মঙ্গোলিয়া, সাহসী মানুষের দেশে : চতুর্থ পর্ব

বহু বছর ধরে আর্কেশিয়া কনফারেন্সে বিভিন্ন দেশে আমার যাতায়াত। স্থপতি মাসুদুর রহমান আর স্থপতি কাজি আরিফের চাপাচাপিতেই বহু বছর আগে আর্কেশিয়ায় আমার প্রথম যোগদান। সেই থেকে বহু দেশে বহুবার এমন সব সম্মেলনে আমি গিয়েছি। এখন আমাকে আর তেমন চাপাচাপি করতে হয় না, আমি নিজে থেকেই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করি। কেননা এসব সম্মেলনের মাধ্যমেই পৃথিবীর বহু দেশে আমার অনেক স্থপতি বন্ধু হয়েছে। এরা কেউ আমার বয়সে বড়ো, কেউ ছোট আর কেউ কেউ সমবয়সী। তবে এদের মধ্যে অনেকেই প্রচণ্ড রকমের মেধাবী স্থপতি। তাই এসব সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে এদের অনেকের অনেক কাজের ওপর গোছানো সব প্রেজেন্টেশন দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এসব দেখে বিস্মিত হয়েছি, উৎফুল্ল হয়েছি আর তার চেয়ে বড় কথা, এদের কাছ থেকে শিখেছিও অনেক কিছু। তবে সম্মেলন উপলক্ষে যেখানেই গিয়েছি, এসব বাদ দিয়েও সেসব দেশের মানুষ, তাদের জীবনাচরণ, তাদের সংস্কৃতি, তাদের নগর পরিকল্পনা আর বিশেষ করে তাদের ভূপ্রকৃতি ও নিসর্গ আমাকে আকৃষ্ট করে অনেক বেশি। তাই সুযোগ পেলেই আমি বেরিয়ে পড়ি আবদ্ধ সেমিনার হল থেকে বাইরের খোলা জগতে সেই দেশটাকে খুব কাছে থেকে দেখার উদ্দেশে। এ কারণেই যেকোনো সম্মেলন শেষ হওয়ার পরও আমি কয়েক দিন বেশি থাকি ঘুরে ঘুরে সে দেশটাকে ভালোভাবে দেখার আর বোঝার উদ্দেশ্য নিয়ে।

এবার পারিবারিক কারণে একটু দেরিতে আমি সম্মেলনে যোগ দিয়েছি। পুমা হোটেল থেকে হেঁটে যখন কনফারেন্স রুমে ঢুকলাম, অনেক দেশি-বিদেশি প্রিয় চেনামুখের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। নিমেষের মধ্যে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি আর অবসন্নতা উবে গিয়ে আমি যেনো আপনা-আপনিই সতেজ হয়ে উঠলাম। কুশলবিনিময় আর কোলাকুলির পর আমি বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত স্থানে গিয়ে স্থপতি কাজি নাসির ভাই, দিলু ভাই , কাজি আরিফ আর তিতাসের সঙ্গে বসলাম। এসব কাউন্সিল মিটিংয়ে কী হয় তা যারা সেখানে থাকে তারা সব জানে আর যারা সেখানে ছিল না তাদের সেটা জানার তেমন কোনো দরকার নেই। কেননা সেগুলো তেমন কোনো মজাদার জিনিস না। তাই এখানে সে পর্বটা এড়িয়ে গেলাম। শুধু পরবর্তী আর্কেশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্বটা খুব সংক্ষেপে উল্লেখ করছি, কেননা এ পর্বের মধ্যে অনেকের জন্য যৎসামান্য কিছু মজাদার উপাদান থাকলেও থাকতে পারে।

নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হলেন যেকোনো পরিস্থিতিতে আড্ডা জমিয়ে রাখা মহা ফুর্তিবাজ জাপানি স্থপতি জর্জ কুনিহিরো আর ফিলিপাইনের স্থপতি ইয়ুলান্ডা ডেভিড রেয়েস। বাইশটি দেশের মধ্যে নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী পাওয়া গেলো চারজন। তাঁরা হলেন চীনের স্থপতি প্রফেসর উ জিং, মালয়েশিয়ার স্থপতি সাইফুদ্দিন বিন আহমদ, মঙ্গোলিয়ার বাতাজাভ বাতখুইয়াগ আর ফিলিপাইনের এড্রিক মার্কো। কিছু সময় পর দেখা গেলো ফিলিপাইনের প্রার্থী তাঁর মনোনয়ন তুলে নিলেন, তখন প্রার্থী থাকলেন তিনজন। প্রত্যেক প্রার্থী তাঁদের গুরুগম্ভীর নির্বাচনী বক্তৃতা শুরু করলেন। শুধু মালয়েশিয়ার প্রার্থী সাইফুদ্দিন তাঁর বক্তৃতায় বেশ কয়েকবার বললেন—Love, love, love । ভোট গণনার পর দেখা গেলো Love বক্তব্য দেওয়া মালয়েশিয়ার সাইফুদ্দিন বিপুল ভোটে জিতে গেছেন। আমার মনে হলো, খুব সম্ভবত সারা বিশ্বের স্থপতিরাই Love জিনিসটা খুব পছন্দ করে।

অবশেষে কাউন্সিল মিটিং শেষ হলো আর সবাইকে বলা হলো বিকেল ৬টার মধ্যে হোটেলের সামনে অপেক্ষারত বাসে উঠতে। আমাদের নাকি একটা খুব মজার জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে। হাতে তখনো ঘণ্টাখানেক সময় আছে। আমি বিশ্রাম নেওয়ার জন্য স্থপতি কাজি আরিফের রুমে যাওয়ার জন্য লিফটে উঠলাম। লিফটের দরোজা খোলার আগেই শুনতে পেলাম, দূর থেকে চড়া ভারী পুরুষ কণ্ঠে বেশ জোরে পাগল করা রবীন্দ্রসংগীত বাজছে। মনে হচ্ছিল যেন এটা হোটেল নয়, এটা আমাদের বাপ-দাদার বাড়ি আর আমাদের চেনা কারো বিয়ের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান চলছে। লিফটের একদম সামনেই দেখলাম বেশ কয়েকটা রুমে বাংলাদেশের কিছু স্থপতি আর মলয় কুমার ঘোষ, দেবোতোষ সাহু, দিলীপ দাসহ কলকাতার কিছু স্থপতি মিলে যৌথ ঘাঁটি গেড়েছে। একদল বাঙাল আর ঘটি মিলে পরিকল্পিতভাবে পুরো ফ্লোরটা সম্পূর্ণ কবজা করে ফেলেছে। এখানে তারা যা করছে, সেটাই যেন এখন আইন। বাঙাল আর ঘটি একত্র হলে পৃথিবীতে অসাধ্য সাধন করতে পারে, ইতিহাসে এর অনেক প্রমাণ আছে। আর এর সর্বশেষ প্রমাণ হলো মঙ্গোলিয়ার এই পাঁচতারা হোটেল, তুশান বিজয়। সত্য কথা বলতে গেলে সুদূর মঙ্গোলিয়ার এমন একটা চরম এলিট ক্লাসের পাঁচতারা হোটেলের করিডর থেকেই এমন অতি উঁচু ভলিউমে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে পাবো এটা আমি কোনো দিনও ভাবতে পারিনি। আমি কেন, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ, যাঁর গান তখন শুনছি, তিনিও মনে হয় বাঙালির এমন দাপটের কথা স্বপনেও চিন্তা করেননি। তিনি বলেছিলেন,

 

সাত কোটি বাঙালিরে হে মুগ্ধ জননী
রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি

 

আজ যদি তিনি বাঙালির এ পাঁচতারা হোটেল বিজয় দেখতে পেতেন, তাহলে তিনি তাঁর এ কথা নিশ্চিত ফিরিয়ে নিতেন এবং স্থপতি কাজি আরিফ আর এনায়েত কবিরকে কোলে বসিয়ে কলকাতার বউবাজার থেকে কড়াপাকের ভীম নাগের সন্দেশ এনে আদর করে খাওয়াতেন।

করিডরে দাঁড়িয়েই দেখলাম এদের রুমের দরোজাগুলো খোলা। যার খুশি ঢুকছে, বের হচ্ছে, কেউ দরোজা আটকাচ্ছে না, মনে হচ্ছে যেন এটা ছাত্রাবাসের ক্যান্টিন রুম। রুমে ঢুকে দেখি এনায়েত কবিরের ব্লুটুথ স্পিকার থেকেই একটার পর একটা রবীন্দ্রসংগীত বেজেই চলেছে। এনায়েত কবির সোফায় কাত হয়ে বসে ঘুমাচ্ছে। রুমে এতো সুন্দর নরম নরম দুটো বিছানা থাকতে সোফায় বসে ঘুমাচ্ছে কেন কে জানে। তবে বুঝতে বাকি রইলো না গত রাত্রি জাগরণের সাইড এফেক্ট এখনো ক্রিয়াশীল। রুমের মধ্যে নানা রকম খাবার, বেকারি আইটেম, চিপসের প্যাকেট, ভারতীয় ব্র্যান্ডের চানাচুর, বাদাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এর মধ্যে একটা নীল রঙের চকচকে প্যাকেট দেখলাম, সেটার ওপর ইংরেজিতে লেখা Basmati Chaal Bhaja ( Zero% Cholesterol and Sugar Free), চাল ভাজাও চটকদার ফ্লেক্সো প্যাকেটে বিক্রি হয়, সেটা আবার শূন্য কোলেস্টেরলযুক্ত হতে পারে এটা আমি জানতাম না। বুঝতে পারলাম, এটা ওপারের দাদাদের সরবরাহ । আমি ব্যস্ততার জন্য দুপুরের খাবার খেতে পারিনি। এখান থেকে নানা পদের খাবার নিয়ে মজা করে খেয়ে নিলাম। এ রুমের সুবিধা হলো, যা খুশি খাও, কারো কাছে কিছু জিজ্ঞেস করতে হয় না, সব কিছুই ফ্রি, সব কিছুই অটোমেটিক কাজি আরিফ গংয়ের এজমালি অ্যাকাউন্টের খরচের খাতায় । মনে হলো যেন লুইস ক্যারোলের নতুন সংস্করণের এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডে এসে মাত্র ঢুকলাম ।
আসলেই একটা জিনিস ভেবে আমি খুব অবাক হচ্ছিলাম যে করিডর থেকে এতো জোরে বিরামহীন গানের শব্দ শোনা যাচ্ছে আর একেকটা ফ্লোরে এতো রুম, তাদের কেউই কোনো কমপ্লেইন করছে না। নাকি বাঙাল আর ঘটি একত্র হতে দেখে বাকিরা সব ভয় পেয়ে গেছে?

আমার মস্তিষ্কের নিউরন সার্কিটের একটা বেয়াড়া দিক হচ্ছে, এক বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সে বিষয়ের সঙ্গে কিছুটা সম্পর্কিত অন্য প্রাসঙ্গিক, আধাপ্রাসঙ্গিক বা অপ্রাসঙ্গিক কিছু জিনিস মাথার মধ্যে ঝিঁঝি পোকার মতো বিরতিহীন ডাকাডাকি করতে থাকে। এই বাঙাল আর ঘটির একত্র হওয়ার কথা লিখতেই দেশভাগের ইতিহাসের অনেকটা লুকিয়ে রাখা একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথা নিয়ে ঝিঁঝি পোকা ডাকা শুরু করলো। মনে পড়ে গেলো, ১৯৪৭ সালে তৎকালীন বাংলা প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নেতাজি সুভাষ বসুর মেজো ভাই শরৎ বসু, আবুল হাশিম (বদরুদ্দীন উমরের বাবা), তরুণ নেতা বঙ্গবন্ধুসহ অনেক হিন্দু-মুসলিম বাঙালি নেতাকে নিয়ে ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান এই দুই রাষ্ট্রকাঠামোর বাইরে তৃতীয় অপশন হিসেবে স্বাধীন-সার্বভৌম অবিভক্ত বাংলার কনসেপ্টটি সামনে নিয়ে আসেন। এটি নিয়ে তিনি বহুদূর এগিয়ে যান এবং ১৯৪৭ সালের ২৭ এপ্রিল দিল্লিতে এক উন্মুক্ত প্রেস কনফারেন্সে ইংরেজিতে সুস্পষ্টভাবে সারা পৃথিবীর সামনে খুব সুন্দরভাবে সেটা প্রকাশ করেন,

Let us pause for a moment to consider what Bengal can be if it remains united. It will be a great country, indeed the richest and the most prosperous in India capable of giving to its people a high standard of living, where a great people will be able to rise to the fullest height of their stature, a land that will truly be plentiful. It will be rich in agriculture, rich in industry and commerce and in course of time it will be one of the powerful and progressive states of the world. If Bengal remains united this will be no dream, no fantasy.

সবচেয়ে আশ্চর্য কথা হলো, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর কাছে এটি উত্থাপন করেন তিনি সেটা মেনে নেন; কিন্তু কংগ্রেস নেতা পণ্ডিত নেহরু আর হিন্দু মহাসভা নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি সেটা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। সেদিন যদি বাঙাল আর ঘটি এক হতো তাহলে পুরো উপমহাদেশের ইতিহাস হয়তো অন্য রকম হতো। সেই প্রায় খ্রিস্টপূর্ব সতেরশ সাল থেকে দূরদেশ হতে আগত আর্যরা এবং তাদের মাধ্যমে বাঙালিদের ওপর দিল্লি, লহোর, লখনউসহ উত্তর ভারতীয়দের যে বিরামহীন আধিপত্য ও শোষণ তার সম্পূর্ণ পরিসমাপ্তি ঘটতো আর উপমহাদেশে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার নিয়ামকসমূহকে পেছনে ফেলে ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকাঠামোর মাধ্যমে বাঙালির অবিভক্ত জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো। তবে এসব কথা এখন বাদ দিই। সুদূর মঙ্গোলিয়ায় এসে দিল্লি, কলকাতা আর ঢাকার গুপ্ত ইতিহাস নিয়ে আলোচনা না করাই আপাতত বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পাঠকরা কখন  খেপে যান বলা যায় না। তাঁরা মঙ্গোলিয়া নিয়ে জানতে চান, গঙ্গা আর বুড়িগঙ্গার আলাপ কেউ এখানে খাবেন না। তবে দাদা দিলীপচন্দ্র চ্যাটার্জি, মলয় কুমার ঘোষ, দেবোতোষ সাহু, অঞ্জন উকিল—এরা থাকতে এই দুই বাঙলার স্থপতিদের ঐক্য কেউ ভাঙতে পারবে না। আমাদের জীবদ্দশায় আপাতত এটাই আশার কথা।

তখনো সন্ধ্যা হতে ঘণ্টাখানেক দেরি। আমরা বিভিন্ন দেশের নবীন-প্রবীণ স্থপতিরা হোটেলের সামনে অপেক্ষমাণ ট্যুরিস্ট বাসগুলোতে উঠে বসলাম। বাসে উঠেই দেখি ড্রাইভার সাহেব বসে আছেন বাসের বাম দিকে, অর্থাৎ বাসের স্টিয়ারিং এখানে বামে, ডাঙ্গা সাহেবের গাড়ির মতো গাড়ির ডানে না। এক মঙ্গোলীয় স্থপতিকে ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করতেই সে কিছুটা অপ্রস্তুত হেসে বললো যে মঙ্গোলিয়ার বেশির ভাগ ব্যক্তিগত গাড়ির স্টিয়ারিংই ডান দিকে আর বাস ও ট্রাকের স্টিয়ারিং বাঁদিকে আর গাড়ি চলে রাস্তার ডান দিক দিয়ে।

কিছুক্ষণ পরই নানা দেশের, নানা ভাষার আর ভিন্ন ভিন্ন ঈশ্বরে বিশ্বাস করা আমরা সবাই সব ভিন্নতা পেছনে ফেলে সেই ছোটবেলায় বাসে করে পিকনিকে যাওয়ার মতো হইহই রইরই করতে করতে চলতে শুরু করলাম। আমরা ভুলেই গেলাম আমাদের সন্তানরাও এখন এভাবেই হইহই করতে করতে এমন পিকনিকে যায়। জ্ঞানীদের মধ্যে যাঁরা বলেন বয়স কেবলই একটা সংখ্যা মাত্র, অন্তত ওই মুহূর্তে তাঁদের কথা আমার খুব সত্য বলে মনে হচ্ছিল। আমাদের বাস উলানবাটোর শহর পেরিয়ে তখন বিস্তীর্ণ খোলা তৃণভূমির মাঝখান দিয়ে চলছে। বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি তৃণভূমি পেরিয়ে বেশ দূরে সারি সারি অনুচ্চ পাহাড় দাঁড়িয়ে। দিনের আলোতেও কোমল ঢালের সেই পাহাড়ের ডগায় শুক্লা দ্বাদশীর প্রায় পূর্ণ গোলাকার চাঁদ দেখা যাচ্ছে।

 

মাহফুজুল হক জগলুল
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আরও পড়ুন