ইউরোপের তস্য গলি

ইউরোপের তস্য গলি

মনে পড়ে সেই সব গলি-ঘুঁজি শুরু আছে, শেষ নেই
গুলি সুতোর মতন শুধু খুলে যায়, সেখানে পাঁচফোড়নের
গন্ধ, ঢাকা বারান্দা
থেকে কেউ ছুড়ে দেয় কাঁঠালের ভূঁতি, বাঁশের খাঁচায়
পোষা ময়না
কৃষ্ণ কথা কয় অতি কর্কশপুরে, একতলা থেকে
তিনতলায় কেউ কারুকে
তার চেয়েও উঁচু গলায় ডাকে, এক রক থেকে আরেক
রকে লাফিয়ে যায়
হুলো, জানলার পর্দা সরিয়ে চেয়ে থাকা এক বন্দিনী
রাজকন্যার কাজল
টানা চোখ, সেই চোখে দূর প্রতিবিম্বিত অশ্রু।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় উত্তর কলকাতার যেসব তস্য গলির বর্ণনা এখানে দিয়েছেন তার চেয়ে আমার দেখা স্পেনের বার্সেলোনা, মাদ্রিদ, টলেডো বা বাদাজোস; পর্তুগালের লিসবন, ইতালির রোম, ফ্লোরেন্স, মিলান; বেলজিয়ামের ল্যুভেন, এন্টওয়ার্প বা চেক রিপাবলিকের প্রাগসহ পুরোনো ইউরোপীয় শহরের কালো কোবাল্ট পাথর বা গ্রানাইট ব্লকে মোড়া গলিগুলো বোধ হয় আরো সরু ও আরো অনেক সর্পিল। তবে কলকাতা, পুরোনো দিল্লি বা আমাদের পুরান ঢাকার গলিগুলোর চেয়ে ইউরোপের এই গলিগুলো আরো অনেক বেশি পরিপাটি, পরিচ্ছন্ন আর অনেক উত্তম ট্রাফিক কাঠামো ও উত্তম নাগরিক আচরণ সংস্কৃতি দ্বারা লালিত বা নিয়ন্ত্রিত । আমাদের নাগরিকদের মধ্যে গ্রাম্যতা অনেক বেশি। দু-তিন পুরুষ নগরে বসবাসের পরও আমাদের গ্রাম্যতা এখনো যায়নি। তিন পুরুষ আগের গ্রামের সে অভ্যাসই আমরা আমাদের আচরণে এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি। সে কারণে আমরা অবলীলায় ‘বারান্দা থেকে কেউ ছুড়ে দিই কাঁঠালের ভূঁতি’ বা এখানে-সেখানে ফেলে রাখি কলার খোসা। আমরা ভুলে যাই, গ্রামে যেমন খাল-বিলে বা বাড়ির পাশের ঝোপঝাড়ে এসব ফেলা দোষের নয়, বরং সেটা ডিকম্পোজড হয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে; কিন্তু নগরে সেটা ফেলা অনেক দোষের, নগরের বাস্তব কাঠামোগত কারণেই সেটা দোষের। কিন্তু গ্রামের সেই গ্রাম্য অভ্যাস আমরা নগরেও নির্বিচারে চালিয়ে যাচ্ছি আর এ কারণেই আমাদের নাগরিক আচার-আচরণের মধ্যে গ্রাম্য উপাদান এখনো অনেক প্রকটভাবে দৃশ্যমান ।

ইউরোপের এমন প্রতিটি গলিতেই নির্দিষ্ট দূরত্বে পাশাপাশি বসানো আছে সবুজ, নীল আর ধূসর রঙের তিনটি ডাস্টবিন। সবুজ ডাস্টবিনে ফেলা হচ্ছে খাদ্য বর্জ্য, উদ্ভিদজাত বর্জ্য ও অন্যান্য জৈব পদার্থের বর্জ্য। নীল ডাস্টবিনে ফেলা হচ্ছে রিসাইকেলেবল বর্জ্য, যেমন বোতল, ক্যান, প্লাস্টিক, কাগজ ও কার্ডবোর্ডের মতো বর্জ্য আর ধূসর ডাস্টবিন হচ্ছে জৈবও নয় আবার রিসাইকেলেবল নয় এমন বর্জ্যের জন্য। সবাই এটা মেনে চলছে, আর অন্যদিকে একদম ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় মিউনিসিপ্যালিটির গাড়ি এসে সব বর্জ্য সরিয়ে নিচ্ছে, আমাদের মতো তারা গলির মোড়ে বাড়ির সব আবর্জনা নির্বিঘ্নে ঢেলে দিচ্ছে না আর সে কারণেই আমাদের শহরের গলিগুলোর মতো ইউরোপের গলিগুলো অপরিচ্ছন্ন নয়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় উত্তর কলকাতার গলিগুলোর চিৎকার, চেঁচামেচি বা জীবনের উচ্চ কোলাহলময় চরিত্রের যে বর্ণনা উপস্থিত করেছেন, সে তুলনায় ইউরোপের গলিগুলোর চরিত্র অনেক বেশি পরিমিত, পরিমার্জিত ও প্রায় কোলাহলশূন্য। তাদের গলিগুলোর চরিত্র যেমন অনেকটা অন্তর্মুখী, অন্যদিকে আমাদের গলিগুলোর চরিত্র অনেকটা বহির্মুখী। তার পরও দেখা যায়, ইউরোপীয় বাসিন্দারাই গলিগুলোতে বেশি কোয়ালিটি সময় কাটায়, সে গলির এক পাশে ওপেন ক্যাফেতে লাঞ্চ, ডিনারসহ সময়ে-অসময়ে দিনভর কফি পানের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা দেওয়ার মধ্য দিয়ে হোক বা অন্যভাবেই হোক। অন্যদিকে আমাদের অঞ্চলের গলিগুলোয় কোনো কোনো বাড়ির রকে চলে মোটামুটি গুচ্ছ গুচ্ছ অকর্মা তরুণ আর বুড়োদের বিচ্ছিন্ন আড্ডাবাজি। কিন্তু ইউরোপের মতো আমাদের গলিগুলোতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে কোয়ালিটি সময় কাটানো বা ইন্টারেকশনের তেমন কোনো সুযোগ নেই। ইউরোপীয় গলিতে আড্ডাবাজি বা ক্যাফেতে সময় কাটানোতে বুড়ো-বুড়ি বা তরুণ-তরুণীদের মধ্যে পুরুষ আর নারী প্রায় সমান সমান। তবে আমাদের এ অঞ্চলের পুরোনো এলাকার গলিগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় নেই বললেই চলে। নারীরা যে আড্ডা দিতে পছন্দ করে না তা নয়, বরং বেশিই পছন্দ করে। তবে আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় গলিতে বসে বা বাড়ির কাছের প্লাজায় বসে সেটা করা প্রায় অসম্ভব।

আগেই বলেছি, ইউরোপের সরু গলিগুলো অনেক বেশি পরিপাটি, পরিচ্ছন্ন আর অনেক উত্তম ট্রাফিক নিয়ম ও সংস্কৃতি দ্বারা লালিত বা নিয়ন্ত্রিত। আর সে কারণেই এই সরু গলিগুলো প্রধানত হেঁটে চলার পথ হলেও এর ভেতরে সুনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচলেরও ব্যবস্থা আছে। প্রয়োজনে অনায়াসে সেখানে অ্যাম্বুলেন্স আর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি বা গার্বেজ ট্রাক চলাচল করতে পারছে আর খুব কম হলেও স্বল্পমাত্রায় পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও আছে সেখানে। লিসবনের মতো শহরে মাত্র দশ ফুট চওড়া গলির ভেতর দিয়েও ট্রাম চলছে, গাড়িও চলছে আর হাজার হাজার মানুষ সুশৃঙ্খলভাবে হেঁটেও বেড়াচ্ছে। এ জিনিসটা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমরা চিন্তাও করতে পারি না। ধরুন, আমরা কী চিন্তা করতে পারি আমাদের ভূতের গলি বা ঠাটারী বাজারের ভেতর দিয়ে এয়ারকন্ডিশন্ড সিটি বাস সার্ভিস নির্বিঘ্নে চলাচল করছে? আসলে আমাদের সমস্যাটা যতো বেশি না ফিজিক্যাল, তার চেয়ে অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা।

গায়ে গায়ে লাগানো তিন-চারতলা দালানবেষ্টিত এসব প্রাণবন্ত গলির শুধু ওপরটা খোলা। লম্বা সাপের মতো ওপরে শুধু চিকন আকাশ দেখা যায়, সে কারণে গলিগুলো অপেক্ষাকৃত ছায়াবেষ্টিত। হলুদাভ নানা শেড বা ব্রিক রেড বা কমলা রঙের এসব দালানের প্রায় প্রতিটিতেই আছে কম প্রশস্ত রট আয়রনের একাধিক ঝুলবারান্দা। প্রতিটি ঝুলবারান্দার পেছনে দুই পাল্লার কাচের ফ্রেঞ্চ উউন্ডো। ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর চরিত্র অনুযায়ীই সব খুলছে বাইরের বারান্দার দিকে আর বারান্দার রট আয়রনের গ্রিল থেকে ঝুলে আছে নানা রঙের ফুলের ছোট ছোট টব। সব মিলিয়ে মনে হয়, যেন গলির দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে রঙবেরঙের টানা ফুলে ফুলে ভরা ভার্টিক্যাল গার্ডেন। এই ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই এ-বাড়ি বুড়ো ও-বাড়ির বুড়োর সঙ্গে গল্প করছে, কথা বলছে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া পাশের বাড়ির তরুণ বা তরুণীর সঙ্গে। কখনো কখনো কিছুটা হাঁকডাক বা চিৎকার-চেঁচামেচি হচ্ছে, তবে সব কিছুর মধ্যে কেমন যেন অদ্ভুত একটা শালীনতা ও পরিমিতিবোধ কাজ করছে।

পরিপাকতন্ত্রের মতো প্রায় অন্তহীন এসব ঘোরানো-পেঁচানো সরু গলি, যাকে ইংরেজি সাহিত্যের অনেক লেখক বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন—’Endless labyrinth of alleyways.’ সবচেয়ে মজার জিনিসটা হলো, এসব সরু গলি চলতে চলতে মানুষের মন যখন কিছুটা ক্লান্ত, কিছুটা অবরুদ্ধ বোধ করতে শুরু করে তখনই হঠাৎ করেই জাদুর মতো গলির শেষ প্রান্তে উন্মোচিত হয় একটা ছোট বা মাঝারি আকারের প্লাজা বা স্কয়ার। প্লাজার মাঝখানে হয়তো একটা ভাস্কর্য অথবা একটা ফোয়ারা। এই ভাস্কর্য বা ফোয়ারার বেদি ঘিরে সুন্দর বসার আয়োজন। প্লাজার দিকে মুখ করে চারদিকে তিন-চারতলা বাড়ি, বেশির ভাগ বাড়ির নিচেই হয়তো নানা ধরনের বর্ণিল জিনিসপত্রে ভরা দোকান আর ছোট ছোট রেস্তোরাঁ বা কফি শপ অথবা বহু যুগের পারিবারিক পরম্পরা সমৃদ্ধ কোনো কারুশিল্পের দোকান বা বেকারি শপ, যেখানে প্রতিদিনের রুটি কেনার অসিলায় ক্লান্ত গৃহস্থের জন্য খানিকক্ষণ আড্ডা মারার ফুরসত মেলে। রেস্তোরাঁয় যাঁরা খেতে আসছেন তাঁদের বেশির ভাগই সামনের উন্মুক্ত প্লাজায় বসে বসে খাচ্ছেন। অনেক বয়স্ক দম্পতি তাঁদের পরিবারের সবাইকে নিয়ে হয়তো বিরাট থালায় Spenish Paella (সি-ফুড, চাল ও অন্যান্য জিনিসসহকারে তৈরি, অনেকটা খিচুড়ির মতো) খাচ্ছেন অথবা স্বামী-স্ত্রী শুধু দুজন এখানে লাঞ্চ বা ডিনার সারছেন Rabo de Toro (ষাঁড়ের লেজ দিয়ে তৈরি খাবার) দিয়ে। এক টুকরো ব্রাউনি বা Gazpacho (স্প্যানিশ টমেটো সুপ)-র সঙ্গে গার্লিক ব্রেড দিয়ে নাশতা সারছেন কেউ কেউ, সঙ্গে থাকছে কাপের পর কাপ কালো কফি। খাচ্ছেন হয়তো সামান্য; কিন্তু আড্ডা মারছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। রেস্তোরাঁর মালিক তাতে যে খুব বিরক্ত তা কিন্তু নয়। কেননা সেও এ পাড়ারই মানুষ, কয়েকশ বছর ধরে পাড়ার অন্যদের মতো পারিবারিকভাবে তাঁরা এখানেই বেড়ে উঠেছেন। মোটামুটি সবাই সবাইকে চেনে, তাই রেস্তোরাঁর মালিকও দেখা যায় ব্যবসার কথা ভুলে গিয়ে এক পর্যায়ে তাদের সঙ্গে আড্ডায় মজে আছেন। সমগ্র প্লাজাটায় কালো কোবাল্ট স্টোন বা ফ্লেমড গ্রানাইটের স্ল্যাব বসানো। চারদিকে বসার আয়োজন। কিছু কিছু জায়গা হয়তো পাথরে আবৃত নয়, সেখানে ঘাস আর গাছ লাগানো। সরু গলিতে এতোক্ষণ হয়তো ঠিকমতো আকাশ দেখা যায়নি এখানে, হঠাৎ করে আকাশ উন্মুক্ত, আলো অবারিত, গ্রীষ্মের সুন্দর রোদ এসে পড়ছে প্লাজায় জমায়েত হওয়া মানুষের শরীরে। ইউরোপের মানুষের কাছে রোদ খুব মূল্যবান জিনিস, শরীরে রোদ লাগানোর জন্য সারা বছর তারা উন্মুখ হয়ে থাকে। স্কয়ারের এক কোনায় হয়তো পাড়ার বয়স্করা আড্ডা দিচ্ছেন বা দৈনন্দিন কজকর্ম নিয়ে প্রয়োজনীয় শলাপরামর্শ করছেন অথবা নিছক অপ্রয়োজনীয় আড্ডাবাজিতে মশগুল হয়ে তাঁদের শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করছেন। তরুণ-তরুণীরা সলজ্জ চোখাচুখি করছে, হয়তো তাদের মধ্যে নতুন কোনো সম্পর্কের ভিত রচিত হচ্ছে এখানে বসেই । অন্যদিকে চিৎকার, চেঁচামেচি, গান আর দৌড়াদৌড়িতে শিশুরা মাতিয়ে রাখছে সমগ্র স্কয়ার। মায়েরা দল বেঁধে গল্পগুজব করছেন আর হঠাৎ হঠাৎ গোপন অস্পষ্ট কোনো আলাপের কারণেই হয়তো সবাই সশব্দে হেসে লুটিয়ে পড়ছেন আর থেকে থেকে মায়েরা শিশুদের কপট ধমক দিচ্ছেন আর শিশুরা সে ধমক আরো মিষ্টি হাসিতে উড়িয়ে দিচ্ছে। এক কোণে কোনো বাবরিওয়ালা জেদি এক তরুণ হয়তো গিটার বা অ্যাকর্ডিয়ান হাতে তার নিজের লেখা গান ধরেছে, সামনে তার উল্টো করে রাখা হ্যাট, সবাই সেই হ্যাটে যে যা পারছে ইউরো রাখছে খুব সম্মানের সঙ্গে, অনেকে আবার হাঁটু গেড়ে বসে ইউরো রাখছে, মনে হচ্ছে যেন দেবতার জন্য নৈবেদ্য সমর্পণ করছে। কেউই দূর থেকে ভিখিরিকে দেওয়ার মতো অভদ্রভাবে ইউরো ছুড়ে দিচ্ছে না। দেখতে দেখতে তরুণকে ঘিরে সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে আর অনেকে তার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে। এভাবে সমগ্র দিনের কর্মক্লান্তিকে পেছনে ফেলে এ প্লাজায় এসে পাড়ার মানুষ সমবেতভাবে আবার নতুন করে পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে।

এই প্লাজাগুলোই হচ্ছে ইউরোপীয় নগরবাসীদের প্রাণ। প্লাজা ছাড়া সারা ইউরোপে কোনো শহর, নগর বা গ্রাম কল্পনা করা যায় না। বছরের পর বছর ধরে পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারীদের সকল প্রাণবন্ত কর্মযজ্ঞ আর উচ্ছ্বাস ধারণ করে এই এলাকার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে প্রাণশক্তির উৎস হয়ে টিকে আছে এ প্লাজাগুলো। এলাকার মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এ প্লাজাগুলো। অতীত ও অনাগত ভবিষ্যতের অগণিত মানুষের আবেগ, উচ্ছ্বাস আর প্রাণে প্রাণ মেলানোর মিলনকেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে এগুলো। এলাকার মানুষ জানে সময় পেলেই দিনে একাধিকবার সেখানে যাওয়া যাবে, কারো না কারো সঙ্গে তার দেখা হয়েই যাবে। দেখা যদি নাও হয়, তবু সেখানে আছে নানা রকম খাবারের আয়োজন আর নানা রকম অ্যাক্টিভিটি। তাই সেখানে গিয়ে আবার নতুন করে নিজেকে একাত্ম করা যাবে পাড়ার সঙ্গে।

একটি প্রাণবন্ত আলোকিত প্লাজায় এসে ইউরোপীয় সরু গলিগুলোর উন্মুক্ত হওয়ার যে গল্প আমি বারবার বলতে চেষ্টা করছি, আমার এ কথা প্রায় দেড় শতাব্দী আগেই আরো অনেক সুন্দর ও সার্থকভাবে শুধু একটি পেইন্টিংয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট ওলন্দাজ শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগ বা ভ্যান গখ। ছবিটির নাম Cafe Terrace at Night. ভ্যান গগের বিখ্যাত Starry Night series পেইন্টিংয়ের মধ্যে এটাই প্রথম কাজ। এই বিশ্ববিখ্যাত ছবিটি তিনি এঁকেছিলেন ১৮৮৮ সালে দক্ষিণ ফ্রান্সের উপকূলীয় শহর আর্লসের শহরতলির এমনই একটি প্লাজা বা স্কয়ার Place du Forum square-এ অবস্থিত জোসেফ মাইকেল নামের এক লোকের পরিচালিত সত্যিকার একটি ক্যাফে, Café de la Gare-কে নিয়ে। ক্যাফেটি সারা রাত চালু থাকতো আর ভ্যান গগ প্রায় প্রতিদিনই এই ক্যাফেতে আসতেন আর কখনো কখনো সারা রাত এখানে কাটিয়ে দিতেন৷ ছবিটি ভালো করে লক্ষ করলেই দেখা যাবে ইউরোপীয় ছোট ছোট প্লাজার প্রাণবন্ত চরিত্র পুরোপুরি ফুটে উঠেছে এখানে। আমি যেসব গলির কথা বলছি, তেমন একাধিক সরু গলি উন্মুক্ত হয়েছে এই ক্যাফের প্লাজায়। পাড়ার প্লাজা বা স্কয়ারের ট্যাভার্ন বা ক্যাফের বাইরের প্লাজার পাশে মানুষ ছোট ছোট টেবিল ঘিরে বসে পানাহার করছে, গল্পগুজব করছে। রাতের তারাঘেরা আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ডে অতিরিক্ত হলুদাভ কমলা আলোয় জ্বলজ্বল করছে ক্যাফের বাইরের দেয়াল। শিল্পসমালোচকরা বলেন, এই অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার প্রায় সব সময়ই তীব্র আবেগে বিহ্ববল হয়ে থাকা ভ্যান গগের সে সময়ের পরিপূর্ণ উৎফুল্ল মনেরই বহিঃপ্রকাশের প্রতিচ্ছবি। এই ক্যাফেটি এখনো প্রায় অমনই আছে আর আজও সারা পৃথিবী থেকে মানুষ দেখতে যায় এই ক্যাফে। পরবর্তী সময়ে ভ্যন গগের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ক্যাফের নাম রাখা হয় ‘ক্যাফে ভ্যান গগ’, যদিও তার অনেক আগেই চরম দারিদ্র্য আর মানসিক যন্ত্রণায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ভ্যান গগ মৃত্যুবরণ করেন। বেশির ভাগ জীবনীকারেরই ধারণা, তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।

যাক, ভ্যান গগ থেকে আবার আমাদের বিষয়ে ফিরে আসা যাক। যা বলছিলাম, আমাদের দেশের সরু গলিগুলো কোনো প্রাণবন্ত আলোকিত প্লাজায় এসে অমন করে উন্মুক্ত হয় না। আমাদের অন্তহীন অপরিচ্ছন্ন প্রায় অন্ধকার গলিগুলো ‘গুলি সুতোর মতন’ মানুষের ক্লান্তি বয়ে বয়ে শুধু চলছেই চলছে। তাই আমাদের গলিগুলো ইউরোপের পরিচ্ছন্ন প্রাণবন্ত গলিগুলোর মতো মানুষের সঙ্গে মানুষের আর মানুষের সঙ্গে তার শহরের আত্মাকে সংযুক্ত করতে পারে না। মানুষের উচ্ছ্বাস, মানুষের আবেগ আর মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রাণের মিলনের চিরায়ত আকাঙ্ক্ষাকে আমাদের শহরগুলো ধারণ করে একে সম্মিলিতভাবে বিকশিত করতে পারে না। আমাদের কাছে জমির মূল্য অনেক বেশি, সে কারণেই ‘নিছক’ প্লাজার জন্য আমরা জমি ছেড়ে দিতে শিখিনি। আমরা অন্ধকার গর্তের মধ্যে বাস করবো, আমাদের শহরে কোনো উন্মুক্ত প্লাজা থাকবে না। কেননা আমাদের কাছে উন্নত নগরজীবনের চেয়ে এক কাঠা জমির মূল্য অনেক অনেক বেশি। এখানেই ইউরোপের তস্য গলির সঙ্গে আমাদের সরু গলির পার্থক্য।

ইউরোপে বারোক স্থাপত্যশৈলীর কারুকার্য খচিত বিশাল বিশাল রাজপ্রাসাদ দেখেছি, রঙিন স্টেইন্ড গ্লাস শোভিত ঊর্ধ্বমুখী গথিক গির্জা দেখেছি, সুউচ্চ সুরক্ষিত দুর্ভেদ্য পাহাড়ি দুর্গ দেখেছি, ফোয়ারা শোভিত প্রশস্ত রাজকীয় এভিনিউ দেখেছি, আধুনিক স্থাপত্যে ডিজাইন করা বিশাল অলিম্পিক স্টেডিয়াম দেখেছি; কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে ইউরোপের সরু সরু পরিপাটি গলির অদ্ভুত জীবন্ত সৌন্দর্য আর গলির মুখে হঠাৎ উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া প্লাজায় মানুষের সঙ্গে মানুষের নিত্যদিনের প্রাণবন্ত মিথস্ক্রিয়ার মধুর স্মৃতিময় অভিজ্ঞতা আমাকে আকর্ষণ করে সবচেয়ে বেশি, যেসব প্লাজায় বসে বসে আমিও জগতের এই মহা আনন্দযজ্ঞে শামিল হয়ে কাপের পর কাপ কফি পান করে যেতে চাই অনির্দিষ্টকাল ধরে।

মাহফুজুল হক জগলুল
১৬ জুলাই, ২০২২

• এখানে দেয়া বেশিরভাগ ছবিই এবছরের মে থেকে জুন মাসে মধ্যে ইউরোপ ভ্রমণের সময় তোলা।

আরও পড়ুন