শিশিরভেজা শান্ত খালি পা দুটি,
সুবিন্যস্ত ঘন ঘাসের নিচে ক্রমশ
ছড়িয়ে দিচ্ছে আমার বাড়ন্ত শেকড়।
মৃত্তিকার গলিত রস ও জল শুষে নিয়ে
সতেজ হয়ে উঠছে আমার সুঠাম কাণ্ড,
ডালপালা, প্রসারিত পাতার শিরা-উপশিরা,
আর মাথার ওপর সূর্যের দীঘল আলো ও তাপ
আমাকে বদলে দিতে তৈরি করছে নতুন নতুন স্নায়ুকোষ।
বানের উদ্বেল ঘোলা জল পাড় উপচে পাগলের মতো ধেয়ে এসে
উর্বরা পললভূমিতে আস্তে আস্তে নিমজ্জিত করছে আমার জঙ্ঘা,
এলোমেলো মাতাল হাওয়ার আঙুল
আমার চুলের গভীরে আদরের বিনুনি কাটছে,
প্রশান্ত নির্ভরতায় চোখ আমার বুজে আসছে পরম সুখে।
তুলোর মতো নরম মেঘের ছায়ারা
আমার শরীরটাকে প্রদক্ষিণ করছে গভীর মনোযোগে।
প্রথম স্পর্শের মতো পাগল হাওয়ায় হাওয়ায়
থরথর করে করে কেঁপে উঠছে গাছের পাতা।
একটি ক্ষুদ্র গোলাকার নামহীন খয়েরি-লাল পোকা
নির্দ্বিধায় উড়ে এসে বসেছে আমার মধ্যমায় গোড়ায়।
মনে হচ্ছে যেন জ্বলজ্বলে আকিক পাথরের আংটি পরেছি হাতে।
একটা অদ্ভুত সবুজ পথভোলা সুঁইচোরা
নিঃশঙ্কায় এসে বসেছে আমার ডান কাঁধের মাঝামাঝি।
নিজেকে এখন বৃক্ষ ভাবতে বেশ লাগছে।
একসময় লাল হতে হতে সূর্য চলে গেলে
পাখিকেও অশেষ অনিচ্ছায় উড়ে যেতে হয়,
মেঘেদের ছায়া মিশে যেতে হয় অন্ধকারে,
তবু টের পাই,
মেঘেরা এখন নেমে আসছে আরো কাছাকাছি,
পাতার ফাঁকে জ্বলজ্বল করছে সুঁইচোরার সম্মোহিত দুচোখ,
হলুদ রঙের আলোয় জ্বলজ্বল করছে আমার ঘরের জানালা,
ঘর এখন আমাকে ডাকছে, ডাকবেই,
অন্ধকার নেমে এলে ঘরকে ডাকতেই হয়।
কিন্তু ততোক্ষণে আমার পায়ের নিচের
শেকড় ছড়িয়ে গেছে অনেক গভীরে,
মাতাল হাওয়া আরো মাতাল হয়েছে,
আমার শরীর এখন হয়ে উঠেছে পৃথিবীর শরীর।
প্রথম প্রহরে অনুরাগের বিন্দু বিন্দু শিশির
ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার পায়ের নিচের ঘাস, আমার শরীর,
গাছের পাতা আর আমার ঘরের ছোট্ট চৌকোনা জলছাদ।
অবশেষে, বৃষ্টি হেসে হেসে আমাকে নিতে চাইছে দীর্ঘতর রিমান্ডে,
কোনো কঠিন প্রশ্নবাণে নয়,
বরং মায়াবী রিমান্ডে বৃষ্টি সারা রাত শুধু তার নিজের গল্প শোনায়,
গল্পের পর গল্প, আর গল্প, ঝিমঝিম, রিমঝিম গল্প।
অকস্মাৎ মাস্তানের মতো কোত্থেকে জোছনা এসে
ছিনতাই করে নিচ্ছে আমার শরীর,
তন্নতন্ন করে তল্লাশি করছে আমাকে আপাদমস্তক।
ঘোরলাগা গৃহত্যাগী জোছনায় আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি,
সময় ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে,
নিমগ্ন লজ্জায় পৃথিবীর দুচোখ বুজে আসছে,
তার দ্রাঘিমা আর অক্ষরেখারা থরথর করে কেঁপে উঠছে।
সুদূর নক্ষত্রের আলোয় আলোয়
বিদেহী মাতাল গন্ধরাজ এখন,
মৈথুনরত পৃথিবীর নগ্ন শরীরে
ছড়িয়ে দিচ্ছে তীর্থের গুপ্ত সৌরভ।
0 Comments