গ্রাম-রাজারকাঠি, কলাখালী, পিরোজপুর
হাওয়া বিবি বিধবা। এক কিশোর সন্তান নিয়ে তার সংসার। বিবরণের কিছু পাই না… একে কি ঘর বলা যায়? পাখির বাসাও মনে হয় এর চেয়ে নিরাপদ। সেই কোন যুগে হাওয়া বিবির দাদা শ্বশুর এই ঘরটি বানিয়েছিলেন। তারপর দশকের পর দশক চলে গেছে, সংসারের চরম অভাব-অনটনে আজ ঘরের এই দশা।
ঘরটি দক্ষিণমুখী, সামনেই খোলা বারান্দা বা বৈঠকখানা। এখানে বসেই সে কাঁথা বোনে, পেছনে খালের পারের রান্নাঘরে উঠানে বসে মুড়ির মোয়া, চিড়ার মোয়া, নকশি পিঠা বানিয়ে বিক্রি করে তার সংসার চালায়।
সামনেই সরকারি রাস্তা, পেছনে বিশাল উদয়কাঠির খাল। সুপারিগাছের পাতা (আমাদের অঞ্চলে বলে সুপারির বাইল) দিয়ে পর্দা বানিয়ে আড়াল তৈরি করে খালের পানিতে হাওয়া বিবি গোসল করে, রান্নার কাজকাম সারে।
তার ছেলে ক্লাস নাইনে পড়ে। তার অনেক আশা, ছেলে পড়াশোনা করে অনেক বড়ো হবে, তখন নতুন করে অনেক সুন্দর ঘর বানাবে। একই সঙ্গে ভাবে, ছেলে যখন পড়তে দূরে যাবে তখন এই হিংস্র সমাজে একজন বিধবার জন্য একাকী জীবন এই ভাঙা ঘরে কতোটা নিরাপদ।
তবে মানবজীবন কেবল হতাশার, বিষদের নয়… কিছু কিছু মানুষ আছে যারা চরম হতাশার মধ্যেও মানুষকে আশার আলো দেখায়… সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়… গত বছর একজন স্থপতিকে এই ছবিগুলো দেখানোর পর সে হাওয়া বিবির ঘরটি সম্পূর্ণভাবে নতুন করে বানিয়ে দেওয়ার জন্য টাকা দেয়… হাওয়া বিবি এখন তার কিশোর পুত্র রাজুকে নিয়ে তার নতুন ঘরে থাকে… হাওয়া বিবি এখন তার মনোবল ফিরে পেয়েছে, আবার নতুন করে বেঁচে থাকার যুদ্ধে নেমেছে সে… এখন সে আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়, অনেক সাহসী, কেননা সে জানে সারা দিনের যুদ্ধ শেষে নতুন ঘরে তার নিদ্রা হবে পরম স্বস্তিময় ও নিরাপদ, যা তাকে আগামীকালের যুদ্ধের জন্য নতুন করে শক্তি জোগাবে… তাই একটি ঘর শুধু একটি ত্রিমাত্রিক স্পেস নয়, একটি সুন্দর, পরিপাটি, নিরাপদ ঘর আসলে জীবনযুদ্ধের এক একটা পাওয়ার হাউস, যা মানুষকে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং অনেক বেশি সৃষ্টিশীল করে তোলে।
তবে কথা আছে, সে নতুন যে ঘরটা বানিয়েছে আর দশটা আশপাশের ঘরের মতো সেটা কি আসলে অন্য রকম কিছু হতে পারতো?
সেটা যদিও আগের চেয়ে নিরাপদ কিন্তু নতুন ঘরে আগের চেয়ে কি বেশি আলো-বাতাস খেলা করে?
গতানুগতিক করোগেটেড আয়রনশিট ব্যবহার না করে অন্য কোনো সাস্টেইনেবল ম্যাটেরিয়াল কি ব্যবহার করা যেতো?
ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে ঘরটা কি আরো সহনীয় করা যেতো?
ঘরের ডিজাইন ও প্ল্যানে কি আরো কোনো ফাংশনাল নতুন অনুষঙ্গ যোগ বা বিয়োগ করা যেতো?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে স্থপতিদের এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের। এ নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে এবং একই সঙ্গে আমাদেরও অনেক অনেক কিছু শেখার আছে তাদের কাছ থেকে। হয়তো দেখা যাবে তাদের শেখাতে গিয়ে অনেক অনেক বেশি কিছু আমরা শিখে আসছি তাদের কাছ থেকে।
স্থপতিদের মধ্যে শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এই সৎ আকাঙ্ক্ষা ও মনস্তাত্ত্বিক দিক পরিবর্তনের চিন্তা আরো জোরালো হোক।

