পৃথিবীর আত্মা

দীর্ঘ নিস্তব্ধতার পর হৃদয় যখন জেগে ওঠে,
পৃথিবীর আত্মা তখন তাকে তার কণ্ঠস্বর শোনায়।
পরম আদরে,
সে তার চব্বিশটি পাঁজর অস্থি উন্মুক্ত করে দেয়।
পর্বত শৃঙ্গের
নিস্তব্ধ গাত্রে গাত্রে বাতাসের প্রবল ঘর্ষণের
শব্দের মতো ধ্বনিত ফিসফিস কণ্ঠে সে বলে,
ধ্যানমগ্ন শুদ্ধ কবি ও নগ্নপদ কৃষকের মতো,
তুমি কৃতজ্ঞ ও সৃষ্টিশীল হতে চেষ্টা করো।
যারা সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ
ঈশ্বর তাদের হৃদয়ে বাস করেন।
তুমি চোখ বন্ধ করে তাকাও,
তোমার আমিত্ব ও ব্যক্তিত্বের মুখোশগুলে ছুড়ে ফেলে
পৃথিবীর বিন্যস্ত চিবুকে তোমার চোখ রাখতে চেষ্টা করো,
দেখবে, সুখের সংকেত ছড়িয়ে আছে তোমার চারপাশে,
তুমি সংকেতগুলো পড়তে চেষ্টা করো।
সমুদ্রের ঢেউ পড়তে চেষ্টা করো,
সূর্যের আলো পড়তে চেষ্টা করো,
চাঁদের পূর্ণিমা পড়তে চেষ্টা করো,
বাতাসের ছায়া পড়তে চেষ্টা করো,
এবং দিন ও রাত্রির হ্রাসবৃদ্ধির গণিতটা বুঝতে চেষ্টা করো।
তুমি কি  লক্ষ করেছো,
একটি ক্ষুদ্র বালুকণাকে তার মসৃণতর পৃষ্ঠদেশ পেতে
আর,
ওই বিশাল স্তব্ধ জলরাশিকে বিস্ফোরিত ঝরনা হতে
কেন হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।
তুমি কি এখন তা বুঝতে পারছো?

 

শুধু তুমি একদিন সেটা লক্ষ করবে বলে
ওরা হাজার বছর তোমার জন্য অপেক্ষা করেছে,
তাই প্রকৃতির সম্মিলিত সকল ধ্বনি ও শব্দ মিলে
যে ঋজু ও গভীর বাক্যটি সৃষ্টি হয়,
একটিবার তুমি সেটি উচ্চারণ করতে চেষ্টা করো,
দেখবে তুমি পাহাড়ের ধ্যানমগ্নতা বুঝতে পারছো,
নদীর বিধৃত সুর, লয় ও ঝংকার বুঝতে পারছো,
বৃক্ষ ও প্লাবন ভূমিতে উদগমিত বীজের উত্তাপ বুঝতে পারছো,
তুমি, সূর্যালোক ও অঙ্কুরের সংশ্লেষণ বুঝতে পারছো,
আর, মেঘমালা ও মরূদ্যানের সম্প্রীতির সূত্র বুঝতে পারছো,
তুমি, আদিম সংকেত ও সৃষ্টির কথা বুঝতে পারছো।
এবং অবশেষে, তুমি দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাত রূপ ও অরূপকে বুঝতে পারছো।
মনে রেখো, অনাবিল সমুদ্রসৈকত বা উদার মরুভূমির বিস্তার, নির্মোহ নদী, নির্ঘুম পাহাড়, ঘন সবুজ বনভূমি,
কিংবা উন্মুক্ত ঝরনাধারার নিঃস্বার্থ জলরাশি,
এরা কেউই একদম লোভী নয়।
এরা সংঘবদ্ধভাবে সেই অনাদিকাল থেকে
তোমাকে কোনো নিঃশর্ত ভালোবাসা
আর নিখাঁদ সমর্পণের কথা শেখাতে চাচ্ছে
তুমি নিশ্চয়ই
এখন তা কিছুটা আঁচ করতে পারছো।

( Paulo Coelho-র Alchemist উপন্যাসের কয়েকটি লাইন পড়তে গিয়ে চট করে এই কবিতাটির ভ্রুণ আমার মাথায় জন্ম নেয়, সে কারণে কবিতাটি তাঁর কাছে ঋণী )

আরও পড়ুন