সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত নবনির্মিত চেঙ্গিস খান এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই দেখি চারদিকে ঝকঝকে রোদ আর মাথার ওপর অদ্ভুত রকমের পরিষ্কার উজ্জ্বল নীল আকাশ। সামনেই বিরাট পার্কিং লট, সারি সারি গাড়ি পার্ক করা, আমরা দুজন গাড়ির দিকে এগোচ্ছি। ডাঙ্গা সাহেবের দৃষ্টি তাঁর গাড়ির দিকে; কিন্তু আমার দৃষ্টি আটকে আছে পার্কিং লটের ওপারের দিগন্ত বিস্তৃত খুব নমনীয় ঢালের আশৈশব ছবি আর টিভিতে দেখা সেই চিরচেনা মঙ্গোলিয়ান তৃণভূমির দিকে। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, জীবনের এই বেলায় অবশেষে আমি আমার পরম আকাঙ্ক্ষিত প্রান্তরে আসতে পেরেছি। সৃষ্টিকর্তার প্রতি পরম কৃতজ্ঞতায় আমার সমস্ত শরীর তখন নতজানু হয়ে আসছিল। চারদিকের ভূপ্রকৃতি আর নিসর্গ আমাকে অভিভূত করছিল; কিন্তু বিস্মিত করেনি। কেননা আমি এমনই একটি ভূমিরূপের রূপকল্প আমার হৃদয় ও মস্তিষ্কের মধ্যে বয়ে বেড়িয়েছি সারা জীবন। এই প্রথম আমার রূপকল্প আর চোখের সামনে যা দেখছি তা সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো, এক পরম তৃপ্তি আর পরিপূর্ণ সন্তোষবোধ নিয়ে আমি অনেকটা ঘোরের মধ্যে ডাঙ্গা সাহেবের গাড়িতে উঠে বসলাম।
ডাঙ্গা সাহেব আমার সুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ নিজের হাতে গাড়ির পেছনে ওঠালেন, আমাকে কিছুতেই এ কাজ করতে দিলেন না। পার্কিং লট থেকে বের হয়ে দারুণ সুন্দর মসৃণ এসফল্টের ছয় লেনের বিশাল বিশাল বাঁক নেওয়া রাস্তা দিয়ে ডাঙ্গাসুরেন ডাঙ্গার সঙ্গে গল্প করতে করতে আমি চলছি। ডাঙ্গা সাহেব নিজেই গাড়ি চালাচ্ছেন। ডাঙ্গা সাহেব প্রথমেই বলে নিলেন, উলানবাটোর পৌঁছাতে দুই ঘণ্টা সময় লাগবে। রাস্তার মিডিয়ানে সবুজ রঙের অগুনতি গ্লেয়ার স্ক্রিন আর রাস্তার সাইডে স্টিলের পুরু গার্ড রেইল বসানো। রাস্তা থেকে সামান্য দূরে টানা ধাতব তারের ফেন্সিং দেওয়া, যাতে দুই পাশের বিস্তীর্ণ পশুচারণ ভূমি থেকে কোনো পশু হাইওয়েতে উঠে যেতে না পারে। সত্যি কথা বলতে গেলে মঙ্গোলিয়ায় এমন অত্যাধুনিক হাইওয়ে আমি আশা করিনি।
তার পরও গাড়িতে উঠে আমার কেমন জানি অস্বস্তি লাগছিল। এর কারণ আগেই বলেছি, সেটা হচ্ছে মঙ্গোলিয়ার বিদঘুটে ট্রাফিক সিস্টেম। গাড়ির স্টিয়ারিং ডান দিকে কিন্তু গাড়ি রাস্তার বাম দিক দিয়ে চলছে না, চলছে ডান দিক দিয়ে আর আমি বসেছি সামনের সিটে বাম দিকে। রাইট হ্যান্ড ড্রাইভ হোক বা লেফট হ্যান্ড ড্রাইভ হোক দুই ধরনের ট্রাফিক সিস্টেমের দেশেই গাড়িতে চড়ার বিস্তর অভিজ্ঞতা আমার আছে। কিন্তু এমন মিক্সড বিদঘুটে সিস্টেমে গাড়ির সামনের সিটে বসার অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম, তবে একটু পরেই এ অস্বস্তি কেটে গেলো। ডাঙ্গা সাহেব তাঁর গাড়ির সিডি প্লেয়ারে খুব লো ভলিউমে অদ্ভুত এক ধরনের মঙ্গোলিয়ান গান বাজিয়ে দিলেন। লো ভলিউমে বাজালেও মাঝে মাঝে ওই বিচিত্র নারী-পুরুষের কখনো মিলিত, আবার কখনো একক কণ্ঠের ওই গান আর বাদ্যের ভলিউম ঝনঝন করে বেড়ে হাই ভলিউম হয়ে যাচ্ছিল, আবার খুব ধীরে ধীরে কমে লো ভলিউম হয়ে যাচ্ছিল। ডাঙ্গা সাহেব আমাকে বললেন, এটা তাঁদের প্রায় দুই হাজার বছরের প্রাচীন সংগীতরীতি, এর নাম ‘উরতিন দু’, যার অর্থ ‘লম্বা গান’। হাজার বছর ধরে বিভিন্ন মঙ্গোলীয় যাযাবর গোত্র ( Nomads-এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে যাযাবর শব্দটি এ লেখায় বারবার ব্যবহার করছি, যদিও এটা Nomads-এর একদম সঠিক প্রতিশব্দ কি না তা নিয়ে আমি নিজেই পুরোপুরি আশ্বস্ত নই) তাদের নানা উৎসবে, বিয়ে বা জন্মদিন বা অন্য যেকোনো খুশির অনুষ্ঠানে এ গান বাজিয়ে আসছে। তিনি আরো বললেন, আজ থেকে প্রায় প্রায় আটশ বছর আগে চেঙ্গিস খান যখন সব যাযাবর গোত্র প্রধানকে ডেকে ঐক্যবদ্ধ মঙ্গোল জাতির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখনো সেখানে এই উরতিন দু সংগীত পরিবেশন করা হয়েছিল। তবে যতোটা মগ্ন হয়ে আমি তখন ওই গান আর বাদ্য শুনছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি মগ্ন হয়ে শুনছিলাম একজন বিশাল কুস্তিগির সাইজের মানুষ কী মিষ্টি নরম কণ্ঠে নিজের দেশের ঐতিহ্য আর ইতিহাসকে তুলে ধরতে কতোটা গর্ববোধ আর অপূর্ব ভালোবাসা নিয়ে আমার মতো এক সামান্য ভিনদেশিকে সেগুলো বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পরবর্তী সময়ে যে কজন মঙ্গোলীয়র সঙ্গে আমি উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছি সবার মধ্যেই আমি এই একই গভীর অভিব্যক্তিপূর্ণ স্বজাতি প্রেম ও নিজের ঐতিহ্যের প্রতি পরম নিবেদিত মনোভাব দেখতে পেয়েছি এবং সে কারণেই খুব অল্প সময়েও আমি ওদের সম্পর্কে অনেক বেশি জানার ও বোঝার সুযোগ পেয়েছি। গত এক শতাব্দীর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা জাতি হিসেবে ওদের অনেক দুর্বল করে ফেলেছে আর এ জন্যই আমার মনে হয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসের বৃহত্তম সাম্রাজ্য আর চেঙ্গিস খানের মতো ভুবনবিজয়ী ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের উত্তরসূরি হওয়ার পরও এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও মঙ্গোল জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। কেননা তারা মনে করে, চীন ও রাশিয়া মিলে তাদের ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের বৃহদাংশ চুরি করে নিয়ে গেছে। আজ আমরা যে মঙ্গোলিয়াকে দেখছি তা প্রকৃত মঙ্গোল জাতির আদি ভূখণ্ডের অতি সামান্য অংশ মাত্র, তবে এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত আলোচনা পরে করবো।
গাড়ির ডিসপ্লে বোর্ডে তাকিয়ে দেখি বাইরের তাপমাত্রা পঁচিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আসার আগে মঙ্গোলিয়া ভ্রমণে পূর্ব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন স্থপতি দিলু ভাই বলেছেন, ভয়াবহ মঙ্গোলিয়ান শীত জামাকাপড়ের ভেতর দিয়ে সূচের মতো একেবারে হাড্ডির ভেতর গিয়ে ঢোকে। তাই উনার উপদেশ অনুযায়ী আমার গায়ে খাঁটি স্কটিস ভেড়ার পশমের তৈরি খয়েরি রঙের ডোরাকাটা হ্যারিস টুইড কোট (আমার মা প্রায় দুই যুগ আগে আমার জন্য এটি বিদেশ থেকে কিনে এনেছিলেন)। এই তাপমাত্রায় হ্যারিস টুইডে বেশ গরম লাগছিল, তাই কোট খুলে দুই হাঁটুর ওপর ভাঁজ করে রাখলাম। তবে আমার এ তথ্যে কেউ যেন বিভ্রান্ত না হন, সেপ্টেম্বরে দিনের বেলায় কখনো কখনো পঁচিশ ডিগ্রি থাকলেও রাতে হঠাৎ করে তা দু-তিন ডিগ্রিতে নেমে যেতে পারে। সুতরাং শেষ বিচারে বিজ্ঞ দিলু ভাইয়ের সতর্কবার্তা মেনে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
পুরো পথেই ডাঙ্গা সাহেব নানা রকমের গল্প করছিলেন। তিনি বলছিলেন উলানবাটোরের উপকণ্ঠে বেশ কয়েকটা হাইরাইজ অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্টের কথা, ডিজাইনার হিসেবে একজন স্থপতির নামও তিনি উল্লেখ করলেন; কিন্তু কিছু কিছু মঙ্গোলীয় নাম উচ্চারণ করাই চরম কষ্টসাধ্য ব্যাপার, মনে রাখার তো প্রশ্নই আসে না। তাই সে স্থপতির নাম মনে রাখতে পারিনি আর সব কিছু লিখে রাখতে গেলে ভ্রমণের আসল ফোকাস নষ্ট হয়ে যায়। আমি তাঁকে বললাম, যে দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে মাত্র দুজন মানুষ বসবাস করে, সে দেশে হাইরাইজ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের কেন প্রয়োজন?
আমি এ ধরনের একটা প্রশ্ন করতে পারি এর জন্য মনে হয় তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। তাই তিনি কিছুটা থতমত খেয়ে গেলেন আর আমিও তাঁর অপ্রস্তুত ভাব দেখে কিছুটা বিব্রত বোধ করতে লাগলাম। আমি তখন তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করার জন্য জিজ্ঞেস করলাম,
আপনার ছেলে-মেয়ে কয় জন?
উনি বললেন,
এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলে তুরস্কের আংকারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে দেশে ফিরে এখন আমার কোম্পানি দেখাশোনা করে। ছেলের ঘরে সুন্দর একটা নাতিও আছে।
প্রসঙ্গ পরিবর্তনে ভালো কাজ হলো। আমাদের কথাবার্তা আবার আগের মতো স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এলো। উনার সঙ্গে কথায় কথায় আরো বুঝলাম, ইউরোপ বা আমেরিকার চেয়ে মঙ্গোলিয়ানদের কাছে চীন আর রাশিয়ার পরই তুরস্কের স্থান। তবে সুদূর বিচ্ছিন্ন দেশ হলেও পশ্চিমা জোটের কাছে মঙ্গোলিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
ন্যাটো এ দেশে তার প্রভাব বৃদ্ধি করতে পারলে সহজেই রাশিয়া আর চীনের ওপর অনেক বেশি চাপ প্রয়োগ করতে পারবে। পশ্চিমারা তাদের সামরিক ও আর্থিক স্বার্থকে লুকিয়ে রেখে সাধারণ মানুষের কাছে গলাধঃকরণযোগ্য নানা রকম চটকদার শব্দ উদ্ভাবন করে, যেমন Weapons of mass destruction, Collateral damage, Strategic alliance ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রেও তারা এমন একটা কন্সেপ্ট উদ্ভাবন করেছে সেটা হচ্ছে Extended Alliance of NATO, তারা অনেক দিন ধরে চাচ্ছে মঙ্গোলিয়াকে এসব ভুজুংভাজুং দিয়ে ন্যাটোর আওতায় নিয়ে আসতে। তবে সেটা চীন ও রাশিয়া কখনোই হতে দেবে না। এ কারণে মঙ্গোলিয়ার রাজনীতি অনেকটাই চীন ও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। ডাঙ্গা সাহেব খুব আক্ষেপ করে বললেন—
রাশিয়া আর চীন, এই দুই ব্রেডের মাঝে লোভনীয় হ্যাম স্যান্ডউইচের মতো আমরা আটকে গেছি। রাশিয়া হলো ওপরের ব্রেড আর চীন হলো নিচের ব্রেড, মাঝখানে আমরা অসহায় এক স্লাইস পুরু হ্যাম। পশ্চিম সীমান্তে বায়ান অলগি প্রদেশ হতে মাত্র পঞ্চাশ কিলোমিটারের জন্য আমরা কাজাখস্তানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারিনি (বায়ান অলগি প্রদেশটি পুরো মঙ্গোলিয়ার একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ, এ কথাটি তিনি উল্লেখ করেননি)। যদি আমরা কাজাখস্তানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারতাম তাহলে অনায়াসে আমরা কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান হয়ে পারস্য উপসাগরে ইরানের বন্দর আব্বাস বা তুরস্কের কৃষ্ণ সাগর আর বসফরাস প্রণালি দিয়ে ভূমধ্যসাগরের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারতাম। এখন প্রধানত চীনের তিয়ানজিন বন্দরের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়। তিয়ানজিন থেকে সড়কপথে উলানবাটোর দূরত্ব প্রায় তেরোশ কিলোমিটার।
২০১৭ সালে আর্কেশিয়ার এক অনুষ্ঠানে যখন নেপালের কাটমাণ্ডুতে গিয়েছি, তখন এক নেপালি স্থপতির কণ্ঠেও এই একই হাহাকার আমি শুনেছি। সে বলছিল, শিলিগুড়ি করিডর যাকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ‘চিকেন নেক’ নামে ডাকে, সেখানে মাত্র চৌদ্দ মাইলের জন্য নেপাল বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেনি, যদি তা হতো তাহলে নেপালের ইতিহাস বদলে যেতো। কিন্তু আমি ভাবলাম, সেটা যদি হতো তাহলে আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, নাগাল্যান্ডসহ সারা উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষ আটকা পড়ে যেতো আর তাদেরও তখন একই মাত্রার অসুবিধা হতো। আসলে যেকোনো স্থলবেষ্টিত দেশের মানুষের মনের মধ্যেই এক ধরনের বঞ্চনার হাহাকার থাকে। সবাই চায় তার দেশ একটু হলেও সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকুক। সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানেই সমগ্র পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত থাকা। যখন অন্য দেশের মাধ্যমে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়, তখন সেই প্রতিবেশী দেশের ওপর এক ধরনের চরম নির্ভরতা জন্ম নেয় এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তখন তাদের স্বাধীনতা অনেক কমে যায়, তাদের সার্বভৌম অস্তিত্ব অনেকটা বিপন্ন হয়ে পড়ে আর এই বাস্তবতার প্রতিফলন পড়ে ওই দেশের সার্বিক নাগরিক মনস্তত্ত্বে। মঙ্গোলিয়ানদের মধ্যে এ মনস্তাত্ত্বিক হাহাকার আমি প্রকটভাবে দেখেছি, নেপালিদের মধ্যেও দেখেছি।
পশুপাখি বা সরীসৃপ কেউই মানুষের বানানো এসব কৃত্রিম সীমান্ত মানে না। শুধু মানুষ এসব সীমান্ত মানে আর মানে বলেই হাজার হাজার বছর ধরে সীমান্তে সীমান্তে রক্তপাত চলে আসছে, মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি হচ্ছে, সংঘাত আর হানাহানি বেড়েই চলেছে। মানুষের বানানো এসব সীমান্তরেখা কখনো চিরস্থায়ী নয়, যুগে যুগে এগুলো পরিবর্তিত হয়েছে। মানুষ তখন আবার নতুন নতুন সীমান্ত আর রাজনৈতিক মানচিত্র বানিয়েছে।
একদিন হয়তো মানুষ আরো অনেক পরিপক্ব হবে, আরো নির্লোভ হবে অথবা প্রযুক্তি এমন কিছু আবিষ্কার করবে যখন এসব সীমানা বা সীমান্ত অকেজো আর হাস্যকর হয়ে যাবে। তখন শিশুরা হয়তো মিউজিয়ামে গিয়ে অতীত পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্র দেখে অবাক হয়ে ভাববে তাদের পূর্বপুরুষরা কতো বোকা ছিল, পৃথিবীটাকে তারা কতো হাস্যকর কারণে প্রচণ্ডভাবে বিভাজিত করেছিল।
এসব ইউটোপিয়ান ভাবনা ভাবতে ভাবতেই আমি একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম, হঠাৎ ডাঙ্গা সাহেবের কথায় ঘোর কাটলো—
ওই সামনে দেখো উলানবাটোর।
আমি অবাক হয়ে সামনের নমনীয় পাহাড়ের ঢালে দেখলাম উলানবাটোর শহর উঁকি দিচ্ছে। আমার বাম দিকে হঠাৎ দেখি একটা স্বল্প প্রশস্ত (বাংলাদেশের নদীর সাপেক্ষে) অগভীর সর্পিল নদী বয়ে চলেছে। হঠাৎ করে উলানবাটোরের উপকণ্ঠে এমন সুন্দর একটা নদী দেখতে পাবো ভাবিনি। ডাঙ্গা সাহেবের কাছে জানলাম এ সুন্দর নদীটির নাম তুল নদী। প্রায় সাতশ কিলোমিটার লম্বা চেঙ্গিস খানের জন্মস্থান মঙ্গোলিয়ার পূর্বাঞ্চলের বিখ্যাত খেন্টি পর্বতমালায় উৎপন্ন এ নদীটি উলানবাটোর শহরকে আগলে রেখেছে। উলানবাটোরে চলাচল করতে গেলে এদিক-সেদিক দিয়ে বারবার অতিক্রম করতে হয় এ নদীকে। অনেক পরিবারকে দেখলাম গাড়ি নিয়ে একদম নদীর পারে বসে পিকনিক করছে। মঙ্গোলদের কাছে তুল নদী ধর্মীয়ভাবে খুব পবিত্র। নদীটিকে তারা ডাকে খাতান নামে, যার অর্থ রানি। তবে রানি নামে ডাকুক আর ধর্মীয়ভাবে যতই পবিত্র হোক উলানবাটোর নগরের মানুষ তাদের স্যুয়ারেজ লাইন তাদের পবিত্র নদীতে উন্মুক্ত করতে মোটেও দ্বিধা করেনি। একই অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব দেখি ভারতীয়দের মাঝে, যেখানে গঙ্গা নদীকে তারা মা বলে ডাকে, স্বর্গের নদী গঙ্গা যে মহাদেব শিবের মাথার ওপর স্বর্গ থেকে পতিত হয়ে এ ধরাধামে মানুষের পাপ মোচনের জন্য বয়ে চলেছে এবং সে কারণে যে নদীতে ‘চান’ করে পাপ মোচনের জন্য কোটি কোটি ভক্ত উন্মুখ হয়ে থাকে, সেই একই ভক্তরা সেই একই নদীতে তাদের দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত স্যুয়ারেজ লাইন উন্মুক্ত করতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। মনুষ্য চরিত্র বড়োই রহস্যময়।
মধ্য নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নদীর পানি জমে প্রায় দুই থেকে আড়াই ফুট পুরু বরফ হয়ে যায়। সে বরফের ওপর দিয়ে অনায়াসে হাঁটা যায়। আমি মাছের দেশের মাছভক্ত মানুষ, নদী দেখলেই আমার সে নদীর মাছের কথা জানতে ইচ্ছা করে। আমি তাই যথারীতি ডাঙ্গা সাহেবকে তুল নদীর মাছের কথা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তুল নদীতে ব্রাউন ট্রাউট ও গ্রেলিং (এগুলো কী ধরনের মাছ তার কোনো ধারণা আমার নেই)সহ আরো কিছু সুস্বাদু মাছ পাওয়া যায়। তবে মাছ খুব বড় হয় না, মাছের আকার লম্বায় বড়জোর ফুট দেড়েকের মতো হয়ে থাকে। বরফ কেটে শীতকালে বড়শি দিয়ে মাছ ধরে এখানকার মানুষ। তবে নদীর পানি দূষিত করার কারণে কিছুদিন আগেই নদীতে মাছের মড়ক লেগেছিল। আমার মনস্তত্ত্বে যে নিষ্কলুষ মঙ্গোলিয়ার চিত্র আমি ধারণ করে বেড়িয়েছি সারা জীবন তার সঙ্গে এ তথ্যটা মেলাতে আমার কষ্ট হচ্ছিল। তবে প্রধানত শুষ্ক দেশ হলেও সব মিলিয়ে মঙ্গোলিয়ায় প্রায় চার হাজার নদী আছে; যদিও মঙ্গোলিয়ার নদীগুলো আমাদের নদীর মতো বিশাল আর প্রমত্তা নয়, আর সারা বছর এদের সবগুলোতে পানিও থাকে না। তবু আশার কথা হলো, এগুলো এখনো আমার কল্পনার নদীগুলোর মতোই নিষ্কলুষই আছে।
ডাঙ্গা সাহেব বলেছিলেন, উলানবাটোরে পৌঁছাতে দুই ঘণ্টা লাগবে। কিন্তু মাত্র ত্রিশ-চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই শহরের কাছাকাছি চলে এলাম। তবে ডাঙ্গা সাহেবের কথাই সত্য হয়েছিল, মাত্র পনেরো-ষোলো লাখ লোকের শহর উলানবাটোরে ঢুকতে গিয়ে দেখলাম অবিশ্বাস্য যানজট।
ডাঙ্গা সাহেব জানালেন, মাত্র পনেরো লাখ লোকের শহর হলেও উলানবাটোরে গাড়ির সংখ্যা পাঁচ লাখেরও বেশি, অর্থাৎ গড়ে প্রতি তিনজনের জন্য একটা গাড়ি। প্রায় প্রতি পরিবারেরই গাড়ি আছে। উলানবাটোর শহরের রাস্তা অনেক প্রশস্ত এবং ফুটপাতও অনেক প্রশস্ত ও বিশ্বমানের আর মোটামুটি গ্রিড আয়রন প্যাটার্নে ডিজাইন করা শহরটি। এ ছাড়া এখানকার ইলেকট্রনিক ট্রাফিক সিগন্যালিং সিস্টেমও আমাদের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক। তার পরও কেন এতো যানজট তা আমি কোনোভাবেই বুঝে উঠতে পারিনি।
এভাবে খুব ধীরে ধীরে ট্রাফিক জ্যামের ভেতর দিয়ে আমরা প্রশস্ত ইখ শুরগুল সড়ক দিয়ে উলানবাটোর শহরে ঢুকলাম। বাঁয়ে দেখলাম উলানবাটোর শহরের স্মারক বিখ্যাত ব্লু স্কাই টাওয়ার, তবে সঙ্গে সঙ্গেই তার আগে আমার চোখ চলে গেলো কাছেই নমস্তে নামের একটা ভারতীয় রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ডের দিকে। আমি সঙ্গে সঙ্গে ওটার ছবি তুলে রাখলাম। কেননা যদি হালাল খাবার না পাই তাহলে আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে এখানে এসে অন্তত মটর পনির, পালং পনির, আলু টমাটর জাতীয় অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাদ্য খেয়ে হলেও জীবন রক্ষা করা যাবে। ইখ শুরগুল সড়ক যেখানে পিস এভিনিউকে ক্রস করেছে সেখানে ডান দিকে আঙুল দিয়ে ডাঙ্গা সাহেব আমাকে একটা তামার ভাস্কর্য দেখালেন, বললেন এটা বিখ্যাত ইটালিয়ান পর্যটক মার্কো পোলোর ভাস্কর্য। মার্কো পোলো ত্রয়োদশ শতাব্দীর একদম শেষের দিকে প্রায় সতেরো বছর চীন ভ্রমণ করেন। তখন চেঙ্গিস খানের নাতি কুবলাই খান বৃহত্তর চীনের সম্রাট, মঙ্গোলিয়াও তখন সেই সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

একটু এগিয়েই বাম দিকে দেখালেন বিশাল একটা স্কয়ার, এটাই বিখ্যাত সুখবাতার স্কয়ার। উলানবাটোর শব্দের অর্থ Red Hiro, যার বাংলা করলে বোধ হয় বলা যায় লাল মহানায়ক, মঙ্গোলিয়ার স্বাধীনতার মহানায়ক সুখবাতার সোভিয়েত রাশিয়ার রেড আর্মির সাহায্যে ১৯২২ সালে চীনের কাছ থেকে মঙ্গোলিয়ার উত্তর অংশকে স্বাধীন করেন। ওদের সেই মহানায়ক সুখবাতারের নামেই এই স্কয়ার। স্কয়ারের উত্তর দিকে গভর্নমেন্ট প্যালেস বা পার্লামেন্ট ভবন। স্কয়ারের ঠিক মাঝখানে আমাদের কনফারেন্সের ভেন্যু হোটেলের ( Best Western Tuushin Hotel) দিকে মুখ করে বসানো ঘোড়ার পিঠে বসা সুখবাতারের বিরাট ভাস্কর্য দেখতে পেলাম। সেখান থেকে সামান্য উত্তর দিকে এগিয়েই ডাঙ্গা সাহেবের কথামতো ঠিক দুই ঘণ্টা পরই ইউনিভার্সিটি স্ট্রিটে আমার নির্ধারিত হোটেল ‘পুমা ইম্পেরিয়াল’-এর সামনে এসে পৌঁছুলাম।
মাহফুজুল হক জগলুল
১ অক্টোবর,২০২২



