আমাদের যখন সিগারেট খাওয়ার বয়স হয়নি, তখন থেকেই আমরা অন্তত একটা সিগারেট ব্র্যান্ডের নাম পড়ে পড়ে বড় হয়েছি। সেই সিগারেটের ব্র্যান্ডের নামটি হলো চারমিনার। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা চারমিনার ব্র্যান্ডের সিগারেট খেতেন আর ব্যবহার করতেন টেক্কা মার্কা দিয়াশলাই । ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত সত্যজিৎ রায় ফেলুদা সিরিজের কয়েক ডজন ভীষণ সুন্দর আর জনপ্রিয় গল্প লেখেন। পরবর্তী সময়ে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ আর ‘সোনার কেল্লা’ সিনেমাও বানান, যেখানে ফেলুদা চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ঠোঁটে চারমিনার সিগারেটকে নায়কোচিত ভঙিমায় ধূমায়িত হতে দেখা যায়।
তবে আমি প্রথম চারমিনার সিগারেট দেখি ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের ঠিক পরপর। ঘটনাটা এমন, পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময়সহ প্রায় বছর দেড়েক আমারা বাটা সু কোম্পানির টংগীর বিশাল গেস্টহাউজের বাসায় থাকতাম কেননা আমার বাবা ছিলেন বাটা সু কোম্পানির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। ১৯৭১ সালের ৫ই ডিসেম্বর গভীর রাতে ভারতীয় বিমান বাহিনী বিমান থেকে বাটা ফ্যাক্টোরি চত্বরে আটটি বোমা ফেলে । তারা খুব সম্ভব বোমাগুলো ফেলতে চেয়েছিলো বাটা ফ্যাক্টোরির পাশেই টি,আই,সি ( টেলিফোন ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন) ভবনের এর উপর যেখানে ছিলো টংগী অঞ্চলে হানাদার পাকিস্থানি মিলিটারির হেড কোয়ার্টার । ওই আটটি বোমার মধ্যে কয়েকটি বোমা পড়ে আমাদের বাসার কয়েক’শ গজের মধ্যে। সবচেয়ে কাছে যে বোমাটি পড়েছিলো তা ছিলো আমাদের বাসা থেকে মাত্র ৫০-৬০ গজ দূরে । তবে তখন আমরা বাড়িতে ছিলাম না, আমরা ছিলাম কয়েক শত গজ দূরে ফ্যাক্টরি পশ্চিম পাশে একটা বিরাট W আকৃতির ট্রেঞ্চের ভিতর। ওই আটটি বোমার মধ্যে সাতটি বোমা আমাদের চতুর্দিকে বিস্ফোরিত হলেও একটি বোমা যে কোন কারণেই হোক বিস্ফোরিত হয়নি । ঐ রহস্যজনক বোমাটি বিস্ফোরিত না হয়ে মাটির গভীরে ঢুকে যায় । বোমাটি দীর্ঘদিন সেখানে ঘুমিয়ে থাকে । বোমাটি যেখানে মাটির ভিতর ঢুকে যায় সেখানে প্রায় তিন ফিট ডায়ামিটারের একটা সুড়ঙ্গের মতো তৈরী হয় । জায়গাটা ছিলো ফ্যাক্টোরি আর আমাদের বাসার মাঝামাঝি। ১৬ই ডিসেম্বরের পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা এসে জায়গাটা লাল রঙের দড়ি দিয়ে ঘিরে দেয় এবং একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়, যাতে লেখা ছিলো,
” DANGER , OUT OF BOUND “
কোন শ্রমিক বা কর্মকর্তা ভয়ে ঐ এলাকার কাছে যেতো না সেজন্য জায়গাটা হয়ে পড়ে জনশূন্য । আমি সবসমই বাটার ফ্যাক্টোরি ক্যাম্পাসে বিনাকারণে ঘোরাঘুরি করতাম । আমাকে কেউ বাধা দিতোনা । একদিন বিকাল বেলা হঠাৎ কেন যেন মনে হলো ঐ ঘুমন্ত বোমাটাকে দেখে আসি , কেন এমন দুর্মতি হয়েছিলো জানিনা । বলা হয় ” idle brain is devil’s workshop ” , আসলেই তাই , যেহেতু তখন দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে, স্কুল তখনো খোলে নাই, সারাদিন কোন কাজ নেই , তেমন কোন সঙ্গিসাথিও নেই তাই সারাদিন এদিকসেদিক ঘোরাঘুরি করা ছাড়া কোন কাজ নেই । একবার মনে হলো , না দরকার নেই রিস্ক নেয়ার । কিন্তু ঐ ডেভিল বা শয়তান তার লোভনীয় প্রলোভন ফাঁদ পেতে রাখে, তাকে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। এক্ষেত্রে প্রলোভন ছিলো একটা কমলা রঙের ইন্ডিয়ান চারমিনার সিগারেটের চকচকে প্যাকেট । প্যাকেটটা পড়ে ছিলো বোমার গর্তের একদম মুখে, খুব সম্ভবত ভারতীয় সামরিক অফিসাররা বোমার অবস্থা পরিদর্শনে এসে এটা ফেলে গিয়েছিলেন । তখন আমাদের ছোটদের সখ ছিলো সিগারেটের প্যাকেট সংগ্রহ করে তা দিয়ে তাস খেলা । চারমিনারের প্যাকেটটি ছিলো আমার কাছে অভিনব কেননা এর আগে এ ব্র্যান্ডের কোন সিগারেটের প্যাকেট আমি দেখিনি কোনদিন । আমি নিশিত ছিলাম এ নতুন প্যাকেটটি দেখিয়ে আমি আমার প্রতিযোগিদের মাত করে দিতে পারবো । যেই ভাবা সেই কাজ , চার্মিনারের আকর্ষনে ভয় কোথায় যেন উবে গেলো , আমি তখন লাল দড়ি অতিক্রম করে ডেঞ্জার এরিয়ার ভিতরে ঢুকে গেছি , এক দৌড়ে পৌছে গেছি একদম বোমার গর্তের সামনে মাটিতে পড়ে থাকা কমলা প্যাকেটটির দিকে । দৌড়ে গিয়ে প্যাকটটি আমার হাফ প্যান্টের পকেটে চালান করে দিলাম। প্যাকেটটি নিয়ে আমি তখনই চলে আসতে পারতাম কিন্তু ভাবলাম বোমার এতো কাছেই যখন এসেই গেছি তখন একবার বোমার সুড়ঙ্গে ভালো করে উঁকি মেরে দেখে নেই না কেন, যদি বোমাটাকে দেখা যায়। জীবনে এমন সুযোগ তো আর আসবেনা। সুতরাং হাটু গেড়ে বসে ঠিক বোমার সুড়ঙ্গের মুখে গলা ঢুকিয়ে ভিতরে দেখার চেষ্টা করতে লাগলাম।
তখনই ঘটলো বোমা ফাটার চেয়েও ভয়াবহ ঘটনাটা , হঠাৎ মানুষের হালকা কথাবার্তার শব্দ শুনতেই পিছনে তাকিয়ে দেখি লাল দড়ির কাছে পচিশ-ত্রিশজন মানুষ দাঁড়িয়ে । আমি তখনো বোমার সুড়ঙ্গের মুখে হাটু গেড়ে বসে আছি। ঐ পচিশ-ত্রিশজন মানুষদের সবাই অবাক বিস্ময়ে নিস্পলক তাকিয়ে আছে আমার দিকে । এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেনো আমি কোন ফাঁসিকাষ্ঠের আসামী । যারা তাকিয়ে আছেন তাদের মধ্য একজন হচ্ছেন স্বয়ং আমার আব্বা , তার পাশে বাটার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ,মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র বিদেশী যে বীর প্রতীক উপাধি পেয়েছিলেন সেই ওডারল্যান্ড আংকেল, আরও আছে বাটার অনেক বড় বড় অফিসার আর এই দলের মাঝে মধ্যমনির মতো দাঁড়িয়ে আছেন জলপাই রঙের স্মার্ট পোশাক পরা ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন খুব বড় অফিসার, খুব সম্ভব তিনি ছিলেন কর্নেল র্যাঙ্কের কোন বড় অফিসার , তাকে ঘিরে আছে আরো পাচ-সাতজন লম্বা লম্বা ভারতীয় সামরিক অফিসার। তারা সেদিন সেখানে এসেছিলেন পরিকল্পিতভাবে বোমাটা ফাটানোর প্রস্তুতি মিটিংয়ে অংশ নিতে। এইসব বাঘা বাঘা মানুষদের সামনে হাতেনাতে ধরা খেয়ে চরম বোকা এক বিধ্বস্ত কিশোরের মতো আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম বিপদজনক সেই সীমানার মধ্যে তখনো আমার হাতের মুঠিতে চেপে ধরে আছি জ্বলজ্বলে কমলা রঙের সেই চারমিনার সিগারেটের প্যাকেট। সেই থেকে চারমিনার সিগারেটের প্যাকেটের ডিজাইন ও রঙ আমার মনে গেঁথে গিয়েছে।
ফিল্টার সিগারেট সুলভ হওয়ার আগের যুগে কলকাতাকেন্দ্রিক শিল্পী-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা চারমিনার সিগারেটের খুব ভক্ত ছিলেন। এ দেশে চারমিনারের সমকক্ষ ছিল স্টার সিগারেট। পরবর্তী জীবনে জানতে পারি, চারমিনার আসলে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের হায়দ্রাবাদের চারটি বিশাল আইকনিক মিনারের একটি মনুমেন্টের নাম (বর্তমানে অন্ধ্র প্রদেশ ভাগ করে তেলেঙ্গানা আর অন্ধ্র এই দুটি প্রদেশ করা হয়েছে, হায়দ্রাবাদ এখন তেলেঙ্গানার রাজধানী) । আজ থেকে প্রায় সোয়া চারশ বছর আগে সুলতান মোহাম্মদ কুলি কুতুব শাহ এটা নির্মাণ করেন। এর ওপর মসজিদ ছিল, মদ্রাসাও ছিল বলে শুনেছি। দুই সপ্তাহ আগে হায়দ্রাবাদ এসে চারমিনার চত্বরে গিয়ে এই বয়সে এসে সেই কিশোর বয়সে মস্তিষ্কে গেঁথে যাওয়া চারমিনার চর্মচক্ষু দিয়ে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।
কথিত আছে পারস্য থেকে স্থপতি এনে চারমিনার ডিজাইন করা হয়েছিল। এর আর্চের ডিজাইনে পারস্য স্টাইল সুস্পষ্ট, তবে সম্পূর্ণ ডিজাইন লক্ষ করলে বোঝা যায়, এতে স্থানীয় প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যেরও সুন্দর পরিমিত মিশ্রণ হয়েছে। খুব সম্ভবত সে কারণেই ডিজাইনটি পণ্ডিত থেকে সাধারণ মানুষ সবার কাছে আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর হয়েছে। ব্রিটিশরা আমাদের ইতিহাসকে যেমন সাম্প্রদায়িকীকরণ করে নাম দিয়েছে হিন্দু পিরিয়ড, মুসলিম পিরিয়ড আর ব্রিটিশ পিরিয়ড (নিজেদের পিরিয়ডকে কিন্তু তারা খ্রিস্টান পিরিয়ড বলেনি), তেমনি আমাদের স্থাপত্যের ইতিহাসকে হিন্দু আর্কিটেকচার, মুসলিম আর্কিটেকচার আর কলোনিয়াল বা ব্রিটিশ আর্কিটেকচার নাম দিয়েছে। সেই হিসেবে এটাকে বলা হয়ে থাকে Indo-Islamic architectural style, আসলে এটার নাম হওয়া উচিত Indo-Persian style-এর একটা ফিউশন।
গ্রানাইট, মার্বেল, লাইমস্টোন দিয়ে তৈরি প্রায় একশ ষাট ফুট উঁচু চারটি মিনারের এই অপরূপ স্থাপত্য সত্যিই খুব সুন্দর। তবে আমার কাছে তার চেয়েও সুন্দর মনে হয়েছে এই চারমিনারকে ঘিরে মানুষের যে বিশাল আনাগোনা, বিশাল কর্মযজ্ঞ, বিশাল ইন্টার-অ্যাকশন তৈরি হয়েছে সেটা। চারমিনারের চারটি আর্চ থেকে সমকোণে বেরিয়ে গেছে চারটি রাস্তা। লাড বাজার এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত । সে হিসেবে চারমিনারকে আদি হায়দ্রাবাদের কেন্দ্র বলা যায়। চারমিনার চত্বর একটা অভাবনীয় সুন্দর আরবান পাবলিক স্পেস। আমাদের চকবাজারকে ৩০ দিয়ে গুণ করলে এই স্পেসটা ভাবা যাবে। কী নেই এই চত্বরে, শাড়ি, চুড়ি, ওড়না, লেহেঙ্গা, শেরওয়ানি, মুজিবকোট (ওরা বলে সাদ্রি), আতরের দোকান, খেলনার দোকান, তাবিজ-মাদুলি, বেলুন, আখের রস, বেদানার রস, ফালুদা, লাচ্ছি, নানা রকমের ঝলসানো কাবার, বাহারি রুমালি রুটি, আলু পরোটা, গোবি পরোটা, পাওভাজি আর হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি তো আছেই। শত শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় এরা এ ব্যবসা বা পেশায় নিয়োজিত আছে এই চারমিনারকে ঘিরে। এলাকাটা প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা।
এমন জীবন্ত ইন্টার-অ্যাকটিভ প্রাণবন্ত আরবান স্পেস পৃথিবীর প্রায় সব বড়ো শহরেই আছে। লন্ডন শহরে যেমন আছে ট্রাফালগার স্কয়ার, সারা লন্ডনের সর্বশ্রেণির, সর্বপেশার মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী সেখানে কারণে-অকারণে, উৎসবে-আনন্দে, বিক্ষোভ-বিদ্রোহে, বিজয় ও পরাজয়ে একত্র হয়ে তাদের নাগরিক জীবনের অস্তিত্বের একাত্মতা প্রকাশ করতে পারে, মনের মিল ও অমিল প্রকাশ করে সংযোগ স্থাপন করতে পারে প্রাণবন্ত সমাজ ও নগরের মূল স্নায়ুকেন্দ্রের সঙ্গে। একইভাবে রোম শহরে আছে এমন বহুসংখ্যক আরবান স্পেস বা প্লাজা , এদের মধ্যে অন্যতম হলো Piazza Navona, Piazza Campo De’Fori, Piazza del Popolo । প্যারিসে এমন প্লাজা আছে অনেক। এগুলোর মধ্যে বিখ্যাত হলো ফরাসি বিপ্লবের স্মৃতিবিজড়িত Place de la Concorde । মাদ্রিদ শহরের এমন অনিন্দ্যসুন্দর বিখ্যাত প্লাজার নাম ‘প্লাজা মেয়র’। নিউ ইয়র্কের আলোকোজ্জ্বল প্রাণবন্ত টাইম স্কয়ারের কথা তো সবার জানা। কঠোর কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত চীনেও প্রতিটি শহরেই এমন অনেক পাবলিক প্লাজা বা আরবান স্পেস আছে। এগুলোর মধ্যে বেইজিংয়ের নানজিং লু আর গুয়াংজুর বেইজিং লু পৃথিবী বিখ্যাত। কায়রোর তহরির স্কয়ার তো আরব বসন্তের জন্য এখন সারা বিশ্বের মানুষের কাছে অতি পরিচিত নাম, যেখানে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ একত্রে সমবেত হতে পারে। আমাদের উপমহাদেশেরও পুরনো শহরগুলোতে এমন অনেক প্রাণবন্ত নাগরিক প্লাজা আছে, যা শত শত বছর ধরে সেই নগরের মানুষের প্রাণবন্ত কর্মযজ্ঞ আর উচ্ছ্বাস ধারণ করে সেই নগরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে নাগরিকদের সতত প্রাণশক্তির উৎস হয়ে টিকে আছে।
এসব পাবলিক প্লাজার মধ্যে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের তৈরি দিল্লির চাঁদনী চৌক অন্যতম, যা চারশ বছর ধরে পুরনো দিল্লির মানুষের প্রাণচাঞ্চল্য, সীমাহীন কর্মযজ্ঞ ও জনমানুষের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের প্রধান মিলনক্ষেত্র। আরবান পাবলিক স্পেসের এ গুরুত্ব অনুধাবন করেই দিল্লির আম আদমি পার্টির বর্তমান সরকার নতুন করে পুরো চাঁদনী চৌক এলাকাটি গত বছর একটি বৃহৎ রেস্টোরেশন প্রকল্পের আওতায় নতুন করে সাজিয়েছে। চাঁদনী চৌকরে মতোই আহমাদাবাদের মানেক চৌক, লাহোরের আনারকলি বাজার আজও একই রকম কর্মযজ্ঞে মত্ত এক একটি অতি প্রাণবন্ত পাবলিক স্পেস, যা ওই সব নগরের মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে অতীত ও অনাগত ভবিষ্যতের কোটি কোটি মানুষের আবেগ, উচ্ছ্বস আর প্রাণে প্রাণ মেলানোর মিলনকেন্দ্র হিসেবে। অন্যদিকে আমরা কী করছি? আমরা নিজেদের আধুনিক স্থপতি বলি, নানা রকম বাস্তব-অবাস্তব উন্নয়নের গল্পের আমরা কারিগর; কিন্তু আমরা কি নগরের ধনী-গরিব সকল শ্রেণির জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত ও সুগম্য এমন ইন্টার-অ্যাকটিভ তেমন বড় মাপের কোনো আরবান পাবলিক স্পেস তৈরি করেছি? যাও তৈরি করা হয়েছিল তাও আমরা দেয়াল বা লোহার বেড়া দিয়ে আটকে দিয়েছি। ছাত্রজীবনে আমরা বিকেলবেলা নিয়মিত সংসদ ভবন চত্বরের সিঁড়িতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতাম। তখন আমাদের জাতীয় মনস্তত্ত্বে নিরাপত্তা নিয়ে এতো বিচিলিত ভাব ছিল না।
আজ আমরা নিরাপত্তা নিয়ে বড়ো বেশি বিচলিত। তাই সংসদ ভবনের বিশাল চত্বর যা ঢাকার সব শ্রেণির জনসাধারণের জন্য একটা প্রাণবন্ত নাগরিক মিলনকেন্দ্র ছিল, তা আজ নাগরিকদের জন্য কঠিনভাবে ‘আউট অফ বাউন্ড’। মানিক মিয়া এভিনিউ আমরা বিশাল মিডিয়ান দিয়ে ছোট করে ফেলেছি। এককালে বায়তুল মোকাররম চত্বরে মানুষ এমনিই জমায়েত হতো, রাজনৈতিকভাবেও জমায়েত হতো, সেটাও আমরা কৌশলে ইসলামিক জাফরি ডিজাইনের বিশাল দেয়াল দিয়ে ঘিরে এর সুগম্যতা নষ্ট করে ফেলেছি। চারদিকে অসংখ্য নির্মাণের ধাক্কায় এককালের পল্টন ময়দান এখন তো এক ফালি জমিন মাত্র, তার সেই প্রাণচাঞ্চল্য অনেক আগেই ছিনতাই হয়ে গেছে।
আসলে এ ধরনের ইন্টার-অ্যাকটিভ স্পেস হচ্ছে এক একটি জীবন্ত নগরের প্রাণ। এই আরবান স্পেসগুলোকে কেন্দ্র করেই নগরের মানুষ প্রকৃত প্রাণবন্ত নাগরিক হয়ে ওঠে।এগুলোর অবর্তমানে নগরগুলো হয়ে ওঠে কংক্রিটের পরিকল্পিত পরিপাটি মর্গ, যেখানে নাগরিকরা অনেকটা মৃত মানুষের মতো । ঢাকা শহরে যদিও বেশ কিছু পার্ক আছে, তবে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, পার্ক বা জলাধার ঘিরে গড়ে তোলা নিসর্গ স্থাপত্য আর কর্মযজ্ঞের ভরপুর আরো প্রাণচাঞ্চল্যে জীবন্ত আরবান পাবলিক স্পেস এক জিনিস নয়। আমার মতে, সে অর্থে ঢাকা শহরের একটি মাত্র ছোট ও আংশিক প্রাণবন্ত স্পেস আছে, যেটা শুধু এক মাসে জন্য কার্যকর থাকে আর সেটি হচ্ছে বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলা, যেখানে অর্ধেকের বেশি মানুষ বই কিনতে নয়, বরং সেখানে যায় মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের আকাঙ্ক্ষায়।
সে জানে, সময় পেলেই একাধিকবার সেখানে যাওয়া যাবে, কারো না কারো সঙ্গে তার দেখা হয়েই যাবে। দেখা যদি নাও হয়, তবু সেখানে আছে নানা রকম খাবারের আয়োজন আর নানা রকম অ্যাকটিভিটি। তাই সেখানে গিয়ে আবার নতুন করে নিজেকে একাত্ম করা যায় এই নগরের আত্মার সঙ্গে । আরবান স্পেসের সে একই নাগরিক তৃষ্ণা মেটাতে নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের মানুষেরা দলে দলে ভিড় জমায় বাণিজ্য মেলায়, যেখানে তারা দ্বিগুণ দাম দিয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনেও মহা আনন্দ উপভোগ করে। কেননা সেখানে গিয়ে তারা তা দের নিজেদের আত্মার সঙ্গে নগরের আত্মার সংযোগ ঘটাতে পারে। আসলে আমাদের দেশের অধিপতি শ্রেণি সাধারণ মানুষকে ভয় পায়। সাধারণ মানুষের কোথাও একত্রে মিলিত হওয়ার সম্ভাবনাকে তারা তাদের জন্য ত্রাসের চোখে দেখে।
মধ্যযুগের অনির্বাচিত নৃপতিরা যে জনসম্পৃক্ত স্থাপত্য গড়তে পেরেছে, তথাকথিত গণতান্ত্রিক আর আধুনিক অধিপতিরা তা করতে ভয় পায়। তাই এ দেশে গত পঁচাত্তর বছরেও তেমন কোনো বড় মাপের ইন্টার-অ্যাকটিভ আরবান স্পেস গড়ে ওঠেনি বা উঠতে দেওয়া হয়নি আর আমরা স্থপতিরাও বুঝে বা না বুঝে বা বাধ্য হয়ে এই জনবিমুখ প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত হয়ে আছি যুগের পর যুগ। এটা একটা বড়ো মাপের প্যারাডক্স। যদিও আমাদের ঢাকা শহরসহ অনান্য শহরে এখন বড়ো মাপের আরবান প্লাজা বা স্পেস তৈরি করা নাও যায়, তবু সরকার, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মিলিত সদিচ্ছা থাকলে আমাদের নগরসমূহের বিভিন্ন পয়েন্টে জমি অধিগ্রহণ করে ছোট ছোট আরবান স্পেস গড়ে তোলা সম্ভব। এ ধরনের ছোট ছোট এলাকাভিত্তিক অনেক সুন্দর সুন্দর আরবান স্পেস আছে রোম, ফ্লোরেন্স, মিলান, লিসবন, ব্রাসেলসসহ ইউরোপের প্রায় সব পুরনো শহরেই । এশিয়ার সিউল , ওসাকা, গুয়াংজু, বেইজিং বা অন্যদিকে কায়রো, বৈরুত, দামেস্কসহ পুরোনো সব আরব শহরেও।
এমন এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট আরবান স্পেস শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই শহরগুলোর নাগরিকদের আত্মার মিলনকেন্দ্র হিসেবে প্রাণবন্তভাবে টিকে আছে।
যা দিয়ে শুরু করেছিলাম আবার চারমিনারেই ফিরে আসি। চারমিনারের পাশেই বিশাল উন্মুক্ত চত্বর সামনে রেখে প্রায় সোয়া তিনশ বছর আগে তৈরি করা হয়েছে মক্কা মসজিদ। এটাও চারমিনারের পুরো মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত। মোহাম্মদ কুলি কুতুব শাহ এই মসজিদের কাজ শুরু করলেও তিনি তা শেষ করে যেতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব হায়দ্রাবাদ বিজয়ের পর এই মসজিদের কাজ শেষ করেন। ততোদিনে প্রায় আশি বছর পার হয়ে গিয়েছে । বলা হয়ে থাকে, মসজিদের বেসিক স্ট্রাকচারের জন্য যেসব ইট ব্যবহার করা হয়েছে তার সব মাটি আনা হয়েছে মক্কা থেকে। এতো মাটি মক্কা থেকে কয়েশ বছর আগে কীভাবে আনলো, আর মক্কায় মাটিই বা কোথায়? যাই হোক, এই মক্কার মাটির ইটের মিথের ওপর ভিত্তি করেই এই মসজিদের নাম হয়েছে ‘মক্কা মসজিদ’। মসজিদের একপাশে হায়দ্রাবাদের বিখ্যাত নিজামদের কিছু কবর আছে। মসজিদের সামনে উঁচু দুর্গের ফটকের মতো বিশাল পুরু কাঠের গেট। গেটে বসে আছে অস্ত্রধারী অনেক পুলিশ, কেননা ২০০৭ সালে এই মসজিদে সন্ত্রাসী বোমা হামলায় তেরোজন মানুষ নিহত হয়েছিল। গেট পেরোলেই বিরাট চৌকোনা জলাধার আর মাঝে ফোয়ারা। হাজার হাজার কবুতর এই জলাধার থেকে পানি খাচ্ছে। জলাধার ঘিরে খুব সুন্দর একটা পাবলিক স্পেস। এই পাবলিক স্পেসে যে শুধু মুসল্লিরা জমায়েত হচ্ছে তা না, বরং এটাকে একটা সেক্যুলার আরবান স্পেস বলা যায়। নানা বয়সের নারী-পুরুষ আর শিশুরা এখানে ঘোরাঘুরি করছে।
মসজিদের উত্তর-পূর্ব দিকে চারমিনার, সেখানকার বিশাল চত্বর থেকে ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে চলেছে আর মসজিদ প্রাঙ্গণে জমায়েত হওয়া শত শত নারী-পুরুষ গ্রানাইটের বেঞ্চের মতো স্থাপনায় বসে বসে সন্ধ্যাটা উপভোগ করছে। সফেদ দাড়িওয়ালা এক সৌম্যকান্তি বৃদ্ধ মুসল্লিকে দেখলাম গ্রানাইটের বেঞ্চের ওপর শুয়ে শুয়ে একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমিও তাঁর দেখাদেখি আশকারা পেয়ে গ্রানাইটের বিশাল প্রশস্ত বেঞ্চের ওপর শুয়ে পড়লাম। ঠাণ্ড বাতাস এসে আমার ভ্রমণ-ক্লান্ত শরীরের ওপর এক অদ্ভুত আয়েশ ছড়িয়ে দিচ্ছে। চারদিকে আকাশে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আমার দৃষ্টিসীমায় অসংখ্য ধূসর কবুতর উড়ে উড়ে মসজিদের মিনার প্রদক্ষিণ করছে। মসজিদের ফোয়ারার নিরন্তর টুপটাপ শব্দ আর চারপাশে সমবেত শিশুদের আনন্দ কোলাহল মিলেমিশে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত শান্তিময় মধুর সুরধ্বনি। মনে হচ্ছে, আমি আস্তে আস্তে একটা পরম শান্তিময় সুরিয়ালিস্টিক স্পিরিচুয়াল জগতে নিমজ্জিত হচ্ছি। আরেকটু হলে আমি হয়তো আমার পাসের বেঞ্চের মুরব্বির মতো নিটোল শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তাম; কিন্তু ততোক্ষণে মুয়াজ্জিন মাগরিবের আজান দিতে শুরু করেছেন। আজান শুনে আমি উঠে বসলাম আর একটা মনস্তাত্ত্বিক দোদুল্যমানতার মধ্যে পড়ে গেলাম। পুরো কোভিডকালে আমি জামাতে নামাজ পড়া এড়িয়ে চলেছি, এখন এই ভিনদেশে এসে মসজিদ চত্বরের ভেতর বসে কী করে নামাজ না পড়ে বের হই। সেই কবে সোয়া তিনশ বছর আগে কুলি কুতুব শাহ নামের এক সুলতান, যাঁর নামই আমি ঠিকমতো শুনিনিই কোনো দিন, যিনি খুব যত্ন করে এই মসজিদটি বানিয়েছিলেন আমি কী করে তাঁর মসজিদে নামাজ না পড়ে যাই! আমার মনে হচ্ছিল তাঁর এতো যত্নে গড়া মসজিদে এক ওয়াক্ত নামাজ না পড়ে চলে গেলে ওনার অসম্মান হবে। ভেবে দেখলাম, যা হয় হবে আমি নামাজের জন্য মূল মসজিদ ভবনের দিকে আস্তে আস্তে অগ্রসর হলাম। মসজিদটি যদিও দশ হাজার নামাজি ধারণক্ষম, তবে নামাজ পড়তে গিয়ে দেখলাম নামাজির সংখ্যা খুবই কম। বড়জোর তিন কাতার। তার মানে মসজিদ চত্বরে জমায়েত হওয়া বেশির ভাগ নারী-পুরুষ এটাকে আরবান স্পেস হিসেবে ব্যবহার করছেন।
এক নামাজি খুব চোস্ত হায়দ্রাবাদি আদাবের সঙ্গে আমাকে সামনের কাতারে ঠেলে দিলেন। নামাজ পড়ার পর বসে বসে আমি ভাবছিলাম সেই কত শত বছর আগে এক সুলতান আর নাম না জানা এক স্থপতি এই মসজিদটি বানিয়েছিলেন, হাজার হাজার মিস্ত্রি আর শ্রমিক এর নির্মাণকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন আর আজ বাংলাদেশ থেকে আসা আমার মতো একজন অচেনা অখ্যাত মানুষ মসজিদের
মেঝেতে আমার কপাল ঠেকিয়ে সেই সোয়া তিনশ বছর আগের সবার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করলাম। এভাবেই মানুষ মরে গেলেও সে সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায় না। মানুষ তার কর্ম আর কীর্তির মাধ্যমে শত শত বছর পরের প্রজন্মের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। এ সম্পর্কের কী নাম দেবো আমি জানি না। শুধু এতোটুকু বুঝতে পারি, ভালো স্থাপত্য বা ভালো শিল্প শত শত বছর পরেও অজস্র মানুষের সঙ্গে অজস্র মানুষের সম্পর্ক স্থাপন করিয়ে দিয়ে নতুন করে প্রাণবন্ত করে রাখতে পারে আমাদের জীবন এবং চিন্তা ও স্বপ্নের জগৎ। কবে আমার নগরে এমন একটি আরবান স্পেস আমি পাবো, যেখানে বসে বসে এমনভাবেই আমি আমাকে প্রতিনিয়ত আবার নতুন করে আবিষ্কর করতে পারবো আর সংযুক্ত থাকতে পারবো আমার নগরের আত্মার সঙ্গে।
মার্চ ২০২২





