ছায়া

সিংহদ্বারে নগররক্ষী বলেছিল,
‘তোমাদের দু’জনার মধ্যে শুধু একজন
নগরে প্রবেশ করতে পারবে,
তুমি অথবা তোমার ছায়া।’
ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুটা বিভ্রান্ত আমি গভীর অনিচ্ছায়
আমার ছায়াকে তুলে দিয়েছিলাম তার হাতে।
নিপুণ দক্ষতায় আমার শরীর থেকে আস্তে আস্তে
আমার ছায়া ছাড়িয়ে নিতে নিতে বৃদ্ধ নগররক্ষী বলেছিল,
‘তুমি ছাড়া তোমার ছায়া
নিতান্তই দুর্বল আর অপ্রয়োজনীয় একটা জিনিস।’
তার কথায় আমি খুব বিরক্ত আর অস্বস্তি বোধ করছিলাম,
আর ছায়ার কাছে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল তখন,
তবুও স্বার্থপরের মতো
ধীর পায়ে অবরুদ্ধ ছায়ার কাছে গিয়ে আমি বলেছিলাম,
‘তুমি কি একা একা কিছুকাল আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারো না?’
আমার প্রশ্ন সরাসরি উপেক্ষা করে
খুব ফিসফিসে ভীত কণ্ঠে ছায়া আমাকে বলেছিল,
‘আমার মনে হচ্ছে তুমি ভীষণ ভুল করছো,
মনে হচ্ছে, এ নগরটা পুরোপুরি কিছু ভুলের ওপর গড়ে উঠেছে।
তুমি বুঝতে পারছো না,
ছায়া ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না,
ঠিক তেমনি
মানুষ ছাড়া ছায়াও, তবু দেখো,
এরা কী নির্মমভাবে আমাদের দু’জনকে আলাদা করে দিচ্ছে।
আমি নিশ্চিত,
এ নগরের মধ্যে বড়ো কোনো ভুল আছে,
তুমি এ ভুল নগরে প্রবেশ কোরো না।’
কিন্তু ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে,
সূর্য আমাদের দু’জনের বেশ কাছে নেমে এসেছে,
দ্বাররক্ষীকে চমকে দিয়ে আমার ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর
হতে হতে তখন নগরের উঁচু প্রাচীরকেও অতিক্রম করতে চাচ্ছে।
ওদিকে প্রাচীন সিংহদ্বার পার হয়ে
বিব্রত ও বিস্মিত পুরোপুরি ছায়াহীন আমি তখন
নির্নিমেষ তাকিয়ে আছি দীর্ঘায়িত আমারই আপন ছায়ার দিকে,
আর
ছাড়পত্রহীন বিবস্ত্র আমার দীর্ঘতর ছায়াও
হতবাক হয়ে দেখছে আমার সঙ্গহীন নিরুত্তর চলে যাওয়া,
কুয়াশার মতো তার গাঢ় করুণ চোখে তখন
জ্বলজ্বল করছে তীক্ষ্ণ এক অচেনা অভিমান আর অবিশ্বাস।
তারপর বহুদিন পার হয়ে গেছে,
এই ভুল নগরে
এতো দিনে আমি আগের অনেক কিছুই ভুলে গেছি,
শরীরের চামড়ার চেয়েও ঘনিষ্ঠ আমার সেই যে ছায়া
এখনো সে আমার জন্য অপেক্ষা করছে কিনা,
আমি ঠিক মনে করতে পারি না,
শুধু দুটো জিনিস
আমি খুব স্পষ্ট মনে করতে পারি,
যে নগরে আমি জন্ম থেকে বাস করেছি,
সে নগর কোন দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল না,
আর
আমি যেখানেই যেতাম সেখানেই আমার ছায়া
পরম সঙ্গীর মতো সর্বক্ষণ আমাকে অনুসরণ করতো।

( হারুকি মুরাকামির উপন্যাস Hard-Boiled Wonderland and the End of the World-এর কয়েকটি লাইন অনুবাদ করতে গিয়ে দেখি সেটা অনেকটা কবিতার মতো রূপ নিয়েছে)

১৫ জানুয়ারি, ২০২২

আরও পড়ুন