জগতের শূন্যগর্ভতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিস্মিত আমি কি খোদ আমার সাথেই তর্ক করি?
নাকি,
‘আমি’ শব্দটি নিছকই একটি অর্থহীন সত্তাহীন স্বকল্পিত সর্বনাম?
এমন কি হতে পারে না, আমরা আসলে অসীম কোনো মহাজাগতিক স্বপ্নেরই ছোট্ট একটা রেশ কাটা ঘোর?
হঠাৎ ঘোর কেটে গেলেই ‘আমি’ নামের এই ‘আমি’
আবার ফিরে যাবো পরম শূন্যতায় ।
লাশকাটা ঘরের বিপন্ন বিস্ময় কি শুধুই জীবনানন্দমুখর স্বপ্নবানের প্রাণেই খেলা করে?
নাকি,
সম্মিলিত এই বিপন্ন বিস্ময় আসলে সর্বগ্রাসী সেই পরম স্বপ্নেরই নিটোল প্রক্ষেপণ?
আমি এর উত্তর জানি না।
কী আশ্চর্য, সূর্যময় সারাটা দিন আমরা অপেক্ষা করি
শুধুমাত্র একটি ঘোর অন্ধকার রাতের জন্য,
সমগ্র রাত কেটে যায় আদিম সেই সূর্যসকালের প্রত্যাশায়,
আলোকিত সূর্যালোকে আবার চলে একই রকম আরো একটি
গার্হস্থ্য রাতের প্রতীক্ষা,
প্রথম দিনের সূর্যোদয় থেকে সর্বশেষ সূর্যাস্ত,
নিরন্তর একই নাটকের পুনঃ পুনঃ রিহার্সাল…
তবুও অনন্ত নক্ষত্রের নিচে সম্পূর্ণ নাটকটি
মঞ্চস্থ হয় না কখনো।
এতো প্রগাঢ় অর্থহীন বিরক্তচক্রের কোনো মানে হয়?
নাকি কেউ কেউ এর মানে জানে?
শৈশব, কৈশোর, যৌবন, সংসার, সন্তান, পূর্ণিমা, অমাবস্যা,
জরা, খরা, সৌরভ ও বর্ষণমুখর উন্মাদনার স্পন্দিত তৃপ্তিবোধ,
এরা কি কেবলই কারো ছায়া, নাকি মোহময় কোনো মায়া,
নাকি ঘোর কোনো পরিপাটি স্বপ্ন বিভোর নিসর্গের অংশ?
মানুষ কি সারাটা জীবন শুধু সাতটি স্বরই শুনে যাবে,
নাকি কেউ কেউ আরো অন্য কোনো স্বরও শুনতে পায়?
মানুষ কি সারাটা জীবন শুধু রংধনুর সাতটি রংই দেখে যাবে,
নাকি কেউ কেউ আরো অন্য কোনো রংও দেখতে পায়?
মানুষ কি সারাটা জীবন সাত আসমান বিদারী কারো ডাকের অপেক্ষায় থাকে?
কেউ কেউ কি সেই ডাক শুনতে পায়?
সেই ডাকের কি কোনো ভাষা আছে, নাকি সে ভাষাহীন কোনো
পরম ভাষা?
প্রতিটি ভাষারও তো থাকে অনেক সীমা-পরিসীমা,
সেও তো কিছু শুদ্ধ ভাব শুষে নেয়, কিছু শব্দ ও ধ্বনি লুকিয়ে রাখে,
যেমন ধাতব তার শুষে নেয় চলমান বিদ্যুৎতের কিছুটা
শক্তি ও প্রবাহ।
মহাজগতের শুদ্ধতম কথোপকথন তাই সম্ভব শুধুমাত্র
বর্ণমালাহীন, ধ্বনিহীন, বাক্যবিহীন এক পরম ভাষায়।
অশুদ্ধ আমি শুদ্ধতম সেই ভাষায় তাঁকে ডাকতে চাই,
যদিও আমি সে ভাষার ব্যাকরণ মোটেও জানি না,
অথবা,
পরমতম শুদ্ধতাই হয়তো সেই ভাষার সহজাত ব্যাকরণ।
আমি যে তাকে ডাকি, সে কি আমাকে ডাকে না?
আমি যে তাকে খুঁজি, সে কি আমাকে খোঁজে না?
আমি এর উত্তর জানি না,
কেউ কেউ নিশ্চয়ই এর উত্তর জানে।
আসলে মানুষের দর্শনের কোনো গন্তব্য নেই,
অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অটল নিয়তির দ্বন্দ্বের অলৌকিক সমীকরণ মানুষ জানবে না কোনো দিন,
আলো-আঁধারিত বিস্ময়ের পথে পথে
সতত নিজেকে আহত করে করে
টালমাটাল পায়ে পায়ে
গন্তব্যহীন এগিয়ে চলাই মানুষের নিয়তি।
এতো দিন ভাবতাম,
জগতের কিছু মানুষ বোধ হয় উন্মাদ,
আর বাকি সব সুস্থ স্বাভাবিক।
এখন মাঝে মাঝে মনে হয়,
আসলে প্রায় সকলেই উন্মাদ
শুধুমাত্র,
কেউ কেউ হয়তো কিছুটা ‘স্বাভাবিক’।
মাহফুজুল হক জগলুল
১৮ নভেম্বর, ২০২০