বায়ারজারগাল, মঙ্গোলিয়ার এক মহিলা রাখাল

উলানবাটোর থেকে ২৮০ কিলোমিটার পশ্চিমে এলসেন তাসারখাই (Elsen Tasarkhai), প্রায় ৮০ কিলোমিটার দ্বীপের মতো একটা বিচ্ছিন্ন মরু অঞ্চল, যা অনেক উঁচু-নিচু বালিয়াড়ি দিয়ে ভরা আর যেখানে মঙ্গোলিয়ার বিখ্যাত দুই কুঁজের উটেরও আবাস। সেখানে উটের পিঠে অনেকক্ষণ বালিয়াড়ি ঘুরে দেখে আমরা যখন প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূরে চলে গেছি, তখন দিগন্ত বিস্তৃত সীমাহীন তৃণভূমির মাঝে হঠাৎ এই মহিলার সঙ্গে দেখা। অনেক দূর থেকেই আমরা বিরাট একটা পেশিবহুল খয়েরি রঙের ঘোড়ার ওপর তাঁর ঋজু হয়ে বসে থাকা দেখছিলাম। ঘোড়ায় চড়ে চড়ে তিনি তাঁর কয়েক হাজার গবাদি পশুর পেছন পেছন ধীরে ধীরে চলছিলেন। তাঁর পশুর পাল লম্বায়ও বোধ হয় দুই কিলোমিটার বা তার বেশি হবে। মঙ্গোলীয় ল্যান্ডস্কেপের রহস্যই হলো এর স্কেল বোঝা যায় না মোটেই। দূর থেকে যাকে একটা ছোট শিলাখণ্ড ভেবেছিলাম, বাইনোকুলার দিয়ে দেখলাম সেটা একটা বন্য ঘোড়া।

ঘোড়ার পিঠে ভ্রুক্ষেপহীন তাঁর দৃঢ় বসে থাকার মধ্যে কেমন যেন একটা সম্মোহনী আকর্ষণ ছিল। আমরা গাড়ি ঘুরিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে দোভাষীর মাধ্যমে অনেকক্ষণ কথা বললাম। উনার নাম বায়ারজারগাল, বয়স বললেন পঞ্চান্ন। মহিলারা বয়স জিজ্ঞেস করলে সাধারণত অস্বস্তি বোধ করে, তবে উনার মধ্যে সে ধরনের কিছুই ছিল না। তিনি আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন খুব ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে। একটা অতিরিক্ত বাক্য তাঁর কথায় ছিল না। তাঁকে অভদ্র বলা যাবে না, আবার নগরের মানুষ দেখে গ্রামের মানুষ যেমন গদগদ হয়ে কথা বলে তাও তাঁর মধ্যে ছিল না বিন্দুমাত্র। আমরা যে তাঁর জগতে খুব আমন্ত্রিত তা তাঁকে দেখে মনে হয়নি, আবার আমরা যে তাঁর কাছে খুব তুচ্ছ তাও মনে হয়নি। দিগন্ত বিস্তৃত মঙ্গোলীয় তৃণভূমির নিসর্গের মতোই তাঁর দেহ-ভাষায় ছিল এক ধরনের আজন্ম নির্মোহতা। তিনি বললেন, তাঁর এ পালে হাজারখানেক ভেড়া আর ছাগল আছে। উনি এক হাজার বললেও আমার মনে হয়েছে এর সংখ্যা অনেক বেশি। এক একটা ছাগল অনেকটা আমাদের দেশের ছোট গরুর সাইজের। এতো বিশাল পশুর পাল ওই সীমাহীন প্রান্তরে তিনি মাত্র একা সামলাচ্ছিলেন। আমাদের সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন তখনো তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল সামনে এগিয়ে চলা পশুর পালের দিকে।

পশুর পালের প্রধান শত্রু হঠাৎ আক্রমণ করা নেকড়ের পাল, সাধারণত দুর্বল আর শিশু পশুদের ওরা নিশানা করে। মহিলার চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছিল যে এমন যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সকালে উঠে পশুর পাল যেদিকে হাঁটা শুরু করে এরাও তাদের গের (বসবাসের গোলাকার মঙ্গোলীয় তাঁবু) গুটিয়ে সেই দিকে ওদের পিছু পিছু সপরিবারে অনুসরণ করতে শুরু করে। তাদের মতে, পশুরা তাদের চেয়ে অনেক ভালো জানে কোন অঞ্চলে বা কোন পাহাড়ের ঢালে তাজা ঘাস আছে আর আছে পানি। সৃষ্টিকর্তা ওদের এ জ্ঞানটি ( instinct) মানুষের চেয়ে অনেক বেশি দিয়েছেন। তাই পশুদের অনুসরণ করার মাধ্যমে ওরা সৃষ্টিকর্তার নিদর্শনকেই যেন অনুসরণ করে। সে কারণে জীবন নিয়ে ওদের কোনো অভিযোগ আর উৎকণ্ঠা নেই। তাই ওরা এই নারীর মতো একই সঙ্গে স্বাধীন আর নির্লিপ্ত, কিন্তু মোটেই কর্মবিমুখ নয়।

মাহফুজুল হক জগলুল
এলসেন তাসারখাই অঞ্চল, মঙ্গোলিয়া
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আরও পড়ুন