমালয় পর্বতের তৈরি হয়েছে সে টেকটনিক প্লেটের ভূতাত্বিক গল্প নিয়ে আমি আগে পড়াশোনা করেছি, কিন্তু সেটা তো মিলিয়ন বছর আগের কথা, নূহ নবীর সময়ে সে সাগরের অস্তিত্ব থাকার কথা না। যাহোক মিথলজি বা কিংবদন্তির সাথে বিজ্ঞানভিত্তিক বিতর্ক করে লাভ নেই।
নাখচিভানের আজকের ভ্রমণের শুরুতেই গিয়েছিলাম ঐতিহাসিক Alinja Fortress — যাকে অনেকেই “ককেশাসের মাচু পিচু” নামে চেনেন। পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন দুর্গ যেন ইতিহাস, প্রকৃতি আর সাহসিকতার এক অনন্য মিলনস্থল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দেড় হাজার থেকে আঠারোশো মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই দুর্গে পৌঁছানো মোটেও সহজ নয়; বরং প্রতিটি ধাপ যেন একেকটি অভিযানের গল্প। উপরে উঠতে পাড়ি দিতে হয় প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার পাথরের সিঁড়ি, যা ধীরে ধীরে মানুষকে নিয়ে যায় মেঘের আরও কাছে, ইতিহাসের আরও গভীরে।
আলিঞ্জা দুর্গের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও গৌরবময়। ধারণা করা হয়, সপ্তম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে এই দুর্গের প্রাথমিক নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সে সময় স্থানীয় শাসক ও আজারবাইজানের মধ্যযুগীয় রাজবংশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে এই দুর্গ নির্মাণ করে। পাহাড়চূড়ায় অবস্থানের কারণে এটি ছিল এক দুর্ভেদ্য সামরিক ঘাঁটি, যেখান থেকে বহু দূর পর্যন্ত শত্রুদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতো।
চতুর্দশ শতকে এই দুর্গ বিশেষভাবে খ্যাতি লাভ করে মধ্য এশিয়ার বিখ্যাত বিজেতা তৈমুর লং-এর অভিযানের সময়। ইতিহাসে বলা হয়, তৈমুর লং বহু বছর ধরে এই দুর্গ অবরোধ করেছিলেন, কিন্তু আলিঞ্জা দুর্গ এতটাই শক্তিশালী ও সুরক্ষিত ছিল যে সহজে এটি দখল করা সম্ভব হয়নি। সেই সময় এই দুর্গকে “অজেয় দুর্গ” বলেও আখ্যায়িত করা হতো।দুর্গের ভেতরে ছিল পানির সংরক্ষণব্যবস্থা, সৈন্যদের থাকার স্থান এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা প্রাচীর। মধ্যযুগীয় সামরিক স্থাপত্য ও কৌশলের এক অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে আজও এই দুর্গ ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
পাহাড়ি বাতাস, চারপাশের রুক্ষ অথচ মোহনীয় প্রকৃতি, আর নিচে বিস্তৃত উপত্যকার দৃশ্য—সব মিলিয়ে আলিঞ্জা দুর্গে ওঠার পথটুকুই যেন এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। প্রতিটি সিঁড়ি পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে খুলে যায় নাখচিভানের বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দূরের পাহাড়গুলোকে তখন মনে হয় ইতিহাসের নীরব প্রহরী, যারা শত শত বছর ধরে এই দুর্গকে আগলে রেখেছে। দুর্গের চূড়ায় পৌঁছে মনে হয়, সমস্ত ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেছে। ওপরে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালে মনে হয়, আকাশ আর পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। সেই মুহূর্তে “ককেশাসের মাচু পিচু” নামটির যথার্থতা সত্যিই অনুভব করা যায়। ইতিহাস, প্রকৃতি আর অভিযাত্রার এক অপূর্ব সমন্বয় এই আলিঞ্জা দুর্গ—যা নাখচিভান ভ্রমণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ এবং আজারবাইজানের ঐতিহাসিক গৌরবের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
আসলে জীবনে কখনো ভাবিনি এই বয়সে এত উঁচুতে উঠতে পারবো। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, শেষ পর্যন্ত পেরেছি। আসলে আমি একটি মানসিক কৌশল অবলম্বন করেছিলাম, যাকে বলা যায় সেলফ হিপনটিক ট্যাক্টিক। পুরো পাহাড়ের চূড়াকে লক্ষ্য না করে সামনে খুব কাছের একটি বিন্দুকে লক্ষ্য করতাম—ভাবতাম শুধু ওই পর্যন্তই যাব। সেখানে পৌঁছে আবার আরেকটি ছোট লক্ষ্য স্থির করতাম। এভাবে ছোট ছোট লক্ষ্যকে সামনে রেখে ধীরে ধীরে লক্ষ্যকে সম্প্রসারিত করতে করতে এগিয়ে যেতে যেতে কখন যে প্রায় দুই ঘণ্টা পেরিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেছি, নিজেই বুঝতে পারিনি। তখন মনে হচ্ছিল, মানুষের জীবনের বড় বড় অর্জনও বুঝি এভাবেই ছোট ছোট লক্ষ্য পূরণের মধ্য দিয়েই সম্ভব হয়। গ্রামের গুরুজনেরা বলতেন,
শরীরের নাম মহাশয়, যাহা সহায় তাহাই সয়।
তবে এ কষ্টকর আরোহণের মধ্য আমার জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক ছিল যে জিনিসটি তা হল সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে দুই পাশে পাহাড়ি বাতাসে দোল খাওয়া লাল, নীল, সাদা, বেগুনি ও বহু রঙের নাম না জানা ঘাসফুল। হয়তো যারা উদ্ভিদবিজ্ঞানের পন্ডিত তারা এগুলোর নাম জানেন, আমরা সাধারণ মানুষরা এগুলোর নাম জানিনা এদের সৌন্দর্যে সদা বিমোহিত হই। এদের নাম জানিনা বলে, আমার নিজেকে খুব অকৃতজ্ঞ মনে হচ্ছিল তখন।
কথাটার সত্যতা আজকে সত্যি সত্যি অনুভব করলাম, তবে অতি কষ্টকর এ আরোহনের মাঝে একটি স্বস্তিদায়ক বিষয় ছিল লাল হলুদ সাদা হালকা সবুজ বেগুনি অপরিচিত ঘাসফুলের দোল খাওয়া ছবি। আলিঞ্জা থেকে ফিরে অঞ্চলের ছায়া ঢাকা প্রাচীন বহু গ্রাম ঘুরেছি।, গ্রামের চত্বরে চত্বরে বসে থাকা বুড়ো মানুষদের সাথে গল্প করেছি। ফসলের ক্ষেতের মাঝ দিয়ে মেঠোপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে কাছে দাঁড়িয়ে দেখেছি রহস্যময় হাছা পাহাড়কে। এখানকার মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী, নূহ (আ) এর নৌকা এই পাহাড়েই এসে আঘাত করেছিল। সেই আঘাতেই পাহাড়ের মাঝখানে সৃষ্টি হয়েছে দ্বিখণ্ডিত খাঁজের মতো এক বিশাল ফাটল। তাই এই পাহাড় শুধু একটি ভূপ্রাকৃতিক বিস্ময় নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের কাছে এক পবিত্র তীর্থভূমি ও সাংস্কৃতিক নোঙর। এই হাছা পাহাড়টি হচ্ছে এই অঞ্চলের একটি স্থির কেন্দ্রভূমি এবং এই কেন্দ্রকে ঘিরে ধরেই এখানকার জনবসতি এবং সভ্যতা গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার বছর আগে।
আছা পাহাড় দেখার পর গিয়েছি আসাফে কাফের গুহা দেখতে। আগেই বলেছি নাখচিভানের পাহাড়ঘেরা রহস্যময় এই জায়গায়ই ছিল আমার এখানে আসার প্রধান উৎসাহের কারণ। কুরআনের সূরা কাহাফের ১৮ নম্বর আয়াতে বলা জয়েছে,
“তুমি মনে করতে তারা জেগে আছে, অথচ তারা ছিল নিদ্রিত। আমি তাদের ডানে ও বামে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম, আর তাদের কুকুরটি ছিল গুহামুখে সামনের দুই পা প্রসারিত করে। তুমি যদি তাদের দেখতে, তবে অবশ্যই তাদের থেকে পিঠ ফিরিয়ে পালিয়ে যেতে এবং তাদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে।”
এই আয়াত যেন সেই গুহাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে নতুন এক অনুভূতি এনে দেয়। মনে হয়, ইতিহাস, বিশ্বাস ও রহস্য এখানে এখনো জীবন্ত হয়ে আছে। আমি সেই মিথ, ইতিহাস ও মানুষের বিশ্বাসকে কাছ থেকে অনুভব করতে চেয়েছিলাম। Ashabi-Kahf Cave Complex স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি গুহা নয়, বরং বিশ্বাস, মিথ, আধ্যাত্মিকতা আর মানুষের অদ্ভুত সব মানত–প্রার্থনার এক মিলনস্থল। কুরআনের সূরা কাহাফে বর্ণিত “আসহাবে কাহাফ” বা গুহাবাসী যুবকদের স্মৃতির সঙ্গে এই জায়গাকে অনেকে যুক্ত করেন। এখানকার মানুষের বিশ্বাস, বহু শতাব্দী আগে কয়েকজন ঈমানদার যুবক অত্যাচার থেকে বাঁচতে এই গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে ছিলেন। যদিও ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে নানা মত আছে, তবুও নাখচিভানের মানুষ গভীর বিশ্বাস নিয়ে এই স্থানকে তীর্থের মতো সম্মান করে।
পাহাড়ের বুক চিরে উপরের দিকে উঠতে উঠতে মনে হচ্ছিল যেন অন্য এক জগতে চলে যাচ্ছি। গুহার দিকে যেতে অসংখ্য সিঁড়ি ভাঙতে হয়—দীর্ঘ এই পথ ধীরে ধীরে উপরে উঠেছে পাহাড়ের চূড়ার দিকে। হাঁটতে হাঁটতে চারপাশে শুধু পাহাড়ি বাতাস, পাখির ডাক আর এক ধরনের নীরবতা, যা শহরের কোথাও পাওয়া যায় না। পথের পাশে বড় বড় গাছ, অনেকটা ম্যাপল গাছের মতো দেখতে, ছায়া ফেলে রেখেছে পুরো রাস্তা জুড়ে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যেন কোনো প্রাচীন কিংবদন্তির ভিতর দিয়ে হাঁটছি।
এখানে আসা মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত বিশ্বাস কাজ করে। অনেকে দূর দূরান্ত থেকে আসে মানত নিয়ে। কেউ সন্তান কামনায়, কেউ বিয়ের আশা নিয়ে, কেউ অসুস্থতার মুক্তির জন্য, আবার কেউ জীবনের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের প্রার্থনা নিয়ে। বিশেষ করে যুবক-যুবতীদের পরিবার এখানে নিয়ে আসে তাদের ভবিষ্যৎ, বিয়ে বা মনোবাসনা পূরণের আশায়। গুহার পাশে দাঁড়িয়ে অনেককে চোখ বন্ধ করে দোয়া করতে দেখলাম। চরম আধুনিক যুবতীদেওর দেখলাম তো না হলে ওইখানে এসে সবাই মাথায় কাপড় দিয়ে একটা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে হেঁটে হেঁটে সিঁড়ি ভেঙ্গে গুহার দিকে উঠছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এখানকার কিছু লোকজ আচার। মানুষ গুহার নির্দিষ্ট অংশের চারপাশে তিনবার ঘোরে। তারপর ছোট পাথর হাতে নিয়ে গুহার দেয়ালে ছুড়ে লাগায়। বিশ্বাস করা হয়, যদি সেই পাথর গুহার গায়ে আটকে যায় বা সহজে পড়ে না যায়, তাহলে তার মানত বা মনোবাসনা পূর্ণ হবে। আমাদের দেশের মাজারের মতো এখানেও দেখলাম অনেক গাছে লাল ফিতা বাঁধা। আসলে আমাদের দেশের এসব মাজারকেন্দ্রিক বা রুহানি সত্তার বিশ্বাসী ধর্মীয় বিশ্বাসগুলো তুরস্ক এবং পারস্য থেকে এসেছে, আজারবাইজান তখন এ সম্রাজ্য গুলিরই অংশ ছিল।তবে শুধু আমাদের এই উপমহাদেশীয় অঞ্চলেই নয় আমি স্পেনের টলেডো দুর্গে ও ফিনল্যান্ডের বালটিক সাগরের তীরে হেলসিংকির একটি সেতুতে এরকম মনোবাসনা পূরণের জন্য লাগানো হাজার হাজার তালা দেখেছি। আসলে এগুলো মানবজাতির মনোবাসনা পূরণের জন্য যে শাশ্বত ঊর্ধ্ব আকাশমুখী সাহায্য প্রার্থনার ধারণা সেখান থেকেই এসেছে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যাই হোক, মানুষের বিশ্বাসের গভীরতা এখানে স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়। মানুষ সেই একই আশায় এই কাজ করে যাচ্ছে বছরের পর বছর। পৃথিবীর কোন অঞ্চলে ভ্রমণে গেলে দেশে দেশে, কালে কালে মানব স্বভাবের এই সব বিচিত্র মিল এবং অমিল গুলোর তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক এবং সংস্কৃতিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে মানব সভ্যতার হাজার বছরের সম্মিলিত সিম্ফনির সুরকে আবিষ্কারের চেষ্টা করাটাই ভ্রমণের ক্ষেত্রে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে হয়।
গুহার উপরের অংশে পৌঁছে নিচের পাহাড়ি দৃশ্যটা ছিল অসাধারণ। চারদিকে নির্জনতা, ঠান্ডা বাতাস আর আকাশের খুব কাছে চলে আসার অনুভূতি। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এই জায়গা শুধু ধর্মীয় নয়, মানুষের আশা আর বিশ্বাসেরও এক আশ্রয়স্থল। আরেকটা বিষয় খুব ভালো লেগেছে এখানকার মানুষের আন্তরিকতা। উপরে ছোট ছোট চায়ের দোকানের মতো জায়গায় চা খাওয়ায়, কিন্তু টাকার ব্যাপারে যেন তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই। মনে হলো অতিথিকে আপ্যায়ন করাটাই তাদের কাছে বড় বিষয়।
নাখচিভানের এই Ashabi-Kahf Cave Complex শুধু একটি গুহা নয়—এটি ইতিহাস, কিংবদন্তি, ধর্মীয় অনুভূতি, লোকবিশ্বাস আর মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আজ সেখানে গিয়ে মনে হয়েছে, পৃথিবীতে কিছু কিছু জায়গা আছে যেখানে মানুষ শুধু ভ্রমণ করতে যায় না, নিজের ভেতরের অদৃশ্য প্রার্থনাগুলোও সঙ্গে নিয়ে যায়।
আমি, গাঙ্গেয় বদ্বীপের এক সন্তান, বহুদূরের ইউরোপ এবং এশিয়ার , পশ্চিম এবং পূর্বের, পারস্য এবং অটোমান সাম্রাজ্যের, ক্রিশ্চিয়ানিটি ও ইসলামের, শিয়া মতবাদ এবং সুন্নি মতবাদের, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের এক্সক্লুসিভ বীভাজনভূমি আজারবাইজানের এ অঞ্চলের মানুষের হাজার বছরের পুরনো মিথলজি, বিশ্বাস, পাহাড় ও নির্জন গুহার নীরবতা আর নিজের অন্তর্গত প্রশ্নগুলোকে একসাথে অনুভব করছিলাম এখানে এসে। মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটি স্থান দেখছি না—বরং মানুষের ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা আর কিংবদন্তি ও কল্পনার গভীরের সংস্কৃতিতে নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছি।
মাহফুজুল হক জগলুল
২২ মে, ২০২৬
আসাফে কাহফের চায়ের স্টলে বসে প্রাথমিকভাবে লেখা