তিতুমীর হলের কার্ড ফ্যাক্টরি

১৯৮৪ সালে আমরা যখন স্থাপত্যের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র তখন আমাদের প্রধান ঘাঁটি ছিল তিতুমীর হলের নর্থ ব্লকের দোতলার একদম পূর্বদিকের শেষ রুমটা। যতোসব সম্ভব-অসম্ভব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূতিকাগার ছিল আমাদের এই রুম। রুমের দুটো সিট ঢাকার ছেলে হওয়ায় মোটামুটি সব সময় খালিই থাকতো। তাই অনায়াসে ওখানে রাতে বিভিন্ন জেলার চেনা বা আধাচেনা বা হুলিয়াপ্রাপ্ত রাজনৈতিক কর্মী বা নেতারা এসে ঘুমাতো। একবার মনে আছে তখন এক এরশাদ ভ্যাকেশনে আমাদের পকেটমানির খুব টানাটানি হওয়ায় আমরা চিন্তা করলাম ঈদকার্ড এঁকে তা বিক্রি করবো। যথারীতি মডার্ন স্টেশনারি থেকে আইভরি বোর্ড আর হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে সস্তা এনামেল পেইন্ট কিনে এনে বাঁশের চটা দিয়ে এই রুমে বসে গণহারে শত শত কার্ড আঁকতে লাগলাম। আমাদের দলে ছিল হাবিব (বর্তমানে বেলজিয়াম প্রবাসী), মোস্তাফিজ (কানাডা প্রবাসী), রেজা (চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন চিফ টাউন প্ল্যানার), জামি (কানাডা প্রবাসী), রশিদ (কোথায় আছে জানি না), বজ্রধর কামাল আর আমি। ফ্যাক্টরি ওয়ার্কারদের মতো কার্ড আঁকতে আঁকতে আমরা এমন পারদর্শী হয়ে গিয়েছিলাম যে এক-একটা কার্ড আঁকতে আমাদের কখনো কখনো এক মিনিটেরও কম সময় লাগতো। গুলশানের কয়েকটি এমবাসি, অনেক কর্পোরেট অফিস ও অনেক নামিদামি হ্যাডিক্রাফট দোকান আমাদের কাছ থেকে নিয়মিত কার্ড কিনতো। প্রতিদিন কার্ড বিক্রি করে যে টাকা পেতাম তা যদি বেশি হতো তাহলে রাতে আমরা দল বেঁধে (এক রিকশায় ৩ জন) ঠাটারীবাজারের স্টার রেস্টুরেন্টে প্লেট থেকে বেরিয়ে ঝুলে থাকা পাঙ্গাশ মাছের পেটি (তখনো বাঙালি পুকুরে পাঙ্গাশ চাষ শেখেনি) আর ফালুদা খেতে যেতাম। আর বিক্রিবাট্টা কম হলে যেতাম বকশীবাজারের কাফে কাশে (এনামুল করিম নির্ঝর ডাকতো কফ ও কাশ) ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে পুঁইশাক-চিংড়ি আর মুরগির মাংস খেতে।

ব্যবসা যে সব সময় লাভজনক হয় তা না, কখনো কখনো ক্ষতির মুখও দেখতে হয়। এমন একটা ক্ষতি হয়েছিল গুলশান এক নম্বরে এখন যেখানে আলমাস সুপার সপ আছে তার নিচতলায়, সেখানে একটা বইয়ের দোকান ছিল তবে এর মালিক কার্ডও বিক্রি করতেন। আমরা তাঁকে অনেক কার্ড বাকি দিয়েছিলাম। তিনি বিদেশিদের কাছে হাতে আঁকা কার্ড বিক্রি করতেন; কিন্তু আমরা যখনই টাকা চাইতে যেতাম তখন অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতেন, ঠাণ্ডা সেভেন আপ খাওয়াতেন; কিন্তু টাকা দিতেন না। অনেক চেষ্টা করেও আমরা তাঁর কাছ থেকে টাকা বের করতে পারতাম না, তবু আমি অনেক দিন পর্যন্ত তাঁর কাছে নিয়মিত যেতাম আর ঠাণ্ডা সেভেন আপ খেয়ে আমাদের পেমেন্টের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করার কথা বলে প্রতি যাত্রায় একটা করে ফ্রি বই নিয়ে আসতাম। আমার এখনো মনে আছে তার দোকান থেকে এ পদ্ধতিতে আমি বিনয় ঘোষের অকেকগুলো বই (হাসনাত ভাই প্রথম আমাকে বিনয় ঘোষের লেখার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন) নিয়ে এসেছিলাম, যা আমার বুক শেলফে এখনো টিকে আছে।

আমাদের সর্বমোট অনেক টাকা লাভ হয়েছিল। লভ্যাংশ ভাগাভাগির পর আমি যে টাকা পেয়েছিলাম তা দিয়ে বিরাট কালো রঙের National Panasonic-এর দুপাশে দুটো detachable soundbox-সহ ভারি সুন্দর একটা ক্যাসেট রেকর্ডার কিনেছিলাম। অন্য কেউ একজন একটা সাইকেল কিনেছিল আর বাকি টাকা দিয়ে কক্সবাজার গিয়েছিল ঘুরতে।

আমি প্রতিটি ডিজাইনের কার্ডের একটি করে স্যাম্পল বহুদিন পর্যন্ত খুব যত্নের সঙ্গে গুছিয়ে রেখেছিলাম, কয়েক বছর আগেও তা নেড়েচেড়ে দেখেছি। কিন্তু আজ খুঁজতে গিয়ে মাত্র একটি কার্ড ছাড়া আর বাকি কোনো কার্ড পেলাম না। Murphy’s law অনুযায়ী যা কিছু খুব যত্নের সঙ্গে গুছিয়ে রাখা হয় তা হারিয়ে যায় সবার আগে। আসলেই Murphy’s law সত্য প্রমাণিত হলো, বাকি সব কার্ড বোধহয় চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেললাম।

২৪ নভেম্বর, ২০২৩

আরও পড়ুন