ছুটি

স্টেশনে এসে দেখি আমার ট্রেন চলে গেছে অনেক আগে,
পরের ট্রেন যখন আসবে তখন আমার ছুটির মেয়াদ শেষ।
বাতিল টিকেট হাতে বিব্রত ভদ্রলোকের মতো
বৃদ্ধ প্ল্যাটফর্মে নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছি আমি একা।
চারিদিকে মহাচিৎকার, জটলা আর মিশ্রিত কোলাহলের ভিতর থেকে
শব্দহীন প্রায় অশরীরী শান্ত পায়ে হঠাৎ ফকির লালন এসে বললেন,
‘বাবাজি, গন্তব্যের জন্য এতো উতলা কেন?
সব ট্রেনই তো কোথাও না কোথাও যায়, নির্ভয়ে একটায় উঠে পড়লেই হয়।’
শুধুমাত্র এই একটি মাত্র বাক্যে,
ঝট করে খুলে গেলো যেন আট কুঠুরি নয় দরোজার সব গুপ্ত কপাট
গোপন গহিন থেকে হঠাৎ বেজে উঠলো অচিন পাখির সেই চেনা গান,
সংকেত পাওয়া মগ্ন শিষ্যর মতো বৈধ টিকেট ছুড়ে ফেলে
অবৈধ যাত্রীর মতো আমি অকস্মাৎ লাফ দিয়ে উঠে বসি
সদ্য বিদায়ি হুইসেল মারা এক ভুল ট্রেনের উইন্ডো সিটে।
ফকির লালন তখন শূন্যের ওপর পোস্তা করা ঘরে বসে মিটিমিটি হাসছেন।
অন্যদিকে চৌরাশিয়ার বাঁশিতে ললিত রাগ বাজিয়ে
ততোক্ষণে দ্রুত ছুটতে শুরু করেছে আমার ভুল ট্রেন।
ট্রেন কোথায় যাচ্ছে আমার জানতে ইচ্ছে করছে না,
সাঁইজি বলেছেন গন্তব্য আপনা থেকেই হাজির হবে,
চলাটাই গুরুত্বপূর্ণ।

এমনও তো হতে পারে এই নষ্ট নগরকে ইস্তফা দিয়ে
কোনো মৌন সন্ন্যাসীর মতো আমি যাচ্ছি কৈলাসের কোনো নির্জন গুহায়,
মানসের হীমশীতল স্বচ্ছ জলে অবগাহন করার নেশায়
থরথর করে কাঁপছে আমার প্রত্যন্ত সব শিরা-উপশিরা।
আবার এমনও হতে পারে আমি কোনো নির্মোহ ভিক্ষু হতে চলেছি,
কঠিন চীবর গাত্রে ধারণ করে যাচ্ছি সোমপুর বিহার,
অমরাবতী কিম্বা লুম্বিনীর স্মৃতিকাতর উদার উদ্যানে।
অথবা কোনো সৌম্য দর্শন সুফির নিগূঢ় বাণীর ছোঁয়া পেতে
আমি ছুটে যাচ্ছি তার দূরবর্তী বিনম্র খানকায়,
ধ্যানমগ্ন দরবেশ নৃত্যের প্রবল ঘূর্ণিতে ঘূর্ণিতে
অবলোকন করতে চাচ্ছি তার ফানাফিল্লার পরম অনুভব।
অবশেষে অশ্লীল অসুখী নগর, রঙিন সব নগ্ন বিপণি, পরিকল্পিত যানজট,
কানাগলির দুরারোগ্য অন্ধকার, পলিথিনের বিষাক্ত ভাগাড়,
আর নষ্ট সব নাটুকে ন্যাকা ন্যাকা পুতুল সংসার ফেলে রেখে
ট্রেনের জানালায় এখন হঠাৎ উঁকি দিচ্ছে
জলজ্যান্ত সোনালি নদীর মতো ঢেউতোলা আদিগন্ত ধানের ক্ষেত,
সারি সারি আমলকী, কাঁঠাল আর যজ্ঞডুমুরের পুরুষ্ঠ ডালপালা।
নগর পেরোলেই এতো সবুজ, এতো সোনালি অপেক্ষা করছে,
আমাকে কেউ আগে বলেনি কেন, ভাবতে আবাক লাগছে।
এরই মাঝে ট্রেনের জানালা গলে চুপিসারে লিলুয়া বাতাস এসে
সম্পূর্ণ এলোমেলো করে দিয়েছে আমার কর্পোরেট হেয়ার স্টাইল।
অন্যদিকে নিরুদ্দেশ এ যাত্রার মরমি রোমাঞ্চ একাকী একতারার
মুহুর্মুহু কম্পনের মতো এখন ছড়িয়ে পড়েছে আমার রক্তস্রোতে
হঠাৎ চেয়ে দেখি আমার সাথে সাথেই চলছে নামহীন একটা ছোট্ট নদী,
কী অপরূপ চকচকে রুপালি তার বুক, কী ছন্দবদ্ধ নিরিবিলি তার ঢেউ,
প্রথম দর্শনেই নদীটির নাম দিলাম আমি সুজন-সখী।
এমন সাবলীল নদীর সাথে কথা বলার মজাই আলাদা,
আলাপে আলাপে বিভোর আমি সুজন-সখীর স্বচ্ছ জলে
শেষমেশ এবার ছুড়ে দিলাম আমার একমাত্র
ট্রাভেল ব্যাগ, সাধের সেল ফোন আর সোনালি হাতঘড়ি।
আমার নিরুদ্দেশ সন্ন্যাস যাত্রার প্রথম বিসর্জন,
আরশিনগরের পড়শির প্রতি আমার প্রথম নৈবেদ্য,
আমার ইমেইল আইডি আর যাবতীয় ডিজিটাল সম্পর্ক
এখন সুজন-সখীর কুড়ি হাত পানির নিচে।

আমি এখন সময় ও সংযোগের ঊর্ধ্বে নির্ভার সেই সহজ মানুষ
সম্পূর্ণ একাকী তবে মোটেও নিঃসঙ্গ নই।
আমার সামনের সিটে প্রায় কিশোরী এক মায়ের কোলে
ছটফট করছে একটি ছোট্ট স্বাস্থ্যবান শিশু,
শিশুটির গায়ে রঙিন ফুলতোলা ফ্রক,
পায়ের নরম গোড়ালি ছুঁয়ে ঝুলছে সোনালি ঘুঙুর।
জগৎ যেন তার দিকে মন্দ চোখে না তাকায়
সে জন্য তার কপালের ঠিক ডান দিকে একটা নিটোল ঘন কালো টিপ।
অচেনা শিশুটির নাম দিলাম আমি লীলাবতী,
লীলাবতী এখন অবাক হয়ে পৃথিবীর রং দেখছে, আর দেখছে আমাকে।
আমারও এখন আমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে,
আমি খুব সাবধানে লীলাবতীর চোখে চোখ রেখে নিজেকে দেখতে চেষ্টা করছি,
বুদ্ধিমতী লীলাবতী সেটা বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ তার চোখ ঘুরিয়ে ফেলেছে।
আমি ভুলে গেছি আমি ভুল ট্রেনের যাত্রী,
আমি ভুলে গেছি আমি কোথায় যাচ্ছি,
আমি ভুলে গেছি আমার পকেটে কোনো টিকেট নেই,
তবু রেল পুলিশ যখন এসে আমার টিকেট চাইলো
আমি নির্ভয়ে তার চোখে চোখ রেখে অবিকল হাছন রাজার
দেওয়ানা হাসিতে তাকে বিভ্রান্ত করে দিতে চাইলাম।

সে বিভ্রান্ত হলো কিনা বোঝা গেলো না,
তবে হাছন রাজার বিপজ্জনক হাসি বিশাল চেইন রি-অ্যাকশনের মতো
সংক্রমিত হতে হতে এখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে
নিশা লাগা মগ্ন সব যাত্রীর কণ্ঠে কণ্ঠে,
মাটির পিঞ্জিরা ভেদ করে শূন্যের মাঝারে এখন দুলছে তাদের বাড়িঘর,
দেখতে দেখতে সমগ্র ট্রেন এখন হাছন রাজার দখলে।
লীলাবতীর মাও এখন মুখে আঁচল টিপে হাসছে,
সম্মিলিত এই বিপুল হাসির বিপরীতে একমাত্র লীলাবতী
কেন জানি বিকট চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিয়েছে,
তবে তার কান্নাকে মোটেও বেসুরো মনে হচ্ছে না।
বরং লীলাবতীর এই নিষ্পাপ কান্না, হাছন রাজার ‘ফালদি’ ওঠা এই রঙ্গিলা হাসি,
দূরপাল্লার ট্রেনের নিরন্তর এই ঘটর ঘট ধাতব শব্দ আর সুজন-সখীর
বুক ছুঁয়ে যাওয়া বাতাসের বশীভূত কণ্ঠস্বর সব একত্র করে
লুডউইগ বিটোফেন এখন সংকলিত করতে যাচ্ছেন
তার আনকোরা মহান কোনো সিমফোনির অতীন্দ্রিয় ফিউশন।
এই সিমফোনি, এমন দিগন্ত বিস্তৃত উইন্ডো সিট,
এই নির্ভার নিরুদ্দেশ যাত্রার পাঠক্রম আর তেজস্বিনী লীলাবতীর কান্নার উত্তাপ
প্রতি মুহূর্তে আমার মধ্যে নির্মাণ করছে আমার নতুন বারামখানা,
আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি ভুল ট্রেনে উঠে আমি মোটেও ভুল করিনি,
এখন আমি নিশ্চিত জানি, আমাকে যেতে হবে আরশিনগর,
সব ট্রেনকেই একদিন না একদিন আরশিনগরে যেতে হয়।

মাহফুজুল হক জগলুল
অগস্ট, ২০২১

আরও পড়ুন