মঙ্গোলীয় স্থপতি গানবাতার বললো যে এখানে উপস্থিত খাবারের বর্ণনা তো হলো, তবে আসল মঙ্গোলীয় ডিশের কথাই নাকি বলা হয়নি। আমার তখন খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। ওর বক্তৃতা শোনার চেয়ে আগে আমার পেটে কিছু দেওয়া দরকার। কেননা প্লেন থেকে নামার পর তখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো খাবার আমি খাইনি। কিন্তু আমাকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ও মঙ্গোলীয় উৎসবের প্রধান খাবার বোদগের গল্প শুরু করে দিলো।
বোদগ হচ্ছে মঙ্গোলীয়দের উৎসব বা বড়ো অনুষ্ঠানের খাবার। একটা আস্ত ভেড়া বা খাসি বা গরুকে আস্ত বারবিকিউ করে বোদগ বানানো হয়। বারবিকিউ করার আগে ওই পশুর শরীরের ভেতর থেকে পাকস্থলীসহ পরিপাকতন্ত্রের অঙ্গগুলো একটা ছোট ফুটো করে বের করে আনা হয়, তবে কিডনি, যকৃত, ফুসফুস, হৃৎপিণ্ডসহ এসব অঙ্গ ভেতরেই থাকে। এরপর ওই ফুটো দিয়ে অনেকগুলো আগুনে গরম করা পাথর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। পাথরের বিখ্যাত সম্ভব হলে কিছু তরিতরকারিও ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তারপর পুরো পশুটাকে তার চামড়া আর লোমসহ আগুনে বারবিকিউ করা হয়। এই পাথরগুলো রান্না শেষে পশুর পেট কেটে বের করে আনা হয়, তখনো পাথরগুলো অনেক গরম থাকে। এই গরম পাথরগুলো মঙ্গোলীয়রা ওদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর রাখে। ওদের ধারণা, এই পাথরগুলোর বিশেষ রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা আছে। একসময় আগুনে সব লোম পুড়ে যায় এবং রান্নার পর খাবারটিকে একটা ঝলসানো চামড়ার বস্তার মতো মনে হয়। আমি কয়েক দিন পর ওই ঝলসানো বস্তা দেখেছি এবং সত্যি কথা বলতে গেলে ওই জিনিস দেখে আমার তেমন ভালো লাগেনি বা খাবার রুচি হয়নি। তবে ওই আস্ত পশুর ঝলসানো চামড়া কেটে যখন ভেতরের প্রায় গলিত মাংস, চর্বি ও সবজিগুলো বের করা হয় তখন অনেকটা কাচ্চি বিরিয়ানির মাংসের মতো সেই ধূমায়িত ও অর্ধগলিত মাংস খেতে কিন্তু ভীষণ সুস্বাদু। ওই জিনিস একবার মুখে দিলে ওই ঝলসানো চামড়ার বস্তার অস্বস্তিকর দৃশ্যের কথা আর মনে থাকে না। ইতিহাসে বর্ণিত আছে যে একবার এক যুদ্ধের সময় খাদ্যাভাব দেখা দিলে চেঙ্গিস খান নিজে বন্য ঘোড়া ধরে চামড়াসহ বারবিকিউ করে এমন বোদগ বানিয়ে খেয়েছিলেন।
চিকিৎসা শাস্ত্রে বলে, We are what we eat. কিন্তু মঙ্গোলিয়া অন্যান্য দেশের মতো নয়, এখানে বিকল্প খুব কম। ভূপ্রকৃতিই ঠিক করে দিয়েছে তার খাদ্যতালিকা। যেহেতু মঙ্গোলিয়ার ভূমিরূপ কৃষিকাজের উপযোগী নয়, তাই পশুচারণই হচ্ছে এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা আর সে কারণে ওদের খাদ্যতালিকায়ও প্রধান স্থান দখল করে নিয়েছে ভেড়া, ছাগল, গরু, উট, ইয়াক বা ঘোড়ার মাংস। কখনো কখনো পার্বত্য ইঁদুর জাতীয় প্রাণীও ( marmot) ওদের খাদ্যতালিকায় উঠে আসে আর এর সঙ্গে থাকে নানা প্রকার দুগ্ধজাত খাবার, যেমন—দুধের নানা রকমের পানীয়, পনির, দই, মাখন ইত্যাদি। তবে সব মাংসের মধ্যে ভেড়ার মাংসই মঙ্গোলীয়দের সবচেয়ে প্রিয়। শীতকালে মঙ্গোলীয় বিশাল তৃণভূমির তাপমাত্রা মাইনাস চল্লিশের নিচেও নেমে যায়, তাই পশুর চর্বি খাওয়াটা ওদের জন্য খুব প্রয়োজনীয়। মোট কথা, কৃষির অনুপস্থিতিতে পশুর মাংস আর দুধই তাদের খাবারের প্রধান উৎস। সবজি বা ফলমূল স্বাভাবিকভাবেই ওদের খাদ্যতালিকায় প্রায় অনুপস্থিত আর জ্বালানি কাঠের অনুপস্থিতির কারণে রান্নার জন্য ওরা ব্যবহার করতো ওদেরই চারণকৃত পশুর শুকনো মল। চেঙ্গিস খানের সবচেয়ে প্রিয় খাবার নাকি ছিল কয়েক হালি আস্ত খাসির মাথার বারবিকিউ আর কয়েক বাটি ঘোড়ার দুধের আইরাগ। তবে আইরাগ খাওয়ার আগে চেঙ্গিস খান সব সময় মঙ্গোল প্রার্থনার প্রথা অনুযায়ী বাটি থেকে কিছুটা আইরাগ বাতাসে ছিটিয়ে দিতেন। তবে আইরাগ ছিটিয়ে যতোই প্রার্থনা করুক অনেক ঐতিহাসিকই একমত যে মঙ্গোল রাজকীয় সদস্য ও সেনাপতিদের মাত্রাতিরিক্ত এই নেশা উদ্রেককারী আইরাগ পানের কারণেই শেষমেশ মঙ্গোল সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল।
সেই শত শত বছর আগেই দুধ থেকে ননী সরিয়ে সেই দুধকে শুকিয়ে ফেলার প্রযুক্তি মঙ্গোলরা আবিষ্কার করে ফেলেছিল আর এটাই ছিল শত শত মাইল পাড়ি দেওয়া চেঙ্গিস খানের সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান খাদ্য। চেঙ্গিস খানের অশ্বারোহী কখনো কখনো প্রয়োজনে একদিনে একশ মাইলেরও বেশি পথ অতিক্রম করতো। সৈন্যরা এই যুদ্ধাভিযানের সময় শুকিয়ে ফেলা দুধ পানিতে গুলিয়ে খেতে নিতো। পণ্ডিতদের ধারণা, আধুনিক পাউডার মিল্কের জন্ম মঙ্গোলীয় ওই শুকনো দুধের অভিজ্ঞতা থেকেই।
সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় আরো একটি খাবারের জন্য মঙ্গোলিয়ার নাম নিতে হবে, সেটা হচ্ছে আইসক্রিম। প্রায় সাতশ বছর আগে মঙ্গোলীয় অশ্বারোহীরা যখন গোবি মরুভূমি পার হতো তখন তারা খাবার হিসেবে দুধের ক্রিম পশুর অন্ত্রনালি দিয়ে বানানো আধারের মধ্যে নিয়ে যেতো। গোবির প্রচণ্ড শীতে ওই ক্রিম জমাট বেঁধে যেতো আর ঘোড়ার বিরামহীন ঝাঁকুনিতে ওই জমে যাওয়া ক্রিম ভেঙে ভেঙে আইসক্রিম হয়ে যেতো। এভাবে সুস্বাদু খাবার হিসেবে আইসক্রিম গোবি মরুভূমি, মঙ্গোলিয়া হয়ে চীনের সম্রাট কুবলাই খানের দরবারে হাজির হয়। কুবলাই খান আইসক্রিমের সঙ্গে তার সবচেয়ে প্রিয় খাবার মধু আর ফ্রুট সিরাপ মিশ্রিত করে আইসক্রিমের স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। হাস্যকর শোনালেও একপর্যায়ে কুবলাই খান রাজকীয় আদেশ জারি করেন যে রাজপরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কেউ আইসক্রিম বানাতে পারবে না। এভাবেই ১২৯২ সালে মার্কো পোলো যখন চীন থেকে স্বদেশে রওনা দেন তখন কুবলাই খান মার্কো পোলোর দীর্ঘ সতেরো বছরের সেবা আর আনুগত্যে খুশি হয়ে তাকে আইসক্রিমের গোপন রেসেপি শিখিয়ে দেয় আর এর মাধ্যমে ইতালির উত্তরাঞ্চল হয়ে সারা ইউরোপ, তথা সারা বিশ্বে মানুষের প্রিয় খাবার হিসেবে আইসক্রিম ছড়িয়ে পড়ে। তবে পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয়রা আইসক্রিম আবিষ্কারের জন্য মঙ্গোলিয়ার নাম নিতে ভুলে যায়। একইভাবে ইয়েমেনের আরবদের কাছ থেকে ইউরোপীয়রা কফি খাওয়া শিখলেও কফির জন্য ইয়েমেনের নাম নিতেও তারা ভুলে যায়। আসলে এশিয়া বা আফ্রিকার মানুষের মেধার স্বীকৃতি দিতে ইউরোপীয়রা ঐতিহাসিকভাবে বরাবরই খুব কৃপণ।
মানবজাতির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে পৃথিবীর এক অঞ্চলের জ্ঞানচর্চা আর আবিষ্কার পৃথিবীর বহুদূরের অন্য অঞ্চলের অন্য সভ্যতায় গিয়ে অনেক বেশি বিকশিত হয়েছে ও পূর্ণতা পেয়েছে। যেমন ধরা যাক পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, অ্যালজেব্রা, ত্রিকোণমিতি, জ্যামিতি ও গণিতের অন্যান্য শাখাসহ আরো অনেক শাস্ত্র মধ্যযুগের মুসলিম বিজ্ঞানী, যেমন—আল খাওয়ারিজিমি, আল ফারাজি, ইবনুল হাইসাম, আল বেরুনি, ইবনে সিনা, আল কিন্দি, আল ফারাবি, ইবনে খালদুন প্রমুখ মেধাবী মানুষের মাধ্যমে বিস্তৃতভাবে বিকশিত হয়ে সব শেষে পশ্চিমা বিশ্বে এসে আরো অনেক বেশি পূর্ণতা পেয়েছে, অনেক দ্রুত বিকশিত হয়েছে এবং মুসলিম বিশ্বে যেটা হয়নি যে এ জ্ঞানগুলো শুধু জ্ঞানই থাকেনি তা শিল্পবিপ্লবে সঙ্গী হয়েছে এবং বিজ্ঞানের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে যে শিল্প ও সার্ভিস গড়ে উঠেছে জনগণ তার সরাসরি ফল ভোগ করতে পেরেছে। আইসক্রিমের ব্যাপারেও সেটা ঘটেছে। সেই সাতশ বছর আগে যে আইসক্রিম মঙ্গোলিয়ার গোবি মরুভূমিতে আবিষ্কৃত হয়েছে এবং কুবলাই খানের রাজত্বে যা আরো সমৃদ্ধ হয়ে মার্কো পোলোর মাধ্যমে উত্তর ইতালিতে পৌঁছে গিয়ে সেখান থেকে কয়েকশ বছর পর আমেরিকায় ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে সেই চমকপ্রদ ইতিহাস এখানে সংক্ষেপে বলছি।
মার্কো পোলো ভেনিসে ফিরে আসেন ১২৯৫ সালে। সেই সময় পৃথিবীর মানুষ আমেরিকা মহাদেশের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতো না। এরও প্রায় দুইশ বছর পর ১৪৯২ সালে আরেক ইটালিয়ান বংশদ্ভূত নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করে। সেই নতুন মহাদেশ আমেরিকায় এর চারশ বছর পর ১৯০৪ সালের সেন্ট লুইস শহরের ওয়ার্ল্ড এক্সপোতে আইসক্রিমের জগতে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে যায়। আইসক্রিমে যুক্ত হয় এক নতুন মাত্রা, এক নতুন স্বাদ। যদিও মার্চিওনি নামের এক ইতালীয় ১৯০৩ সালে কোন আইসক্রিমের পেটেন্ট নেয়, তবে ওই এক্সপোতে একটি মজার ঘটনার মাধ্যমে সারা বিশ্বে আইসক্রিম নতুন আকারে, নতুন স্বাদে ও আশ্চর্যজনক নতুন আবেদন নিয়ে মানুষের কাছে উপস্থিত হয়। সেই চমকপ্রদ ঘটনাটি হচ্ছে যে সেই এক্সপোতে আর্নল্ড নামের এক আইসক্রিম বিক্রেতার স্টল ছিল। সে সময় আইসক্রিম কাপে ঢেলে বিক্রি করা হতো। আর্নল্ডের আইসক্রিমের স্টলের পাশেই আর্নেস্ট নামের এক সিরিয়ানের প্যানকেকের স্টল ছিল। এক্সপোতে আর্নল্ডের আইসক্রিম ভীষণ বিক্রি হতে শুরু করে। একপর্যায়ে আইসক্রিম শেষ না হলেও আইসক্রিমের জন্য পরিষ্কর কাপ নিঃশেষ হয়ে যায় আর নতুন করে কাপ ধুয়ে তা পরিবেশন করা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে, তাই আইসক্রিম বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। তখন পাশের স্টলের বুদ্ধিমান সিরিয়ান আর্নেস্ট তার প্যানকেককে একটা কোনের মতো বানিয়ে আর্নল্ডকে বলে ওই প্যানকেকের কোনের মধ্যে আইসক্রিম ঢুকিয়ে বিক্রি শুরু করতে। আর্নল্ড প্রথমে মনে করেছিল যে আর্নেস্ট তার সঙ্গে কৌতুক করছে; কিন্তু যখন সে বুঝলো যে সে মোটেও কৌতুক করছে না তখন সেও সিরিয়াস হয়ে গেলো আর প্যানকেকের কোনের ভেতর আইসক্রিম ঢুকিয়ে বিক্রি করার চেষ্টা করলো। দেখা গেলো যে ক্রেতারা আগের চেয়ে অনেক অনেক বেশি সাড়া দিচ্ছে আর সে নিজেও খেয়ে দেখলো যে খেতে সেটা আগের চেয়ে অনেক বেশি মজাদার আর সুস্বাদু । প্যানকেকের কোনের আইসক্রিম এতো দ্রুত এতো জনপ্রিয় হতে লাগলো যে অন্য সব আইসক্রিম বিক্রেতাও আর্নেস্টের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ প্যানকেক কিনতে শুরু করলো। এরপর এক্সপো শেষ হয়ে গেলে আর্নেস্ট তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ওয়াফেল দিয়ে সর্বপ্রথম আইসক্রিমের কোন বানানো কারখানা প্রতিষ্ঠা করে এবং এভাবেই সারা পৃথিবীর আইসক্রিম এক নতুন জগতে প্রবেশ করে।
আমার প্রিয় শিক্ষক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও গবেষক রফিক কায়সার স্যার আমাকে বলেছিলেন যে ভ্রমণকাহিনি লিখতে গেলে অবশ্যই সে অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও খাবার নিয়ে লিখতে হবে। আমিও মনে করি, মানুষের খাদ্যাভ্যাস আর রন্ধনপ্রণালীর ভেতর দিয়ে সে অঞ্চলের মানুষের সভ্যতা ও জীবনাচরণের অনেক লুক্কায়িত তথ্য বেরিয়ে আসে। তাই ভ্রমণ নিয়ে লেখার সময় আমি সব সময় গুরুর উপদেশ মেনে চলি। তবে আইসক্রিমসহ তাবৎ খাবারের গল্প আপাতত এখানেই শেষ করছি।
আপাতত খাবার নিয়ে জ্ঞানার্জন যখন শেষ হলো, তখন ডজনখানেক বার ধন্যবাদ, ধন্যবাদ বলে অনেক কষ্টে গানবাতারকে তার মতোই পানীয়প্রিয় এক কোরিয়ান স্থপতির হাতে সঁপে দিয়ে আমি বুফে ডিনারের লাইনে এসে দাঁড়ালাম। মঙ্গোলীয়রা যতোই পানীয়প্রিয় আর মাতাল হোক এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই। ওদের হ্যাং ওভার কাটানোর জন্য ওদের কাছে আছে এক দারুণ কার্যকর ঐতিহ্যবাহী টোটকা, সেটা হচ্ছে গজরের রসের সঙ্গে এক জোড়া ভেড়ার চোখ খেয়ে ফেলা, এটা পান করার সঙ্গে সঙ্গে নাকি হ্যাং ওভার ছুটে যায়।
বুফে খাবারের লাইনে আমার পেছনেই দাঁড়ালো মালয়েশিয়া ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব আর্কিটেক্টসের সাধারণ সম্পাদক অনেক দিনের পরিচিত স্থপতি দাতুক তান পেই। আমাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র কালো একটা কোভিড মাস্ক পরে ছিলেন। বোঝাই যাচ্ছিল, আমাদের সবার চেয়ে তিনি অনেক বেশি সতর্ক। ভদ্রমহিলা খুব করিৎকর্মা। সারা বছরই পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরে বেড়ান বিভিন্ন স্থাপত্যবিষয়ক সেমিনার আর মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করে। তাঁর সঙ্গে তাঁর ডিজাইনকৃত সদ্য চালু হওয়া বিরাট শপিং মলের ডিজাইন নিয়ে আলাপ করতে করতে আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে বুফে টেবিলের দিকে এগোচ্ছি। আমি তাঁকে অনেকবার ভদ্রতা করে আমার আগে দাঁড়াতে বললাম, কিন্তু কিছুতেই তিনি তাতে রাজি হলেন না। বরং গল্প করতে করতে তিনি আমাকে বললেন, কুয়ালালামপুর এসে যেন তাঁকে ফোন করি, তাহলে আমাদের তিনি তাঁর ডিজাইন করা শপিং মল নিজে ঘুরিয়ে দেখাবেন। এসব আলাপ করতে করতেই আমি বুফে টেবিলের একদম প্রথম প্রান্তে যেখানে খালি প্লেট থাকে সেখানে এসে দাঁড়ালাম। আমি তখন একটা খালি প্লেট হাতে নিয়ে ভদ্রতাবশত তাকে দিলাম, দেখলাম সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেটা তাঁর পেছনে যে ছিল তাকে দিয়ে দিলেন। আমি তাঁকে আবার একটা প্লেট দিলাম, তিনি মুচকি হেসে আগের মতোই সুরুৎ করে প্লেটটা আবারও তাঁর পেছনে দিয়ে দিলেন। আমি বোকার মতো আবার তাঁকে একটা প্লেট দিলাম। এবারও তিনি কিছুটা বিব্রতভাবে হেসে আগের মতোই পেছনের জনকে প্লেটটা দিয়ে দিলেন। এভাবে আমি যখন পঞ্চমবার তাঁকে প্লেট দিতে যাবো তার আগ মুহূর্তে আমার বোকামিটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলো। আমি বুঝতে পারলাম যে এই কোভিড আতঙ্কের সময় তিনি চাচ্ছেন না অন্যের ছোঁয়া কোনো প্লেটে খাবার খেতে। কোভিড এসে হয়তো চিরদিনের জন্য আমাদের জীবনাচরণ ও ভদ্রতার পারিমাপকগুলো বদলে দিয়ে গেছে। আমি তখন পঞ্চম প্লেটটি দিতে গিয়েও তাঁকে না দিয়ে নিজে সে প্লেটে খাবার নেওয়ার জন্য এগিয়ে যেতে যেতে ভাবতে লাগলাম, জগতে কতো কিছুই যে আমার এখনো শিখতে বাকি আছে। এই সহজ জিনিসটা বুঝতে আমার কেন এতো সময় লাগলো এই ভেবে নিজের ওপর খুব বিরক্ত লাগছিল, নিজেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া একজন রাম ভোদাই বলে মনে হচ্ছিল তখন।
মাহফুজুল হক জগলুল
২২, অক্টোবর, ২০২২
