মঙ্গোলিয়া, সাহসী মানুষের দেশে : তৃতীয় পর্ব

আমার হোটেলের নাম পুমা কেন, কে জানে। পুমা তো জানতাম উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার রকি পার্বত্য অঞ্চলের প্রাণী, মঙ্গোলিয়ায়ও কি পুমা পাওয়া যায়? আমার মনে হয় না। তবে পুমা নিয়ে ভাবনায় হোঁচট খেলাম। কেননা আমাদের গাড়ি যে বড়ো এভিনিউ থেকে ডানে মোড় নিয়ে ত্রিশ-চল্লিশ ফুট চওড়া ইউনিভার্সিটি স্ট্রিট দিয়ে ঢুকেতে চাচ্ছে, সেখানে কিলবিল করছে শত শত আধুনিক পোশাক পরিহিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী। আমার হোটেলের রাস্তার ঠিক ওপাশেই অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম University of the Humanities। রাস্তায় যে একটা বড়ো সাইজের গাড়ি ঢুকতে চাচ্ছে সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই এই মানবিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের। তারা রাস্তার মাঝখানে হাতে বইপত্র, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। ওদের কাছে রাস্তাটাই মনে হচ্ছে ওদের নিজস্ব ইউনিভার্সিটির প্লাজা স্পেস। কোনো কোনো জুটি দেখলাম রাস্তার ওপরই বসে আছে, কেউ কেউ আবার ফুটপাতে বা আশপাশের ভবনের রক টাইপের স্পেসে বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে। ছাত্র আর ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় সমান সমান। সকলকেই মনে হচ্ছে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান, অন্তত জামাকাপড়ে তাই মনে হচ্ছে। আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বেশভূষার স্টাইলের সঙ্গে মঙ্গোলীয় এসব ছাত্র-ছাত্রীর বেশভূষার স্টাইলে কোনো পার্থক্য নেই। কোনো কোনো তরুণ-তরুণীর পরনে হাঁটুর ওপর ছেঁড়া প্যান্ট, মাথার চুল খুব এলোমেলো, তবে ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যায় এরা ‘Carefully careless’ গোত্রের পোলাপান। আসলে এ বয়সে সারা পৃথিবীর তরুণ-তরুণীরাই এমন অনেক কিছু করে, যা আপাতভাবে যুক্তির বাইরে মনে হয়। এ বয়সটাই মানুষের জীবনের অনন্য সময়, ভিন্ন রকমের ভাবনার, চিন্তা করার আর ভিন্ন মাত্রার সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখার সময়।

পরেরদিন যখন ঘুরেফিরে আমার হোটেলের আশপাশে ভালোভাবে দেখেছি, তখন বুঝেছি আমার হোটেলের চারদিক ঘিরেই সারা মঙ্গোলিয়ার প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত। আমার হোটেলের তিন মিনিট উত্তর দিকে হাঁটলেই ইখ শুরগুল সড়ক আর সম্বু সড়কের প্রায় কোনায় National University of Mongolia, এটি মঙ্গোলিয়ার অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ। এর কাছেই Mongolian University of Arts and Culture। হোটেলের ঠিক পেছন দিকেই Mongolian University of Engineering and Technology, এটাই পুরো মঙ্গোলিয়ার মধ্যে স্থাপত্যশিক্ষার সবচেয়ে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় । এর পাশেই একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যাল, নাম Etugen University, সেখান থেকে একটু দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হাঁটলেই Mongolian State University of Education, তার একটু পূর্ব দিকে Ider University এবং সেখান থেকে বেশ কিছুটা পূর্ব দিকে LETU Mongolia American University এবং এর কাছেই University of Finance and Economics of Mongolia। মোদ্দা কথা, আমার হোটেলটা আসলে উলানবাটোর শহরের ছাত্র-ছাত্রীতে গমগম করা অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নামের

আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের ওপর অবস্থিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন আর কমার্স ফ্যাকাল্টির মাঝখানে যদি একটি হোটেল কল্পনা করা যায় তাহলে আমার এই পুমা ইম্পেরিয়াল হোটেলের অবস্থানটি সঠিকভাবে অনুভব করা যাবে।
শুধু শিক্ষার বন্দোবস্তই নয়, আমার হোটেল আর মানবিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একদম সঙ্গেই ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে বিপুল বিনোদন ও খাওয়াদাওয়ার আয়োজন। হোটেল ঘেঁষেই দুটো বড়ো Karaoke Club, একটা বিশাল ডিসকো ক্লাব, নাম I Loft, যার উত্তাল গান আর বাদ্যের আওয়াজ সারা রাত বহুদূর থেকেও শোনা যায়।

হোটেলের দক্ষিণেই রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে এমন একটা পিজা হাট আর একটা জ্বলজ্বল করা KFC রেস্টুরেন্ট এবং এর ওপরতলায় খুব পরিশীলিত মেজাজের একটা পরিচ্ছন্ন জাপানি রেস্টুরেন্ট, নাম নাগোমি। ঠাণ্ডা জাপানি রেস্টুরেন্টের কাছেই আবার খুব গরম রেস্টুরেন্ট, নাম Little Sheep Hot Pot Restaurant আর সেটার পাশেই The LOF 10 Game Centre। মোদ্দা কথা, হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীর বিনোদন আর উদরপূর্তির সব পরিকল্পিত আয়োজন আমার হোটেলের চারপাশ ঘিরে আর এসব করার জন্য যখন অর্থের প্রয়োজন হবে তার জন্য আমার হোটেলের সামনের ভবনের নিচতলাতেই আছে খান ব্যাংক। চেঙ্গিস খানের দেশের এয়ারপোর্টের নাম হবে চেঙ্গিস খান এয়ারপোর্ট, বাণিজ্যিক ভবনের নাম হবে খান প্লাজা, হাইরাইজ অফিস টাওয়ারের নাম হবে খান-উল টাওয়ার, হাই এন্ড অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের নাম খান হিলস রেসিডেন্স, পাঁচতারা হোটেলের নাম হবে কেম্পেন্সকি খান হোটেল আর ব্যাংকের নাম হবে খান ব্যাংক আর আমার মতো ট্যুরিস্টের নাম হবে খান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক—এটাই তো স্বাভাবিক। খানে খানে চারদিক খান খান।

ওদিকে ডাঙ্গা সাহেবের চোখে-মুখে প্রচণ্ড বিরক্তি। তবু তিনি প্রখর সংযম রক্ষা করে পুটপুট করে ভদ্রভাবে হর্ন বাজাতে বাজাতে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝখান দিয়ে আস্তে আস্তে এগোচ্ছেন। তবে আমি বেশ মজা পাচ্ছি হঠাৎ ঘিরে ধরা এই মঙ্গোলিয়ান তারুণ্যের উৎসবের মাঝখানে নিজেকে আবিষ্কার করে। অবশেষে অনেক কসরতের পর ডাঙ্গা সাহেব তাঁর গাড়ি পুমা হোটেলের সামনের পোর্চের নিচে থামালেন। পুমা ইম্পেরিয়াল হোটেল অনেকটা ছোটর মধ্যে বড়ো হোটেল। বাইরে যতোই কোলাহল থাক ভেতরে খুব নিরিবিলি, একজন রিসেপশনিস্ট আর সর্বক্ষণ মোবাইল নিয়ে ক্রীড়ারত একজন দারোয়ান, এই হলো হোটেলের দৃশ্যমান স্টাফের সংখ্যা। রিসেপশনের ছেলেটির চেহারা বোকা বোকা, ওর পরনে কালো স্যুট আর নীল টাই এবং চোখে পুরনো ডিজাইনের অত্যন্ত পুরু লেন্সের চশমা। ছেলেটা এতো চিকন আর লম্বা যে তার মেরুদণ্ড কিছুটা বেঁকে আছে। তাই তার সমস্ত শরীর ঝুঁকে আছে সামনের দিকে। আমাকে আর ডাঙ্গা সাহেবকে দেখে কেমন একটা ভ্যাবলার মতো হেসে মিনমিনে কণ্ঠে অস্পষ্ট ইংরেজিতে কী যেন বলে অভ্যর্থনা জানালো। এয়ারপোর্টে নামার পর থেকে এতোক্ষণ যেসব তাগড়া তাগড়া মঙ্গোলিয়ান দেখেছি এ ছেলেটি একদম তাদের বিপরীত। আমি বুকিং ডটকমের মাধ্যমে বুক করা আমার কনফার্মেশন নাম্বার তাকে দিলা। সে আমার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে অপ্রস্তুতভাবে নাড়াচাড়া করতে লাগলো। অন্যদিকে ডাঙ্গা সাহেব দেখলাম ঘড়ি দেখছেন, তার মানে তাঁর তাড়া আছে, আমি তাঁকে অনেক কৃতজ্ঞতাসিক্ত গতানুগতিক ভদ্রতাপূর্ণ কথাবার্তা বলতে লাগলাম। মাত্র আড়াই ঘণ্টার পরিচয় হলেও উনার সঙ্গে একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। উনিই আমার জীবনের প্রথম মঙ্গোলিয়ান বন্ধু। ডাঙ্গা সাহেব তাঁর দুহাত বাড়িয়ে দিলেন, আমরা একে অপরকে হালকা আলিঙ্গন করার পর উনার বিশাল ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন বিদায় করমর্দনের জন্য। আমি কিছুটা ভয়ে ভয়ে আমার হাত বাড়িয়ে দিলাম। সত্যি কথা বলতে গেলে এমন বিশাল বপুর মানুষের সঙ্গে জীবনে আমি এই প্রথম করমর্দন করলাম। তবে আগেই বলেছি, উনি হলেন জেন্টেল জায়ান্ট, আমার হাতে উনি মোটেও চাপ দিলেন না, অতি স্বাভাবিক মানুষের মতো ছিল তাঁর বিদায় করমর্দন। তবে বিদায় নেওয়ার পরপরই তিনি আবার ফিরে এসে বললেন যে আমাদের পারস্পরিক যোগাযোগ রাখার জন্য আমাদের হোয়াটসঅ্যাপে কানেক্টেড থাকা উচিত। কয়েক মিনিট মোবাইল নিয়ে গুঁতাগুঁতির পর আমরা দুজনে হোয়াটসঅ্যাপে সংযুক্ত হয়ে গেলাম। তিনি আবার করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালেন, এবার আমি হাসিমুখে আমার হাত বাড়িয়ে দিলাম। এমন একজন দশাসই কুস্তিগির সাইজের বিশাল হাতের সঙ্গে হাত মেলাতে তখন আমার আর কোনো শঙ্কা নেই। কেননা ততক্ষণে ডাঙ্গা আমার জীবনের প্রথম মঙ্গোলীয় বন্ধু হয়ে গেছেন।

ডাঙ্গা চলে যাওয়ায় আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ তখন রিসেপশনিস্ট লম্বা ছেলেটার দিকে। তাকিয়ে দেখি তখনো সে আমার বুকিংয়ের কাগজ নিয়ে অনভ্যস্তভাবে নাড়াচাড়া করছে, আবার কখনো কম্পিউটারে গুঁতাগুঁতি করছে। সেখানেও যখন তেমন সুবিধা করতে পারছে না তখন দেখলাম ওকে সাহায্য করার জন্য দারোয়ান এসে কম্পিউটার চাপাচাপি করছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এরপর দেখলাম সব কাজ ফেলে রেখে কাকে যেন ফোন করে অনেকটা কান্নাকাটির ভঙ্গিতে মঙ্গোলিয়ান ভাষায় কথাবার্তা বলছে। আমার কিছুটা মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো, আমি বেশ রাগত স্বরে বললাম,

Any problem?

সে পুরু লেন্সের চশমার গ্লাসের ভেতর থেকে আমার দিকে করুণভাবে তাকিয়ে অস্পষ্ট ইংরেজিতে বললো,

My name is Borjigin, Sir.
Today is the first day in my life in any job, Sir.

বেচারার সরল স্বীকারোক্তিতে আমার খুব মায়া লাগলো। তবে প্রত্যেকটা মানুষই যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুভাবে কথা বলে, একটা সে নিজের সঙ্গে নিজে আপন কথ্য ভাষায় বলে নীরবে, আর একটা সে সমাজ, পরিবার, পরিস্থিতি, শালীনতা জ্ঞান ইত্যাদি বিবেচনা করে সামাজে গ্রহণযোগ্য ভাষায় বলে সরবে। ততক্ষণে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা যাত্রার ক্লান্তিতে আমি সম্পূর্ণ অবসন্ন আর ওদিকে স্থপতি কাজি আরিফ বারবার ফোন দিচ্ছে প্রোগ্রামে যোগ দেওয়ার জন্য। তাই আমিও মনে মনে বললাম, ব্যাটা আর কাওরে পাইলি না, আমারেই বানাইতে হইলো তোর জীবনের প্রথম কাস্টমার?
তবে মুখে আমি বললাম,

It’s okay, take your time, don’t worry.

আমার অভয়বাণীতে বেশ কাজ হলো। বেচারা আগের চেয়ে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এলো; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। তবে সে যখন বুঝলো এ কাজ তাকে দিয়ে এখন হবে না তখন সে একটা বুদ্ধিমানের কাজ করলো। কোনো কাগজপত্র বা ক্রেডিড কার্ড চার্জ করা বাদ দিয়েই আমাকে আপাতত একটা রুম দিয়ে দিলো আর বললো পরে সব কিছু আপডেট করে নেবে, আমি যেন কোনো চিন্তা না করি। আমি তখন আবার মনে মনে বললাম,

আরে বাপু, আমি তো আমারে নিয়া চিন্তা করতেছি না, আমি চিন্তা করতেছি তোমারে নিয়ে।

হোটেল লবিতে দেখলাম একটা কফিশপ আর একটা উত্তর ভারতীয় রেস্টুরেন্ট। দাদাদের রেস্টুরেন্ট দেখে মনে বেশ বল পেলাম, কেননা হালাল খাবার না পেলে এখানে এসে অন্তত মটর পনির, পালং পনির, আলু গোবি, আলু টমাটর জাতীয় অতিমাত্রার মসলাযুক্ত ভেজিটেরিয়ান থালি খেয়ে প্রাণ রক্ষা করা যাবে। তবে রেস্টুরেন্টের দিকে আমার তাকানো দেখে রিসেপশনিস্ট বুুর্জিগিন মনে হয় আমার মনের কথা বুঝতে পারলো। তখন সে যা বললো তার অর্থ হচ্ছে এই বিন্দাস ভারতীয় রেস্তোরাঁ তাদের মর্জি হলে কোনো কোনো দিন খোলে আর বেশির ভাগ দিনই খোলে না। কবে খুলবে তা কেউ আগে থেকে জানে না, তাই আমি যেন এদের ওপর নির্ভর না করি। দারোয়ানকেও দেখলাম পেছন থেকে বুর্জিগিনের কথায় সমর্থন দিয়ে মাথা নাড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। অনেকটা হতাশা নিয়ে আমি লিফটের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। আমার সঙ্গে সঙ্গে আমার লাগেজ নিয়ে চলছে সেই দারোয়ান, সে এখন হোটেলের বেল বয় চরিত্রে অভিনয় শুরু করেছে।
তবে রুমে ঢুকে আমার মন ভালো হয়ে গেলো, বিশাল সাড়ে চারশ স্কয়ার ফুটের রুম, সঙ্গে একটা লিভিং স্পেস। আমাদের কনফারেন্স ভেন্যু হোটেল হচ্ছে উলানবাটোরের অন্যতম বিলাসবহুল হোটেল Best Western Premier Tuushin Hotel। বেশির ভাগ স্থপতিই সেখানে উঠেছে; কিন্তু আমি যেহেতু পরে এসেছি তাই সে হোটেলের জন্য আমি কোনো রুম পার্টনার পাইনি । তাই ভেন্যু হোটেল থেকে মাত্র তিন-চার মিনিট হাঁটা দূরত্বের এই পুমা হোটেল নির্বাচন৷ এখানকার রুম ভাড়া ভেন্যু হোটেলের তিন ভাগের এক ভাগ এবং রুমের সাইজ প্রায় দ্বিগুণ আর সকাল ১১টা পর্যন্ত ফ্রি ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা। আর একটা জিনিস দেখলাম সেটা হচ্ছে, যদি সশরীরে ব্রেকফাস্টে উপস্থিত হতে না পারি তাহলে আগে থেকে জানিয়ে রাখলে তারা রুমে ব্রেকফাস্ট পাঠিয়ে দেবে। এমন খানদানি ব্যবস্থা আমি আমার জীবনে আর কোনো হোটেলে দেখিনি।

যাই হোক, রুমে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আমি তাড়াতাড়ি ছুটলাম আমাদের কনফারেন্স ভেন্যু হোটেলের দিকে। অনেকে আমার জন্য অপেক্ষা করছে আর আমিও অনেকের জন্য অপেক্ষা করছি। গুগল তথ্য মতে, আমার হোটেল থেকে সেখানে হেঁটে যেতে চার মিনিট লাগার কথা। আমি যখন আমার হোটেলের লবি অতিক্রম করছি তখন দেখলাম সেই ভ্যাবলা রিসেপশনিস্ট আমাকে কি যেন বলার জন্য দুই হাত নেড়ে ইশারা করছে । আমি ভেবে দেখলাম এখন যদি আমি এই ব্যাটার নতুন চাকরির এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ হতে যাই তাহলে আমার মহা সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমি ওর দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে, অনেকটা ওকে না দেখার ভাব দেখিয়ে দ্রুত লবি পার হয়ে রাস্তার দিকে পা বাড়ালাম। এয়ারপোর্ট থেকে এ পর্যন্ত আমি ছিলাম এয়ারকন্ডিশন্ড স্পেসের মধ্যে, তাই যখনই রাস্তায় হাঁটা শুরু করলাম তখনই প্রথম বুঝতে পারলাম উলানবাটোরের বাতাস বেশ দূষিত। বাতাসে গাড়ির ধোঁয়ার গন্ধ সুস্পষ্ট।

অবশেষে আমার পা এখন আবাল্য স্বপ্নে লালিত সেই মঙ্গোলিয়ার মাটিতে । আমি এখন হাঁটছি মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোরের ইখ শুরগুল সড়কের বাম দিক দিয়ে দক্ষিণ বরাবর বিশাল প্রশস্ত ফুটপাত দিয়ে। আমার ডানে দেখতে পাচ্ছি বিখ্যাত সুখবাতার স্কয়ার আর পার্লামেন্ট ভবন আর আমার গন্তব্য প্রাইম মিনিস্টার আনান্দান আমার স্ট্রিটের ওপর অবস্থিত বিলাসবহুল বিশাল ছাব্বিশ তলা কনফারেন্স ভেন্যু হোটেল, Best Western Premier Tuushin Hotel।

উলানবাটোরের আগের নাম ছিল উরগা। ১৯২৪ সালের থেকে এর নাম দেওয়া হয় উলানবাটোর। উলানবাটোর শব্দের অর্থ Red Hiro, যার বাংলা করলে বোধ হয় বলা যায় লাল মহানায়ক, মঙ্গোলিয়ার স্বাধীনতার মহানায়ক সুখবাতার সোভিয়েত রাশিয়ার রেড আর্মির সাহায্যে ১৯২২ সালে চীনের কাছ থেকে মঙ্গোলিয়ার উত্তর অংশকে স্বাধীন করেন। এর মাত্র পাঁচ বছর আগে ১৯১৭ সালে মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাশিয়ায় পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গোলিয়া হয়েছে পৃথিবীর দ্বিতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এর সতেরো বছর পর ১৯৩৯-এ মাও জেদংয়ের নেতৃত্বে গণচীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে চীন মঙ্গোলিয়ার চেয়ে বেশ জুনিয়র। তবে মঙ্গোলিয়ার দক্ষিণাঞ্চল রয়ে যায় চীনের অধীনে একটি প্রদেশ হিসেবে, সে অংশের নাম ইনার মঙ্গোলিয়া আর পুরো মঙ্গোল জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার বসবাস এই ইনার মঙ্গোলিয়াতেই। সে হিসেবে বীরের জাতি, সাহসী জাতি আর প্রচণ্ড আগ্রাসী মঙ্গোল জাতি আজ এক দ্বিখণ্ডিত ও ঝিমিয়ে পড়া জাতি। বলা হয়ে থাকে, মঙ্গোলরা যখন থেকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে গিয়ে নগরে সংসার পেতেছে তখন থেকেই তাদের শৌর্য-বীর্য আর প্রচণ্ড আগ্রাসী আক্রমণাত্মক চরিত্রে শৈথিল্য এসেছে। তবে এখনো মঙ্গোল সংস্কৃতি ও জীবনাচরণে ঘোড়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। সত্যি করে বলতে গেলে মঙ্গোলিয়ায় ঘোড়ার সংখ্যা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। আর একটা মজার তথ্য হলো, মঙ্গোলিয়ার বন্য ঘোড়ার ক্রোমোজম সংখ্যা সাধারণ ঘোড়ার চেয়ে দুটা বেশি। সাধারণ ঘোড়ার ক্রোমোজম সংখ্যা ৬৪, গাধার ৬২ আর মঙ্গোলিয়ার বন্য ঘোড়ার ৬৬। যদিও অর্ধেকের বেশি মঙ্গোলিয়ান চীনের অধীনে রয়ে গেছে; তার পরও বর্তমান মঙ্গোলীয়রা তাদের স্বাধীনতার মহানায়ক সুখবাতারকে খুব শ্রদ্ধা করে। উলানবাটোরের একদম কেন্দ্রস্থলে তাঁর ভাস্কর্যসহ বিশাল এই সুখবাতার স্কয়ারই তার প্রমাণ। আমি হাঁটতে হাঁটতে আমার সামনে ডান দিকে সুখবাতার স্কয়ারের মাঝখানে সুখবাতারের ঘোড়ার ওপর বসা বিশাল ভাস্কর্যটি দেখতে পাচ্ছি; কিন্তু আমার এখন সেদিকে যাওয়ার সময় নেই। আমার দ্রুত পৌঁছাতে হবে সম্মেলনকেন্দ্রে। আমাদের ভেন্যু হোটেল এই স্কয়ারের একদম সঙ্গেই। হোটেল রুমের জানালা দিয়ে তাকালেই গমগম করা বিশাল সুখবাতার স্কয়ার দেখা যায়।
মজার কথা হলো, ১৯২২ সালে স্বাধীন হলেও পৃথিবীর বহু দেশ মঙ্গোলিয়াকে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি বহু বছর, এমনকি মাত্র সেদিন, ১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গোলিয়াকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে নেয় আর স্বাধীনতার প্রায় চার যুগ পর ১৯৬১ সালে মঙ্গোলিয়া জাতিসংঘের সদস্য হয়।

এভাবে হাঁটতে হাঁটতে সত্যি সিত্যি ঘড়ি ধরা চার মিনিটের মধ্যে আমি ভেন্যু হোটেলের সাত তলায় সম্মেলন কেন্দ্রে এসে পৌঁছুলাম। এবারের ARCASIA Forum-21-এর কনফারেন্সের থিম হচ্ছে The Future of Sustainable Urban Development। Sustainble

জিনিসটা সারা বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে ও বিশেষ করে স্থপতিদের মধ্যে এখন খুব প্রিয় আলোচিত বিষয়। তবে দুঃখজনক ও কিছুটা প্যারাডক্সিক্যাল হলো যে আমরা বিভিন্ন দেশের স্থপতিরা যারা এসব সাস্টেইনেবল ও গ্রিন লিভিং নিয়ে খুব সোচ্চার, আমাদের অনেকেরই ব্যক্তিগত জীবনাচরণ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমার মতে, ভোগবাদ ও সাসটেইনেবিলিটির দর্শন চর্চা একত্রে চলতে পারে না। যা হোক, এ আলোচনা এখানে বোধ হয় তেমন প্রাসঙ্গিক নয়।

একটু বলে নেওয়া দরকার আর্কেশিয়া আসলে কী। আর্কেশিয়া হলো এশিয়ার বাইশটি দেশের আর্কিটেক্টদের একটি অ্যাসোসিয়েশন। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ অ্যাসোসিয়েশনটির প্রধান কাজ হচ্ছে এশিয়ার এই কয়েকটি দেশের স্থাপত্য পেশা ও স্থাপত্যশিক্ষার উন্নয়ন ও পারস্পরিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে পেশাগত উৎকর্ষ সাধন করা। আনন্দের কথা হলো, বর্তমানে এই অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন বাংলাদেশের স্থপতি ড. আবু সাইদ মোস্তাক আহমদ। সাইদ ভাই ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থাপত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। বাংলাদেশের একজন স্থপতি এবারের কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করবেন এটা বাংলাদেশের একজন স্থপতি হিসেবে আমাদের জন্য ছিল খুব আনন্দের (আমি আমার যেকোনো লেখায় গর্ব আর অহংকার এই দুটি শব্দ নৈতিক কারণে কখনোই ব্যবহার করি না, সেটা না হলে এ বাক্যটিতে আনন্দের বদলে গর্ব কথাটা ব্যবহার করতাম)। বুয়েটের তিতুমীর হলে প্রথম বর্ষে আমি ছিলাম সাইদ ভাইয়ের রুমমেট আর তাঁর থিসিসের কামলা। কামলা শব্দটি আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের একটা পরিচিত পরিভাষা। যেসব জুনিয়র সিনিয়রদের ক্লাস প্রজেক্ট বা বিশেষ করে ফাইনাল থিসিস প্রজেক্টে ড্রাফটিং বা মডেল বানাতে সাহায্য করে বা ফুটফরমাশ খাটে আর এভাবে খাটতে খাটতেই অনেক কিছু শেখে, তাদেরই কামলা বলা হয়। কনফারেন্সে আসা ভারতীয় স্থপতি দেবোতোষ সাহু জানালো ভারতের স্থাপত্যের ছাত্ররা এদেরকে বলে ঘোড়া, অন্যান্য দেশে কী বলা হয় সেটা আমি এখনো জানতে পারিনি। তবে একেবারে ক্লিনিকালি দেখতে গেলে জিনিসটা বৈধ না, তবে পরম্পরা হিসেবে এটা স্থাপত্যশিক্ষা কার্যক্রমের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে।
আর্কেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট . সাইদ ভাইয়ের সহকারী হলো স্থপতি জিয়াউল ইসলাম। জিয়া ARCASIA-র অনারারি সেক্রেটারি। জিয়া বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থাপত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। আমি যেমন ছিলাম এককালে সাইদ ভাইয়ের কামলা, এই জিয়াও ছিল ছাত্রজীবনে আমার কামলা। শুধু কামলা বললেই সম্পূর্ণ বলা হয় না। যদি কামলাদের জন্য কোনো নোবেল প্রাইজ থাকতো সেটা জিয়া পেতো। কেননা আমার মনে আছে, ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় গুলশানে আমাদের বাসা আর মহাখালীর মাঝে বন্যার পানি উঠে রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আর তখন সব কামলা কাজে আসা বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু একমাত্র জিয়া কেমন করে যেন তার ভেসপা রিকশায় উঠিয়ে তারপর আমার বাসায় প্রতিদিন নিয়মিত পৌঁছাতো। জিয়ার নিয়মানুবর্তিতা, আন্তরিকতা ও একাগ্রতা তুলনাহীন।

মাহফুজুল হক জগলুল
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আরও পড়ুন