২৮ ফেব্রুয়ারি, প্রতিরোধ , প্রতিশোধ ও আমাদের কবিতার দ্রোহ

২৮ ফেবরুয়ারি, প্রতিরোধ, প্রতিশোধ ও আমাদের কবিতার দ্রোহ

(একজন বুয়েট ছাত্রের স্মৃতি, ১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি)

এই দিনটি ছিল একটি ভয়ংকর দুঃখজনক দিন। অবৈধ ক্ষমতা দখল, মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি, সামনের প্রস্তাবিত উপজেল নির্বাচন বিরোধিতা নিয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। দুপুরের বেশ পর হাজার হাজার ছাত্র জমায়েত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন আর ব্যাবসায় প্রশাসন ভবনের সামনে। পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলের প্রস্তুতি চলছে। ছাত্রদের উজ্জীবিত করতে জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ও কবি মোহন রায়হান ভাই একটা জ্বালাময়ী কবিতা পড়লেন,

‘আমাদের মৃত্যুর জন্য আজ কোনো পরিতাপ নেই,
আমাদের জন্মের জন্য আজ কোনো ভালোবাসা নেই,
আমাদের ধ্বংসের জন্য আজ কোনো প্রতিকার নেই,
আমাদের সবকিছু আজ শুধু ছলনার, ব্যর্থতার ক্লেদ নিয়ে আসে।
আজকে এখানে একজন শিক্ষক জন্মাক, আজকে এখানে একজন বুদ্ধিজীবী থাক,
আজ নবজন্ম হোক এ দেশের লেখক-কবির আর তারা অন্ধকারে ঝলসিত আগ্নেয়াস্ত্রের মতো হোক স্পর্ধিত;
স্পর্ধিত হোক আজ তারা স্পর্ধিত হোক।’

সেদিন মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন সকল ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতারা, বুয়েটের দুই সূর্যসন্তান খন্দকার মোহাম্মদ ফারুক (তিন তিনবার বুয়েটের নির্বাচিত ভিপি এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি) আর মুনিরুদ্দীন আহমদ (জাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি) দুজনও ছিলেন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম প্রধান নেতা। বুয়েটের অন্য কোনো ছাত্র পরবর্তী সময়ে আর কোনো দিন ছাত্ররাজনীতির ওই উচ্চতায় পৌছুতে পারেনি। বিশাল মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, টিএসসি, কার্জন হল পার হয়ে ফুলবাড়িয়ার দিকে অগ্রসর হয়, তখনই হঠাৎ দাঙ্গা পুলিশ সামনে ও পেছনে দুদিক থেকেই ঘিরে ধরে। তবে আশ্চর্যজনক হলো, পেছনে ছিল কয়েকটি পুলিশবিহীন ট্রাক। এ রকম খুব কম হয়, দুদিক থেকে সাধারণত দাঙ্গা পুলিশ ঘিরে রাখে না, একটা পথ কৌশলগত কারণে সাধারণত খোলা রাখে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার জন্য। আজ যেন একটু অন্য রকম। কেমন গা ছমছমে ভাব।

হঠাৎ বোঝা গেল তাদের বীভৎস পরিকল্পনা। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছনের ধীর গতিতে মিছিল অনুসরণ করা ট্রাকটি বর্তমান ফায়ার ব্রিগেড অফিসের পাশ থেকে দ্রুতগতিতে উঠিয়ে দেওয়া হলো মিছিলের ওপর। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতবিহ্বল হয়ে গেলো, ঘটনাস্থলেই শহীদ হলেন ছাত্রলীগের ইব্রাহীম সেলিম ও দেলোয়ার হোসেন । আহত হলো অসংখ্য ছাত্র, চিরকালের জন্য পঙ্গু হয়ে গেলো অনেকে। নিহত ছাত্রদের লাশ দুটোও পুলিশ নিয়ে গেলো। ওরা দুজনই ছিলেন দক্ষিণ বাংলার সন্তান। সেলিম ছিলেন পিরোজপুরের ছেলে আর দেলোয়ার পটুয়াখালীর । ফুঁসে উঠলো সারা দেশ। সারা দেশে বিক্ষোভে ফেটে পড়লো ছাত্র-জনতা। রাজপথের আগুন সাংস্কৃতিক মানসেও ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। জাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা কবি মোহন রায়হান ভাই ছিলেন স্বভাবে অনেকটা কাজী নজরুল ইসলামের মতো, চট করে লিখে ফেলতে পারতেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে লিখে ফেললেন ‘বুনো শুয়োরের ট্রাক’,

সামরিক আইন প্রশাসকের দফতরগুলো
পরিণত হয়েছে মিউনিসিপ্যালিটির
প্রস্রাবখানায়।
ওই যায় ওই…
বুনো শুয়োরের ট্রাক
ওই যে পালায় ঘাতক শুয়োর…
পিষে পিষে দ’লে দ’লে
তাজা তাজা ফুল
ওই তো পালায় বর্বর ড্রেজার।
ওই যায় ওই…
বুনো শুয়োরের ট্রাক…
ঘোত্ ঘোত্ ঘোত্ ঘোত্
প্রতিবাদী মিছিলকে
পিষে পিষে দ’লে দ’লে
ওই যে পালায় খুনি।

কবি ফরহাদ মাজহার এ সময় লিখলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘লেফটেনান্ট জেনারেল ট্রাক’,

হে সামরিক পোশাক পরিহিত শাহানশার মতো ট্রাক
এই মিছিল
তোমার মত বহুত শাহানশা’কে উলঙ্গ করে ছেড়েছে
তারপর প্রস্রাব করতে করতে
প্রস্রাব করতে করতে
প্রস্রাব করতে করতে

বুয়েটের সচেতন ছাত্রসমাজের বুকেও তখন দ্রোহের আগুন জ্বলছে অন্য মাত্রায়। ট্রাক, গাড়ি পুড়ছে পলাশীর মোড়ে, সলিমুল্লাহ হল আর আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের মাঝের রাস্তায়, বকশীবাজার মোড়ে। এ রকম এক অগ্নিগর্ভা সময়ের প্রেক্ষাপটে বুয়েটের স্থাপত্যে আমার এক বছরের সিনিয়র ছাত্রনেতা মনজুর কাদের হেমায়েতউদ্দিন ভাইকে নিয়ে আমরা দুজন একটা ছোট প্রতিবাদী কবিতার সংকলন বের করি মাত্র দুই-তিন দিনের মধ্যে।

সংকলনে অনেকেই কবিতা দিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে যাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিখ্যাত হয়েছেন।

সংকলনে, আমাদের বন্ধু সহপাঠী মোজাম্মেল বাবুর (বর্তমানে একাত্তর টেলিভিশনের কর্ণধার) কবিতাটির নাম ছিল ‘রক্ত বমি’, ওর কবিতার শেষ চারটি লাইন তুলে দিচ্ছি,

আমাদের বিপ্লব
গাছের শেকড়ে শেকড়ে ছড়াবে
পাখীর কূজনে কূজনে ছড়াবে
কি দিয়ে রুখবে সমূহ ভাঙন ।

স্থাপত্যের ছাত্র ও তৎকালীন বুয়েট ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের তুখোড় সাহসী ছাত্রনেতা মাহফুজুর রহমান ভাইয়ের (পরবর্তী সময়ে পোল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত) কবিতার নাম ছিল ‘শালা’,

এতো তোকে গালি দিলুম
তবু বুঝি সখ মেটেনি।
ট্রাক চালিয়ে ভান দেখালি
সেদিন রাতে গান্জা খেয়ে পড়ে ছিলি ।
শোক এলো তোর—
এ কোন ছিরি ?

আমাদের স্থাপত্যের বন্ধু সহপাঠী এনামুল করিম নির্ঝরের (পরবর্তী সময়ে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র পরিচালক ও নির্মাতা ) কবিতার নাম ছিল ‘ঘরের ভেতর শত্রু’, ওর কবিতার শেষ কয়টি লাইন ছিল এমন,

তবে জনাব আপনি একবারো
কবি রাজার ভাঁওতাবাজি বিনাশ করে
সুযোগ খোঁজেন চালাকির—
তবে জানবেন নিশ্চিত নিজের দেশের মানুষের
শিকার হবেন আপনিই।

ছাত্রনেতা শাহিনুল ইসলাম খান ইতি ভাই (বর্তমানে সিডিএর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ) লিখেছিলেন  ‘দেশের এক আহাম্মক ‘ নামের একটি কবিতা,

প্রতিরোধে প্রতিশোধে
জনতা যে শত ক্রোধে
সামরিক কুত্তার চামড়া যে তুলবেই ।

এ ছাড়া আরো যাঁরা কবিতা দিয়েছিলেন তাঁরা হলেন—মরহুম তাজুদ্দিন (স্থপতি ও বিল্ডিং সেফটি বিশেষজ্ঞ), মনজুর কাদের হেমায়েতউদ্দিন (সুপরিচিত স্থপতি), মুস্তাফিজুর রহমান (কানাডা প্রবাসী স্থাপত্যের শিক্ষক), আব্দুল হক শাহিন (নিউজিল্যান্ড প্রবাসী আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত প্ল্যানার ও স্থপতি)।সংকলনের প্রচ্ছদে নতুনত্ব আনার জন্য আর একই সঙ্গে পয়সা বাঁচানোর জন্য কাগজ প্যাকিংয়ের জন্য যে গাঢ় নীল রঙের প্যাকিং পেপ্যার ব্যবহার করা হয়, সেই বিনি পয়সার কাগজ ব্যবহার করি; কিন্তু আমাদের এই এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল হয় না। আমাদের জানা ছিল না প্যাকিং কাগজের ওপর মোমের পাতলা প্রোটেক্টিভ প্রলেপ থাকে, তাই ট্রাডল মেশিনের রং তার ওপর লাগতে চায় না। ইচ্ছা ছিল গাঢ় নীল রঙের ওপর সাদা রঙে স্ক্রিন প্রিন্টে ম্যাট কন্ট্রাস্ট প্রচ্ছদ ছাপার; কিন্তু স্ক্রিন প্রিন্ট করতে যে টাকা দরকার ছিল, তা আমাদের কাছে ছিল না।

তাই শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলাম, কম দামে ট্রাডল প্রেসেই ছাপবো। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র, ছাত্রলীগ নেতা মিজানুল মাহবুব ভাই ছিলেন স্থাপত্যে আমাদের এক বছরের সিনিয়র। মিজান ভাই খুব সুন্দর স্কেচ করতেন। তিনি পটাপট পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই ছোট্ট এক টুকরা ট্রেসিং পেপারে ‘প্রতিরোধে প্রতিশোধ’—এই থিমে দুর্দান্ত একটা স্কেচ করে দিলেন কাভারের জন্য। মিজান ভাই খুব সুন্দর কবিতাও লিখতেন, পাশ করার মাত্র কয়েক বছর পর তিনি এক দুরারোগ্য ইউরিনারি ডিজিজে মারা যান। এখানে প্রাসংগিক না হলেও ওনার একটা কবিতার দুটি লাইন উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারলাম না,

যদি দুঃখ দাও, প্রিয়
সুতীব্র দুঃখ দিও
এক আধটুকু দুঃখে দুঃসহ দহন
সুখ যদি দাও
সুতীব্র সুখে যেন উবে যায় সকল মনন

যাক, প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ট্রাডল মেশিনে সরাসরি সাদা রঙে প্রিন্ট হয় না, সাদা রং শুধু অন্য রঙের সঙ্গে মেশানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। আমারা গোঁ ধরলাম, না, নীল তেলতেলা কাগজের ওপর সাদা প্রিন্ট করতেই হবে। শাহ সাহেব বাজার, মোগল আমলের ঐতিহাসিক খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদের ঠিক পেছনেই সেলিম সাহেবের খাজা আর্ট প্রেস। জীবনে অনেক কালো রঙের মানুষ দেখেছি; কিন্তু সেলিম সাহেবের মতো কুচকুচে ও চকচকে কালো মানুষ আমি আর দেখিনি। তাঁর দাঁতগুলো ছিল অফসেট পেপারের চেয়েও সাদা আর তাঁর হৃদয়টা ছিল তার চেয়ে আরো অনেক সাদা। তাই তিনি যখন হাসতেন তখন তাঁকে খুব সুন্দর দেখাতো। এমন অদ্ভুত ভালো মামুষ আমি জীবনে কম দেখেছি। উনার ওপর জীবনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় নিষিদ্ধ ছাপাজনিত কতো অত্যাচার যে করেছি তার হিসাব নেই। এক মুখ হাসি নিয়ে তিনি সব অত্যাচার সহ্য করতেন। মানুষটা আজ বেঁচে নেই। যেখানেই থাকুন পরম করুণাময় তাঁকে যেন এমন হাসি-খুশি রাখেন সেখানেও।

মনজুর ভাই বললেন, ব্যাক কাভারটা ফাঁকা না রেখে ‘প্রতিরোধে প্রতিশোধ টাইপ’ একটা টাটকা কিছু লিখে ফেলো, ওটাও সাদা রং দিয়ে ছাপবো। গভীর রাতে বাসি পেটে প্রেসে বসেই এই ‘টাটকা’ জিনিস লিখে ফেললাম,

“স্বৈরাচার এখন তার পূর্ণমত্তায়। সাম্রাজ্যবাদের কালো ছায়ায় ঢেকে গ্যাছে সমগ্র স্বদেশ। ট্রাকের চাকার নিচে এখন তাই প্রতিবাদী যুবকের থেঁলতে যাওয়া দেহ আর শিক্ষকের পবিত্র দেহে নির্লজ্জ বর্বরের আঘাত। নারীর শরীরও আজ রক্তাক্ত, দেহে তার সশস্ত্র অসভ্যের হাত। বুকে গুলি নিয়ে শুয়ে আছে এখন সহস্র যুবক। মায়ের চোখেও আবার সেই পুরনো জলের দাগ। এখন কি করে বসে থাকা আর, চাই প্রতিশোধ। চাই প্রতিরোধ। বুকের পোষা আগুনে চাই দাবানল দাহ। আমাদের জীবনই হবে আমাদের অস্ত্র আর আমাদের মৃত্যু আমাদের নবজীবনের শর্ত। এখন তাই প্রতিরোধেই প্রতিশোধ।”

কিন্তু বাদ সাধলেন প্রেসের হেড সুপারভাইজার আলাউদ্দিন মিয়া। তিনি সোজা বলে দিলেন,

এই ডেঞ্জার কাম আমি পারমু না। এই বয়সে পুলিশের বাঁশডলা খাবার সোয়াদ আমার নাইক্কা ।

অধস্তনের এই আপাত ‘বেয়াদপিতে’ সেলিম সাহেব রেগে গেলেন না, উনি আসলে রাগতেই জানতেন না। উলটো তিনি হেসে দিলেন, উনি সব কথায়ই হাসতেন। উনি বললেন, ঠিক আছে, আমি নিজেই চেষ্টা করি। সেলিম সাহেবের রাতভর নানা চেষ্টা আর মনজুর ভাইয়ের নানা রকম টাটকা ‘বিজ্ঞানভিত্তিক’ টেকনিক্যাল কনসালটেন্সির পরও প্রচ্ছদ হিসেবে যে বস্তু বের হলো তা এক কথায় ভয়াবহ, কিন্তু আর কোনো উপায় ছিল না আমাদের, সময় খুব কম। ছাপা শেষে একগাদা ‘প্রতিরোধে প্রতিশোধ’ নিয়ে আমরা ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম আর পাঁচ টাকা করে বিক্রি করতে লাগলাম। যেকোনো বিচিত্র কারণেই হোক আমাদের প্রথম ক্রেতা হলেন স্থাপত্য বিভাগের প্রফেসর ইমামুদ্দীন টলো স্যার, তিনি চরম বিরক্তির সঙ্গে ভুরু কুঁচকে পাঁচ টাকা বের করে দিলেন আর মনোযোগ দিয়ে কবিতাগুলো পড়তে লাগলেন। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সবাই প্রচ্ছদের ভূয়সী প্রসংশা করলো, বিশেষ করে স্থাপত্যের ছাত্ররা। স্থপতিরা বোধ হয় বিশ্বব্যাপীই সব সময় দুরূহ ও দুর্বোধ্য বস্তু পছন্দ করে, অথবা কেউ কেউ যা বোঝে না তার বেশি তারিফ করে।

বিক্রিতে মনজুর ভাই খুব পারদর্শী ছিলেন। সবাই তো আর কাব্যরসিক হয় না, হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু মঞ্জুর ভাইয়ের পাল্লায় পড়লে রসিক-বেরসিক নির্বিশেষে সবাইকেই একটি তাজা টাটকা ‘প্রতিরোধে প্রতিশোধ’ কিনতে হতো। অনেকে অনিচ্ছা সত্ত্বে ও মলিন মুখে এই ‘টাটকা’ জিনিস কিনতো। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন পাঁচ টাকায় ৩টা কড়কড়া বেনসন (মেড ইন লন্ডন) সিগারেট কেনার পরও ৫০ পয়সা ফেরত পাওয়া যেতো। ওই ৫০ পয়সায় সেন্ট্রাল ক্যাফেটেরিয়ায় ক্ষুদ্র তিনকোনা ভাসমান লেবুসহ প্রচণ্ড মিষ্টি এক কাপ লেবু চা পাওয়া যেত অথবা দুপুরবেলা পুরো দুই প্লেট ‘আখনি’ নামের এক মৃদু তৈলাক্ত মাঝারি সরু চালের ভাতের সঙ্গে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সাইজের চার-পাঁচ পিস মাংসসহ এক অদ্ভুত ধরনের পোলাও পাওয়া যেতো। আমাদের এক বন্ধু রসিকতা করে বলতো, এতো ছোট সাইজের মাংস কাটা বটি দিয়ে সম্ভব নয়, এর জন্য নাকি বলাকা মার্কা ধারালো ব্লেড ব্যবহার করা হতো। তাই পাঁচ টাকা তখন অনেক টাকা,পাঁচ টাকা খরচ করে কবিতা কিনতে আত্মা লাগে।

যেকোনো কারণেই হোক আমাদের ‘প্রতিরোধে প্রতিশোধ’ উতরে গেল, সব কপি বিক্রি হয়ে গেল। এটা এতো পাঠকপ্রিয়তা পাবে আর সাড়া জাগাবে ভাবতেই পারিনি। হয়তো, মানুষের চেতনা যখন স্বতঃস্ফূর্ত দ্রোহের আগুনে জ্বলে ওঠে, তখন তার নান্দনিক বোধের ব্যাকরণও বদলে যায়। সংকলনে আমার কবিতা ‘সরল ইতিহাস’-এর কিছুটা এখানে তুলে দিচ্ছি,

জালিয়ানওয়ালার আবদ্ধ আঙিনায়
ওরা আমাদের গুলিবিদ্ধ করলো,
ছিন্ন ছিন্ন করলো আমাদের দেহ
আমরা তবু মরিনি
ওরা মরেছে।
এবার ফুলহীন ফুলবাড়িয়ায়
ওরা আমাদের পিষ্ট করলো ট্রাকের চাকায়,
থেঁতলে দিলো আমাদের দেহ আর বুকের যা কিছু,
আমরা এবারো মরিনি;
ওরা ঠিক ঠিক এবারো মরবে।
আমরা আসলেই মরিনি,ওরা মরেছে ।

ইতিহাস শিক্ষা দেয়, অগণিত মানুষ কবিতার মাধ্যমে যে স্বপ্ন লালন করে তা কখনো মরে না। কবিতার বুক থেকে উৎসারিত রক্ত ও ঘামে ভেজা আমাদের লালিত দৃঢ় স্বপ্ন সত্য হয়েছিল, ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারকে পরাজিত করেছিল। কবিতা বিজয়ী হয়েছিল। সৎ কবিতা কখনো পরাজিত হয় না। শুনেছি, মৃত্যুর সময় শহীদ সেলিম ছয় মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রেখে যান, যার বয়স এখন হওয়ার কথা সাঁইত্রিশ, সেই পিতাহারা মেয়েটির খোঁজ আমরা হয়তো অনেকেই রাখিনি । আমাদের সেই দ্রোহের আগুন আজ হয়তো নিভে গেছে, ব্যক্তিগত সমৃদ্ধির খায়েশে আমরা আজ হয়তো অনেক তন্ত্রমন্ত্র আর লগ্ন-তিথি মেনে চলি, তবু যারা জাতির চরম দুঃসময়ে নিজের জীবন দিয়ে আমাদের চেতনাকে শাণিত করে গিয়েছিলেন একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের স্বপ্নে, তাঁদের  আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই , আমাদের পরের প্রজন্মসমূহ যেন সেই কিংবদন্তির নায়কদের গল্প মনে রাখে। কেননা আজ আমি আমাদের অগ্নিগর্ভ সময়ের সেই সব কিংবদন্তির অকুতোভয় অমর শহীদ আর সেই সব স্বতঃস্ফূর্ত দ্রোহের কবিতার কথা বলছি,

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল…
সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা
সুপুরুষ ভালবাসার সুকণ্ঠ সংগীত কবিতা
জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা
রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।
আমরা কি তাঁর মত কবিতার কথা বলতে পারবো
আমরা কি তাঁর মত স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো?

আমি যাঁর কবিতা দিয়ে আমার লেখা শেষ করলাম, ব্যক্তিগতভাবে কবি হিসেবে আমার প্রিয় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ স্বৈরাচারী এরশাদের হালুয়া-রুটির মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন এবং সেই সময় তিনি বাংলা একাডেমির একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পড়তে এসেছিলেন । কবি মোহন রায়হান ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা কজন তাঁকে বাংলা একাডেমির বিশাল স্টেজ থেকে নামিয়ে দিয়েছিলাম, তাঁকে আমরা কবিতা পড়তে দিইনি । আমরা যখন তাঁর মাইক্রোফোন কেড়ে নিই, তখন তিনি তাঁর মোটা গ্লাসের চশমার ভেতর দিয়ে আমাদের দিকে অদ্ভুত এক বিস্ময় ও অপমানিতের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। আমার সেই দৃষ্টি এখনো স্পষ্ট মনে আছে। এই ছিল আমাদের অগ্নিগর্ভ যৌবনের প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের কবিতাময় পরম সৃষ্টিশীল নির্মম এক সময়, যখন আদর্শকে সমুন্নত রাখতে প্রিয় কবিকেও আঘাত করতে আমরা দ্বিধা করিনি ।

স্থপতি মাহফুজুল হক জগলুল

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

আরও পড়ুন