পথের ছোট গল্প

আমেরিকার কাপুরুষিত ইরান আক্রমনকে কাজে লাগিয়ে এদেশের নির্লজ্জ জ্বালানী তেল সিন্ডিকেটের কারণে কৃত্রিম তেল সংকটের এ যন্ত্রনার মধ্যে এক বাল্যবন্ধুর পেট্রোল পাম্প থেকে বহু কষ্ট করে ফুল ট্যাঙ্ক অকটেন ভরে গতকাল সকাল ঠিক পাঁচটায় ঢাকা থেকে গাড়িতে করে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এসে পৌঁছেছি সকাল নয়টা ত্রিশ মিনিটে। টানা দু’দিন ফিফথ ইয়ার ফাইনাল থিসিস জুরিতে অংশগ্রহণ করে ঢাকার দিকে রওনা দিয়েছি আজ বিকেল পৌনে ছয়টায়। আগামী দু’দিনে আইএবির হিস্ট্রি কমিটির মিটিং আর পহেলা বৈশাখের প্রস্তুতির অনেক কাজ বাকি তাই আজ যেভাবে হোক ঢাকায় পৌঁছাতে হবে। মোটামুটি এস্টিমেট ছিলো রাত সাড়ে দশটায় বাসায় পৌছে ডিনার করবো।বরাবরের মতো ড্রাইভারকে কিছু বাছাই সিডি দেয়া আছে, সে এর মধ্য থেকেই তার ইচ্ছে মতো অথবা আন্দাজেই সিডি চালায়, আমি সাধারণত তার দৈবচয়ন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করি না তবে প্রায়ই খেয়াল করেছি কিছুটা রাগ প্রধান গান হলে ব্যাটা পট করে বাটন টিপে গানটা স্কিপ করে দেয়, আমি কিছু বলি না, শাস্ত্রীয় সুরের বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সি বোধহয় ও নিতে পারেনা। আজ গাড়ি ছাড়ার সাথে সাথেই সিডিতে বেজে উঠলো খুব চেপে চেপে নাভি থেকে শ্বাস নেয়া প্রচন্ড শান্তিনিকেতনী গায়কী ঘরানার এক নারী শিল্পীর রবীন্দ্র সংগীত,

জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে,
বন্ধু হে আমার, রয়েছ দাঁড়ায়ে।

এতো কন্ঠ চেপে চেপে গাওয়া গান ড্রাইভার বোধ নিতে পারছিলো না, কয়েকটা একই কিসিমের গানের পর তাই হঠাৎ করে দেখলাম সে সিডি বদলে দিল। এবার বাজছে জগজিৎ সিংয়ের,

তুম ইতনা জো মুসকুরা রাহে হো,
ক্যা গম হ্যায় জিসকো চ্ছুপা রাহে হো।

এক পর্যায় মাগরিবের নামাজের জন্য অচেনা এক শহরের অজানা এক মসজিদে গাড়ি থামল, অচেনা অনেক মানুষের সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়ে পরিচিত নামাজ পড়ে নিলাম। এরপর শুরু হলো অন্ধকার রাস্তায় অন্ধকার গাড়ি চলা। ঘন্টাখানেক গাড়ি চলার পর হঠাৎ খেয়াল করলাম সিডি প্লেয়ারের বাজছে উমরাও জানের গান,

ইস শাম্মে ফিরোজা কো আঁধি সে ডারাতে হো,
ইস শাম্মে ফিরোজা কে পারওয়ানা হাজারো হ্যায়।

এর ভাবার্থ করলে মোটামুটি এমন,

এ দীপ্তিময় প্রদীককে তুমি ঝোড়ো ঝাপ্টার ভয় দেখাও,
তুমি জানো,
এ দীপ্তিময় প্রদীপে হাজারো পতঙ্গ ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত।

উর্দু-ফার্সি সাহিত্যে এই শাম্মা বা শমা হচ্ছে প্রিয়জনের প্রতীক আর পরওয়ানা হচ্ছে সেই প্রেমিকের প্রতীক, যে আলোতে আকৃষ্ট হয়ে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাচ্ছে।
এই একটা সিডিই বোধ হয় আমার আর আমার ড্রাইভার, উভয়েরই গভীর পছন্দের। আমাদের দেশের অধিপতি শ্রেণি আর সাধারণ শ্রমজীবী শ্রেণীর মধ্যে সাংস্কৃতিক পার্থক্য বিশাল। এটা একটি অসুস্থ সমাজ বাস্তবতার উপসর্গ। পৃথিবীর আর কোন দেশে বা সমাজের এলিট শ্রেণির সংস্কৃতির সাথে সাধারণ মানুষের সংস্কৃতির পার্থক্য এতো তীব্র নয়। যা হোক, অন্তত অল্প কিছু গানে আমার আর আমার ড্রাইভারের ভালোলাগার মিল আছে। আসলে ১৯৮১ সালের ওমরা জানের সিনেমার জন্য লেখা উত্তরপ্রদেশের উর্দু সাহিত্যের অন্যতম কেন্দ্রভূমি আলীগড়ের প্রখ্যাত উর্দু কবি শাহরিয়ার আখলাক মোহাম্মদ খানের গানগুলো আমার খুবই প্রিয়। আমি বারবার এ গানগুলো শুনি তবু গানগুলো কখনো আমার কাছে পুরনো হয় না।

তবে সাথে দু’জন অত্যন্ত বিজ্ঞ ও কালচারড স্থপতি, তাদের এ গান পছন্দ হচ্ছে কিনা সেটাও ভাবছি। একালের অতিরিক্ত সংস্কৃতিবানরা আবার উর্দু বা হিন্দি গান সহ্য করতে পারেন না। যা হোক ঘন্টা দুয়েক এমন চলার পরে এবার শুরু হয়েছে অদিতি মহসিন। এ মহিলার রবীন্দ্রসংগীত আমার বেশ প্রিয়। গাড়ি খুব স্পিডে চলছে, চোখ বুজে খুব আরাম অনুভব করছি আর ক্লান্তি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি। সঙ্গের সাথী স্থপতি মাথা হেলান দিয়ে মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পরেই আমাদের যমুনা ব্রিজ পার হতে হবে। হঠাৎ মাঝারি মাত্রার ব্রেক করে গাড়ি থেমে গেলো। ড্রাইভার ব্যাটা কাচুমাচু হয়ে পিছনে তাকিয়ে মাল্টিপল প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল,

ছার, সামনে রোড সাইনে লেখা রংপুর ১০৫ কিলোমিটার। ঘটনা কি, ছার?

রংপুর ঢাকার দিকে আইলো কবে, ছার?

ঘটনার কিছুই না, রাস্তার পাশে দোকানের সাইনবোর্ডে তাকিয়ে দেখি আমরা তখন বগুড়ায়, মোটামুটি অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা উল্টা চলার খেসারত দিতে হবে এখন। সিডিতে তখন অদিতি মহসিন গেয়ে চলেছেন,

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে,
দিনরজনী কত অমৃতরস উথলি যায় অনন্ত গগনে।
পান করি রবে শশী অঞ্জলি ভরিয়া
সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি–
নিত্য পূর্ণ ধরা জীবনে কিরণে।
বসিয়া আছ কেন আপন-মনে,
স্বার্থনিমগন কী কারণে?
চারি দিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি,
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি
প্রেম ভরিয়া লহো শূন্য জীবনে।

বগুড়ায় গাড়ি তখন ইউ টার্ন নেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে আর আমি ভাবছি এই ভদ্রলোক সেই ১০০ বছর আগে কি সব অলৌকিক গান লিখে গেছেন, সব পরিস্থিতির জন্যই উপযুক্ত, কার্যকর, প্রাসঙ্গিক ও সান্তনাদায়ক।

শুধু রবীন্দ্রনাথের কারণেই বোধহয় মাথা ঠান্ডা রেখেই ড্রাইভারকে বলতে পারলাম,

সামনে যে রেস্টুরেন্টে বেশি ট্রাক পার্কিং করা দেখবা সেখানে গাড়ি থামাবা। ঝাল গরুর মাংস দিয়ে গরম গরম পরোটা খেতে হবে। ট্রাক ড্রাইভাররা যেখানে বেশি খায় সেসব খাবার হোটেলের গরুর মাংসের স্বাদ খুব ভালো হয়।

মাহফুজুল হক জগলুল
১২ এপ্রিল, ২০২৬
রাত ১০:৪০ 

আরও পড়ুন