খাকি ভূতের আছর, জাহীদের অভিমানী চলে যাওয়া : প্রথম পর্ব

ওকে

 

মজিবর… মজিবর বলে বুয়েটের আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের ডিজাইন ক্লাসে যে ছাত্রটিকে ফারুক খান স্যার ঘন ঘন ডাকছেন তার নাম আসলে মজিবর না, তার নাম জাহীদ, সৈয়দ জাহীদ হোসেইন। জাহীদ নামের সঙ্গে মজিবর নামের কোনো ধ্বনিগত সাযুজ্য নেই; কিন্তু কোনো এক বিচিত্র কারণে স্যার তাকে প্রায়ই মজিবর নামে ডাকেন। মানুষের অনেক কাজকর্মই বোঝা যায় না, ফারুক স্যারকে বোঝা আরো জটিল।

জাহীদ দুর্দান্ত সুন্দর স্কেচ করতো, সে পেন্সিল স্কেচই হোক বা পেন স্কেচ। নিমেষের মধ্যে এঁকে ফেলতে পারতো সব কিছু। ল্যান্ডস্কেপ বা হিউম্যান ফিগার দুটোই ভালো আঁকতো। বসে বসে কথা বলতে বলতে বা আড্ডার মাঝে কাগজের ওপর ওর হাত চলতেই থাকতো। কিছু না কিছু আঁকতোই সব সময়। ও খুব শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতো, সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় জড়ো হওয়া আমাদের শ্রেণির মানুষরা নিজেদের অজান্তেই যেমন একটা lingua franca তৈরি করে নিয়েছি ও ফলো করছি, তা ও ফলো করতো না। আমরা যেমন বলি ‘আসছিলাম’ বা ‘গেছিলাম’, ও বলতো ‘এসেছিলাম’, ‘গিয়েছিলাম’। তাই ওর কথা আমার কাছে খুব মিষ্টি লাগতো।

আমাদের দেশের ঢাকার মানুষরা নিজের বাসায় কথা বলে নিজ জেলার ভাষায়, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে অন্য এক ভাষায়, আর স্টেজে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেই চট করে ভাষা বদলিয়ে তথাকথিত প্রমিত বাংলায় কথা বলতে শুরু করে (আমিসহ পূর্ব বাংলার ৯০ শতাংশ মানুষের স্টেজের ভাষণের উচ্চারণেই বোঝা যায় যে এমন করে অতি সতর্ক হয়ে প্রমিত বাংলায় শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছে, তবে যাদের কষ্ট হয় না তারা জীবনে খুব ‘সাইন’ করে বলে আমার ধারণা)। চিটাগং বা সিলেট বা বরিশালের বন্ধুরা যখন নিজ নিজ শহরে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে তখন কিন্তু যার যার নিজেদের অঞ্চলের ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলে, ঢাকার বন্ধুদের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলে তা কিন্তু ওখানে বলে না। যাক, প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

আমি যে সময়ের কথা বলছি, এরশাদের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। মজিদ খানের শিক্ষানীতি ছাত্রসমাজ লাথি মেরে প্রত্যাখ্যান করেছে। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার জন্য মিছিল নিয়ে আসে। পুলিশ নির্মমভাবে গুলি চালায় ছাত্রদের মিছিলে। নিহত হন অনেক ছাত্র। ওই সময়ের জাসদ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরে ডাকসুর জিএস ডা. মুশতাক ভাইয়ের (পরবর্তী জীবনে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Nutritional Epidemiology-তে পিএইচডি করেন, বর্তমানে তিনি IEDCR-এর উপদেষ্টা) মতে, সেদিন আনুমানিক পঞ্চাশজন ছাত্রকে হত্যা করা হয়। ঢাকায় মোজাম্মেল আইয়ুব ও জয়নাল এবং চট্টগ্রামে মোজাম্মেল কাঞ্চনের লাশ পাওয়া গিয়েছিল। দীপালি সাহা ও জাফরের লাশ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে শহীদ মিনারে এরশাদের প্রধানমন্ত্রী মিজান চৌধুরীকে ছাত্ররা ধাওয়া দিয়েছে। তিনি পালিয়ে বেঁচেছেন, তবে একদল অতি রসিক ছাত্র তাঁর পায়জামা খোলার চেষ্টা করেছে। এ নিয়ে রাতে নজরুল ইসলাম ক্যান্টিনে অনেক ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে গল্প তৈরি হতো; কিন্তু আমাদের নেতা হাসনাত ভাই এলেই প্রসঙ্গ বদলে ফেলতাম, মিজান চৌধুরী ছিলেন হাসনাত ভাইয়ের আপন মামা।

এ রকম একসময়ের প্রেক্ষাপটে আমি আমাদের সহপাঠী জাহীদকে বললাম, ‘চল, আন্দোলনের পক্ষে একটা মিনি কার্টুন পত্রিকা বের করি।’ ও ছিল খুব আমোদপ্রিয়, খুব নির্বিবাদী মানুষ, কোনো রকম রাজনৈতিক দলাদলি বা ঝামেলার মধ্যে যেতে চাইতো না। ও কিছুতেই রাজি হলো না।

বললো, ‘দোস্ত, আমার মা জানলে আমাকে মেরে ফেলবে।’

সে কঠিন সামরিক শাসনের সময় এরশাদকে নিয়ে কার্টুন বের করলে গ্রেফতারসহ নানা পুলিশি নির্যাতনের সমূহ আশঙ্কা। আমি দমে গেলাম। কিন্তু বুদ্ধি আঁটতে থাকলাম, কী করে ওকে রাজি করানো যায়। আমার মাথায় নানা রকম রাজনৈতিক কার্টুনের আইডিয়া কিলবিল করে; কিন্তু আমি তো আর ওর মতো স্কেচ করতে পারি না, আমার দৌড় আলপনা আর সামান্য কিছু আঁকাআঁকি পর্যন্ত।
কী করি, কী করি!

আমি জাহীদের পেছনে লেগে রইলাম। ‘চিহ্ন’ নামের আমাদের সাংস্কৃতিক সংগঠনের নানা অনুষ্ঠানের মাধমে আমাদের বন্ধুত্ব আর পারস্পরিক যোগাযোগ আরো বাড়তে লাগলো, বিশেষ করে এনামুল করিম নির্ঝরের লেখা চিহ্নের নাটক ‘বিভাজিত উপাখ্যান’-এর সেট ডিজাইন আমরা একত্রে করেছিলাম। সে সময় আমরা রায়েরবাজারের অলিতে-গলিতে একত্রে ঘুরতাম আধা ভাঙা ঠেলাগাড়ির চাকার খোঁজে। রায়েরবাজারের অলি-গলি জাহীদের মুখস্থ ছিল। অনেক খোঁজার পর আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত আধা ভাঙা ঠেলাগাড়ির চাকা পেলাম; কিন্তু সম্যাসা হলো ওই বস্তু নিয়ে যাবো কীভাবে। নতুন প্রজন্মের পাঠকদের জন্য বলছি, তখন ঢাকা শহরে গুলশান, বনানীসহ সব রাস্তায়ই বিশাল আকারের গরুর গাড়ির চাকার মতো কাঠের চাকার ঠেলাগাড়ি চলতো, এখনকার মতো মোটরগাড়ির চাকা দিয়ে ঠেলাগাড়ি চালানো হতো না। কোনো রিকশাওয়ালাই ওই বস্তু বহন করতে রাজি হয় না। অবশেষে এক রিকশাওয়ালার হাতে-পায়ে ধরে রায়েরবাজার থেকে ঠেলাগাড়ির আধা ভাঙা চাকা অনেক কষ্টে আঁকড়ে ধরে রিকশায় করে আমি যখন বুয়েটের দিকে আসছিলাম, তখন আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় তা দেখে ফেলে এবং আমি আসলেই বুয়েটে পড়ি কি না এই ঘোরতর সন্দেহ আমার পারিবারিক মহলে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। যে সত্যি সত্যি বুয়েটে পড়ে তার তো রিকশায় করে ঠেলাগাড়ির চাকা নিয়ে পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে ঘোরার কথা নয়। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে আমার রক্ষণশীল পরিবারে আমাকে বিরক্তিকর উৎকট ঝামেলায় পড়তে হয়, সেসব কথা এখানে আর বলতে চাচ্ছি না। তারা তো জানে না নির্ঝরের পাল্লায় পড়লে ঠেলাগাড়ির চাকা কেন, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্ররাও ঘোড়াগাড়ির চাকা মাথায় নিয়ে লুঙ্গি পরে ক্লাসে হাজির হবে। এ কথা লিখতে গিয়ে প্রায় একই রকম একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল, নির্ঝর ও আমার দুজনেরই প্রিয় বন্ধু ছিল স্থাপত্যের ছাত্র হাবিব। ও যখন বেলজিয়ামের ল্যুভেন ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করে তখন গ্যারি নামে ওর এক বেলজিয়ান সহপাঠীকে মসুর ডাল খাইয়ে খাইয়ে প্রায় নেশাগ্রস্ত করে ফেলে। তিন বেলা খাবারের সঙ্গে পাতলা ডাল না খেলে তার চলে না, কখনো-সখনো মসুর ডালের অভাব পড়লে হাবিব উল্টো তার কাছ থেকে ডাল ধার নিয়ে আসতো। আমি নিজে ১৯৯৫ সালে গ্যারির ডর্মে গিয়ে তার রান্না করা পাতলা ডাল খেয়েছি। সঙ্গে আরো কিছু ওর আইরিশ ও জার্মান বন্ধু ছিল, তারাও দেখলাম ফ্লেমিস এসপারাগাস, গ্রিলড চিকেনের সঙ্গে মহা আমোদে পাতলা মসুর ডাল খাচ্ছে। কিছু কিছু মানুষের সম্মোহনী ক্ষমতা থাকে প্রবল। ১৯৮৭ সালে হাবিব স্থাপত্য বিভাগ ছাত্রসংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিল। ওহ… আবার অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলাম।

অবশেষে বারবার আমার ঘ্যানর ঘ্যানর করার কারণেই হোক বা অন্য যেকোনো বিচিত্র কারণেই হোক, অনেক দিন পর জাহীদের মন গললো, কার্টুন আঁকতে জাহীদ রাজি হয়ে গেলো। তবে শর্ত দুটি :

প্রথম শর্ত,
সম্পূর্ণ গোপন রাখতে হবে যে কার্টুনগুলো ওর আঁকা।
দ্বিতীয় শর্ত,
আইডিয়া আমার দিতে হবে, সে শুধু সেই অনুযায়ী এঁকে দেবে।

আমি পরমানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। তখন খুব সম্ভব ১৯৮৪ সালের মে বা জুন মাস। প্রথমেই একটা নাম ঠিক করা দরকার। নাম আমার আগেই ঠিক করা, আমাদের আন্দোলন যেহেতু ক্রনিক সামরিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে তাই নাম দিলাম ‘খাকি ভূতের আছর’।

শুরু হয়ে গেলো আমাদের গোপন আঁকাআঁকি। আমি নানা রকম থিম দিই আর জাহীদ আঁকে। মুনির ভাই, মিজান ভাই আর মঞ্জুর ভাইও মাঝে মাঝে বুদ্ধি দেন। বেশির ভাগ কার্টুনই আঁকা হতো তিতুমীর হলের রুমের দরজা বন্ধ করে অথবা দুপুরের পর সেন্ট্রাল ক্যাফেটেরিয়ার দোতলার নীরব লবিতে। চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই কার্টুন আঁকার কাজ শেষ হয়ে গেল। কাভার ও ব্যাক কাভারসহ মোট চব্বিশটি কার্টুন সিলেক্ট করলাম প্রিন্টের জন্য। অফসেটে প্রিন্ট করার আর্থিক সামর্থ্য আমাদের ছিল না, তাই আমরা ঠিক করলাম, প্রথমে চব্বিশটি কার্টুনের জন্য চব্বিশটি ব্লক করিয়ে নেওয়ার। তখন চারদিকে ধরপাকড়, আটক, নির্যাতন, জেল-জুলুম। চারদিকে সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দাদের কঠোর নজরদারি… এরশাদের পূর্ণ নজর ছাত্রসমাজের প্রতি, রাজনৈতিক দলগুলোকে হ্যান্ডেল করা মোটামুটি সে রপ্ত করে ফেলেছে; কিন্তু একমাত্র সমস্যা হচ্ছে এই বেয়াড়া বেয়াদব ছাত্রসমাজ। কোনো টোপই তারা গেলে না। সংবাদপত্রগুলো সব কঠিন আওতার মধ্যে, সঠিক সংবাদ প্রকাশ মানে জীবন নিয়ে টানাটানি। এ রকম এক কঠিন সময়ে এই ‘মহামান্য’-কে নিয়ে কার্টুন বের করা আর আগুনে ঝাঁপ দেওয়া মোটামুটি একই কথা। সত্যি কথা বলতে কী, আমার একটু ভয় ভয় করতে লাগলো। স্থাপত্যের আমার এক বছরের সিনিয়র মঞ্জুর কাদের হেমায়েতউদ্দিন ভাই প্রথম থেকেই জানতেন আমার পরিকল্পনার কথা। লাঠি, গুলি, টিয়ার গ্যাস বা গ্রেফতারবরণসহ ছাত্ররাজনীতির সকল বৈধ ও অবৈধ প্রায় সকল কাজেরই অভিজ্ঞতা আমার ছিল।রাউফুন বসুনিয়া হত্যার পর হরতালে পিকেটিং করতে গিয়ে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পরিবাগে স্থপতি মাজহারুল ইসলাম স্যারের বাড়ির পেছন দিকের একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন বাড়ির দোতলায় গিয়ে লুকিয়েছিলাম আমরা কয়েকজন। তবে শেষ রক্ষা হলো না। এক তাগড়া পুলিশ আমাকে ধরে এক লাথি মেরে দোতলার মেজেনাইন ফ্লোর থেকে সোজা নিচতলায় ফেলা দেয়। আমি ভেবেছিলাম বুঝি মরে যাবো। আশ্চর্য লাগে, আল্লাহর রহমতে আমি তৎক্ষণাৎ কোনো ব্যথাই অনুভব করিনি। কোনো এক লেখায় যেন পড়েছিলাম প্রথম আঘাতের পর অন্য আঘাতগুলোতে আর ব্যথা লাগে না। আসলেই কথাটা ১০০% সত্যি। লাথি মেরে ফেলা দেওয়ার পর আমাকে মোটা মোটা লাঠি আর রাইফেলের বাঁট দিয়ে যে বেদম প্রহার করা হয়েছিল কোনো বিচিত্র কারণে আমি তখন কোনো ব্যথা অনুভব করিনি। এ প্রজন্মের অনেকে জিজ্ঞেস করে যে বুয়েটের ছাত্র হয়ে সেই পরিবাগে কেন গিয়েছিলাম আন্দোলন করতে? আমি তাদের কী জবাব দেবো বুঝে পাই না। এই গ্রেফতার ও হাজতবাসের মধ্যে অনেক মজার মজার অভিজ্ঞতা হয়। কোনো একদিন হয়তো তা নিয়ে লিখবো, ইনশাল্লাহ। কিন্তু আমি যে খুব সাহসী মানুষ তা কিন্তু না, আমি আসলে খুব ভীতু প্রকৃতির মানুষ। এই সব সংঘাতময় পরিবেশে সব সময়ই আমার খুব ভয় ভয় করতো। স্থাপত্যের দুজন মানুষ ছিলেন অকুতোভয়, তাঁর একজন মঞ্জুর ভাই, অন্যজন মাহফুজ ভাই। এঁদের আমি কখনো ভয় পেতে দেখিনি, বরং ভয় দিতে দেখেছি।

এ কাজে এ রকম সাহসী সঙ্গী দরকার। দুঃসাহসী মঞ্জুর ভাইকেই তাই কমরেড হিসেবে ঠিক করলাম। মঞ্জুর ভাই বিখ্যাত মানুষ, তাঁকে সমসাময়িক কালে বুয়েট ও ঢাকা মেডিক্যালে চিনতো না এমন কেউ বোধ হয় ছিল না। সব সময় কিছু না কিছু নিয়ে মহাব্যস্ততায় টগবগিয়ে থাকতেন। একটা উদাহরণ দিলে তাঁর প্রাণশক্তি ও দেহশক্তির টগবগানির কিছুটা ধারণা মিলবে। আমাদের সময় ফ্যাকাল্টি বিল্ডিংয়ে কোনো এলিভেটর ছিল না, বিল্ডিংটা ছিল চারতলা। এলিভেটর কোরটি ইটের প্লাটার্ড দেয়াল দিয়ে আটকানো ছিল; কিন্তু কোরের ছাদ ছিল খোলা। মঞ্জুর ভাই আর তাঁর সহপাঠী মাহমুদ ভাই যখন প্রথম বর্ষে, কী কারণে যেন সন্ধ্যাবেলায় ফ্যাকাল্টির ছাদে গিয়েছিলেন, তারপর মাহমুদ ভাই হঠাৎ একটা ভূতুড়ে দৃশ্য দেখলেন… মঞ্জুর ভাইয়ের দেহ নিমেষে বাতাসে মিলিয়ে গেলো। সত্যি সত্যি মঞ্জুর ভাই চোখের পলকে গায়েব হয়ে গেলেন। মাহমুদ ভাই চরম মার্ক্সবাদী মানুষ, এই অলৌকিকতা মেনে নেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। তার ঘোর ভাঙলো যখন তিনি একটা দূরবর্তী অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ শুনতে পেলেন, ততক্ষণে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। মাহমুদ ভাই বুঝতে পারলেন রহস্যটা কী, মঞ্জুর ভাই পাঁচতলা থেকে পড়ে গেছেন আবদ্ধ অন্ধকার এলিভেটর কোরের মধ্যে। মাহমুদ ভাই খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন (পরবর্তী সময়ে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবান অ্যান্ড রিজিয়নাল প্ল্যানিংয়ে পিএইচডি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত হন)। সব সময় নিজের বুদ্ধিতে চলতেন। এবারও নিজের বুদ্ধিতেই চললেন। কাউকে খবর না দিয়ে তিনি মোমবাতির খোঁজে বের হওয়াটাকে সবচেয়ে জরুরি কাজ মনে করলেন। অতক্ষণে মঞ্জুর ভাইয়ের অবস্থা ‘কাহিল’। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে আবার হাজির হলেন ছাদে। মোমবাতি উঁচিয়ে দেখতে চাইলেন মঞ্জুর ভাইকে দেখা যায় কি না, তারপর অনেকটা বাংলাদেশ টেলিভিশনের খবর পাঠকের মতো নির্ভেজাল নির্বিকার ভাবলেশহীন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, মঞ্জুর তুই পড়ছিস? দশ-পনেরো মিনিট পরেও মঞ্জুর ভাইয়ের পতন ক্রিয়া শেষ হয়েছে কি না এ নিয়ে বোধ হয় উনার মনে তখনো ঘোরতর সন্দেহ ছিল।

সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, পাঁচতলা থেকে অন্ধকার গহ্বরে পড়ে গিয়েও তিনি জ্ঞান হারাননি। তিনি এ অবস্থায়ও বুঝতে পারলেন যে পাঁচতলা থেকে পতনে তার মৃত্যু না হলেও মোমবাতির আগুনে তিনি জ্বলে মরবেন। তিনি ওই অবস্থায় তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে বললেন, তুই মোমবাতি আগে সরা আর অন্যদের খবর দে। মাহমুদ ভাই কথামতো মোমবাতি নিভিয়ে দিলেন আর সবাইকে খবর দিলেন। শেষমেশ নিচতলায় এলিভেটর কোর ভেঙে মঞ্জুর ভাইকে উদ্ধার করা হয়। এতো ভয়ানক দুর্ঘটনার পরও মঞ্জুর ভাইয়ের মাত্র একটি পা ফ্র্যাকচার হয় এবং অন্য কিছু মাইনর ইনজুরি হয়। মাসখানেকের মধ্যেই মঞ্জুর ভাইকে আবারও আগের মতো ফ্যাকাল্টিতে ‘টগবগাতে’ দেখা যায়। প্রতিবছর নতুন ব্যাচ এলেই মঞ্জুর ভাইয়ের প্রথম কাজ হলো ওদের ডেকে নিয়ে তাঁর মহাপতনজনিত মহাকাব্য শোনানো। এই মহকাব্যের গুণেই হোক বা অন্য কোনো কারণেেই হোক এভাবে প্রতি নতুন ব্যাচ থেকে তাঁর  কিছু মুরিদ তৈরি হয়ে যেতো। সবাই-ই যে তাঁকে পছন্দ করতো তাও আবার না। এই হলো মঞ্জুর ভাইয়ের আংশিক পরিচয়। আংশিক বলছি এ কারণে যে পুরো পরিচয় দিতে গেলে লেখা অন্যদিকে চলে যাবে, যা আমি এখন চাচ্ছি  না।

মঞ্জুর ভাইকে নিয়ে গেলাম পুরানা পল্টনের গ্রাফিক্স সিস্টেমস লিমিটেডের হালিম সাহেবের কাছে। উনি ছিলেন বহুদিনের পরিচিত। খুব অমায়িক মাইডিয়ার টাইপ মানুষ। ফুটপাত থেকে দরোজা খুললেই উনাদের অফিস, মাঝে কোনো রিসিপশন টিসিপশন নেই, পাঁচ-সাতজন লোক গাদাগাদি করে বসতেন সেই রুমে। একটু পেছনে বসতেন উনার বড় ভাই রহিম সাহেব, রাশভারী মানুষ রহিম সাহেব খুব বিখ্যাত ফটোগ্রাফার ছিলেন। ওই সময়ের বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠানের ক্যালেন্ডারে উনার তোলা ছবি ব্যবহৃত হতো। উনার সামনে কথা বলতে আমাদের ভয় করছিল।

হালিম সাহেবকে বললাম, ব্যক্তিগত কিছু আলাপ আছে, ভেতরের স্টুডিও রুমে চলেন।

আমরা ভেতরে গিয়ে তাঁকে কার্টুনগুলো দেখালাম। সব দেখাতে পারলাম না, তিন-চারটা দেখেই তিনি মনে হয় ঘেমে উঠলেন। বললেন, ‘ভাই, আপনাকে অনেক সম্মান করি, আমারে মাফ করেন ভাই, এখনই এইগুলা নিয়া এখান থেকে চলে যান। এরপর কোনো কাজ থাকলে অন্য কাওরে দিয়ে পাঠাইয়েন, নিজে আর আইসেন না ‘

আমরা বের হয়ে এলাম। হুলিয়াপ্রাপ্ত পলাতক আসামির মতো মনে হতে লাগলো নিজেদের। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। তারপর পরবর্তী প্রায় দুই সপ্তাহ আমরা শেখ সাহেব বাজারের প্রিন্টপাড়ায় অনেক ঘোরাঘুরি করলাম। কিন্তু কোনো কূলকিনারা হলো না। আমরা যখনই ‘এ ফোর’ সাইজ এনভেলাপ থেকে এই ‘বস্তু’ বের করি যেন ঝাঁপি খুলে জ্যান্ত গোখরো সাপ বের করেছি, এমনভাবে সবাই আঁতকে ওঠে, লাফিয়ে দূরে সরে যায়। সব জায়গায়ই প্রায় একই কথা… ‘ভাই, আর কোনো দিন আমাদের এখানে আসবেন না ‘ কেউ কেউ আবার আরো সরেস উপদেশদাতা বলেন, ‘ভাই, বাবা-মা ইঞ্জিনিয়ার হইতে পাঠাইছে কতো আশা নিয়া, আপনারা এই ডেনজার লাইনে নামছেন কেন? এখনো সময় আছে এই সব বাদ দ্যান। একবার বাঁশডলা খাইলে জীবনে আর খাড়াইয়া কথা কইতে পারবেন না।’ পেছন থেকে এক বৃদ্ধ প্রুফরিডার বোধ হয় আরো রসিক ছিলেন, তিনি তাঁর পুরু কাচের চশমার ফাঁক দিয়ে আমাদের দিকে বিদ্রুপের জুলুজুলু চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘জীবনে আর বিয়াও করে পারবেন না।’

মঞ্জুর ভাই মোটেও বিদ্রুপ সহ্য করার পাত্র নন, চট করে রেগে যাওয়া মানুষ। তাঁকে সামলানো আর এক অতিরিক্ত দিকদারি। আমাদের কাজ করতে হবে নীরবে কোনো রকম বাদানুবাদ বা ঘটনার জন্ম না দিয়ে।এই অবস্থায় সব ফাঁস হয়ে গেলে সত্যিই বাঁশডলা খেতে হবে। আর সত্যি সত্যি যদি এই বয়সে প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, তাও তো বেশ চিন্তার ব্যাপার। অনেক কষ্টে সব কিছু হজম করে আমরা চলে আসি ক্যাম্পাসে।

চলবে……

 

৪ জুলাই, ২০২০ 

আরও পড়ুন