মঙ্গোলিয়া, সাহসী মানুষের দেশে : দশম পর্ব

আমার বক্তব্যের পর মনে হলো, রিসিপশনিস্ট বুর্জিগিন আমার কথা মোটামুটি মেনে নিয়েছে । এবার দেখলাম, তার মধ্যে সেই বিতর্কের ভাবটা কেটে গেছে। বরং সে আরো বেশি আলাপ জমাতে চাচ্ছে আমার সঙ্গে। কিন্তু তখন অনেক রাত, আমি অনেক ক্লান্ত, তাই চাচ্ছিলাম রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতে। ব্লাড প্রেসারের ওষুধ খাওয়া তখনো বাকি। ও আমার ক্লান্তি বা অমনোযোগিতাকে অনেকটা উপেক্ষা করে উল্টো বলে বসলো,

আমার নামের অর্থ কি জানো?

স্বাভাবিকভাবেই আমার পক্ষে তার মঙ্গোলীয় নামের অর্থ জানার প্রশ্নই আসে না। তাই আমি তাকে কথা বলতে দিয়ে চুপ করে রইলাম। ও বললো,

বুর্জিগিন শব্দের মানে হচ্ছে , নীল-ধূসর নেকড়ে। এই নেকড়ে সাধারণ কোনো নেকড়ে নয়, এটা হচ্ছে আমাদের চেঙ্গিস খানের পূর্বপুরুষ সেই বিশেষ স্বর্গীয় নেকড়ে। হাজার বছর ধরে আমরা মঙ্গোলরা বিশ্বাস করে আসছি যে আমরা কোনো সাধারণ মানবগোষ্ঠী নই, আমরা হচ্ছি এক পৌরাণিক হরিণী আর এক নীল-ধূসর নেকড়ের মিলনের ফলে যে মানবশিশু জন্ম নিয়েছিল তার সন্তান। আমরা তাই পৃথিবীর অন্যান্য মানবগোষ্ঠীর চেয়ে ভিন্ন আর এ কারণে মঙ্গোলদের কাছে নেকড়ে আজও খুব পবিত্র প্রাণী আর সৌভাগ্যের প্রতীক। নেকড়ের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ দিয়ে আজও মঙ্গোলীয় ওঝারা বিভিন্ন রকমের রোগের ওষুধ বানায়। চেঙ্গিস খানের জন্মও এই বুর্জিগিন উপগোত্রে। তাই মঙ্গোলদের বিশ্বাস, চেঙ্গিস খানের রক্তে মিশে আছে সেই রহস্যময় নীল-ধূসর নেকড়ের রক্ত। সে কারণেই চেঙ্গিস খানের ছিল অপার্থিব ক্ষমতা, যার মাধ্যমে তিনি এতো কম সময়ের মধ্যে নেকড়ের মতো ক্ষিপ্রতায় পৃথিবীর বৃহত্তম ভূখণ্ড তাঁর রাজত্বের আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছিলেন।

তারপর সে নেকড়ের বিভিন্ন শুকনো অঙ্গ-প্রতঙ্গ আর হাড়ের গুঁড়োর নানা রকম বিশেষ বিশেষ পৌরুষ বর্ধনকারী গুণের বর্ণনা দিতে শুরু করলো। আমার শক্তি বর্ধন করার কোনো ইচ্ছা ছিল না, তাই আমি উঠে দাঁড়ানোয় সে আলাপ আর প্রলম্বিত করার সুযোগ পেলো না। তবে আমাকে সে ততোক্ষণে কিছুটা মেপে ফেলেছে, বুঝে গেছে কোনো দিকে আমার উৎসাহ আর সে হিসাব করেই তখন সে অন্য প্রসঙ্গ আনলো। সে জিজ্ঞেস করলো, আমার ফিরতে কেন এতো দেরি হলো, নিশ্চয়ই তোমাদের আয়োজকরা তোমাদের মিনি নাদাম দেখিয়েছে। আমি ওর অনুমানশক্তিতে কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম, বললাম,

তুমি বুঝলে কীভাবে?

ও বললো,

এটা বোঝার জন্য মঙ্গোলিয়ান ‘উ’ (ওঝা) হওয়ার দরকার পড়ে না, এটা চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায় । আমাদের দেশে কোনো বিদেশি দল এলে মঙ্গোলীয়দের একটিই মাত্র কাজ আর তা হচ্ছে আতিথিদের জন্য মিনি নাদামের ব্যবস্থা করা। দল-মত-পেশা-নির্বিশেষে সব মঙ্গোলীয়র মাথায় এই একই জিনিস, কোনো হেরফের নেই। তোমাদের নিশ্চয়ই সেখানে কুস্তি দেখানো হয়েছে?

আমি বললাম,

হ্যাঁ, অনেক কুস্তিগিরের কুস্তি লড়া দেখেছি।

শুধু পুরুষ কুস্তিগির না, নারী কুস্তিগিরের কুস্তিও দেখেছো?

আমি কোনো উত্তর দিলাম না। আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের আলাপটাকে সে আবারও ভিন্ন পথে এই গভীর রাতে আস্তে আস্তে আদিরসাত্মক দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। এমন একজন অচেনা-অজানা ভিনদেশি ভাতিজা বয়সের তরুণের সঙ্গে আদিরসাত্মক আলাপ করার কোনো আগ্রহ আমার ছিল না। তাই আমি আবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম । ও তখন সঙ্গে সঙ্গে বললো, মঙ্গোলদের ইতিহাসে এমন বিখ্যাত নারী কুস্তিগিরের কাহিনি আছে, যেটা না জেনে মঙ্গোলিয়া ছেড়ে গেলে তুমি আফসোস করবে। ও ব্যাটা বুঝে গেছে গল্প শোনায় আমার আগ্রহ আছে। আমি বুঝতে পারলাম, এখন ও নতুন গল্প শুরু করবে, মোবাইল অন করে দেখি তখন রাত দেড়টা বেজে গেছে (হাতঘড়ি নিতে ভুলে গিয়েছিলাম)। ওদিকে স্থপতি আরিফ আর লাভলুকে কথা দিয়ে এসেছি আধাঘণ্টার মধ্যে ফিরবো, তবু গল্প শোনার লোভ সামলাতে পারলাম না। আমি আবার চেয়ারে বসে পড়লাম । ও তখন সেই নারী কুস্তিগিরের গল্প শুরু করলো । আমি ওর গল্প আর পরবর্তী সময়ে বইপত্র ঘেঁটে যা জানতে পেরেছি তা যোগ করে এখন নিজের ভাষায় লিখছি।

শুধু তাগড়া জোয়ান পুরুষরাই যে কুস্তি লড়ে তা না, ইতিহাসে অনেক বিখ্যাত মঙ্গোল নারী কুস্তিগিরেরও নাম শোনা যায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল মোঙ্গল নারী খুতুলুন। আজও মঙ্গোলদের লোকজ সাহিত্য আর গানে বারবার ঘুরেফিরে আসে খুতুলুনের নাম। তাকে নিয়ে আজও অনেক মজার মজার গল্প চালু আছে মঙ্গোলদের মধ্যে। যদিও মার্কো পোলোর বিখ্যাত বই ‘The Travels of Marco Polo’-তে খুলুতুনকে শুধু একজন নারী কুস্তিগির হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে মঙ্গোলীয়দের লোকগাথায় খুতুলুনকে কুস্তিগির ছাড়াও কখনো বীর যোদ্ধা হিসেবে, কখনো অসহায় ও গরিব নারীদের ত্রাণকারী হিসেবে দেখা যায়। চেঙ্গিস খানের চার ছেলের মধ্যে একজনের নাম ওগেডি। এই ওগেডির ছেলে হলো কাশিন। কাশিনের ছেলে কাইদুর চৌদ্দজন ছেলে আর শুধু একটি মাত্র খুব সুঠাম আর সুন্দরী কন্যা ছিল। সেই কন্যার নাম ছিল এই খুতুলুন। সে হিসেবে রাজকন্যা খুতুলুন ছিল চেঙ্গিস খানের রক্তধারার চতুর্থ পুরুষ। কাইদু ছিল মধ্য এশিয়া আর উইগুর অঞ্চলের শাসনকর্তা। চীনের সম্রাট কুবলাই খান ছিল খুতুলুনের বাবা কাইদুর চরম শত্রু। সম্পর্কে কুবলাই খান ও তার ভাই হালাকু খান ছিল কাইদুর চাচা। রাজকন্যা খুতুলুন ছিল যেমন সুন্দরী তেমন বলশালী। তার সঙ্গে কুস্তি লড়ে কোনো পুরুষও জিততে পারতো না। ঘোড়ায় চড়া, তীরন্দাজীসহ নানা শারীরিক দক্ষতা ও অসামান্য শক্তিমত্তার কারণে খুতুলুন তার বাবার সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতো এবং এ কারণে ও ছিল ওর বাবার সবচেয়ে প্রিয় সন্তান।

সমস্যা শুরু হলো তখনই, যখন কাইদু খুতুলুনের বিয়ের আয়োজন করতে চাইলো। খুতুলুন শর্ত দিলো যে, যে পুরুষ তাকে কুস্তিতে পরাজিত করতে পারবে তাকেই সে বিয়ে করার কথা চিন্তা করবে আর তাকে যদি পরাজিত করতে না পাতে তবে শাস্তিস্বরূপ সেই পুরুষকে একশ ঘোড়া দিতে হবে। এই একশ করে করে খুতুলুন দশ হাজার ঘোড়ার মালিক হয়ে যায়; কিন্তু কোনো পুরুষই তাকে কুস্তিতে পরাজিত করতে পারে না। ঘটনা শেষ পর্যন্ত এমন হয় যে আর কোনো পুরুষই তার সঙ্গে কুস্তি লড়তে সাহস পেতো না। এভাবে খুতুলুনের বয়স বেড়ে যায়, কিন্তু তার বাবা তাকে বিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়। তবে জীবনের একপর্যায়ে খুতুলুন নিজেই এক সুঠাম সুপুরুষের প্রেমে পড়ে। অনেকের মতে, সে পুরুষটি ছিল এক মঙ্গোল শাসক, যার নাম ঘাজন আবার অন্য মতে সে তার বাবার রাজত্বের এক সুদর্শন কয়েদির প্রেমে পড়ে। খুতুলুনের বাবা কাইদু তার চৌদ্দটি ছেলেকে বাদ দিয়ে তার একমাত্র কন্যা খুতুলুনকে তার রাজত্বের উত্তরাধিকারী করতে চেয়েছিলেন, তবে শেষমেশ তার ছেলেদের ও বয়োজ্যেষ্ঠ মঙ্গোল সমাজপতিদের সম্মিলিত বিরোধিতার কারণে খুতুলুনকে রাজত্বের ভার দিতে পারেননি। ধারণা করা হয়, মাত্র ছেচল্লিশ বছর বয়সে ১৩০৬ সালে খুতুলুন খুব সম্ভবত কোনো যুদ্ধের মাঠে নিহত হয়। তবে আজও মঙ্গোল রূপকথা বা লোকগাথায় খুতুলুন অনেকটা পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে জীবন্ত রয়েছে। আজও নানা নতুন লেখায়, নতুন নতুন গল্পের ভেতর দিয়ে খুতুলুন নতুনভাবে মঙ্গোলদের কাছে উপস্থিত হচ্ছে। প্রিন্সেস খুতুলুন নামে মঙ্গোলীয় পরিচালক বাসানজারগাল একটি চলচ্চিত্র বানিয়েছে। সম্প্রতি নেটফ্লিক্স গাঁজাখুরি তথ্যে ভরপুর মার্কো পোলো সিরিজে এই খুতুলুন চরিত্রটি খুব গুরুত্ব দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছে।

তবে মার্কো পোলোর বিতর্কিত গ্রন্থের কথা বাদ দিলেও চতুর্দশ শতকের প্রথম দিকে মঙ্গোলদের শাসনামলে বৃহত্তর পারস্যের ইতিহাস নিয়ে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ রশিদ আল দ্বিনের লেখা ‘জামি আল তারিখ’ গ্রন্থে খুতুলুনের বিস্তৃত বর্ণনা আছে। এ ছাড়া মঙ্গোলদের নিয়ে লেখা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রাচীনতম গ্রন্থ, যা ১২২৭ সালে চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পরপরই লেখা হয় সেই ‘The Secret History of the Mongols’-এও রাজকন্যা খুতুলুনের বিশদ বর্ণনা আছে।

গল্প করতে করতে রাত তখন আড়াইটা বেজে গেছে। বুর্জিগিন গল্প করতে করতে কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছে। তার চোখ দুটি অদ্ভুত রকম চকচক করছে, ওই ঘোর থেকে যে বের হতে চাচ্ছে না৷ আমাকেও সে অনেকটা ঘোরের মধ্যে নিয়ে গেছে; কিন্তু দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি আর সারা দিনের নানা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ফলে আমি তখন প্রচণ্ড ক্লান্ত। আমার তখনই রুমে ফিরে যাওয়া উচিত, তবু আমি কেন যেন চেয়ার ছেড়ে উঠতে পারছি না। অনেক গভীর রাতে মানুষ যখন কথা বলে, তখন তার মনের অনেক পর্দা সড়ে যায়, নিজের ওপর তার আরোপিত নিয়ন্ত্রণগুলো অকেজো হয়ে ওঠে। মানুষের আলাপ তখন হয় অনেক সাবলীল, সত্য আর স্পষ্ট। খুব সম্ভবত সে রকম অবস্থার কারণেই আমি তাকে কেন যেন হঠাৎ এই প্রশ্নটা করে বসলাম,

তুমি যে ধূসর-নীল নেকড়ের বংশধর, আবার তোমার নামও বুর্জিগিন অর্থাৎ ধূসর-নীল নেকড়ে আর পূর্ণিমার সময় নাকি নেকড়েদের মধ্যে আত্মারা এসে ভর করে। পূর্ণিমা আসতে তো মাত্র আর এক রাত বাকি, তুমি কী তখন তোমার মধ্যে সেই নেকড়ের অস্তিত্ব অনুভব করো?
আমার প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গেই সে আমার চোখে চোখ রেখে তাকালো। মনে হচ্ছিল, তার চোখ দুটি কেমন যেন একটা অপার্থিব জ্যোতিতে চকচক করে উঠছে। যদিও মুখে কিছু বললো না, আমার কেন যেন মনে হলো আমার প্রশ্নটা সে খুব অপছন্দ করেছে। আমি কেমন যেন বর্ণনাতীত এক ধরনের অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলাম। তারপরও আমি রুমে ফিরে না গিয়ে ওখানেই নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলাম। নিশ্চুপ থাকাটাই অনেক সময় কথা বলার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। আমাদের থেকে একটু দূরেই দারোয়ান বাতুর নির্দিষ্ট লয়ে নিশ্চিন্ত ছন্দোময় নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমাদের যাদের ঘুমানোর কথা তারা জেগে আছি আর আমাদের মধ্যে যাদের জেগে থাকার কথা তারা ঘুমিয়ে পড়েছে।

মাহফুজুল হক জগলুল
২২,অক্টোবর, ২০২২

আরও পড়ুন