চরেরবাড়ি, কলাখালী, পিরোজপুর
নান্না হাওলাদারের ঘর নামক এই বস্তুর খুব কাছেই কালীগঙ্গা নদী। অতি দরিদ্র নান্না এই নদীর জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে নিয়ে দূরদূরান্তের হাটবাজারে বিক্রি করে সংসার চালায়। নান্নার বউয়ের নাম নাহার বিবি।
এই নিতান্ত তুচ্ছ স্ট্রাকচারেরও কিছু সৃজনশীল স্ট্রাকচারাল কৌশল আছে। ঝড়ের সময় নদী থেকে আসা জোরালো বাতাসের ধাক্কায় যেন এই ছোট্ট আশ্রয়টি উড়ে না যায় সে জন্য চাল থেকে বেশ কিছু সুপারিগাছের ফ্রেম সোজা ঢুকে গেছে মাটির ভেতর। এতে আশ্রয়টি অনেক বেশি ঝড় সহনীয় হয়েছে।
এই ঘর নিয়ে কী লিখবো আমি?
এর বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। ঘরটি কোনমুখী তা জানা নিষ্প্রয়োজন। ঘরের ভেতর কয়টি রুম তা বলা নিষ্প্রয়োজন। ঘরটিতে কী কী ম্যাটেরিয়াল ব্যবহৃত হয়েছে তা বলা নিষ্প্রয়োজন। ঘরটি কয় চালা তা বলাও নিষ্প্রয়োজন। এ ঘরটি আর কতো দিন টিকবে তা বলাও নিষ্প্রয়োজন।
শুধু এদের নিয়ে চিন্তা করাটা নিষ্প্রয়োজন নয়, বরং খুব, খুব, খুব বেশি প্রয়োজন। এর চেয়ে আর কিছু বলতে আজ আর ভালো লাগছে না, তার পরও বলি :
এতো দারিদ্র, এতো নিরাশার মাঝেও জগতের আর সব মায়ের মতো নাহার বিবিও তার মেয়েকে সাজাতে ভালোবাসে। এই পৃথিবীতে তার একমাত্র সম্পদ ঘরের সামনের যে বুড়ো মেন্দি (শুদ্ধ বাংলায় বলে মেহেদি) গাছটা আছে সেই মেন্দি পাতা বেটে সে তার শিশুকন্যা ফাতেমার দুই হাতের নরম তুলতুলে তালুতে পরম আদরের সঙ্গে খুব সুন্দর আলপনার নকশা এঁকে দেয়। তার এই নকশার গ্রাফিকস বের হয়ে এসেছে তার জন্ম-জন্মান্তরের একান্ত নিজস্ব চিত্রকল্প ও নিষ্কলুষ সাংস্কৃতিক রক্তধারার ভেতর থেকে। আমাদের নাগরিক চিরচেনা পরাশ্রয়ী ব্রুটাল গ্রাফিকস থেকে তা সম্পূর্ণ আলাদা।
ফাতেমা মহানন্দে সারা পাড়া ঘুরে ঘুরে সবাইকে তার এই হাতের নকশা দেখিয়ে বেড়ায়। সে জানিয়ে দিতে চায়, জগতের মহা আনন্দযজ্ঞের সেও একজন ভাগীদার। তাকে আর অবহেলা করা যাবে না।
পূর্বে প্রকাশিত লিঙ্ক
