বার্সেলোনার শহীদ মিনার, মধুর ক্যান্টিন আর বিশ্বব্যাপী ‘লিটল বাংলাদেশ’

ইতিহাসকে টেনে আনলে কাতালান জাতির প্রধান কেন্দ্রভূমি আর স্পেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বার্সেলোনার ইতিহাসকে অনায়াসে দুই হাজার বছর টেনে নেওয়া যায়। ভূমধ্যসাগর তীরের এই বন্দরনগরকে বলা যায় ইতিহাসের মেল্টিং পট। ভূমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করে ইতালি, গ্রিস, উত্তর আফ্রিকা, মিসর, তুরস্কের বসফরাস হয়ে সমগ্র কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী এলাকা এবং অন্যদিকে সিরিয়া, লেবানন, জর্দান, ফিলিস্তিন হয়ে মধ্যপ্রাচ্য আর আরব উপদ্বীপের সঙ্গে সমগ্র স্পেন উপদ্বীপ আর মধ্য ইউরোপের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সমুদ্র সংযোগ ভূমি এই বার্সেলোনা। ১৯৯২ সালের অলিম্পিকের স্বাগতিক শহর এবং আমার প্রিয় শিল্পী জোয়ান মিরো আর বিখ্যাত স্থপতি ও পরবর্তী সময়ে সেন্ট উপাধিপ্রাপ্ত আন্তোনি গৌডির শহর এই বার্সেলোনা, তবে আজ বার্সেলোনা শহরের বর্ণনা দেওয়ার জন্য আমি এ লেখা লিখিনি। সে জন্য বার্সেলোনা নিয়ে শত শত বই আছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব আর্কিটেক্টস (UIA)-এর কনফারেন্সে ইউরোপে এসে মাদ্রিদ থেকে লিসবন হয়ে গিয়েছিলাম বার্সেলোনা। বার্সেলোনার সবচেয়ে পর্যটক অধ্যুষিত এলাকা রামলা দে রাভাল। এই রাস্তা সারা রাত জেগে থাকে, এর খুব কাছেই ছোট একটা প্লাজা, ‘প্লাজা পেদ্রো’কে নিয়ে, যাকে বার্সেলোনার প্রায় পনেরো হাজার বাঙালি প্লাজা পেদ্রো নামে ডাকে না, ডাকে ‘একুশে চত্বর’ বলে। কেননা অনেক অনেক চেষ্টার পর ২০১৮ সালে প্লাজা পেদ্রোতে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে একটি খুব ছোট্ট শহীদ মিনার স্থাপন করেছে এখানকার বাঙালিরা। যদিও শহীদ মিনারটি খুবই ছোট, তবে শহীদ মিনারের পেছনে অভিবাসী বাঙালিদের সম্মিলিত আবেগ কিন্তু মোটেই ছোট নয়; সেটা অনেক বড়। একুশে ফেব্রুয়ারিতে এখানকার বাঙালিরা শহীদ মিনারকে ঘিরে বড় অনুষ্ঠান আয়োজন করে, কাতালানিয়ার গভর্নর, অনেক দেশের কনস্যুলার এবং আমাদের রাষ্ট্রদূতও জমায়েত হন শহীদ মিনারে।

এখানেই আলাপ হয়েছিল বার্সেলোনার মেয়র অফিসকে অনেক প্রকার ডকুমেন্টস সরবরাহ করে অবশেষে অনুমতিপত্র সংগ্রহ করে শহীদ মিনার স্থাপনকারী দলের অন্যতম একজন টঙ্গীর মোহাম্মদ কামরুলের সঙ্গে। বহু বছর ধরে তিনি বার্সেলোনায়, তাঁর আবেগ দেখে আমি অভিভূত হলাম। তিনি আমাকে বললেন, আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে কয়েক বছরের মধ্যে এই প্লাজায় ঢাকার শহীদ মিনারের হুবহু ডিজাইনের শহীদ মিনার তাঁরা এখানে বানাবেনই। আমি জানি না, তাঁরা সেটা পারবেন কি না। তবে আমি আশ্চর্য হই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সত্তর বছর পরও বাংলাদেশ থেকে না হলেও আট হাজার কিলোমিটার দূরের এক ইউরোপীয় শহরের শত শত বছর পুরোনো এক প্লাজায় শহীদ মিনার স্থাপনের প্রতিজ্ঞা নিয়ে মাত্র চল্লিশোর্ধ্ব বয়সের মোহাম্মদ কামরুলের বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার আবেগের উচ্ছ্বাস দেখে। শহীদ মিনার স্থাপনের সমগ্র পরিকল্পনার পেছনে আছেন বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাঙালি নেতা, ‘অ্যাসোসিয়েশন কালচারাল ই হুমানিতারিয়া দে বাংলাদেশ এন্ কাতালানিয়া’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছেন তাঁরা এবং আরো বড়ো পরিসরে শহীদ মিনার নির্মাণের সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।

স্পেনে পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার বৈধ-অবৈধ বাংলাদেশি আছেন। স্পেনসহ সারা ইউরোপে তাঁদের স্থায়ী হওয়ার ইতিহাস অনেকেরই খুব মধুর নয়। নানা বৈধ-অবৈধ পথে, নানা পাহাড়-পর্বত-সমুদ্র পাড়ি দিয়ে জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে তাঁদের অনেকেই এ দেশে এসেছেন। সেই দুর্গম ও দুঃসহ যাত্রায় অনেকেই সফল হননি, অনেকেই অসহনীয় কষ্ট সহ্য করে ভূমধ্যসাগরের নীল জলে ডুবে বা প্রচণ্ড শীতে জনমানবহীন পথেই মৃত্যুবরণ করেছেন, শুভ্র তুষারে ঢেকে গেছে তাঁদের নিষ্পাপ মৃতদেহ, তাঁদের অনেকেরই লাশ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোন দেশে বা কোন অচেনা মাটিতে তাঁদের সমাধি হয়েছে, তাও কেউ জানে না। হয়তো কোনো প্রত্যন্ত মাটিতে তাঁদের গণসমাধি হয়েছে, যেখানে তাঁদের জন্য কোনো এপিটাফ লেখা হবে না কোনো দিন । তাঁদের অনেকেরই মা হয়তো কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গেছেন, আবার অনেকের অবুঝ মা হয়তো এখনো তাঁর আদরের পুত্রের অপেক্ষায় দিন গুনছেন, প্রত্যহ তাঁর জায়নামাজ হয়তো ভিজে যাচ্ছে তাঁর চোখের জলে। এ দেশ, এ জাতি তাঁদের বলতে গেলে কিছুই দেয়নি, তবু দেশের প্রতি তাঁদের টান, দেশের প্রতি তাঁদের ভালোবাসার বিন্দুমাত্র কমতি নেই। আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবি, এ দেশের শিক্ষিত আর সুবিধাভোগী অংশ দেশের সব সুযোগ-সুবিধা শুষে নিয়ে মানি লন্ডারিং করে এ দেশ থেকে টাকা পাচার করছে আর যাঁদের এ দেশ কিছুই দেয়নি তাঁরা উল্টো দেশে টাকা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন এবং ভিনদেশে শহীদ মিনার বানানোর জন্য সংগ্রাম করছেন আর অভাবনীয় সব স্বপ্ন দেখছেন। তাঁদের এই সুগভীর দেশপ্রেম, তাঁদের এই পবিত্র আবেগকে কীভাবে সম্মান জানাবো, আমি ভেবে পাই না।

যতোই বিদেশ ঘুরি বড়জোর একবেলা ভিনদেশি খাবার খাওয়া যায়, তারপর পেটে যখন ক্ষুধা লাগে তখন শরীর দেশি খাবার খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে ওঠে। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের লাভা পিএস হলো বাংলাদেশি অধ্যুষিত বিশাল এলাকা, যেখানে রয়েছে অসংখ্য বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট আর আছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনও। শিশু ও কিশোরদের বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে স্কুল, আছে মাদ্রাসা আর মসজিদও। এখানে ‘দেশ রেস্তোরাঁ’ নামের বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে আমি যে অপূর্ব সুন্দর কাচকি মাছের ভুনা খেয়েছি আমার জীবনে আমি এতো সুন্দর কাচকি মাছের রান্না আর কোথাও খাইনি।

বার্সেলোনায় এসেই দেশি খাবারের খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের হোটেল থেকে দশ মিনিটের হাঁটাপথ, বিখ্যাত ট্যুরিস্ট কেন্দ্র লা রাম্বলার কাছেই এই রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টের মালিক মাদারীপুরের শিক্ষিত যুবক শফিক খান। অমায়িক তাঁর ব্যাবহার। শুধু সুস্বাদু খাবারের জোগান দেওয়া নয়, বিদেশবিভুঁইয়ে যেকোনো আপদবিপদে তিনি এগিয়ে আসেন এ দেশে বেড়াতে আসা সব বাঙালির জন্য।

 

তার রেস্টুরেন্টের খাবার খুব সুস্বাদু, আর সুন্দর খাবার খাওয়ার পর গল্প করতে করতে গ্লাস ভর্তি গরম গরম দুধ চা। তবে সবচেয়ে সুন্দর হলো তাঁর রেস্টুরেন্টের না। রেস্টুরেন্টটির নাম রেখেছেন তিনি ‘মধুর ক্যান্টিন’। জিজ্ঞেস করায় বললেন, ছাত্রজীবনে বেশির ভাগ সময়ই তাঁর কাটতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আড্ডা দিয়ে। সেই মধুময় স্মৃতি তিনি ভুলতে পারেননি কোনো দিন। তাই সুদূর বার্সেলোনায় এসে তাঁর নিজের রেস্টুরেন্টের নাম দিয়েছেন তিনি মধুর ক্যান্টিন। সেই কবে বিক্রমপুরের শ্রীপুরের আদিত্য চন্দ্রের ছেলে মধুসূদন দে (মধু)-এর নামে প্রতিষ্ঠিত মধুর ক্যান্টিন, যাকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে মধুদার অস্তিত্ব পৃথিবী থেকে মুছে দিতে চেয়েছিল; কিন্তু তারা তা পারেনি, বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন আজ শুধু ক্যান্টিন হিসেবেই টিকে নেই, বরং এ দেশের সকল ছাত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে টিকে আছে। ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসে জহির রায়হান বলেছিলেন,

‘আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো’

মজার কথা হলো, জহির রায়হানের কথা সত্য হয়েছে, মধুর ক্যান্টিন এখন দ্বিগুণ হয়েছে। কেননা আজ মধুদার সেই একই নামের আরো একটি ‘মধুর ক্যান্টিন’ সগর্বে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুদূর ইউরোপের বিশাল ভাইব্রেন্ট শহর বার্সেলোনায়, যেখানে বহু পাকিস্তানিও সুস্বাদু খাবার খেতে ভিড় জমায়। সত্যিই আশ্চর্য ঘটনা, প্রকৃতির নীরব প্রতিশোধ কেউ ঠেকাতে পারে না। বোদলেয়ার সঠিক বিলেছিলেন,

‘Truth is stranger than fiction.’

মহাকালের আবর্তে সত্য একসময় বিস্ময়করভাবে রূপকথাকেও হার মানিয়ে দেয়। যদি কেউ বার্সেলোনা যান আর আমার মতো দেশি খাবারের ক্ষুধার গ্রাম্যতা আপনার মধ্যে থাকে, তাহলে অবশ্যই মধুর ক্যান্টিনে যাবেন, আমি নিশ্চিত আপনি খুব তৃপ্ত হবেন, শফিক খান সেখানে আপনার জন্য অপেক্ষায় আছেন।

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও দেখেছি RUA DO BENFORMOSO আর মাত্রিমনি এলাকা হলো মোটামুটি আরেক ‘লিটল বাংলাদেশ’, এখানে পুরোনো লিসবনের কালো কোবাল্ট পাথরের সুন্দর সরু গলিগুলোতে বহু বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট, দোকান আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অনেক রাত পর্যন্ত অগণিত বাংলাদেশিদের পদচারণে গমগম করে এই এলাকা। বিশেষ করে বাঙালি রেস্টুরেন্ট CHARCOAL GRILL-এর রান্না অতুলনীয়। কেননা এখানেই আমি প্রতিদিন খেয়েছি, তবে আরো অসংখ্য বাঙালি রেস্টুরেন্ট আছে। তাদের অনেকেরই রান্না নিশ্চয়ই ভালো, তবে আমি দেখেছি CHARCOAL GRILL-এর অপূর্ব সুন্দর রান্নার টানে বাংলাদেশি ছাড়াও পাকিস্তানি, ভারতীয়, আফগানিসহ অনেক দেশের মানুষ এখানে খেতে আসে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে পাবেন শিমুল মিয়া ও তাঁর দোকান, যেখানে সব বাংলাদেশি খাবার ও জিনিসপত্র পাবেন আর বাঙালিদের যেকোনো সমস্যায় সবার আগে তিনি এগিয়ে আসবেন। প্যারিসের গার দ নর্থ আর এথেন্সের ওমানিয়া স্কয়ারও এমনিভাবে আস্তে আস্তে প্রাণবন্ত ‘লিটল বাংলাদেশ’ হয়ে উঠছে। সুইডেনের স্টকহোমে এখন পর্যন্ত এমন বাংলা টাউন নেই, তবে এখানে প্রায় পঞ্চান্নটি ইন্ডিয়ান নামের রেস্টুরেন্ট আছে, যার মধ্যে প্রায় পঞ্চাশটির মালিকই বাংলাদেশি। শুধু ব্যাবসায়িক সুবিধার স্বার্থে তাঁরা নিজেদের ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট হিসেবে পরিচয় দেন, তবে প্রতিটিতেই বাংলাদেশি খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা আছে।

আজ থেকে প্রায় ছাব্বিস-সাতাশ বছর আগে যখন প্রথম ইউরোপে গিয়েছিলাম, তখন একমাত্র লন্ডন আর ব্রিটেনের কিছু শহর বাদে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে গিয়ে একা একা নিজেকে খুব অসহায় মনে হতো। কিন্তু এখন আর তেমন মনে হয় না। কেননা আজ আমি জানি ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার প্রায় সব প্রধান শহরেই আছে ‘লিটল বাংলাদশ’ বা বাংলা টাউন। সবচেয়ে বড়ো কথা, এই লিটল বাংলাদেশগুলো হলো বিদেশবিভুঁইয়ে ভিনদেশি খাবার খেতে খেতে ক্লান্ত ভ্রমণরত বাঙালিদের জন্য দেশি খাবারের মূল্যবান স্পট, অনেকটা রুক্ষ মরুভূমির বুকে ছায়া সুনিবিড় সুখময় মরূদ্যান খুঁজে পাওয়ার মতো । বিদেশে বাংলাদেশিরা এখন অনেক বুক ফুলিয়ে চলতে পারে। কেননা আপদবিপদে ‘লিটল বাংলাদেশ’-এর বাংলাদেশিদের কাছ থেকে কোনো না কোনো সাহায্য নিশ্চিত মিলবেই। তাই এখন বুকে থাকে অনেক সাহস, অনেক ভরসা।

ব্রিটেনে মোট বাংলাদেশির সংখ্যা পাঁচ লাখের ওপরে। এর মধ্যে ইস্ট লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানিতে কর্মরত অনেক বাঙালি নাবিক শতাধিক বছর আগে থেকেই টাওয়ার হ্যামলেটে বসবাস শুরু করে। সমগ্র যুক্তরাজ্যের প্রায় অর্ধেক বাংলাদেশির বাস লন্ডনে । এর পরের স্থান ওয়েস্ট মিডল্যান্ড, বার্মিংহামের অন্তর্ভুক্ত, এ অঞ্চলে বাংলাদেশিদের প্রায় ১২ শতাংশের বসবাস। নর্থ ওয়েস্টের ম্যানচেস্টার ও ওল্ডহ্যামে মোট ১০ শতাংশ বাংলাদেশির বসবাস। মিডলসবারের সাউথব্যাংক বাংলা টাউন নামে পরিচিত। ম্যানচেস্টারের লংসাইট ও নর্থইস্টের সাউথব্যাংককেও মিনি বাংলা টাউন বলা হয়। মোট কথা, লন্ডনসহ ব্রিটেনের অনেক এলাকা আছে, যেখানে গেলে মনে হয় যেন বাংলাদেশেই আছি, এমনকি হোয়াইট চ্যাপেল ও এর ব্রিকলেনসহ অনেক এলাকার সরকারি রোড সাইন , হাসপাতাল ও অন্য সাইনবোর্ডগুলোতেও ইংরেজির নিচেই বাংলায় লেখা দেখতে পাওয়া যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিউ ইয়র্কে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশির বাস আর সেখানকার জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা বা এস্টোরিয়ার কিছু এলাকা হয়ে গেছে ‘লিটল বাংলাদেশ’। হিলসাইড এভিনিউ আর Homelawn street-এর ইন্টারসেকশনকে নগর কর্তৃপক্ষ অফিশিয়ালি ‘Little Bangladesh Avenue’ ঘোষণা করেছে, সেখানে বাংলাদেশের হেন জিনিস নেই যা পাওয়া যায় না, কোনো কোনো দোকানে আমি পাটশাক, ঢেঁকিশাক, কচুর লতি, এমনকি থানকুনি পাতা পর্যন্ত বেচতে দেখেছি। মোটামুটি সুপারশপ, সেলুন, ডাক্তারের চেম্বার, ডেন্টিস্টের ক্লিনিক, আইনজীবীর চেম্বার, ফার্মেসি, ট্রাভেল এজেন্ট, রেস্টুরেন্ট, বিভিন্ন পেশাজীবীদের অফিস, মনোহারি দোকান, কম্পিউটার, ইন্টারনেট সার্ভিস, পুরোনো গাড়ি বিক্রি, সারাইয়ের গ্যারেজ, স্কুল ছাত্রছাত্রীদের কোচিং সেন্টার, নাচ-গান শেখার স্কুল, কমিউনিটি সেন্টর, মসজিদ, এমনকি ঘটকের অফিসসহ সব কিছুই আছে সেখানে।

জ্যামাইকায় অন্তত দু-তিনটে রাস্তার পরপরই আমি একটা বাংলাদেশি মসজিদ দেখেছি। ব্রঙ্কসের স্টারলিং এভিনিউয়ের বাংলা টাউন সুপারমার্কেট এলাকা বা ব্রুকলিনের আবদুল্লাহ সুপারমার্কেট এলাকাতেও বাংলাদেশিদের বড়ো ধরনের সমাগম হয়, আস্তে আস্তে এসব এলাকাও বাংলাদেশি এলাকা হয়ে উঠছে। এ ছাড়া নিউ ইয়র্ক ও কানাডা বর্ডারে বাফোলো সিটি এখন সর্বোচ্চ বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা হয়ে গেছে। অন্যদিকে অ্যাঞ্জেলেস সিটি কর্তৃপক্ষ অফিশিয়ালি নিউ হ্যাম্পশায়ার ও থার্ড স্ট্রিটে এমন বাংলাদেশি অধ্যুষিত কর্মচঞ্চল এলাকায় ‘LITTLE BANGLADESH ‘ নামে ফলক লাগিয়ে দিয়েছে আর ডালাসের সুগারল্যান্ডও ধীরে ধীরে বাংলাদেশিদের এলাকা হয়ে উঠছে । কানাডায়ও বারো-চৌদ্দ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করে। বৃহত্তর টরন্টোর স্কারবরো শহরের ভিক্টোরিয়া পার্ক এভিনিউ ও ড্যানফোর্থ এভিনিউয়ের সংযোগস্থল এবং সন্নিহিত এলাকাটি কানাডায় বসবাসরত বাঙালিদের কাছে বাংলা টাউন বা বাংলাপাড়া নামে পরিচিত । এখানে সব ধরনের কেনাকাটাসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক- সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাপ্তাহিক আড্ডা ইত্যাদিতে বৃহত্তর টরন্টো এলাকার বাংলাদেশিরা জমায়েত হন। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্য এ অঞ্চলের ঠিক লাগোয়া ডেন্টোনিয়া পার্কে সিটি ও স্থানীয় বাংলাদেশিদের উদ্যোগে ঢাকার মূল শহীদ মিনারের আদলে ছোট আকারের একখানি শহীদ মিনারও নির্মিত হয়েছে । প্রতি ফেব্রুয়ারিতে হিম ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি এই শহীদ মিনারে উপস্থিত হন।

অন্যদিকে লিটল ইন্ডিয়ার কাছেই সিঙ্গাপুরের সেরাঙ্গুন প্লাজায় অবস্থিত অত্যন্ত প্রাণবন্ত বাংলা টাউন বা লিটল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের হেন জিনিস নেই, যা এখানে বিক্রি হয় না। তেমনি ব্যাংককের পাওরাত, নানাসহ সুকুমভিত সয় ১১ এলাকাটায় আছে নানা বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট, ট্রাভেল এজেন্সি, মানি এক্সচেঞ্জ, মোবাইল সিমের দোকান বা ২৪ ঘণ্টর মধ্যে স্যুট বানিয়ে দেওয়ার টেইলর শপ ইত্যাদি। মালয়েশিয়ার সঙ্গে সমুদ্রপথে আমাদের বাণিজ্যের ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে সেই পঞ্চদশ শতক থেকেই। তবে অনুমান করা যায়, তার আগেও বাংলার সঙ্গে মালয়দের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। পেনাং শহরের ‘বাঙালি মসজিদ’ প্রতিষ্ঠা করা হয় আজ থেকে প্রায় দুইশ বিশ বছর আগে। প্রায় পাঁচ শতক ধরেই কিছু বাঙালি নাবিক ও বণিক স্থায়ীভাবে মালয়েশিয়ায় বসবাস শুরু করেন, তবে ১৯৮৬ সাল থেকে শ্রমিক হিসেবে বাংলাদেশিরা সে দেশে যাওয়া শুরু করে। এখন বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা দশ থেকে বারো লাখ। কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাং, বারজায়া টাইম স্কয়ার ও জালান আলোর এলাকার বেশ কিছু অংশ বাংলা টাউনে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশেষ করে বুকিত বিনতাংয়ের বিশাল রসনা বিলাস রেস্তোরাঁ প্রবাসী বাঙালিদের প্রধান মিলনকেন্দ্র। এ ছাড়া শিল্প শহর শাহ আলমের সিতিয়া শপিংমল এলাকা ও সীমান্ত শহর জোহর বারুর মসজিদ আল আটটাসের বেশ কিছু এলাকা বাংলা টাউনে পরিণত হয়েছে। জোহর বারুর আম্মা রেস্টুরেন্ট প্রবাসীদের প্রধান মিলনকেন্দ্র।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের লাকেম্বা এলাকা এরই মধ্যে বাংলা টাউনে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় তিন থেকে চার লাখ বাংলাদেশি বসবাস করে। জোহানেসবার্গের খণ্ড খণ্ড অনেক এলাকা এরই মধ্যে বাংলা এলাকা হিসেবে পরিচিত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বাঙালিদের একটা বিশেষত্ব হলো, এ দেশের প্রায় অধিকাংশ প্রবাসীই নিজেরা ব্যাবসা করে এবং অনেক দক্ষিণ আফ্রিকান তাদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও এমন অনেক বড় বড় বাংলা টাউন গড়ে উঠেছে। শুধু সৌদি আরবেই বিশ-পঁচিশ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছে ,সে দেশে মক্কার নাক্কাস আর মিসফালা এলাকা, জেদ্দার বালাদ এলাকা, রিয়াদের বাথা আর হাই উল উজারাত এলাকা এবং দাম্মামের সিকো এলাকা বা মদিনার বলদিয়া এলাকাগুলো খুব প্রাণবন্ত বাংলা টাউন হিসেবে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে ইউনাইটেড আরব আমিরাতে দশ লক্ষাধিক বাংলাদেশি বসবাস করে, যা ওই দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। এ কারণেই স্বাভাবিকভাবে দুবাইয়ের দেইরা দুবাই এলাকা ও শারজাহর রোল্লাহ এলাকার দ্বাওয়ার মুল্লা সড়ক ঘিরে গড়ে উঠেছে অত্যন্ত জনসমাগমপূর্ণ বাংলা বাজার বা বাংলা টাউন এলাকা।

সত্যি করে বলতে গেলে বালাদেশিদের আর আটকে রাখা যাবে না। ১৯৪৭ সালে তিন দিকে আটকানো পদ্মা, মেঘনা আর যমুনা বিধৌত একটা অতি ক্ষুদ্র জলকাদায় অর্ধনিমজ্জিত বদ্বীপের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষকে ঠেলেঠুলে জোর করে ভরে দেওয়া হয়েছিল। তখনকার পূর্ব পাকিস্তান ও পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সে কারণেই হয়েছে এ গ্রহের সবচেয়ে ঘন বসতিপূর্ণ জনপদ। পূর্ব বাংলার কৃষকের শ্রম নিষিক্ত সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়ে গড়ে উঠেছিল কলকাতা শহর, যা আমরা হারিয়েছি সে সময়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ বঙ্গবন্ধুর মতো নেতারাও কেউই বিশ্বাস করতে পারেননি যে কলকাতা আমাদের হারাতে হবে । বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে সে কথা আক্ষেপ করেই তিনি লিখেছেন,
‘শহীদ সাহেবের (সোহরাওয়ার্দী) পক্ষ থেকে বাংলা সরকারের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী ঘোষণা করেছিলেন, কলকাতা আমাদের রাজধানী থাকবে। দিল্লি বসে অনেক পূর্বেই যে কলকাতাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে একথা আমরা জানতামও না, আর বুঝতামও না।’

তখনকার প্রিন্সলি স্টেট ত্রিপুরার রাজপরিবার চেয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে। কিন্তু তখনকার মুসলিম লীগ নেতাদের অবহেলা ও অদূরদর্শিতার কারণে সেটা বাস্তব রূপ পায়নি। সে কারণে ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও দুই বছরেরও বেশি সময় পর ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে ত্রিপুরা ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়। একইভাবে ত্রিপুরা, আসাম আর আরাকানও আমরা হারিয়েছি।বর্তমানে আবার উল্টো আরাকান থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে জোর করে ধরে আমাদের এই ছোট্ট ভূখণ্ডের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে; আবার অন্যদিকে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকেও নতুনভাবে অনেককে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে ।

তবে এতো অন্যায়-অবিচারের পরও পূর্ববঙ্গের কৃষকের সন্তান সেই বাঙালিদের ‘কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি’, আজ তারা ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর সমস্ত আনাচকানাচে । মানুষকে জোর করে চেপে ভরে দিলেই হবে না, প্রকৃতি তার আপন নিয়মেই অগ্রসর হবে আর মনে রাখতে হবে, মানবজাতির ইতিহাস প্রধানত মাইগ্রেশনেরই ইতিহাস। ইতিহাস তার অমোঘ আপন গতিতেই চলবে আর সে কারণেই প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি আজ প্রবাসী হয়েছে। ইউরোপসহ পৃথিবীর বহু গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী দেশের জনসংখ্যাও এর চেয়ে অনেক কম। এই বিপুল প্রবাসী বাংলাদেশি এবং এর পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষায়, প্রযুক্তিজ্ঞানে ও অর্থবিত্তে দিনে দিনে আরো সম্মৃদ্ধ হবে এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের জন্য এক বিশাল ও বহুমুখী অপার সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে এদের মধ্যে। এ গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে জাতীয় নীতিনির্ধারক মহলে ও জাতীয় রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে গভীরভাবে আমলে নিতে হবে । ১৯৭৮-এর পরবর্তী সময়ে দেং জিয়াও পিংয়ের খোলা নীতির পর চীন যখন বিপুল গতিতে গ্লোবাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হলো তখন সেই অর্থনৈতিক উল্লম্ফনে একটা প্রধান ভূমিকা রেখেছিল ইউরোপ-আমেরিকার প্রবাসী চীনারা এবং আজও তারা চীনের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের যে এক কোটি প্রবাসী নাগরিক আছে তারা ও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম একদিন ওদের মতো আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিশ্চয়ই বিশাল ভূমিকা রাখবে। আমাদের শুধু দরকার সঠিক পরিকল্পনা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক অবিচারের সকল বাধা অতিক্রম করে আমরা আস্তে আস্তে সিই সুদিনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।

১২ আগস্ট, ২০২২

পূর্বে প্রকাশিত লিঙ্ক

আরও পড়ুন