বিশাল বাড়িটির উঠোনে জ্বলজ্বল করছিল
থোকা থোকা হলুদ গোলাপ, আর
উঠোনটির ঠিক মাঝখানে ছিল
পৃথিবীর শীতলতম জলের একটি কূপ।
সেটা ছিল শেষ শরতের নির্মল একটি পূর্ণিমার রাত,
এমন মায়াবী সেই জ্যোৎস্না ধোয়া রাতে
কাছেই থেমে থেমে নিদ্রাহীন পেঁচার ডাক আর
নিশাচর চতুষ্পদের পরিচিত গর্জন শোনা যাচ্ছিল।
ঠিক সে সময়, খুব দয়ালু চেহারা, প্রশস্ত কাঁধ আর
পিঙ্গল চোখের এক মধ্যবয়স্ক মানুষ
তার ঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসলো।
কোনো বুদ্ধিমান গৃহস্থ এমন গভীর রাতে কখনো
ঘর থেকে বের হন না,
কিন্তু সে বেরিয়েছিল শুধু আমারই খোঁজে।
তার অভিব্যক্তি ছিল পরিপূর্ণ সন্ত্রস্ত আর
তার দু’চোখে ছিল অতলান্ত বিষাদ।
শামস, শামস, আপনি কোথায়?
এই বলে বলে সে চিৎকার করছিল।
বাতাস তখন হঠাৎই দ্রুত বইতে শুরু করলো আর
চাঁদ অকস্মাৎ জমাট মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গেলো।
এদের কেউই চাচ্ছিল না এখন যা ঘটতে যাচ্ছে
তার সম্মুখ সাক্ষী হয়ে থাকতে।
ওদের দেখাদেখি পেঁচারাও
ওদের ডাকাডাকি থামিয়ে দিলো, আর বাদুড়েরা বন্ধ
করে দিলো ওদের স্বভাবসুলভ ডানা ঝাপটানো।
এমনকি ঘরের উনুনের আগুনও তার চড়চড় শব্দ থামিয়ে
তখন প্রস্তুতি নিচ্ছিল আসন্ন শোক সংবাদের।
এক পরম অদ্ভুত নিস্তব্ধতা সমগ্র চরাচর ঘিরে ধরেছে তখন,
এমনি সময়ে মধ্যবয়স্ক মানুষটি খুব ধীর শান্ত পায়ে
আস্তে আস্তে কূপের দিকে অগ্রসর হলো।
কূপের একদম কিনারায় দাঁড়িয়ে ঝুঁকে সে
নিচের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলো,
প্রিয় শামস, আপনি কি এখানে?
উত্তর দেওয়র জন্য আমি আমার মুখ খুললাম
কিন্তু আমার ওষ্ঠ থেকে কোনো শব্দ বেরোলো না।
এবার মানুষটি আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকে আবার কূপের একদম নিচের দিকে দেখতে চেষ্টা করলো।
প্রথমবার সে জলের অন্ধকার ছাড়া আর
কিছু দেখতে পেলো না।
তারপর কূপের একদম গভীরে ঝড়ের শেষে
ভেসে থাকা জাহাজ ভাঙা কাঠের টুকরোর মতো
আমার নিষ্প্রাণ হাতটাকে ভেসে থাকতে দেখলো।
তারপর সে আমার চক্ষু যুগলকেও চিনে ফেললো,
আমার চোখ দু’টো জ্বলজ্বলে কালো পাথরের মতো
মেঘের আড়াল থেকে সদ্য বেরিয়ে আসা
পূর্ণিমার চাঁদের দিকে একদম সোজা তাকিয়ে ছিল।
আমার চোখ দু’টো সত্যিই পরিপূর্ণ স্থির হয়ে ছিল
আকাশের দিকে,
যেন তারা আমার হত্যার ব্যাখ্যা চাইছিল
চাঁদ আর রাতে জ্বলে থাকা তাবৎ নক্ষত্রদের কাছে।
মানুষটি এবার হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লো আর
উন্মাদের মতো দু’হাতে তার বুক চাপড়াতে চাপড়াতে
আর্তনাদ করে উঠলো ,
ওরা হত্যা করেছে। ওরা আমার শামসকে হত্যা করেছে।
নিস্তব্ধ পূর্ণিমার রাতে তার সেই আর্তনাদ
বিস্ফোরিত কাচের ধারালো টুকরো টুকরো হয়ে
তীব্র বেগে চারিদিকে ছড়িয়ে যেতে যেতে আঘাত
করলো প্রতিবেশী ঘরগুলোর অভিজাত জাফরি জানালায়।
ঘুমকাতুরে প্রতিবেশীরা তখন রাগে আর্তনাদকারীকে অভিশাপ দিতে লাগলো।
মহা বিরক্তি নিয়ে তারা জানতে চাচ্ছিল,
এই গভীর রাতে কোন উন্মাদ
এমন নির্বোধের মতো চিৎকার করে যাচ্ছে।
তারা যদি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতো,
তা হলে দেখতে পেতো তাদের নয়নমণি
এ উন্মাদের নাম মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি।
( তুর্কি লেখিকা এলিফ শাফাকের বিখ্যাত উপন্যাস The Forty Rules of Love-এ বর্ণিত শামস তাবরিজির হত্যাকাণ্ড ও তাঁর মৃত্যুতে সুফিসাধক ও কবি জালালুদ্দিন রুমির শোকের বর্ণনা নিয়ে লেখা অধ্যায়টি এখানে কবিতার মতো করে অনুবাদের চেষ্টা করেছি। বিশ্ববিখ্যাত সুফিসাধক ও কবি জালালুদ্দিন রুমির আধ্যাত্মিক গুরু ও পরম বন্ধু শামস তাবরিজি জীবিত অবস্থায় ছিলেন আপাতভাবে চরম পাগলাটে আর পরম রহস্যময় মানুষ আর তাঁর মৃত্যু নিয়ে আজ পর্যন্ত চলছে তার চেয়েও গভীরতর রহস্য। সুফি ইতিহাস অনুসারে, শামস তাবরিজি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। তারা মনে করে, রুমি ও শামসের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য ঈর্ষান্বিত হয়ে মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির ঘনিষ্ঠ শিষ্যরা তাঁকে হত্যা করে কূপের মধ্যে ফেলে রাখে। অন্যদিকে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, তিনি কোনিয়া থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর আজারবাইজানের খোয় শহরে ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে কবর দেওয়া হয়।)
মাহফুজুল হক জগলুল
২৭ ডিসেম্বর, ২০২২