মঙ্গোলিয়া, সাহসী মানুষের দেশে : ষষ্ঠ পর্ব

আগেই বলেছিলাম, আমাদের জন্য সে রাতে মঙ্গোলিয়ান ইউনিয়ন অব আর্কিটেক্টস আয়োজন করেছিল মিনি নাদাম আর মিনি নাদাম কী তা বোঝার জন্য ম্যাক্সিমাম নাদাম কী জিনিস এখন সেটা বলার চেষ্টা করছি। প্রত্যেকটা মানবগোষ্ঠীরই কিছু উৎসব থাকে, অঞ্চল-নির্বিশেষে শত শত বছর ধরে মঙ্গোলদের প্রধান উৎসব হলো নাদাম উৎসব, ওরা বলে এরিন গুরভান নাদাম। প্রথম দিনই সেই মঙ্গোলিয়ান সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ডানজ্ঞাসুরেন ডাঙ্গা আমাকে আক্ষেপ করে বলেছিলো,

এতো দূরে এলে যখন মাস দুয়েক আগে নাদাম উৎসবের সময় এলে না কেন? নাদামের সময় এলে তুমি আসল মঙ্গোলিয়া দেখতে পেতে।

কথা সত্য, প্রতিবছরের জুলাই মাসের ১১ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত এই তিন দিন সারা মঙ্গোলিয়ায় নাদাম উৎসব উদযাপিত হয়। আমরা মঙ্গোলিয়া আসার দুই মাস আগেই নাদাম উৎসব হয়ে গেছে। আমরা যেমন বলি ঈদের পরে ওই কাজটা করবো বা ঈদের পরে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করবো, ওরাও তেমনি বছরের সব কার্যক্রম, বিশেষ করে বিয়েসহ অন্যান্য পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান নির্ধারণ করে নাদামকে কেন্দ্র করে। ১৯২২ সালে মঙ্গোলিয়ান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জনক দামদিন সুখবাতার মঙ্গোলিয়ান বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকীতে সরকারি নির্দেশ জারি করে জুলাইয়ের ১১ থেকে ১৩ তারিখ নাদাম উৎসবের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়, যা আজ পর্যন্ত বলবৎ আছে। এর আগ পর্যন্ত নাদাম ছিল অনেকটা তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্ম আর মঙ্গোলীয় তৃণভূমি অঞ্চল ও সাইবেরিয়া অঞ্চলের একদম নিজস্ব সামান ধর্মাশ্রিত ঐতিহ্যবাহী উৎসব। সামানরা অনেকটা আমাদের ওঝাদের মতো, এরা ভূত-প্রেত নিয়ে কাজ করে, মানুষের ভবিষ্যত বলে দিতে পারে বলে বিশ্বাস করে আর মানুষের বিপদমুক্তির জন্য তাবিজ-কবজ, ঝাড়ফুঁক দেয়। এদের অনেককে দেখেছি ঐতিহ্যবাহী মঙ্গোলীয় জোব্বা পরে পাথরের স্তূপের ওপর দুধ ছিটিয়ে নানা প্রকার আচার-অনুষ্ঠান আর আরাধনা করতে। মঙ্গোলিয়ার একদম অভ্যন্তর অঞ্চলে একবার আমাদের এক যাত্রা শুরুর সময় দেখলাম, এদেরই একজন আমাদের গাড়ির চার চাকায় গুনগুন করে মন্ত্র পড়ে পড়ে একটা বড়ো বাটি থেকে দুধ নিয়ে লম্বা হাতলের একটা চামচ দিয়ে চাকাগুলো ভিজিয়ে দিচ্ছে আমাদের পথের নিরাপত্তার আশীর্বাদ হিসেবে।

যখন থেকে সরকারি আদেশে নাদাম পালন শুরু হয় তখন থেকেই নাদামের সঙ্গে সামরিক কুচকাওয়াজসহ অন্যান্য সরকারি প্রপাগান্ডার মতো ইভেন্ট যুক্ত হতে শুরু করে। চেঙ্গিস খানের আমলেও সব গোত্রের মধ্যেই এমন নাদাম উৎসব হতো; কিন্তু তখন সেই শত শত বছর আগে তারা গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করতো না। তাই তাদের পক্ষে জুলাই মাসের ১১ তারিখ কবে তা বোঝার প্রয়োজনও হতো না। তারা নাদাম উৎসব নির্ধারণ করতো তাদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী। আজও যাযাবর মঙ্গোলরা তাদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী তাদের নাদাম উৎসব পালন করে, সে কারণে তাদের উৎসবের তারিখ আর নগরের সরকারি আদেশে নাদাম উৎসবের তারিখ এক নয়। সে জন্য উলানবাটোর শহরের নাগরিকরা শহরের নাদাম উদযাপন করেও আগে বা পরে যাযাবরদের সঙ্গে আরো কয়েকটি নাদাম উৎসবে যোগ দিতে পারে আর বেশির ভাগ নররবাসী সেটাই করে।

মঙ্গোলীয় যাযাবরদের মধ্যে এখনো প্রচলিত, তাদের ঐতিহ্যবাহী বর্ষপঞ্জি অনেকটা তাদের রাস্তার ট্রাফিক সিস্টেমের মতো মিক্সড সিস্টেম, অর্থাৎ চান্দ্র ও সূর্য বর্ষ গণনা পদ্ধতির মিশ্রণ। মঙ্গোলীয়দের এ বর্ষপঞ্জিকে তারা বলে সালাবার বা সাগলাবার। সূর্যের উত্তরায়ণের পর থেকে দ্বিতীয় নতুন চাঁদ যেদিন উঠবে, সেদিনই হবে তাদের নববর্ষ বা সাগান সার। সাগান সার শব্দের অর্থ ‘সাদা চাঁদ’। মঙ্গোলরা এ সময় সাদা পোশাক পরে, সাদা ঘোড়ায় চড়ে আর সাদা তরল অর্থাৎ দুধ খায়। এই নববর্ষকে ধরে নিয়েই ঠিক মধ্য গ্রীষ্মের সময় সারা মঙ্গোলিয়ায় নাদাম উৎসব পালন করা হতো। এ বছর সেই চাঁদ উঠেছিল ১ ফেব্রুয়ারি। তাই তাদের নববর্ষ বা সাগান সার হয়েছিল ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে। গত বছর ওদের নববর্ষ হয়েছিল ফ্রেব্রুয়ারির ১২ তারিখে। সেই হিসেবে যারা ওদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী নাদাম পালন করে, তাদের নাদামের তারিখও আগের বছরের চেয়ে পিছিয়ে গিয়েছিল।

খুব সহজ করে বলতে গেলে নাদাম শব্দের অর্থ হলো ‘পুরুষের তিনটি খেলা’। এই তিনটি খেলাকে কেন্দ্র করেই নাদাম উৎসব পালন করা হয়। এ তিনটি খেলা হচ্ছে কুস্তি, ঘোড়াদৌড় আর তীরন্দাজী। তবে পুরুষের খেলা হলেও বর্তমানে নাদাম উৎসবে মহিলারাও অনেক ইভেন্টে প্রতিযোগিতা করে। মরিন খুর নামের মঙ্গোলিয়ানদের একান্ত নিজস্ব একটা বাদ্যযন্ত্র আছে, যেটা অনেকটা বেহালার মতো, তবে সেটা কাঁধে ঠেকিয়ে নয়; বরং কোলের ওপর রেখে বাজানো হয়। এই মরিন খুর বাজিয়ে বাজিয়ে আর মঙ্গোলিয়ার ঐতিহ্যবাহী লম্বা লম্বা টানের সম্মিলিত ‘উরতিন দু বা লম্বা গান’-এর মাধ্যমে তারা নাদাম উৎসবের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে নাদাম উৎসব শুরু করে। এই ঘোষণার পরপরই শুরু হয় বিশালসংখ্যক নানা রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত নারী-পুরুষের সম্মিলিত বিয়েগলি নাচ। প্রত্যেক মঙ্গোলীয় নারী-পুরুষই কিছু না কিছু এই বিয়েগলি নাচ জানে। বিয়ের অনুষ্ঠানে বা বিভিন্ন সামাজিক বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে হঠাৎ দেখা যেতে পারে যে কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ নারী বা পুরুষরা আনন্দে দল বেঁধে এই বিয়েগলি নাচ শুরু করে দিয়েছে। নাদামের সময় প্রতিদিন উপরোল্লিখিত তিনটি খেলার প্রতিযোগিতার শেষেই থাকে ঐতিহ্যবাহী নানা পদের বিশাল সম্মিলিত ভোজের ব্যবস্থা,

যাকে এরা বলে খুশুর। মঙ্গোলদের ৯টি গোত্রের প্রতিনিধিত্বকারী চেঙ্গিস খানের ৯টি ইয়াকের লেজ, আজও নাদাম উৎসবের উদ্বোধনের সময় উলানবাটোরের সুখবাটার স্কয়ার থেকে জাতীয় স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এ তথ্যটা নিয়ে আমি কিছুটা বিভ্রান্ত। কেননা আমার ট্যুর গাইড এ ক্ষেত্রে বলেছে, এ ৯টি আসলে ইয়াকের লেজ নয়, ওগুলো চেঙ্গিস খানের ৯টি ঘোড়ার লেজ। আমি অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেও এ ব্যাপারে কোনো মীমাংসায় আসতে পারিনি। মোট কথা, ইয়াকের লেজ হোক আর ঘোড়ার লেজই হোক, এর মাধ্যমে ওই ৯টি গোত্রসহ চেঙ্গিস খানকে মঙ্গোলীয়রা আজও পরম সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করে প্রতিবছর। সারা মঙ্গোলিয়ার প্রধান নাদাম উৎসব অনুষ্ঠিত হয় উলানবাটোরের সেন্ট্রাল স্টেডিয়ামে আর উলানবাটোর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে ‘খুই দোলন খুদাগ’ নামের এক উপত্যকায়। সারা পৃথিবী থেকে হাজার হাজার ট্যুরিস্ট এই নাদামের সময় মঙ্গোলিয়ায় আসে। আগে থেকে হোটেল বুক করে না রাখলে তখন উলানবাটোরে থাকার জায়গা পাওয়া দুঃসাধ্য হয়ে যায়। এখন একে একে এই তিনটি খেলা সম্পর্কে সংক্ষেপে বলি। প্রথমেই বলি কুস্তি নিয়ে।

মঙ্গোলীয় ট্র্যাডিশনাল কুস্তি ওদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কুস্তিকে ওরা বলে বখ। চেঙ্গিস খান তাঁর সেনাবাহিনীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সর্বোচ্চ অবস্থায় রাখতে এবং সর্বদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখতে নিয়মিত কুস্তির চর্চা ও প্রতিযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিতেন। সেই আটশ বছর আগে চেঙ্গিস খানের সময় যেভাবে কুস্তি লড়া হতো, এখনো হুবহু একইভাবে তাদের ট্র্যাডিশনাল রঙিন নেংটি, যাকে ওদের ভাষায় বলে শুডাগ আর দুই হাতাযুক্ত বুক খোলা এক ধরনের উদ্ভট রঙিন পোশাক, যাকে ওরা বলে জোডগ পরে ওরা কুস্তি লড়ে। এ সময় ওদের পায়ে থাকে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত উঁচু কারুকার্যখচিত গাম বুটের মতো জুতা, যাকে ওরা বলে গুতাল। রেফারি যিনি থাকেন, তিনি পরে থাকেন বিশাল রঙিন রাজকীয় জোব্বা আর তাঁর মাথায় থাকে একটা মুকুটের মতো খাড়া টোপলাওয়াল টুপি, এরা একে বলে গুগু টুপি। মোট হাজারখানেক কুস্তিগির নাদামের দশ রাউন্ডের একটা নক-আউট টুর্নামেন্টের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা করে করে ফাইনালের দিকে এগিয়ে যায়। কুস্তিগিররা তাদের পা বা হাত ছাড়া শরীরের অন্য কোনো অংশ দিয়ে মাটি স্পর্শ করলেই সঙ্গে সঙ্গে তার পরাজয় ঘোষিত হয় । খ্যাতিমান কুস্তিগিরকে সুযোগ দেওয়া হয় তার প্রতিপক্ষ বেছে নেওয়ার। প্রত্যেক কুস্তিগিরের একজন করিৎকর্মা উৎসাহদাতা বা আমেরিকানদের মতো চিয়ার লিডার থাকে, যাকে ওরা বলে জাসুউল। এজজন জাসুউল নানা রকম চিৎকার, চেঁচামেচি, হাততালি আর লাফালাফি করে যার যার ওস্তাদকে সাহস জোগায়। প্রথা অনুযায়ী এই জাসুউল তৃতীয়, পঞ্চম ও সপ্তম রাউন্ডের পরপরই বিজয়ী কুস্তিগিরের জন্য প্রশংসাসূচক গান গেয়ে অনুষ্ঠান মাতিয়ে রাখে। মানুষ শুধু কুস্তি দেখতে আসে না, এদেরও দেখতে আসে। এই জাসুউলদের পারফরম্যান্সও কুস্তিগিরদের চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়।

সপ্তম ও অষ্টম পর্যায় পর্যন্ত যারা যেতে পারে তাদের ‘জান’ অর্থাৎ ‘হাতি’ খেতাব দেওয়া হয়, আর যারা নবম ও দশম পর্যায়ে যায় তাদের বলে ‘আর্সলান’ অর্থাৎ ‘সিংহ’। এভাবে যখন চূড়ান্ত পর্যায়ের কুস্তিগিররা একে অপরের দিকে পা দিয়ে মাটির ওপর সজোরে পদক্ষেপ করতে করতে অগ্রসর হতে থাকে, তখন সব জাসুউল হই হই করে একত্রে মাঠে নেমে পড়ে আর চারপাশের সমবেত হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশু মিলে এক মহা আনন্দ, চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। সারা মঙ্গোলিয়ার মানুষ তখন ঘর ছেড়ে নাদামে নেমে আসে। যেসব কুস্তিগির অন্তত দুবার সিংহ উপাধি পায়, তারা ওদের সমাজে অনেক বড়ো ধরনের সেলিব্রেটি। এদের বলে আভ্রাগা। পথেঘাটে যদি কোনো মঙ্গোলিয়ানের সঙ্গে এমন কোনো আভ্রাগার দেখা হয়, তখন তারা সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে সেলফি তোলার চেষ্টা করে। মঙ্গোলীয়রা শুধু তাদের দেশেই নয়, সারা পৃথিবীতে কুস্তির জন্য বিখ্যাত। জাপানের অনেক সুমো গ্র্যান্ড চ্যাম্পিয়ান কুস্তিগিরই মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত ।

এবার বলি নাদামের আরেক খেলা ঘোড়দৌড় নিয়ে। মঙ্গোলিয়ান ঘোড়দৌড়ের সঙ্গে আমাদের সচরাচর দেখা ঘোড়দৌড়ের কিছুটা তফাত আছে। আমরা সাধারণত রেসকোর্সে যেসব দুই থেকে আড়াই মাইল অতিক্রম করা স্বল্প দূরত্বের অত্যন্ত দ্রুত ঘোড়দৌড় দেখে অভ্যস্ত, নাদানের ঘোড়দৌড় সে রকম নয়। নাদামের ঘোড়দৌড় অনেকটা ম্যারাথন ক্রস-কান্ট্রি প্রতিযোগিতা। দুই বছর বয়সী ঘোড়ার জন্য অতিক্রম করতে হয় দশ মাইল, এই দুই বছরের ঘোড়ার দৌড়কে বলে ‘দাগা’। অন্যদিকে সাত বছর বয়সী ঘোড়ার জন্য অতিক্রম করতে হয় প্রায় সতেরো মাইল তৃণভূমির পথ। মঙ্গোলিয়ার সবচেয়ে বড় নাদাম উৎসবে হাজারখানেক ঘোড়া অংশগ্রহণ করে থাকে। ঘোড়ার দৌড় শুরু হওয়ার আগে উপস্থিত দর্শকরা সম্মিলিতভাবে মঙ্গোলীয় ঐতিহ্যবাহী গান গাইতে থাকে আর ঘোড়ার জকিরাও গান গেয়ে ওঠে। জকিদের এ গানকে বলে জিঙ্গো। প্রত্যেক বয়স শ্রেণিতে শীর্ষ পাঁচ ঘোড়াকে এয়ারগিন তাভা খেতাব দেওয়া হয় আর শীর্ষ তিনটিকে সোনা, রুপা ও ব্রোঞ্জের মেডেল পরিয়া দেওয়া হয়। বিজয়ী জকিকে ‘তুমনি এখ’ নামের একটা খেতাব দেওয়া হয়। এই ‘তুমনি এখ’-এর বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘দশ সহস্রের নেতা’। যে ঘোড়াটি দাগা রেসে একদম লাস্ট হয় তাকে ওরা হাসতে হাসতে কৌতুক করে ডাকে ‘বয়ান খোদুদ’, যার অর্থ ‘ভরা পেট’। এই ভরা পেট অলস ঘোড়ার ওপর সমবেদনা জানিয়ে সব শেষে সবাই মিলে হাসতে হাসতে একটা গান গায়, একে ওরা বলে ওই বেচার ঘোড়ার জন্য আশীর্বাদের গান। এ গানের মূল কথা হচ্ছে, ঘোড়াটিকে এমনভাবে আশীর্বাদ করা যেন পরের বছর সে বিজয়ী হতে পারে। আসলে পুরো নাদাম উৎসবের মূল জিনিসটা হচ্ছে সামাজিক সম্মিলনের মাধ্যমে সকলে একতাবদ্ধ হয়ে আনন্দ উপভোগ করা, সবার জন্য সববেদনা আর শুভ কামনা করা, প্রতিযোগিতা বা বিজয়ী হওয়াটা এখানে সামান্য উপলক্ষ মাত্র।

নাদামের তৃতীয় খেলা হচ্ছে তীরন্দাজী। প্রতি প্রতিযোগী তীরন্দাজকে চারটি করে তীর দেওয়া হয়। দশজনের একটি দল করে করে এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৫ সাল থেকে মহিলারাও এ খেলায় অংশগ্রহণ শুরু করে। পুরুষদের লক্ষ্যভেদ করতে হয় পঁচাত্তর মিটার দূর থেকে আর মহিলাদের করতে হয় পঁয়ষট্টি মিটার দূর থেকে। প্রত্যেক প্রতিযোগী এ সময় ওদের ঐতিহ্যবাহী রঙিন জোব্বা, যাকে ওরা বলে দেল, সেটা পরেই এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। কুস্তি বা ঘোড়দৌড়ে বয়স্ক মঙ্গোলরা তেমন অংশগ্রহণ না করলেও এই প্রতিযোগিতায় অনেক বয়স্ক নারী-পুরুষ অংশ নেয়।

নাদাম সম্পর্কে মোটামুটি জানা হলো। এখন ফিরে আসি আমাদের জন্য চেঙ্গিস খান ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্সে আয়োজিত মিনি নাদাম প্রাঙ্গণে। এবারের আর্কেশিয়ার মঙ্গোলীয় আয়োজকরা তাদের আয়োজিত মিনি নাদামে আমাদের সবার জন্য হাড় কাঁপানো শীতের রাতে নাদামের মতো ডজনখানেক কুস্তিগির একত্র করে কুস্তি দেখার সুযোগ করে দেয়। আমরা যদিও খুব মজা করতে করতে চারদিকে খাটানো সুন্দর সুন্দর তাঁবুতে বসে আরউল খেতে খেতে হালকা মেজাজে কুস্তি দেখছিলাম; কিন্তু সব কুস্তিগির ছিল ভীষণ সিরিয়াস। এমন ভীম আর ঘটোৎকচ সাইজের কুস্তিগিরদের কুস্তি লড়া দেখে আমার খুব প্রিয় ভাইজান, কলকাতার স্থপতি দিলীপ চট্টোপাধ্যায়ের হঠাৎ খুব জোশ উঠে গেলো। দিলীপদার শখ হলো কুস্তিরত অবস্থায় ওদের সঙ্গে ফটো তুলবেন আর এ ফটো তোলার দায়িত্ব তিনি দিলেন এই নিরীহ বাঙালকে। আমি কাছে দাঁড়িয়ে দেখলাম, জিনিসটা বেশ বিপজ্জনক। কুস্তিগিররা হঠাৎ ডানে আছড়ে পড়ছে তো আবার পরমুহূর্তেই বামে আছড়ে পড়ছে। হঠাৎ ভীম সামনে আছড়ে পড়ছে তো পরপরই জরাসন্ধ পেছনে আছড়ে পড়ছে। কুস্তিরত অবস্থায় এদের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ফটো তোলার পোজ দিতে গেলে যেকোনো মুহূর্তে এদের যে কেউ গায়ের ওপর এসে পড়তে পারে। যদি বিশাল সাইজের ওই একশ ষাট কেজির ঘটোৎকচ আর ভীমরা কোনোক্রমে দিলীপদার গায়ের ওপর আছড়ে পড়ে তাহলে মুহূর্তের মধ্যে কিছু বোঝার আগেই দীলিপদা চিংড়ি চচ্চড়ি হয়ে যাবেন। কিন্তু তাকে সেটা বোঝায় কে, তার জোশ তখন চরমে। তিনি বারবার ওদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পোজ দিচ্ছেন; কিন্তু আমি ফটো তোলার আগেই হুড়মুড় করে তেড়ে আসা কুস্তিগিরদের কারণে দিলীপদা খুব স্মার্টলি লাফ দিয়ে সরে যাচ্ছেন। এভাবে ওদের কোস্তাকুস্তি আর দিলীপদার চৌকস লাফালাফির মধ্যে অন্ধকারে আমিও বারবার স্থান বদল করে বেশ কয়েকটা ছবি তুললাম। তবে এতো হুলুস্থুল নড়াচড়ার মধ্যে সেগুলো বেশি পদের ছবি হয়নি। তবে কুস্তি লড়া শেষ হয়ে গেলে নীল নেংটি পরা এক কুস্তিগিরের সঙ্গে দিলীপদার একটা দারুণ নায়কোচিত পোজ দেওয়া ছবি তুলতে পেরেছিলাম বলে দিলীপদার কাছ থেকে আর বকা খেতে হয়নি।

মাহফুজুল হক জগলুল

আরও পড়ুন