ঠাকুরোভা, প্রাগের রবীন্দ্র চত্বর
যতোদূর জানি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুইবার ভিয়েনা হয়ে প্রাগে গিয়েছিলেন। প্রথমবার ১৯২১ সালে, প্রথম মহাযুদ্ধের পরপরই আর পরেরবার ১৯২৮ সালে। ১৯২১ সালে তাঁর সংক্ষিপ্ত সফরে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। তখন মাত্র কয়েক বছর আগে ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তিনিই প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। সারা পৃথিবীর সংস্কৃতিবান মানুষ শুনতে চায়, জানতে চায় এই ঋষির মতো দেখতে মানুষটির কথা। সদ্য যুদ্ধোত্তর ইউরোপীয় সন্ত্রস্ত মানসে তাই তখনকার তাঁর বক্তব্যগুলো সেখানকার বিপর্যস্ত শিল্পী ও সৃজনশীল সমাজের মধ্যে এক নতুন চিন্তা আর বিশেষ করে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের কারণে জন্ম নেওয়া সর্বব্যাপী হতাশার বিপরীতে এক নতুন আশাবাদ ও সৃজনশীলতার সূত্রপাত করে, এর মাধ্যমে প্রাগ তথা ইউরোপীয় চিন্তাশীল সমাজ বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত হয়।
যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ কবিকে সরাসরি স্পর্শ করতে না পারলেও এ সময়ের অনেক আগেই তিনি হারিয়েছেন তাঁর স্ত্রী, পিতা ও দুই সন্তান। তাই প্রিয়জন হারানোর কষ্ট তিনি নিজের জীবন দিয়েই এরই মধ্যে অন্তরের গভীরে অনুভব করেছেন। ১৯২৮ সালের সফরে প্রাগের জাতীয় নাট্যশালায় রবীন্দ্রনাথের দুটি নাটকও মঞ্চস্থ হয়েছিল।
সার্বিকভাবে রবীন্দ্র দর্শন তৎকালীন প্রাগের চিন্তাশীল শিল্পী আর বুদ্ধিজীবী সমাজকে বিশেষভাবে আলোড়ত করেছিল আর তার স্বীকৃতি হিসেবে প্রাগ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির বিশাল মনোরম চত্বরে শহরের জোন-৬-এর একটা এলাকার নাম দিয়েছিলেন তাঁরা ঠাকুরোভা (Thakurova) আর এখানে একটি সুন্দর ঘাসের চত্বরের ওপর স্থাপন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ ভাস্কর্য । প্রাগে এসে গতকল গিয়েছিলাম এই ঠাকুরোভায়। কিন্তু সেখানে রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য খুঁজে পেতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।
গমগম করা প্রাণোচ্ছল প্রাগ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে অনেক ছাত্রছাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম। তারা কেউই বলতে পারে না রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্যটি কোথায় বা আদতে এমন কোনো ভাস্কর্য আছে কি না। সামনে ইউনিভার্সিটির বিশাল আধুনিক লাইব্রেরি ভবন আর লাইব্রেরির নিচেই চমৎকার ক্যাফেটেরিয়া। অগত্যা সেখানে বসে লাঞ্চ করলাম আর আশপাশের ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞেস করলাম রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য সম্পর্কে। এতো ছাত্র আর শিক্ষক কিন্তু সেখানেও ওই একই অবস্থা, কেউই জানে না এমন কোনো ভাস্কর্যের কথা। এক পর্যায়ে রেগে গিয়ে বললাম—
আরে বাবা, এ জায়গার নাম ঠাকুরোভা কেন হলো তা জানো তোমরা?
আমাদের রাগের উত্তরে তারা শুধু বিব্রতভাবে ভদ্রোচিত সুন্দর হাসি দেয়; কিন্তু কিছু বলে না। দেখলাম, কাছেই বিশাল আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্ট ভবন। ভাবলাম সেখানে যাই, আমার ধারণা ছিল আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের পোলাপানরা সাধারণত অনেক সেয়ানা হয়, তারা সারা জীবন অনেক প্রয়োজনীয় আর অপ্রয়োজনীয় জিনিসের খোঁজ-খবর রাখে, নিশ্চয়ই এটাও তারা জানবে। কিন্তু না, আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো, দেখলাম এখানকার আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের পোলাপানরা আরো বেশি ভেজিটেবল।
শেষমেশ এক লিকলিকে পড়ুয়া টাইপ ছাত্র পেলাম, যে খুব ব্যস্তসমস্তভাবে কোথায় যেন যাচ্ছিল। সে-ই একমাত্র বলতে পারলো ভাস্কর্যের লোকেশন, তবে তার ওপর আমাদের তেমন ভরসা হলো না। তাই তাকে অনুরোধ করলাম আমাদের সেখানে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে। কিন্তু সে যেতে রাজি হলো না, সাধারণত সিরিয়াস ভাবধারার ছাত্ররা একটু কম পরোপকারী হয়ে থাকে। তাই সেটা মেনে নিয়েই তার নির্দেশিত পথেই আমরা এগোলাম আর কিছুক্ষণ হাঁটার পরই পেয়ে গেলাম দুই পাশে বিশাল গাছের সারির মাঝে সবুজ ঘাসের চত্বরের মাঝে আমাদের রবি ঠাকুরের আবক্ষ ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য।
আসলে নতুন প্রজন্মের নতুন জগতের নতুন আকাঙ্ক্ষায় এখানকার যুবক-যুবতীরা রবীন্দ্রনাথকে বোধ হয় এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি। হয়তো পারবেও না কোনো দিন, অথবা হয়তো পারবে কোনো একদিন। যাই হোক, ভাস্কর্যটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, আমার রবীন্দ্রনাথকে এ জাতি সম্মান করেছে, সে সম্মান আমার অস্তিত্বকেও ছুঁয়ে গেছে অবলীলায় অনেক গভীরে। কোনো এক অদ্ভুত জাদুতে আমিও তখন সব কিছুর সঙ্গে সম্মানিত ও একাত্ম বোধ করতে লাগলাম। নিজের অজান্তেই আমার মনের গভীর থেকে সেই গান বেজে উঠলো—
বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো
সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারো।
নয়কো বনে, নয় বিজনে
নয়কো আমার আপন মনে,
সবার যেথায় আপন তুমি, হে প্রিয়,
সেথায় আপন আমারো
এই সুদূর ইউরোপের অচেনা মাটিতে একজন বাঙালি হিসেবে, একজন বিশ্ব নাগরিক হিসেবে এর চেয়ে বেশি আমি কী-ই বা আর চাইতে পারি?
মাহফুজুল হক জগলুল
প্রাগ, চেক রিপাবলিক
৩১ মে, ২০২২

