মহান উদারতা

ওকে

 

আমি মৃত ছিলাম, তারপর আমি জীবিত হয়েছি,
আমি কান্না ছিলাম, তারপর আমি হয়েছি উল্লাস।
ভালোবাসা প্রথম যখন সুঠাম শরীরে আমার কাছে এসেছিল
আমি নিমেষে সিংহের মতো দুর্ধর্ষ হয়েছিলাম,
তারপর ধীরে ধীরে কোমল সন্ধ্যাতারার মতো
নরম আলোয় জ্বলে উঠেছিল আমার হৃদয়।
সে আমাকে বলেছিল, তুমি এখনো যথেষ্ট উন্মাদ নও
তাই এ ঘরে বসতি হবার যোগ্য হয়ে উঠতে পারোনি আজ পর্যন্ত
ওদিকে আমার উন্মাদনা শেষমেশ এমন বন্য হয়ে উঠেছিল যে
আমাকে দিনরাত শৃঙ্খলিত করে রাখা হতো,
তবুও সে বললো, তুমি আমার সাথে বসবাসের জন্য
এখনো যথেষ্ট বন্য হয়ে ওঠোনি।
এবার আমি তীব্র মাতাল হবার চেষ্টা করলাম,
অপার আনন্দের এক অপার্থিব স্তরে
প্রায় পৌঁছে গিয়েছিলাম আমি।
কিন্তু সে বললো, তুমি তো এখনো যথেষ্টই আত্মসচেতন,
নিটোল সুখস্বপ্ন আর দ্বিধায় দুলছে তোমার টলটলে বাসনা,
তুমি এখনো ঠিক আমার জন্য প্রস্তুত নও।
আমি চারপাশের সব কিছু থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলে
পরিপূর্ণ নির্বোধ হতে চাইলাম,
কিন্তু সে বললো,
এখন তুমি সমবেত সবার জন্য প্রদীপ হয়ে ওঠো।
আমি বললাম, আমি তো মোটেও কোনো প্রদীপ নই,
বরং আমি হচ্ছি নিতান্তই ঊর্ধ্বগামী কিছু বিক্ষিপ্ত ধোঁয়া,
চেয়ে দেখো, আমাকে ঘিরে কেউ সমবেত হচ্ছে না।
সে বললো, তুমি এখন শিক্ষক, নেতা ও পথপ্রদর্শক হও।
কিন্তু আমি তো মোটেও শিক্ষক নই
নেতা নই, পথপ্রদর্শকও নই।
বরং তার ইচ্ছার কাছে
আমি নিতান্তই একজন সমর্পিত দাস হতে চেয়েছি।
সে বললো, ওড়ার জন্য তোমার নিজেরই তো প্রশস্ত ডানা আছে

আমি তোমাকে আর নতুন কোনো পালক দেবো না।
তবু আমি তার কাছেই বর্ণিল এক জোড়া ডানা চাইলাম,
আমার মনে হচ্ছিল আমি ক্ষুদ্র একটি ডানাবিহীন পাখি।
আকাশের ওপার থেকে কে যেন আমাকে বললো,
তুমি নিশ্চল হয়ে দাঁড়াও, মহান এক উদারতা আস্তে আস্তে তোমার দিকে নেমে আসছে,
তুমি এবার ভালোবাসার জন্য প্রস্তুত হও।
আর ভালোবাসা আমাকে বললো,
তুমি শুধু আমার সাথেই থাকো,
আমি বলে দিলাম,
আমি শুধু তোমার সাথেই থাকবো।
সে বললো, তুমি সূর্যালোকের ঝরনা হয়ে ঝিরঝির করে ঝরছো,
আমি বৃক্ষের বিস্তৃত ছায়া হয়ে মৃত্তিকার শরীরে লুটিয়ে পড়ছি,
তুমি আমার সমগ্র রুক্ষতাকে ধীরে ধীরে মসৃর্ণ করে তুলছো।
ভোরবেলার সূর্যালোকে আত্মা অনেকটা অন্ধকার জলের মতো,
আস্তে আস্তে সে বলে ওঠে, ধন্যবাদ, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।
তারপর আবার সূর্য অস্তমিত হয়,
শুকতারার আলোর মাধুর্যে নেয়ে ওঠে রাতের পড়শি আকাশ,
তোমার হাসির উত্তরে
আকাশও তার হাসি ছড়িয়ে দেয় বিস্তীর্ণ উন্মুখ চরাচরে।
শুধু সেই নিবিষ্ট দাবারু কিছুই বলে না,
সুস্থির সম্রাটের অপূর্ব ভঙ্গিমায় নিঃশব্দে
সে চালে তার দাবার ঘুঁটি।
শেষবেলায় স্পষ্ট হয়ে যায়,
আমি নিজেই ছিলাম তার খেলার একান্ত অনুষঙ্গ,
পুরোটা পথে পথে তিনিই ছিলেন আমার অতিক্রান্ত পথ,
এই কথা ভেবে ভেবে
অচেনা এক উপচে পড়া পরম পূর্ণতায়
ভরে ওঠে আমার এই তৃষিত হৃদয়।

( মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির কবিতা Sublime Generosity-র ইংরেজি অনুবাদ থেকে ভাবানুবাদ )
ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২২

আরও পড়ুন