জুরিখ থেকে প্রাগের পথে ইউক্রেনের শরণার্থী

এ বছর মে মাসের শেষ সপ্তাহের গল্প। সুইজারল্যান্ডের জুরিখ থেকে আমরা চার স্থপতি মাসুদ, টিটো, মারুফ আর আমি প্রাগ যাচ্ছি। মাঝপথে জার্মানির মিউনিখের Munich Hauptbahnhof স্টেশনে ট্রেন বদলিয়ে সেখান থেকে সোজা প্রাগ। Munich-কে জার্মানরা লেখে München, আর München Hauptbahnhof শব্দের অর্থ হলো ‘মিউনিখ কেন্দ্রীয় স্টেশন’। ইংরেজিতে Prague লিখলেও জার্মানরা Praha লেখে। কোনো জায়গা বা ভিনদেশি কোনো মানুষের নামের ইংরেজি বানান ও উচ্চারণ আমি সব সময়ই সন্দেহের চোখে দেখি। কেননা ব্রিটিশরা সারা পৃথিবীতে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের সঙ্গে সঙ্গে আরো যে একটি মহাপাপ করেছে তা হচ্ছে তামাম পৃথিবীর অসংখ্য স্থান ও ব্যক্তির নামের উচ্চারণ ও তার সঙ্গে সঙ্গে বানান বিকৃতি ঘটিয়ে এক অপমানজনক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। এ বিকৃতি থেকে অনেক জাতিই বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে, তবে আরো কতো শতাব্দী লাগবে সম্পূর্ণভাবে এ জঞ্জাল সরাতে তা কে জানে। সে কারণেই বিশাল কিন্তু ইউরোপীয় মানদণ্ডে কিছুটা জরাজীর্ণ মিউনিখ স্টেশনে Prague-এর পরিবর্তে Praha লেখা দেখে আমার সেই পুরোনো সন্দেহ আবার সজাগ হয়ে উঠলো।দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি কিছুটা উপশমের জন্য আমরা এ-যাত্রায় অনেকটা ব্যতিক্রমী মাত্রার সাহস দেখিয়ে ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কেটে ফেলেছিলাম। যথারীতি মিউনিখ থেকে ট্রেনে উঠে দেখি ফার্স্ট ক্লাস কেবিনগুলোর মধ্যে এক এলাহি কাণ্ড। ট্রেনের ভেতরে

বেশির ভাগ যাত্রীরই কেমন জানি অপরিচ্ছন্ন আর ছন্নছাড়া চেহারা। কারো কারো পায়ে আমাদের দেশের দরিদ্র মানুষের মতো সস্তা রঙিন প্লাস্টিকের ময়লা স্যান্ডেল। স্যান্ডেলের ফাঁক দিয়ে তাদের ময়লা বুড়ো আঙুল দেখা যাচ্ছে।এতো দিন দেখে আসা ঠিক ইউরোপীয় পরিচ্ছন্ন ও পরিমিত জামাকাপড় পরা নাগরিক চেহারা ও জীবনাচরণের সঙ্গে এদের কিছুই মিলছে না। এদের কারো সঙ্গেই সুটকেস জাতীয় কিছু দেখছি না, বরং সবার সঙ্গেই আমাদের এগারোসিন্ধুর এক্সপ্রেসের বিনা টিকিটের হতদরিদ্র যাত্রীদের মতো পোঁটলা-পুঁটলি আর গাট্টি-বোঁচকা। একটু পরেই জানতে পারলাম, এরা সবাই যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের উদ্বাস্তু। ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাসের প্রায় সব কেবিনই তারা জোর করে দখল করে ফেলেছে। আমাদের ভাগ্য ভালো, ট্রেনের এক নিরাপত্তারক্ষীর সহযোগিতায় আমরা আমাদের

কেবিনটার দখল নিতে পারলাম। নিরাপত্তারক্ষী জানালো, তাদের প্রতি নির্দেশ আছে ইউক্রেনের উদ্বাস্তুদের কিছুই বলা যাবে না।আগেই এক লেখায় বলেছিলাম আমাদের মধ্যে মাসুদের একটি প্রধান গুণ হচ্ছে, ও কয়েক মিনিটের মধ্যেই মানুষের সঙ্গে খাতির তৈরি করতে পারে। এখানেও সেটাই দেখলাম, কিছুক্ষণ পরেই মাসুদ উদ্বাস্তু দলের একাংশের সঙ্গে খাতির করে ফেললো আর এক উদ্বাস্তু কিশোরকে আমাদের কেবিনে নিয়ে এসে তার সঙ্গে অনর্গল মজার আলাপ শুরু করে দিলো। ভাবখানা এমন যে কিশোরটি যেন ওর খালাতো বা মামাতো ভাই, যদিও দুজনের কেউই কারো ভাষা বোঝে না।

ইউক্রেন সোভিয়েত রাশিয়া থেকে আলাদা হয় ১৯৯১ সালে। এর বেশ কয়েক বছর পর আমি রাশিয়া গিয়েছিলাম। সেখানে তখন অনেক ইউক্রেনীয়র সঙ্গে আমার সখ্য হয়েছিল। সে সময় আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সে অনুযায়ী রুশ আর ইউক্রেনীয়দের মধ্যে আমি তেমন কোনো তফাত দেখিনি। নামেমাত্র বর্ডার ছিল, কিন্তু দুই দেশের মানুষই নিত্য এপার-ওপার যাতায়াত করতো। মস্কোর প্রায় সব পরিবারেই ইউক্রেনীয় আত্মীয়স্বজন ছিল। মস্কোতে আমার যে বন্ধুর বাসায় আমি উঠেছিলাম তার পত্নীই ছিল ইউক্রেনীয় আর ওর মেয়ে রুশ হলেও থাকতো কিয়েভে। আমি যে কয়েক দিন ছিলাম প্রতিদিনই দেখতাম ইউক্রেন থেকে কোনো না কোনো আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধব সে বাসায় আসতো আর হাসি-তামাশা, গালগল্পে ও মদ্যপানে মাতিয়ে রাখতো সারা অ্যাপার্টমেন্ট। মদ্যপানের ফলে তারা কেউ মাতাল হতো না তবে একটাই সমস্যা ছিল, সেটা হচ্ছে, মদ্যপানের পর তাদের কেউ কেউ কেন যেন অ্যাপার্টমেন্টের লিফটের মধ্যে প্রস্রাব করে ভরিয়ে ফেলতো। ভাবতে অবাক লাগে, আজ এরা একে অন্যের চরম শত্রু।

প্রাগের যাত্রাপথে ট্রেনে আমি যেসব ইউক্রেনের উদ্বাস্তু দেখেছি তারা খুব বিপদগ্রস্ত ও অপরিচ্ছন্ন পোশাক পরিহিত ছিল, তাদের সঙ্গে ছিল অনেক গাট্টি-বোঁচকা। কিন্তু সত্যি করে বলতে গেলে আমি তাদের চোখে-মুখে তেমন অসহায় কোনো ভাব দেখিনি। তারা সবাই পুরোটা সময় চিৎকার-চেঁচামেচি আর হাসি-তামাশা কর‍তে করতে যাচ্ছিল। হয়তো পুরোটাই আমার বোঝার ভুল। গভীর বিপদে মানুষ বোধ হয় এমনই নির্বিকার আচরণ করে অথবা হয়তো আমরা যে অংশকে দেখেছি পশ্চিম ইউরোপের উন্নত অর্থনীতি, সমাজ ও চাকচিক্যময় জীবন তাদের সামনে কোনো নতুন সম্ভাবনার দরোজা খুলে দিয়েছে বলে তারা হয়তো মনে করেছে। অথবা হয়তো সম্পূর্ণই অন্য কিছু, জগতের কতোটুকুই বা আমরা বুঝি।

মাহফুজুল হক জগলুল
৩১ জুলাই, ২০২২

আরও পড়ুন