বিড়ালের নাম ছিল পল্লবী,
বিড়ালের নাম কী করে পল্লবী হতে পারে
এ প্রশ্ন আমাদের দু’ভাই-বোনের মাথায় আসেনি কখনো।
মা বলেছিলেন,
পল্লবীকে বস্তায় ভরে কালীগঙ্গার পারে ফেলে দিয়ে আসতে,
যথারীতি আমি আর আমার ছোট বোন পূর্ণিমার ভরা জোয়ারে
দামোদর যেখানে বহুদূরে কালীগঙ্গার সাথে অনিচ্ছায় মিশেছে
সেই হোগলা বনের অন্ধকারে পল্লবীকে ফেলে এসেছিলাম।
ফিরে আসার ঠিক আগ মুহূর্তে,
ফোঁপাতে ফোঁপাতে ছোট ছোট নরম আঙুলে
বস্তার মুখ আলতো করে খুলে দিয়েছিল আমার ছোট বোন,
বিক্ষত পূর্ণিমাকে সাক্ষী রেখে ফিরে আসতে আসতে
আমরা দু’জন সেদিন আর কোনো কথা বলিনি, পেছন ফিরেও তাকাইনি।
ভোরবেলা, ধীর স্বাভাবিক পায়ে পল্লবী ফিরে এসেছিল ঘরে,
তার ফিরে আসার মধ্যে কোনো অভিমান ছিল না,
ছিল না কোনো অপমানবোধ,
যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিমায় বরাবরের মতো
চোখ বুজে সে শুয়ে ছিল মায়ের পদ্মপালঙ্কের ঠিক নিচে।
পল্লবীর ফিরে আসায় আমি আর আমার বোন
খুব অবাক হয়েছিলাম।
মা কেন জানি মোটেও অবাক হননি।
মা কেন অবাক হননি সেটা ভেবে ভেবে সেদিন
আমরা দু’ভাই-বোন আরো বেশি অবাক হয়েছিলাম।
আজ মা নেই,
আমরা অনেক বড়ো হয়েছি,
আমার বয়স এখন মায়ের সেই বয়স ছাড়িয়ে গেছে।
এখন আমরা দু’ভাই-বোন আর আগের মতো অবাক হই না।
আজ আমরা বুঝতে পারি, মা জানতেন
আমরা ঠিকই বস্তার মুখ খুলে দিয়ে আসবো।
পল্লবীর সাথে মায়ের নিশ্চয়ই আলাদা কোনো হিসাব ছিল,
অথবা হিসাবটা ছিল আসলে আমাদের সাথেই,
প্রত্যেকটি মানুষেরই নিজস্ব কিছু হিসাব থাকে,
মানুষ তার সব হিসাব তার জীবনকালে প্রকাশ করে না।
আজ আমি জানি,
যতো দূরেই ফেলে আসতে চাই না কেন,
পল্লবীরা বারবার ঠিকই ফিরে আসবে।
একবার হিসাবের খাতা খুললে হিসাব আর কখনো বন্ধ হয় না।
পল্লবী আমাদের প্রলম্বিত জীবন থেকে হারিয়ে গেছে সেই কবে,
আমি এখন সে দিনক্ষণ মনেও করতে পারি না।
তবে আজকাল পল্লবী প্রায়ই ফিরে আসে,
এমনভাবে ফিরে আসে যেন কিছুই হয়নি,
যেন আমি তাকে বস্তাবন্দি করে ফেলে আসতে যাইনি।
পল্লবী শুধু একা ফিরে আসে না,
আরো অনেক বস্তাবন্দি অন্ধকার
আর হিসাব নিয়ে ফিরে আসে,
এমন এমন সব হিসাব নিয়ে ফিরে আসে
যা আমার কাছে মোটেও পছন্দের নয়,
তবু আমি বিদ্ধ হবার সমূহ আশঙ্কা নিয়ে
কেন জানি পল্লবীর জন্য অপেক্ষায় থাকি।
আমার সেই বোন এখন
অনেকগুলো সমুদ্রের ওপারে ব্যতিব্যস্ত প্রবাসী,
পল্লবী তার কাছেও ফিরে আসে কিনা
মাঝে মাঝে সে কথা আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে,
তবে কেন যেন সাহস করে আমি
সে কথাটা তাকে জিজ্ঞেস করেতে পারি না।
১২ নভেম্বর, ২০২১