ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা ও একটি নৌকার গল্প

খুব সম্ভবত তখন ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ডুবে গেছে সমগ্র বাংলাদেশ। সে সময় বুয়েটে আমাদের ফাইনাল ইয়ারের থিসিস জমার প্রস্তুতি চলছে। বন্যার ভয়াবহতা আর সারা দেশে অনাহারী মানুষের চরম অসহায়ত্ব আমাদের পাগল করে তুললো, নিজেদের খুব স্বার্থপর মনে হতে লাগলো। এক পর্যায়ে হঠাৎ থিসিসের কাজকর্ম ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমরা নেমে পড়লাম দুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ সংগ্রহের কাজে। গুল্লি মারি থিসিস, যা হয় হবে, তবে আমাদের মধ্যে রিস্ক নিতে চায় না এমন কিছু ছাত্র অবশ্য খাইরুল আনাম স্যারের কাছে গেলো থিসিস নিয়ে কী করবে তা জানতে। স্যার বললেন, মানুষের এমন চরম দুর্যোগের সময় থিসিসের কথা বাদ দাও। এখন থিসিস করার সময় না।

এরপর আমাদের আর পায় কে, গুরু যখন পক্ষে শিষ্যের নাচন তখন থামায় কে। যদিও পরবর্তী সময়ে আমাদের ব্যাচের সবাই থিসিসের ফাইনাল পার্টে শূন্য পেয়েছিল, তবে শূন্য পাওয়ার সঙ্গে বন্যা বা ত্রাণকাজের কোনো সম্পর্ক ছিল না। পাইকারি দরে এই ঐতিহাসিক শূন্য পাওয়ার পর থেকে আমরা হয়ে গেলাম ‘জিরো ব্যাচ’।

অন্যদিকে স্থাপত্য বিভাগ ছাত্রসংসদের আয়োজনে তার আগেই অবশ্য আমরা নেমে পড়েছিলাম পলাশীর খোলা রাস্তায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা হাত পেতে রাস্তার যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা তুলতাম। কেউ ১ টাকা দিতো, কেউ ২ টাকা দিতো, কেউ কেউ তার মানি ব্যাগে যা আছে সব দিয়ে দিতো। রিকশায় করে যাওয়া এক বৃদ্ধা মহিলার কথা আমার আজও মনে আছে, যিনি তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগ ঝেড়ে যা ছিল তা সব আমাদের দিয়ে দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, বুয়েটের ছেলেদের টাকা দিলে একটি টাকাও নষ্ট হবে না। তোমাদের অনেক দোয়া করি বাবারা।

আমি তাঁকে বলেছিলাম,
রিকশা ভাড়াটা অন্তত রেখে দেন।
তিনি বলেছিলেন,
লাগবে না।

আর এক উঠটি টিভি অভিনেত্রী আর বিজ্ঞাপনী মডেলের কথা মনে আছে, যিনি বিশাল মাপের একটা বেমানান কালো সানগ্লাস চোখে লাগিয়ে রিকশা করে আজিমপুরের দিকে যাচ্ছিলেন। রিকশা থামিয়ে তাঁর কাছে সাহায্য চাইতেই তিনি আঁতকে উঠে আমাদের ছিনতাইকারী ভেবে চিৎকার করে উঠেছিলেন আর দুই হাত নেড়ে চেঁচামেচি করে লোকজন ডাকছিলেন তাকে বাঁচানোর জন্য। নারীকণ্ঠের অমন ডাকাডাকিতে চারদিকে তখন অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে, তবে কিছুক্ষণ পরে তিনি যখন আসল ঘটনা বুঝলেন তখন ভয়েই হোক বা নিস্তার পাওয়ার চকিত আনন্দেই হোক একশ টাকার একটা চকচকে নোট তাঁর বাহারি ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে বের করে আমাদের চাদরের ওপর ফেলে দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।

যাই হোক, কয়েক দিনে এভাবে অনেক টাকা জোগাড় করে কয়েক ট্রাক খাদ্য আর কাপড়চোপড় নিয়ে একটা বিরাট নৌকা করে আমরা ১০/১২ জন স্থাপত্যের ছাত্র বন্যার্তদের সাহায্য করার জন্য প্রগতি সরণির কাছে এখন যেখানে বৌদ্ধ মন্দির সেখান থেকে নৌকা নিয়ে (তখন ওই পর্যন্ত গভীর জলাধার ছিল) সোজা শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে ঘোড়াশালের দিকে রওনা দিলাম। অক্সফাম নামের একটা ব্রিটিশ এনজিওও আমাদের অনেক ত্রাণ-সাহায্য দিয়েছিল।

আমাদের দলে আমিসহ সেদিন আরো ছিল আমার ব্যাচের হাবিব (বর্তমানে বেলজিয়াম প্রবাসী, ছাত্রসংসদের সহসভাপতি), আলী নকী (আইএবির নবনির্বাচিত সহসভাপতি ও স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভিসি), রেজাউল করিম খোকন (আইএবির প্রাক্তন ট্রেজারার), কাজি আরিফ (আইএবির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, আর্কেশিয়ার গ্রিন অ্যান্ড সাস্টেইনেবল আর্কিটেকচার কমিটির চেয়ারম্যান), সাজ্জাদ রশিদ (প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও আইএবির প্রাক্তন ট্রেজারার), আব্দুস সোবহান (সিনিয়র স্থপতি, তৎকালীন স্থাপত্য ছাত্রসংসদের ক্রীড়া সম্পাদক ও বুয়েট ফুটবল, হকি ও ভলিবল টিমের খেলোয়াড়), খন্দকার সাব্বির আহমেদ (বর্তমানে আইএবির নবনির্বাচিত সভাপতি ও বুয়েটের প্রখ্যাত প্রফেসর), ইশতিয়াক জহির তিতাস (আইএবির ও UIA-এর সহসভাপতি), মাহবুবুর রহমান (স্থাপত্য ছাত্রসংসদের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক), ইকবাল হাবিব (বিশিষ্ট জাতীয় ব্যক্তিত্ব ও প্রখ্যাত পরিবেশ অ্যাক্টিভিস্ট), জুলকারনাইন হেলাল (কানাডা প্রবাসী স্থপতি), শাকুর মজিদ (বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত সাহিত্যিক), ফারুক আহমেদ (আইএবি চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের ভাইস চেয়ারম্যান), রম্য রহিম চৌধুরী (মিডিয়া জগতের বিখ্যাত মানুষ), জাফর হাদি (প্রাক্তন বুয়েট শিক্ষক, বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত আরবান ডিজাইনার), সেবী (স্থাপত্য অধিদপ্তরের সিনিয়র স্থপতি)-সহ আরো কয়েকজন। আরো হয়তো অনেকে ছিল, এখন নাম মনে করতে পারছি না। এই দলের মধ্যে হাবিব আর আমিই ছিলাম সবচেয়ে সিনিয়র, অর্থাৎ পালের প্রধান গোদা।

সন্ধ্যার দিকে আমরা শীতলক্ষ্যা নদীর পারে কালীগঞ্জে নৌকা থামাই। কালীগঞ্জ তখন প্রায় পুরোটাই পানির নিচে, অনেক মানুষ বাড়িঘরের ছাদেও আশ্রয় নিয়েছে। প্রায় সব রেস্টুরেন্ট আর ভাতের দোকান পুরোপুরি বন্ধ। রোদ, বৃষ্টি, বন্যার পানি আর নিজের ঘামের গন্ধে আমরা নিজেরাই তখন নিজেদের চিনতে পারছি না। আমার জামা-প্যান্ট পানিতে ভিজে গেছে, আমার পরনে তখন লুঙ্গি আর গায়ে সাব্বিরদের ব্যাচের বাবুর নীল রঙের একটা জিনসের শার্ট (খুব সুন্দর ফ্রি হ্যান্ড পার্স্পেক্টিভ আঁকতে পারতো বাবু, থার্ড ইয়ার পর্যন্ত পড়েছিল ও, তারপর হঠাৎ পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে কোথায় যেন

হারিয়ে যায়, সে কোথায় আছে তা আমরা কেউ জানি না)। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, অবসন্ন দেহে অনেকে তখন নেতিয়ে পড়েছে । কয়েকজন ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে লুকিয়ে নৌকার ভেতরে রাখা ত্রাণের বস্তা থেকে পাউডার মিল্ক বের করে খাওয়া শুরু করে দিয়েছিল এবং প্রফেশনাল না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে তাদের থুতনিতে লেগে থাকা সাদা গুঁড়ো দুধ মুছতে ভুলে যাওয়ায় তারা আমাদের কাছে ধরাও পড়ে গিয়েছিল।

কোথায় খাবার পাবো, কোথায় ঘুমাবো, নৌকায় তো সবার ঠিকমতো বসারই জায়গা নেই। জায়গার অভাবে অনেককে নৌকার গলুইয়ের ওপরই বসে যেতে হয়েছে সারাক্ষণ। তখন মোবাইল ফোন আবিষ্কার হয়নি। ঢাকার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করারও কোনো উপায় নেই। সবচেয়ে সিনিয়র আমি, সবাই মনে মনে ভাবছে জগলুল ভাই যখন সবাইকে নিয়ে এতোদূর এসেছে নিশ্চয়ই তার কোনো পরিকল্পনা আছে; কিন্তু আমি তো জানি রাতের খাবারের বা রাতে ঘুমানোর আমার কোনো পরিকল্পনা নেই, আমার পরিকল্পনা শুধু দুস্থ বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ। সে মহা অনিশ্চয়তার মধ্যে এগিয়ে

এলো সাব্বির। সাব্বিরের আব্বা তখন দেশের পুলিশপ্রধান। সাব্বিরের মারফত কালীগঞ্জ থানার ওসির কাছে খবর গেলো। তারপর সব কিছু পানির মতো সহজ হয়ে গেলো। আমাদের রাতে থাকার জন্য কালীগঞ্জ হাসপাতালের নবনির্মিত একটা ওয়ার্ড ছেড়ে দেওয়া হলো। হাসপাতালের কিছু নতুন বিছানা আর অল্প কয়েকটা মশারির ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন। তবে বন্যার কারণে সারা কালীগঞ্জে তখন ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না। আমাদের সবার রাতের খাবারের ও মোমবাতির ব্যবস্থাও ওসি সাহেব করলেন। সেদিন ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর ডিমের তরকারি দিয়ে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত আমরা ১৫ জন মনে হয় ৩০ জনের খাবার খেয়ে ফেলেছিলাম। সাব্বিরের কারণেই সেদিন আমার নেতৃত্বের সম্মান রক্ষা পেয়েছিল।

আমি সব সময় বলি, জগৎ বড়োই রহস্যময়, আর ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার বলেছিলেন, Truth is stranger than fiction…. তবে রহস্যের পেছনেও তাঁর রহস্য থাকে, যা আমরা সব সময় বুঝে উঠতে পারি না। কেননা আজ ৩৪ বছর পর ত্রাণের নৌকার সেই সাব্বির, সেই আলি নকী আর আমি কেমন করে যেন আবার একত্রে উঠেছি আর একটি বড়ো নৌকায়, সঙ্গে আছে সেই ফারুক আর

সেই নৌকার সহযাত্রীদের মতো একদল অত্যন্ত মেধাবী আর যোগ্য কর্মপাগল টগবগে তরুণ স্থপতি। এ নৌকার নাম আইএবির নৌকা। ৩৪ বছর আগে সেই নৌকার নেতৃত্ব ছিল আমার হাতে আর আজ আমরা একত্রে যে নৌকায় উঠেছি সে নৌকার নেতৃত্ব এখন প্রিয় সাব্বিরের হাতে। ইনশাআল্লাহ এবার সাব্বিরের নেতৃত্বে আমরা সবাই মিলে এবং সবার সহযোগিতা নিয়ে আগের মতোই সাফল্যের সঙ্গে ও নিরাপদে আমাদের নৌকা আমাদের কাঙ্ক্ষিত বন্দরে ভেড়াতে পারবো।

 

সিনিয়র, জুনিয়র, সব মতের ও পথের স্থপতিদের ধন্যবাদ জানাই। একটি সুন্দর ও কার্যকর আইএবি বিনির্মাণে সবার সহযোগিতা কামনা করি। সবার উপদেশ ও পরামর্শ কামনা করি। সবাইকে নিয়ে যেন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারি, এই দোয়া কামনা করি। আমাকে যাঁরা চেনেন আর যাঁরা চেনেন না সবার মতামত, উপদেশ, পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণের জন্য আমি অপেক্ষায় রইলাম। ধন্যবাদ।

ছবিঃ শাকুর মজিদ ও অন্যান্য

মাহফুজুল হক জগলুল
৫ ডিসেম্বর, ২০২২

আরও পড়ুন