বছরখানেক আগে মাদ্রিদের এক বিশাল গোলচক্করের পাশের প্রশস্ত ফুটপাতে দাঁড়িয়ে চতুর্দিক দেখছি আর শহরটাকে নিজের মতো করে বোঝার চেষ্টা করছি। এমন সময় কানে এলো,
ভাই, আমি তাওহিদ, সুইডেনের তাওহিদ।
তাকিয়ে দেখি ছোটখাটো একজন মানুষ মুখে একটা অদ্ভুত শান্ত আর নির্মল হাসি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এমন নিখাদ সুন্দর হাসি জীবনে খুব কম দেখেছি। তাওহিদের সঙ্গে আমার পরিচয় কয়েক বছর আগে জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে, সামনাসামনি এই প্রথম দেখা। প্রথম ধাক্কাটা সামলে নিয়েই আমি চিনতে পারলাম, এই সেই তাওহিদ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতক সম্পন্ন করা স্থপতি তাওহিদ।
এরপর তাওহিদের সঙ্গে অনেক ইন্টার-অ্যাকশন হয়েছে। যতোই ওর সঙ্গে মিশেছি ততোই বিস্মিত ও মোহিত হয়েছি ওর নানা রকম গুণ আর চারিত্রিক সৌন্দর্য দেখে। ও খুব ভালো ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছে, বহু সংগঠন করেছে, বর্তমানে সুইডেনের বাম রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত, Architectural Lighting-এর ওপর সে একজন আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞ, আরো অনেক কিছু। তবে ওর যে জিনিসটা আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে সেটা হচ্ছে ওর নির্ভেজাল বিনয়, আন্তরিক দায়িত্বশীলতা আর অন্তরঙ্গ আতিথেয়তা। জীবনে আমি অনেক বিনয়ী মানুষ দেখেছি, এদের অনেকেই বিনয়ী হওয়া উচিত সে কারণে বিনয়ী বা সামাজিক দায়িত্বশীলতার কারণে বিনয়ী বা কৃত্রিমভাবে আরোপিত বিনয়ী; কিন্তু তাওহিদ হচ্ছে একদম অকৃত্রিম ও মজ্জাগত ন্যাচারাল বিনয়ী। বিনয় উঠে এসেছে একদম ওর ধমনি, শিরা-উপশিরার মধ্যে প্রবাহিত লোহিত কণিকার ভেতর থেকে। হৃদয়ের গভীরতম অন্তস্তল থেকে। সেখানে বিন্দুমাত্র খাদ নেই। ওকে যতো দেখেছি ততোই অবাক হয়েছি।
কয়েক মাস আগে যখন কোপেনহেগেনের UIA Congress-এ আমরা আইএবি থেকে একটা বড়ো প্যাভিলিয়ন নিলাম আমাদের দেশের স্থাপত্য আর আমাদের স্থপত্যের আউটসোর্সিং করার সক্ষমতাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে, সে কার্যক্রমে তাওহিদ প্রবাসে থেকেও এগিয়ে এসেছিল সবার আগে। প্রথম দিকে একটি অপরিচিত দেশে, অপরিচিত ভেন্যুতে ও অপরিচিত কন্ট্রাক্টর নিয়োগ করে এই প্যাভিলিয়ন নির্মাণ করতে গিয়ে মহাবিপদে পড়ে গিয়েছিলাম ঢাকায় বসে পরিকল্পনা করা আমরা একদল স্থপতি। সত্যি কথা বলতে গেলে একদম যেন অকূল মহাসমুদ্রে পড়ে গিয়েছিলাম। সে অসহায় অবস্থায় একদিন সদ্য হার্ট সমস্যায় হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরা তাওহিদকে স্টকহোমে ফোন করে ওর কাছে কিছু পরামর্শ চাচ্ছিলাম। বাঙালি জাতি সারা বিশ্বের মধ্যে পরামর্শদানে মহা ওস্তাদ। ভাবছিলাম তাওহিদও হয়তো সে রকম কোনো ওস্তাদি পরামর্শ দেবে। কিন্তু না, সে অন্য সবার মতো কোনো পরামর্শের সহজ পথে গেল না। পরেরদিন সেই অসুস্থ শরীর নিয়ে রাতের ট্রেনেই ও স্টকহোম থেকে সোজা কোপেনহেগেন গিয়ে সাইট পরিদর্শন করলো। কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে মিটিং করলো। সেই কন্ট্রাক্টর অনেক এক্সপেন্সিভ বলে দুদিন কোপেনহেগেনে থেকে আরো দুজন কন্ট্রাক্টর খুঁজে বের করলো, এদের মধ্যে একজন আবার বাংলাদেশি। তাওহিদের জন্যই সে যাত্রায় আমরা অকূল সমুদ্রে কূলের দেখা পাই।
তাওহিদকে ট্রেন ভাড়া ও হোটেল ভাড়া দিতে চেয়েছি বহুবার, কোনোভাবেই সেটা দিতে পারিনি। এরপর যখন প্যাভিলিয়ন উদ্বোধন হয়েছে, রিলিজিয়াসলি সেখানে একদম সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছে। অবাক হয়ে দেখেছি, যারা যারা সেখানে দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল, তাদের অনেকের মধ্যেই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা দেখেছি ও ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু তাওহিদকে এক মুহূর্তের জন্যও দায়িত্ব পালন থেকে সরে যেতে দেখিনি, বরং যা তার দায়িত্বের মধ্যে রাখা হয়নি, হাসিমুখে সেগুলোও অনবরত নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। যেকোনো দায়িত্ব স্বজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া তাওহিদের একটা প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। মানুষ ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়, তাওহিদ ঘরের খেয়ে বনে মোষ, গরু, বাঘ, ভল্লুক সব তাড়ায়, পারলে বনের আগাছাও পরিষ্কার করে। গত জুলাই মাসে সুইডেন ভ্রমণের সময় সেটা বারবার দেখেছি। শুধু আমি একা না, আমাদের অনেকেই সেটা দেখেছে। সুইডেনে যে কদিন ছিলাম, দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টাই তাওহিদ ছিল সঙ্গে। রাত দুটোর সময়ও তাওহিদ আমার হোটেলে, আবার খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখেছি তাওহিদ ঠিক সময়মতো এসে হাজির হয়েছে।
গতকাল ছিল নিখাদ বিনয়ী আর অসম্ভব সুন্দর মনের আমার এই ছোট ভাইটির জন্মদিন। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমার এই ভাইটিকে ও ওর পরিবারের সবাইকে অনেক অনেক ভালো রাখেন, সুস্থ রাখেন ও সুখে রাখেন।
৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৩