ইস্তানবুলের সুফি নৃত্য

 

২০১২ সালের কথা, গিয়েছি ইস্তানবুল, আমার ডিজাইন করা একটা বড় মসজিদ প্রজেক্টের ক্যালিগ্রাফির কাজে। বিশ্ব বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার ডঃ মোজাফফর এসিভিটের সাথে সেখানে মিটিং আর তার ক্যালিগ্রাফির কাজ দেখা। সংগে আছে পরিব্রাজক বন্ধু প্রকৌশলী শামিম। ১১০’x৩’ সাইজের পবিত্র কোরানের আয়াতের বিশাল ক্যালিগ্রাফ রিয়েল স্কেলে তিনি নিজে হাতে স্ক্রল করা কাগজে আঁকবেন বা লিখবেন, পরে দেশে এসে তা ওয়াটার জেটের সাহায্যে মার্বেল কেটে ইনলে করে মসজিদের বাইরের উত্তর আর দক্ষিন দেয়ালে বসানো হবে। মসজিদের ভিতরের পশ্চিম দেয়ালের জন্য থাকবে আরো কিছু জটিল ক্যালিগ্রাফ। শুধু কাগজে এঁকে দেবার জন্য তাকে দিতে হবে ৫০ হাজার ডলার। ডঃ মজাফফর আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত কালিগ্রাফির বিখ্যাত শিক্ষক ও গুরু, এ ছাড়াও তিনি “Symmetricity in Quran” এই নামে বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থের লেখক। ওনার বাসা ইস্তানবুল শহরের পূর্ব অংশে, অর্থাৎ এশিয়া অংশে। ইস্তাম্বুল একটি বিচিত্র শহর যার পূর্ব অংশ এশিয়া মহাদেশে আর পশ্চিম অংশ ইউরোপের অন্তর্ভুক্ত। ওনার সাথে মিটিং করতে ওনার সেই বাসায় গেলাম পাঁচ কেজি চাঁপাইনবাবগঞ্জের টসটসে হিমসাগর আম নিয়ে। খুব খুশি হয়ে আমগুলো তিনি নেড়েচেড়ে দেখলেন তবে মিটিংয়ের সময় আমাদের খেতে দিলেন লাল টকটকে তুর্কী তরমুজ আর টার্কিশ কফি। আমাদের আনা আম উনি আমাদের পরিবেশ করলেন না। বাংলাদেশের দুস্পাপ্য এই সুমিষ্ট আমগুলোর পুরোটাই নিশ্চয়ই উনি ওনার পরিবার নিয়ে উপভোগ করতে চেয়েছিলেন।

ইস্তানম্বুলে থাকা খাওয়ার সুবন্দোবস্ত করেছেন ক্লায়েন্ট। সাথে সারাদিনের জন্য গাড়ি আর এক বেয়াদপ ড্রাইভার।  সবচেয়ে উপকারী আর আনন্দময় ছিল সার্বক্ষণিক গাইড হিসেবে ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত বাংলাদেশী ছাত্র ওয়ালিদের উপস্থিতি। প্রফেশনাল কাজের ফাঁকে ফাঁকে ইস্তানবুল আর ইজনিকের দর্শনীয় সব জায়গায়ই নিয়ে গেলো ওয়ালিদ, প্রত্যন্ত অনেক তুর্কী গ্রামে ঘুরলাম। আঙুর গাছের পুরু লতায় ঘেরা গ্রামের অনেক ছোট ছোট মসজিদে ঘুরে ঘুরে তুর্কী মুসল্লিদের সাথে নামাজ পড়লাম।

মসজিদের এসব নামাজি থেকে ড্রাইভার অথবা সম্মানিত অধ্যাপক—যার সঙ্গেই কথাবার্তা হোক না কেন, কথায় কথায় তারা এক পর্যায়ে তুলে আনবে নানা তুর্কি কীর্তি বা অটোমান সাম্রাজ্যের বিবিধ ইতিহাস ও উপাখ্যানের দীর্ঘ গল্প। এসব গল্পের বেশিরভাগই আমাদের জানা; তবে দু’টি তথ্য আমার কাছে বেশ নতুন ও চমকপ্রদ মনে হলো। সেগুলো হচ্ছে কফি ও টিউলিপ ফুলের গল্প।

ওদের কাছ থেকে যা জানলাম তা হলো, কফির উৎপত্তি পূর্ব আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় হলেও সারা পৃথিবীকে কফির সঙ্গে নাকি পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ইস্তাম্বুল। গল্পটা এমন; ইথিওপিয়ার কাফা অঞ্চলের এক রাখাল লক্ষ্য করেছিল যে তার ছাগলগুলো এক ধরনের লাল ফল খাওয়ার পর অস্বাভাবিক চঞ্চল হয়ে ওঠে। সেখান থেকেই কফি ফলের গুণাগুণের কথা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এই ফল ও তার ব্যবহার লোহিত সাগর পেরিয়ে পৌঁছে যায় ঠিক ওপারের ইয়েমেনে। ইয়েমেনের সুফি সাধকেরা রাতভর জিকির ও আধ্যাত্মিক সাধনার সময় জেগে থাকার জন্য কফি পান করতে শুরু করেন। সেখান থেকেই তুর্কিরা কফি নিয়ে আসে ইস্তাম্বুলে। ইস্তাম্বুল শহরে খুব দ্রুত কফি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং সেখানে অনেক কফিহাউস বা কাহভেহানে গড়ে ওঠে। এগুলো ক্রমশ সাহিত্য আড্ডা ও বুদ্ধিবিনিময়ের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। এভাবেই ইথিওপিয়া থেকে ইয়েমেনের সুফিদের হাত ধরে ইস্তাম্বুলের মাধ্যমে সারা ইউরোপ কফির সঙ্গে পরিচিত হয়। তাদের গল্পের মোদ্দা কথা হলো—তুর্কিদের প্রতি সারা পৃথিবীর কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, কারণ তারাই কফি নামের পানীয়টির সঙ্গে বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে তাদের দাবি, টিউলিপ ফুলও নাকি তারাই ইউরোপকে চিনিয়েছে। ওরাই প্রথম লক্ষ্য করে যে টিউলিপ ফুলকে পাশ থেকে আঁকলে আরবি “আল্লাহ” শব্দের আকৃতির সঙ্গে মিলে যায়। এই প্রতীকী মিল থেকেই ফুলটি অটোমান যুগে বিশেষ আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে অটোমান দরবারে টিউলিপকে মর্যাদা ও সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। এ কারণেই অটোমান শিল্পী ও স্থপতিরা টিউলিপ ফুলের মোটিফকে তাদের স্থাপত্য, মোজাইক কাজ ও ক্যালিগ্রাফিতে নিয়মিত ব্যবহার করেছেন। অটোমানদের সঙ্গে বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ ফুলের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে সারা ইউরোপে। এরপর থেকেই টিউলিপ বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে নেদারল্যান্ডসে, যেখানে এটি একসময় অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।

ইস্তাম্বুলের এতো গল্প শোনা আর এত কিছু দেখার পরেও শুধু একটা জিনিস বাদ রইলো, সেটা হচ্ছে সুফিদের নাচ ( The Dancing Darwish) বা ছেমা মহফিল দেখা। আমি তেমন সুফিবাদী মানুষ নই তবে এ বিষয়ে কেন যেন আমার মধ্যে প্রচন্ড কৌতূহল অনুভব করি। যতদূর জানি ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিখ্যাত সুফি সাধক ও কবি জালালুদ্দিন রুমি এই প্রার্থনাময় ধ্যানমগ্ন নাচ উদ্ভাবন করেন অথবা তার গুরু শামস তাবরিজি তাকে এ নাচ শেখান। ভাবতে অবাক লাগে ৮০০ বছর হয়ে গেলো এখনো কোন প্রকার রাস্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই এই কবি প্রতিনিয়ত পূর্ববর্তী  শতাব্দীর চেয়ে আরো বেশি পাঠককে মুগ্ধ ও বিমোহিত করে চলেছেন। রবীন্দ্রনাথ সংশয়ে ছিলেন ১০০ বছর পরে মানুষ তার কবিতা পড়ে কি ভাববে, জালালুদ্দীন রুমি কী চিন্তা করেছিলেন ৮০০ বছর পরে মানুষ তার কবিতা পড়ে কি ভাববে? আমার মনে হয় এইসব নিয়ে তিনি চিন্তা করতেন না। ‘আমিত্ব’ জিনিসটা তার চিন্তা প্রক্রিয়ার মধ্যে কখনো ছিল না তবে একই সাথে তিনি মানুষের সীমাহীন আধ্যাত্মিক বিশালতায় এবং অনিঃশেষ অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন আর সেকারণেই তিনি উচ্চারণ করতে পারতেন,

“You are not a drop in the ocean. You are the entire ocean in a drop” Rumi

সুফিরা বিশ্বাস করে মহাবিশ্বের সবকিছুই একটা অচেনা-অজানা ছন্দ ও লয়ে ঘোরে। তারা বিশ্বাস করে প্রকৃতির মহান এ ছন্দ ও লয়কে নিজের হৃদপিণ্ডের স্পন্দনের সাথে একই ঐকতানে স্পন্দিত করতে পারে শুধু সুফিরা, আর এ স্তরে যেতে একজন সুফিকে কঠোর সাধনা করতে হয়। এ সাধনারই একটি অংশ হচ্ছে এই সুফি নৃত্য বা ছেমা। সুফিরা মহাবিশ্বের যে ঐক্যবদ্ধ ছন্দ ও লয়ের ঐকতান নিজের মধ্যে ধারণের কথা বলে বিখ্যাত তুর্কী লেখিকা এলিফ শাফাক সুফিবাদের গুরু মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি ও তার আধ্যাত্মিক গুরু শামস তাবরিজির জীবন নিয়ে লিখিত তার বিখ্যাত বই The Forty Rules of Love এ সেকথাই খুব সুন্দর একটি বর্ণনার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন, এখানে সেটা তুলে দিচ্ছি,

Everything in the universe moves with a rhythm; the pumping of the heart, the flaps of a bird’s wings, the wind on a stormy night, a blacksmith working iron, or the wounds an unborn baby is surrounded with inside the womb… Everything partakes, passionately and spontaneously, in one magnificent melody. The dance of the whirling dervishes is a link in that perpetual chain. Just as a drop of seawater carries within it the entire ocean, our dance both reflects and shrouds the secrets of the cosmos.

নৃত্যরত সুফিরা অদ্ভুত পোশাক পরে ঐ একই ছন্দ আর লয়কে নিজের মধ্যে ধারণ করার প্ররম আকাঙ্খা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে নাচে।  সূর্য ঘোরে, চন্দ্র ঘোরে, পৃথিবী ঘোরে, আমাদের সৌর জগত ঘোরে তার সব গ্রহ উপগ্রহ নিয়ে, আমাদের মিল্কিওয়েও ঘোরে, ঘোরে সমগ্র মহাবিশ্ব। আমাদের শরীরে মধ্যেও ঘোরে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র  ইলেকট্রন, তাদের সাথে তাল রেখে ঘোরে এই নৃত্যরত সুফিরা। ঘুরতে ঘুরতে তাদের ‘নাফসের’ আমিত্ব, অহংকার, লোভ, পাপ, বস্তুগত পিপাসা সব ঘূর্ণায়মান এই ধ্যানের মাধ্যমে বিসর্জন দিতে চায় সেই এক ও একক পরমাত্মার পানে।

কার নির্দেশে প্রকৃতির এই ঘূর্ণন? এই ঘূর্ণনের কেন্দ্রে কে?

” আকাশ ও জমিনে যা কিছু আছে, সমস্তই স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁরই কাছে আত্মসমর্পন করেছে এবং সব কিছুই তাঁরই দিকে ফিরে যাবে।” (সুরা ইমরান,৮৩)

সুফিবাদের সাথে ক্লাসিক্যাল ইসলামপন্থী বা শরিয়াপন্থীদের একটা বিরাট বিরোধের জায়গা হলো এই সংগীত আর তাদের এই বিশেষায়িত প্রার্থনার নৃত্যধারা। যে কোন দেশের বা অঞ্চলের অভিজ্ঞ সুফিকেই আপনি যখন সংগীত নিয়ে জিজ্ঞাসা করবেন, দেখবেন তিনি স্মিত হাসি মুখে রেখে পৃথিবীর অন্য যে কোন সুফিদের মতো মোটামুটি হুবহু  একই  জবাব দেবেন, যে জবাবটা বিখ্যাত তুর্কী লেখিকা এলিফ শাফাকের কাছ থেকে আবার ধার নিচ্ছি,

Music is underlying all forms of life… All nature is singing.

শরিয়াপন্থীরা মনে করেন শুধুমাত্র পরিশীলিত কথামালা সমৃদ্ধ গান ইসলামে জায়েজ আর তার সাথে অনুমোদিত আরবের বাদ্য দফ , যা অনেকটা ক্ষুদ্র ঢোলের মতো কিন্তু ঢোল যেমন দু’দিক দিয়ে বাজানো যায় এটা কেবল এক দিক দিয়ে বাজাতে হয়। অন্য কোন বাদ্যযন্ত্র শরিয়া পন্থীরা অনুমোদন দেয় না। হদিসে উল্লেখ আছে রাসুল (সাঃ) বিয়ের অনুষ্ঠানে গান শুনেছেন যেখানে গানের সাথে দফ বাজানো হয়েছিলো , তাই দফ অনুমোদন পেয়েছে কিন্তু শরিয়ত পন্থীদের মতে অন্যসব বাদ্যযন্ত্র ও সব ধরনের তারের বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ । কিন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কতোটুকু মেনেছে মুসলিমরা কে জানে, কেননা এক্ষেত্রে প্যারাডক্স হচ্ছে অনেক তারের বাদ্যযন্ত্রের উদ্বভাবকই হচ্ছেন মুসলিমরা। এখানে বিষেশভাবে উত্তর ভারতের অষ্টাদশ শতকের সংগীতজ্ঞ আমীর খসরুর নাম নিতেই হয় যিনি তারের শ্রেষ্ঠ বাদ্যযন্ত্র সেতার আবিস্কার করেছিলেন। এখানে বলে রাখি, এ আমির খসরু আর ত্রয়োদশ শতকের বিখ্যাত সুফি সাধক সংগীত গুরু আমীর খসরু যিনি কাওয়ালী ও উপমহাদেশীয় গজলের জনক এক ব্যক্তি নন।

তবে শরিয়া পিন্থীদের কথা হলো নতুন ধরনের যে কোন ইবাদত পদ্ধতি আবিষ্কার করার অর্থই হচ্ছে বিদাত আর প্রত্যেকটি বিদাতের গন্তব্য সোজা জাহান্নাম। সুফিরা এর উত্তরে বলেন, শরিয়তের যেখানে শেষ, মারিফতের শুরু সেখান থেকে, আর আমরা তো ইবাদত করছি না, আমরা তাঁর সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য এর মাধ্যমে নিরন্তর নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে চাচ্ছি। আর এক্ষেত্রে কোরানের একটি আয়াতকে অনেকেই রেফারেন্স হিসেবে চিন্তা করে, সেটা হচ্ছে,

“….যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোন সৎকাজ করবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্‌ উত্তম পুরস্কারদাতা, সর্বজ্ঞ।”

সুফিবাদের গুরু জালালুদ্দিন রুমি যিনি ছিলেন তার সময়ের সবচেয়ে বড় শরিয়ত পন্থী পন্ডিত। প্রচন্ড যশ ও খ্যাতি সম্পন্ন শরিয়ত পন্থী এই ইসলামি পন্ডিত জীবনের এক পর্যায়ে চরম রহস্যময় সুফি সাধক শামস তাবরিজির সাহচর্যে এসে তাঁর সব পার্থিব যশ ও খ্যাতিকে ধুলায় বিসর্জন দিয়ে এই সুফি নাচ শুরু করলেন। শোনা যায় নিজের যশ ও খ্যাতিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে শামস তাবরিজির কথা মতো তিনি পানশালা থেকে প্রকাশ্যে মদ কিনে আনেন যেনো তার ভক্তরা তার থে দূরে সরে যায় এবং যশ ও খ্যাতির আকর্ষনে নয় শুধুমাত্র বিশুদ্ধ স্রষ্টার প্রেমে তার মন নিমগ্ন থাকতে পারে। শামস তাবরিজির এই শিক্ষা অনুসরণের পরে এক পর্যায়ে তাই এই রুমিকেই বলতে শোনা যায়,

Forget safety.
Live where you fear to live.
Destroy your reputation.
Be notorious.

মোটকথা নিজের আমিত্বকে পরিপূর্ণ বিসর্জন দিয়ে নতুন এক অদেখা অচেনা আধ্যাত্মিক মাত্রায় নিজেকে প্রতিস্থাপনের নিজস্ব লড়াই ই হলো সুফিবাদের পরম কথা। শোনা যায় নাচ শুরুর কয়েক ঘন্টা আগে রুমি একটি বদ্ধ ঘরের মধ্যে নিরবে ধ্যান করতেন। তারপর যে কয়েকজন সুফি নাচে অংশ গ্রহণ করতো তারা একত্রে এসে অজু করতেন ও নামাজ পড়তেন। তারপর তারা সকলে সুফি নাচের কাপড় পরতেন। সুফিদের নাচের এ কাপড়ের নির্দিষ্ট প্রতীকী অর্থ বহন করে। মধু রঙের উঁচু মাথার টুপিকে তারা ব্যবহার করতো কবরের ফলকের প্রতীক হিসেবে, সাদা কাপড়ের পরিধেয় হলো কাফনের কাপড়ের প্রতীক আর কালো রঙের আলখেল্লা হলো অন্ধকার কবরের উপস্থাপন। অবশেষে সেই প্রস্তুতি কক্ষ থেকে সুফি নাচের মঞ্চে আসার সময় রুমি উচ্চারন করতেন একটি কবিতা, সেটি হচ্ছে,

আমাদের জ্ঞান এখন আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রেয় ও পৃথিবীর ষষ্ঠ দিক অতিক্রম করে এর বাইরের মাত্রাকে অনুভব করতে যাচ্ছে।

এরপরই বাঁশি বেজে উঠতো আর আস্তে আস্তে রুমি মঞ্চে প্রবেশ করতেন, তার সাথে সাথে অন্য ছয়জন দরবেশও প্রবেশ করতেন, সবশেষে প্রবেশ করতেন শামস তাবরিজি । তখন একজন কোরান থেকে তিলাওয়াত করতেন,

নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে নিদর্শন রয়েছে এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও, তোমরা কি দেখো না? (সুরা যারিয়াত, ২০-২১)

এরপরই শুরু হতো সুফি নাচ বা ছেমা। সফরের শেষ দিকে এক বিকেলে বন্ধু শামিমকে নিয়ে গেলাম মাওলানা রুমির প্রবর্তিত সেই বিখ্যাত ‘ঘূর্ণন নৃত্য ‘ বা ছেমা দেখতে। বেশ পুরনো স্টেইন্ড গ্লাসে ঘেরা এক বিশাল উঁচু ঘরের মধ্যে আমরা গোল হয়ে বসলাম, গোলের মাঝখানে কিছুক্ষন পর শুরু হলো সেই সুফি নৃত্য বা ‘দরবিশ নাচ’। স্টেইন্ড গ্লাসের ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের হালকা আলো এসে ঘূর্ণয়ামান সুফিদের উপর পড়ে এক অন্য মাত্রার আবহ তৈরি করেছে। বিচিত্র হালকা বাদ্যযন্ত্রের সাথে কোরানের আয়াত আর দুরুদের সংমিশ্রণে অদ্ভুত ছন্দ আর তালে তালে ঘুরে ঘুরে উর্ধ্বাকাশে হাত উঠিয়ে নাচ।

নাচ মানে শুধু বিভিন্ন ভংগিমায়  ঘুর্ণন, অন্য কোন মুদ্রার ব্যবহার তেমন নয়। বিচিত্র অপার্থিব ছন্দ, লয় আর তিলাওয়াতের আবহে ঘুর্ণণ হঠাৎ কমে আসে, কখনো সম্পুর্ন থেমে যায়, আবার শুরু হয় ঘূর্ণন। আবার কখনো ঘুর্ণনের বেগ হয় তীব্র। ডান হাত উপরে তোলা আর বাম হাত মাটির দিকে নামানো অবস্থায় বিরামহীন ঘুরে ঘুরে নাচ। ডান হাত উপরে উঠিয়ে রাখার প্রতীকী অর্থ হলো উর্ধাকাশ থেকে স্রষ্টার কাছ থেকে রহমত চেয়ে নিয়ে নিম্নগামী বাম হাতের মাধ্যমে তা সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়া। সুফিরা বিশ্বাস করে এভাবে ঘূর্ণনের সময় উর্ধে তুলে ধরা হাতের মাধ্যমে রহমত গ্রহণ করে তারা স্রষ্টা আর সৃষ্টির মধ্যে রহমত বিতরনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।আমার সামনে তখন সেই ৮০০ বছর আগে রুমির প্রবর্তিত পোশাক পরে একালের সুফিরা অনবরত ঘুরে ঘুরে নেচেই চলেছে। চোখের সামনে চলছে অবিরত ঘূর্ণন।  দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই আমিও সেই ঘূর্ণন নিজের মধ্যে অনুভব করতে থাকি। কোরানের যে সব আয়াত গুলোর অর্থ জানতাম সেই সব আয়াত যখন পড়া হচ্ছিলো তখন নিজের মধ্যে কেমন যেন এক ধরনের অপার্থিবতা  অনুভব করতে থাকি। আস্তে আস্তে ঘূর্ণন ক্লাইমেক্সে চলে আসে, একদম শেষের দিকে উচ্চারিত হতে থাকলো সুরা হাশরের সেই বিখ্যাত শেষ  তিন আয়াত। আয়াতের শেষ দিকে আল্লাহর অনেক সুন্দর সুন্দর নামের পর বলা হয়েছে “আসমা উল হুসনা”, অর্থাৎ, সকল সুন্দর নাম সমূহই তাঁর। পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের যেকোন ভাষা পরিভাষায় তাঁর সত্তার সংগে সংগতিপূর্ণ যে কোন সুন্দর নামেই তাঁকে ডাকা যাবে। শুধুমাত্র ৯৯টি নামের মধ্যে তিনি সীমাবদ্ধ নন।

” তিনিই আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তিনিই অধিপতি, পবিত্র, নিরবদ্য, নিরাপত্তা বিধায়ক, রক্ষক, পরাক্রমশালী, প্রবল, গর্বের অধিকারী। যারা তার শরীক স্থির করে, আল্লাহ তা হতে পবিত্র মহান।

তিনিই আল্লাহ সৃজনকর্তা, উদ্ভাবন কর্তা, রূপদাতা, তাঁরই সকল উত্তম নাম  (আসমা উল হুসনা)।আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে, সবকিছুই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরীক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।  (সুরা হাশর,২২-২৪)

আগেই বলেছি ক্রমশ অপার্থিব এক সুখময় অনুভূতির মধ্যে তলিয়ে যেতে লাগলাম। সময় যেন স্তব্ধতায় অবরুদ্ধ হয়ে গেলো। একদম শেষ মুহূর্তে মনে হলো নৃত্য, বাদ্য, ঘূর্ণনশীল প্রার্থনারত উর্ধ্বমুখী হাতগুলি সব একত্রে একাকার হয়ে কাঁদছে। একপর্যায়ে নাচ শেষ হলো, বাদ্য শেষ হলো, ঘূর্ণন শেষ হলো, সব শেষ হলো কিন্তু আমার মধ্যে ঘূর্ণন তখনও শেষ হয়নি। মনে হচ্ছিলো বিরাট হলের মধ্যে শুধু আমি একা। চারপাশে আর কেউ নেই। আলোও নয় অন্ধকারও নয়, সম্পূর্ণ অন্য এক অচেনা-অদেখা আবহের মধ্যে শুধু আমি একা বসে আছি। এরপর অনেকক্ষণ পরে যখন স্বাভাবিক হয়ে উঠলাম, হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম আমার দু’চোখ কখন ভিজে গেছে আমি খেয়ালই করিনি।

১৯ জুলাই, ২০২০

আরও পড়ুন