ওকে
পাখিদের কোনো নাগরিকত্ব নেই
তাই তারা সীমান্ত বোঝে না।
অনায়াসে তারা তাই অতিক্রম করে যায় বিপজ্জনক
সব আকাশসীমা,
জিরো পয়েন্টে লটকে থাকা ঝুলন্ত লাশের উঁচু উঁচু সীমান্ত বেড়া,
কিম্বা মারাত্মক অস্ত্রসজ্জিত সতর্ক সব রাগী রাগী বর্ডার চেকপোস্ট।
পাখিদের টেক্সটবুকে সে কারণে ফেলানী নামের কোনো
ছোট্ট টুনটুনি পাখির দুঃখী গল্প নেই।
সীমান্ত বোঝে না বলেই পাখিদের কোনো পেশাদার সেনাবাহিনী নেই,
নেই কোনো তারকাখচিত সুবেশী মেজর জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার,
নায়েব সুবেদার বা তীক্ষ্ণ ধার বেয়নেট হাতে দরিদ্রঘর থেকে
উঠে আসা আধপেটা সিপাইদের ঝাঁক ঝাঁক অনুগত বাহিনী।
সেই আদিম যুদ্ধ থেকেই পৃথিবীর সিপাইরা সব দরিদ্র ঘরের ক্ষুধার্ত সন্তান।
ক্ষুধার টানে জাতীয়তার পচা মদ খেয়ে খেয়ে তাদের যুদ্ধে যেতে হয়,
ঘোরগ্রস্ত ভূতের মতো পরম প্রতিবেশীর রক্তে রাঙাতে হয়
তাদের হাতের দশটি নগ্ন আঙুল।
পাখিরা যেহেতু কেউ দরিদ্র নয়, তাই ক্ষুধার টানে তাদের
কাউকে কখনো যুদ্ধে যেতে হয় না।
সীমান্ত বোঝে না বলেই পাখিরা
পাহাড়, নদী, সমুদ্র আর বনভূমিকে সার্ভে টেবিলে স্কেল রুলার বসিয়ে
জ্ঞানপাপীর মতো যত্রতত্র ভাগাভাগি করতে শেখেনি।
পাখিরা কখনো জল, বায়ু ও মাটিকে মানুষের মতো বিষাক্ত করে না
স্বার্থপর উন্মাদের মতো নদীর বুকের ওপর দাঁড়িয়ে
উজানে বানায় না আত্মঘাতী নির্মম বাঁধ।
পাখিরা সবাই মায়াময় ঘোর সংসারী,
কর্মে সাম্যবাদী শ্রমিক আর ঋতুক্রমে মুখরিত উৎসুক পর্যটক।
জন্মগতভাবে সব পাখিই যদিও কিছুটা কবিরাজি ও স্থাপত্য জানে,
তবে তাদের মধ্যে কোনো রাজনেতা, বণিক, ট্যাক্স কালেক্টর,
পেয়াদা, অস্ত্র ব্যবসায়ী ও দালাল নেই।
পাখিরা যেহেতু সবাই প্রায় সমান বুদ্ধিমান,
তাই বুদ্ধি ধার নেবার জন্য তাদের সর্বজান্তা অবসরপ্রিয়
কোনো বুদ্ধিজীবীর প্রয়োজন হয় না।
সার্বভৌমত্ব, সংবিধান, জাতীয়তা, পাসপোর্ট, ভিসা, নাগরিকত্ব সনদ, মানুষকে বিচ্ছিন্ন
রাখার বানোয়াট রাজ্যের সব আজগুবি জিনিসপত্র তাদের কাছে একদম অচেনা।
পাখিদের যেহেতু কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই,
তাই তাদের ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ, বাহারি নামের সব এনজিও
বা জাতিসংঘের মতো ফাজিলদের কোনো দরকার হয় না।
পাখিদের লোভ বা ক্ষমতালিপ্সাও নেই,
তাই ডক্টর ফস্টাসের মতো কখনো তারা নিজের আত্মাকে বিক্রি করে না।
পাখিরা জন্মগতভাবেই ধার্মিক ও নিষ্পাপ,
শুধু শুদ্ধ সংগীতের মাধ্যমে তারা তাদের প্রার্থনা জানায়
তাই তাদের গহিন কোনো বৈরাগ্য আশ্রম, চাকচিক্যময় কোনো ধর্মশালা,
ঊর্ধ্বাকাশ ছোঁয়া কোনো উদ্ধত উপাসনালয় অথবা
বেতনভোগী বাকপটু কোনো ধর্মগুরুর দরকার হয় না।
পাখিরা কখনো মিথ্যা বলে না,
তাই তাদের সমাজে বিবিসি, সিএনএন বা নিদেনপক্ষে
বিটিভির মতো পেশাদার কোনো জাদুকরের দল নেই।
মানুষ যেসব জিনিস খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করে
পাখিদের কাছে সেসব নিতান্তই বাহুল্য ও হাস্যকর।
মানুষও একদিন পাখির মতো সীমান্ত বুঝতো না,
মানুষ তখন পাখিদের মতো সরল ও সুখী ছিল,
অবারিত ছিল তার জীবন ও চলাচল।
মানুষ যদি আবার সুখী ও অবারিত হতে চায়,
তবে মানুষকে পাখিদের মতো সব সীমান্ত অস্বীকার করতে হবে,
অথবা
সবাই মিলে পৃথিবীকে পাখিদের কাছে তুলে দিতে হবে।
(এ লেখাটি সম্ভবত পদ্যও হয়নি, গদ্যও হয়নি। তার পরও এমনভাবে ছাড়া আমি আর অন্য কোনোভাবেই
লিখতে পারলাম না। কেননা আমি খুব সীমাবদ্ধ মানুষ, পাখিদের মতো আমি সীমা অতিক্রম করতে শিখিনি)
মাহফুজুল হক জগলুল
সেপ্টেম্বর, ২০২১